ব্যাংকের সুদহার কমানোর উদ্দেশ্যে কী?

অর্থনীতির আকার বাড়ার সাথে বাড়ছে আর্থিকখাতের পরিসর। সরকারি, বেসরকারি ও বিদেশি মিলে দেশে ব্যাংকের সংখ্যা এখন ৫৭টি। প্রত্যন্ত অঞ্চলে সেবা দেয়ার জন্য নতুন করে আরো কয়েকটি ব্যাংকের অনুমোদন দিতে আগ্রহী সরকার। একটি শক্তিশালী ও স্থিতিশীল আর্থিক খাতের উপর নির্ভর করে দেশের অর্থনৈতিক অগ্রগতি। নতুন বিনিয়োগ বহুলাংশে নির্ভর করে ব্যাংক ঋণের ওপর। সহজে ও স্বল্পসুদে ঋণ পেলে উদ্যোক্তরা বিনিয়োগে আগ্রহী হয়ে থাকেন। তবে বাংলাদেশে বিনিয়োগের ক্ষেত্রে ব্যাংক ঋণের উচ্চ সুদ অন্যতম বাধা বলে বরাবরই অভিযোগ করে আসছেন উদ্যোক্তারা। তাদের দাবি বিশ্বের অনেক দেশের তুলনায় এই হার বাংলাদেশে বেশি।
এসব বিবচেনায় নিয়ে গেল বুধবার বেসরকারি ব্যাংক মালিকদের সংগঠন বাংলাদেশ এসোসিয়েশন অব ব্যাংকস (বিএবি) এর নেতারা এক বৈঠকে ঋণ ও আমানতের সুদহার কমানোর সিদ্ধান্ত নিয়েছেন। সিদ্ধান্ত অনুযায়ী এখন থেকে সকল বেসরকারি ব্যাংক, ঋণের বিপরীতে সুদ ৯ শতাংশের বেশি নিবে না। অন্যদিকে তিনমাস মেয়াদী আমানতের সুদ ৬ শতাংশের বেশি দিবে না। বর্তমানে বিভিন্ন মেয়াদী ঋণের সুদহার সাড়ে ৮ থেকে সাড়ে ১৬ শতাংশ এবং তিন মাস মেয়াদী আমানতের সুদহার সাড়ে ৩ থেকে সাড়ে ১০ শতাংশ পর্যন্ত।
মালিকদের এমন সাংগঠনিক সিদ্ধান্ত নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন সাবেক শীর্ষ ব্যাংকাররা। তাদের মতে, আর্থিক খাতের নিয়ন্ত্রক সংস্থা হিসেবে বাংলাদেশ ব্যাংকের মত প্রতিষ্ঠান আছে। মুক্তবাজার অর্থনীতির এই যুগে বিশ্বের কোন কেন্দ্রীয় ব্যাংক সুদহার নির্ধারণ করে দিতে পারে না। বাংলাদেশে যা হচ্ছে তা বাজার অর্থনীতির উল্টো পথে চলা। সুদহার কমানোর সিদ্ধান্ত একেবারেই অবাস্তব এবং বাস্তবায়নযোগ্য নয়। প্রতিযোগিতার বাজারে ব্যাংকগুলোর পরিচালনা পর্ষদ নিজেরা বৈঠক করে সুদহার সমন্বয়ের সিদ্ধান্ত নিতে পারে এবং সেই সিদ্ধান্ত কেন্দ্রীয় ব্যাংককে জানাতেও হয়।
এভাবে সাংগঠনিক সিদ্ধান্ত চাপিয়ে দিলে অনেক ব্যাংক, বিশেষ করে নতুন ব্যাংকগুলো ক্ষতির মুখে পড়তে পারে বলে আশঙ্কা সাবেক ব্যাংকারদের। তাদের বক্তব্য, এখন সুদহার কমানোর ঘোষণা এসেছে পরবর্তীতে হয়তো সুদহার বাড়ানোর ঘোষণাও দিয়ে বসতে পারেন মালিকরা। এই ধরনের সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষমতা আইনে থাকুক আর না থাকুক, শোভন অর্থনীতির জন্য তা ইতিবাচক নয়। কিছুদিন আগেই আমরা দেখেছি, তারল্য সংকটের কারণে উচ্চসুদে আমানত সংগ্রহের কথা বলে ঋণের সুদহারও বাড়িয়ে দিয়েছিল ব্যাংকগুলো। সুদ কমাতে বাংলাদেশ ব্যাংক চিঠি দিলেও তা মানা হয়নি। তাই শঙ্কা থেকে যায়, মালিকরা যখন প্রয়োজন মনে করবেন তখন হয়তো সুদহার বাড়িয়ে দিবেন। তারাই যদি নীতি নির্ধারণী সিদ্ধান্ত নেন, তাহলে নিয়ন্ত্রক সংস্থার প্রয়োজন কী?
