আইপিও অনুমোদন: বিনিয়োগকারীদের ভবিষ্যত নিয়ে ছিনিমিনি খেলবেন না

ব্যবসা সম্প্রসারণ কিংবা ব্যাংক লোন পরিশোধে বেশিরভাগ কোম্পানি আইপিও’র (প্রাথমিক গণ প্রস্তাব) মাধ্যমে পুঁজিবাজারে তালিকাভুক্ত হয়ে অর্থ উত্তোলন করে থাকে। আইপিও’তে আসার আগে কোনো কোনো কোম্পানির প্রসপেক্টাসে মুনাফা,ইপিএস ফুলিয়ে ফাঁপিয়ে দেখানো হলেও দুই তিন বছর গত হলেই সেগুলোর আসল রহস্য উন্মোচিত হয়েছে। প্রফিট কম দেখানো, ডিভিডেন্ড না দেয়া, পরিচালকদের অন্তর্দ্বন্দ্ব, বিভিন্ন ঋণ কেলেঙ্কারিতে জড়িয়ে পড়া, একসময় পুরো কোম্পানিটিকেই ভেতর থেকে শেষ করে দেয়া হচ্ছে যেমনটি কাজীর গরু কেতাবে থাকার মতো। এতে প্রতিনিয়ত বিনিয়োগকারীরা ক্ষতির মুখে পড়লেও আজ পর্যন্ত কোনো পরিচালক খারাপ অবস্থায় রয়েছে তেমন উদাহরণ নেই। তালিকাভুক্ত এমনও কোম্পানি রয়েছে যার পরিচালকরা বিনিয়োগকারীদের কাছ থেকে টাকা নিয়ে নিজেদের অন্য কোম্পানিতে বিনিয়োগ করেছে। কোম্পানির পণ্য এমন কোনো গ্রাম নেই যেখানে বিক্রি হচ্ছে না। কিন্তু বছরের পর বছর তারা লোকসান দেখিয়ে বিনিয়োগকারীদের ডিভিডেন্ড বঞ্চিত করছে। অন্যদিকে ভেতর ভেতরে পরিচালকরা নানা স্বাদের ক্রিম খাচ্ছে। তাদের কাছে তালিকাভুক্ত কোম্পানি মানেই লুটপাটের স্বর্গরাজ্য। ক’দিন পর দেখা যায় তাদের বিরুদ্ধে আর্থিক প্রতিষ্ঠানের অর্থ ঋণ আদালতে মামলা হয়েছে, পত্রিকায় বিশাল বড় নিলাম বিজ্ঞপ্তি চলে এসেছে। তালিকাভুক্ত এমনও একাধিক কোম্পানি রয়েছে যেগুলোর পণ্য শুধু দেশেই নয় বিদেশেও জনপ্রিয় হয়ে উঠেছে। অথচ পরিশোধিত মূলধনের বিপরীতে যে পরিমাণ ডিভিডেন্ড প্রদান করে মুনাফার তুলনায় তা কিছুই নয়।

কিন্তু এগুলো দেখার দায়িত্বে কেউই নেই। বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশন (বিএসইসি) শুধুমাত্র ডিসক্লোজার ব্যাসিসে তালিকাভুক্তির অনুমোদন দিয়ে থাকে। স্টক এক্সচেঞ্জ শুধুমাত্র কোম্পানির দেয়া কাগজপত্রের ওপরই নির্ভরশীল। সেদিনও বিএমবিএ’র নতুন অফিসের উদ্বোধনকালে বিএসইসির চেয়ারম্যান ড. খায়রুল হোসেন বলেছেন, বিএসইসি শুধু ডিসক্লোজার ব্যাসিসে আইপিও অনুমোদন দিয়ে থাকে। তাই মার্চেন্ট ব্যাংকগুলোকে ইস্যু আনতে সতর্কতা অবলম্বন করতে তিনি বলেছেন। এখন একটি কোম্পানির আগা-গোড়া দেখার দায়িত্ব শুধুমাত্র ইস্যু ম্যানেজারকেই দিয়ে দিলে সমস্যা আরো জটিল হয়। কারণ মার্কেটে ইস্যু আনতে ইস্যু ম্যানেজারদের যেভাবে প্রতিযোগিতা করতে হয় তাতে অনেক ভেতরগত সমস্যা জানা থাকলেও স্বার্থের কারণে লুকাতে হয়। তাই শুধুমাত্র ডিসক্লোজার ব্যাসিসে বিএসইসি’র আইপিও অনুমোদন দেয়া কতটুকু যুক্তিযুক্ত তা যথেষ্ট প্রশ্নবিদ্ধ । অবশ্য বিএসইসি নিজেদের দায় বিনিয়োগকারীদের গলায় চাপিয়ে দিয়ে সাফ জানিয়ে দিয়েছে যে “শেয়ারবাজারে বিনিয়োগ ঝুঁকিপূর্ণ, জেনে ও বুঝে বিনিয়োগ করুন”। একজন বিনিয়োগকারীর পক্ষে কোনো কোম্পানির ২০০ শেয়ার কেনার আগে সেই কোম্পানির পরিচালনা পর্ষদের খবর নেয়া, ফ্যাক্টরীর প্রকৃত অবস্থা জানা কতটুকু সম্ভব তা সহজেই অনুমেয়। এ্যাপোলো ইষ্পাত যখন তালিকাভুক্ত হয় তখন ডিএসই থেকে ফ্যাক্টরী পরিদর্শনে গেলে কোম্পানি কর্তৃপক্ষ তাদের ফ্যাক্টরীতেই ঢুকতে দেয়নি। এ নিয়ে নানা তুলকালামের ঘটনা ওইসময়ে মার্কেটের সঙ্গে সম্পৃক্ত সবাই জানে। যেখানে নীতি নির্ধারণী মহলের সঙ্গেই কোম্পানির এরকম আচরণ সেখানে একজন ক্ষুদ্র বিনিয়োগকারীদের সঙ্গে কি রকম আচরণ করা হবে তা বোঝার বাকি থাকে না। শুধুমাত্র ডিসক্লোজার ব্যাসিসেই নয় বিএসইসি এবং স্টক এক্সচেঞ্জের প্রতিনিধি দলের সরাসরি ফ্যাক্টরী পরিদর্শন এবং কোম্পানির দেয়া তথ্য অনুসন্ধানের ভিত্তিতে আইপিও অনুমোদন দেয়া বিনিয়োগকারীদের প্রাণের দাবি হয়ে উঠেছে। তাই একেবারেই সরাসরি পর্যবেক্ষণ বন্ধ করে দিয়ে দয়াকরে বিনিয়োগকারীদের ভবিষ্যত নিয়ে ছিনিমিনি খেলবেন না।

 

 

শেয়ারবাজারনিউজ/ম.সা

আপনার মন্তব্য

*

*

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.

Top