শেয়ারবাজার নীতি সহায়তা দ্রুত বাস্তবায়নে তাগিদ দিয়ে গভর্নরকে অর্থমন্ত্রীর চিঠি

শেয়ারবাজার রিপোর্ট: পুঁজিবাজারে বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলোর বিনিয়োগ বা এক্সপোজার গণনা সহজ ও বাজারবান্ধব করতে গত ফেব্রুয়ারি ও মার্চে নেওয়া সিদ্ধান্ত দ্রুত বাস্তবায়নের জন্য বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নরকে চিঠির মাধ্যমে তাগিদ দিয়েছেন অর্থমন্ত্রী আবুল মাল আবদুল মুহিত। ব্যক্তিগত হস্তক্ষেপ কামনা করে হলেও গভর্নর ফজলে কবিরকে সিদ্ধান্ত কার্যকরের জন্য  গত সোমবার লেখা এক চিঠিতে এ তাগিদ দেন অর্থমন্ত্রী। এর আগেও ওই বৈঠকগুলোর পর এ বিষয়ে চিঠি দিয়েছিলেন তিনি।

চিঠিতে অর্থমন্ত্রী বলেন, গত ২৭ ফেব্রুয়ারি ও ১২ মার্চ শেয়ারবাজার বিষয়ে দুটি সভা হয়। সভা দুটিতে গৃহীত সিদ্ধান্ত বাস্তবায়নে গভর্নরকে অনুরোধ করে চিঠি দেওয়া হয়েছে। তা ছাড়া সিদ্ধান্তগুলো দ্রুত বাস্তবায়নের লক্ষ্যে পরপর দু’দিন টেলিফোনে তিনি গভর্নরের সঙ্গে কথা বলেছেন বলে জানা গেছে। এরপরও এসব বিষয়ে বাংলাদেশ ব্যাংক থেকে দৃশ্যত কোনো কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়া হয়নি।

অর্থমন্ত্রী উল্লেখ করেন, এ কারণে গত পাঁচ থেকে ছয় মাস শেয়ারবাজারের সূচক ও লেনদেন ক্রমাগত কমছে। সূচক কমেছে প্রায় এক হাজার পয়েন্ট। শেয়ারবাজার নিয়ন্ত্রক সংস্থা বিএসইসি নানা সংস্কারমূলক পদক্ষেপ নিলেও দরপতন থামছে না। এতে সাধারণ বিনিয়োগকারীরা ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছেন, হারাচ্ছেন মূলধন। এ অবস্থায় অর্থ মন্ত্রণালয়, বাংলাদেশ ব্যাংক, বিএসইসি, আইসিবিসহ সংশ্নিষ্টদের শীর্ষ কর্মকর্তাদের নিয়ে গত ২৭ ফেব্রুয়ারি ও ১৩ মার্চের সিদ্ধান্তগুলো দ্রুত বাস্তবায়নের তাগিদ দিয়ে চিঠিতে গভর্নর ফজলে কবিরের ব্যক্তিগত হস্তক্ষেপ কামনা করেছেন অর্থমন্ত্রী আবুল মাল আবদুল মুহিত।

চিঠিতে শেয়ারবাজারে ব্যাংকগুলোর বিনিয়োগ গণনা সহজ ও শেয়ারবাজারবান্ধব করতে গৃহীত পাঁচটি সিদ্ধান্ত এবং সংকটকালীন রাষ্ট্রীয় মালিকানাধীন বিনিয়োগ সংস্থা আইসিবি যাতে বিনিয়োগ বাড়িয়ে পরিস্থিতি সামাল দিতে পারে, তার জন্য এর সক্ষমতা বাড়াতে ‘একক গ্রাহক ঋণসীমা’ সংক্রান্ত বিধি থেকে অব্যাহতি দেওয়ার সিদ্ধান্ত কার্যকরের অনুরোধ জানিয়েছেন অর্থমন্ত্রী। শুরুতেই ব্যাংকগুলোর জন্য সমন্বিত বিনিয়োগ সীমা (কনস্যুলেটেড বেসিস এক্সপোজার) গণনার বিষয়টি বাদ দেওয়ার কথা বলেছেন তিনি।

২০১৩ সালে সংশোধিত ব্যাংক কোম্পানি আইনের ২৬ক ধারায় বলা হয়েছে, কোনো ব্যাংক তার মূলধনের সর্বোচ্চ ২৫ শতাংশের সমপরিমাণ অর্থ শেয়ারবাজারে বিনিয়োগ করতে পারবে। তবে ২০১৪ সালের ২৫ ফেব্রুয়ারি পৃথক এক সার্কুলার করে ব্যাংকগুলোর শেয়ারবাজার-সংশ্নিষ্ট সহযোগী প্রতিষ্ঠানগুলোর বিনিয়োগে বিধিনিষেধ আরোপের জন্য সমন্বিত বিনিয়োগ (কনস্যুলেটেড বেসিস এক্সপোজার) গণনা পদ্ধতি আরোপ করে বাংলাদেশ ব্যাংক। এ ক্ষেত্রে সহযোগী প্রতিষ্ঠানের বিনিয়োগসহ শেয়ারবাজারে কোনো ব্যাংকের মোট বিনিয়োগ সীমা তার মূলধনের সর্বোচ্চ ৫০ শতাংশের সমপরিমাণ অর্থ নির্দিষ্ট করে দেয়।

অর্থমন্ত্রী লিখেছেন, ব্যাংক কোম্পানি আইনের বাইরে ২০১৪ সালের ২৫ ফেব্রুয়ারি এই সার্কুলারের মাধ্যমে সমন্বিত গণনার বিষয়টি আরোপ করায় শেয়ারবাজারে তারল্য প্রবাহের ক্ষেত্র সংকুচিত হয়েছে। এ অবস্থায় শেয়ারবাজার সহায়ক করতে শুধু আইনে বর্ণিত নীতি অনুসরণের কথা বলেছেন তিনি।

ব্যাংকের এক্সপোজার গণনায় আরও চারটি নীতি সংশোধনের তাগিদ দিয়েছেন অর্থমন্ত্রী। এর অন্যতম হলো- বাজারমূল্য নেই এমন সিকিউরিটিজের এক্সপোজার গণনায় বর্তমানের বাজারমূল্যকে ভিত্তি ধরার নীতি বাদ দিয়ে ক্রয়মূল্যকে ভিত্তি ধরা। এমন সিকিউরিটিজের মধ্যে রয়েছে বন্ড, ডিবেঞ্চার, প্রেফারেন্সিয়াল শেয়ার এবং অতালিকাভুক্ত মিউচুয়াল ফান্ড।

কোনো ব্যাংক কৌশলগত বিনিয়োগ হিসেবে কোনো কোম্পানিতে বিনিয়োগ করলেও তাও এক্সপোজার গণনা থেকে বাদ দেওয়ার সিদ্ধান্ত হয়। একই সঙ্গে কোনো ব্যাংকের শেয়ারবাজার-সংশ্নিষ্ট সহযোগী কোম্পানি ব্যাংক ঋণের যতটুকু শেয়ারবাজারে বিনিয়োগ করেছে, শুধু ওইটুকুই এক্সপোজার বিবেচনা করার সিদ্ধান্ত হয়।

এ ছাড়া আইসিবিকে ‘একক গ্রাহক ঋণসীমা’ সংক্রান্ত আইনি বিধান থেকে অব্যাহতি দেওয়ার সিদ্ধান্ত কার্যকরের জন্য অনুরোধ জানিয়ে অর্থমন্ত্রী বলেছেন, শেয়ারবাজারে সহায়ক ভূমিকা পালনের জন্য সরকার আইসিবি প্রতিষ্ঠা করেছে। কিন্তু বাংলাদেশ ব্যাংকের ‘একক গ্রাহক ঋণসীমা’ গণনায় অন্তর্ভুক্ত হওয়ার কারণে শেয়ারবাজারে আইসিবির বিনিয়োগ ক্ষমতা কমেছে।

এদিকে, চীনের সাংহাই ও শেনজেন স্টক এক্সচেঞ্জের কাছে ডিএসইর কৌশলগত শেয়ার বিক্রিতে মূলধনী মুনাফার ওপর করছাড়ে আবারও আশ্বাস দিয়েছেন অর্থমন্ত্রী। গত সোমবার বিএসইসির চেয়ারম্যান ড. এম খায়রুল হোসেন সচিবালয়ে সাক্ষাৎ করতে গেলে অর্থমন্ত্রী এ আশ্বাস দেন।

বাজেট ঘোষণার পর ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জ ও এর ব্রোকারদের সংগঠন ডিবিএর একটি প্রতিনিধি দল অর্থমন্ত্রীর সঙ্গে সাক্ষাৎ করে। ওই সময় চীনাদের কাছে শেয়ার বিক্রির ওপর মূলধনী কর সম্পূর্ণ ছাড় দেওয়ার দাবি জানিয়েছিলেন তারা। করছাড় পেলে চীনাদের থেকে পাওয়া প্রায় ৯৫০ কোটি টাকার পুরোটা তিন বছরের জন্য শেয়ারবাজারে বিনিয়োগের প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন তারা।

জানা যায়, সোমবার অর্থমন্ত্রীর সঙ্গে বৈঠকে বিএসইসির চেয়ারম্যান এ করছাড়ে অনুরোধ করেছেন। একই সঙ্গে শেয়ার কেনাবেচার ওপর বিদ্যমান কর কমানোরও সুপারিশ করেছেন তিনি।

বৈঠকে শেয়ারবাজার চলমান অবস্থা বিষয়ে বিএসইসির চেয়ারম্যানের কাছ থেকে ধারণা নেন অর্থমন্ত্রী। এবারের বাজেটে শেয়ারবাজার ইস্যুতে অর্থমন্ত্রী সরাসরি কোনো প্রণোদনা দেননি। তবে ব্যাংক, আর্থিক প্রতিষ্ঠান এবং বীমা কোম্পানির প্রাতিষ্ঠানিক করহার আড়াই শতাংশ কমানোর কারণে দীর্ঘ মেয়াদে বিনিয়োগকারীরা উপকৃত হবেন বলে উল্লেখ করেন বিএসইসির চেয়ারম্যান।

 

শেয়ারবাজারনিউজ/আ

আপনার মন্তব্য

Top