সম্প্রতি ব্যাংকগুলোকে নানামুখী সুবিধা দিয়েছে সরকার। বাজেটে শুধুমাত্র এ খাতকেই দেয়া হয়েছে করপোরেট কর সুবিধা। এছাড়াও গেল এপ্রিলে মালিকরা সরকারের সাথে দেনদরবার করে আরো কিছু সুবিধা আদায় করে নিয়েছেন। তারল্য সংকট মেটাতে ঋণ-আমানত অনুপাত (এডিআর) কমানো এবং তা সমন্বয় করতে আগামী বছরের মার্চ পর্যন্ত সময় দেয়া হয়েছে। অন্যদিকে কেন্দ্রীয় ব্যাংকে রাখা বাধ্যতামূলক জমার হার তথা সিআরআর ১ শতাংশ কমানো হয়েছে। এছাড়া বেসরকারি ব্যাংকগুলোতে রাখা সরকারি প্রতিষ্ঠানের আমানতের পরিমাণ ২৫ শতাংশ থেকে বাড়িয়ে ৫০ শতাংশ করা হয়েছে। মুদ্রানীতিকে পাশ কাটিয়ে এসব সুবিধা আদায়ের উদ্দেশ্য ছিল; অনিয়ম-দুর্নীতির কারণে নগদ অর্থের সংকটে থাকা ব্যাংকগুলোকে অর্থের যোগান দেয়া।
নগদ অর্থের সংকট কাটাতে যদি এত সব পদক্ষেপ নেয়া হয়, তাহলে স্বাভাবিক ভাবেই প্রশ্ন আসে আমানত ও ঋণের সুদহার কমানোর উদ্দেশ্য কী? সুদহার কমালেতো আমানতকারীরা ব্যাংকমুখো হবেন না। অন্যদিকে ঋণের ঋণের চাহিদাও বেড়ে যেতে পারে (অবশ্য আদৌ বাড়বে কিনা তা নিয়ে সন্দেহ আছে)। দুইয়ে মিলে, ব্যাংকগুলোর তারল্য সংকট আরো তীব্র হবে, এটাইতো স্বাভাবিক। তবে কি আমরা ভেবে নিবো এপ্রিলে নেয়া পদক্ষেপের ফলে দুই মাসেই ব্যাংকগুলোর অর্থের সংকট কেটে গেছে?
যদি গিয়ে থাকে তাহলেতো ঐ সময় দেয়া সুবিধাগুলো ফেরত নেয়া যেতে পারে। আর যদি সংকট বিদ্যমান থাকে তাহলে সুদ কমানোর সিদ্ধান্ত কি আদৌ বাস্তবায়ন হবে? ঋণের সুদহার কমানোর পিছনে বড় যুক্তি হলো বিনিয়োগ বাড়ানো। আমরা জানি, চলতি বছরের শেষ দিকে জাতীয় নির্বাচন। নির্বাচনকে সামনে রেখে সাধারণত বাংলাদেশের রাজনৈতিক পরিস্থিতি অস্থিতিশীল হয়ে পড়ে। এমন বাস্তবতায় উদ্যোক্তারা নতুন কোন বিনিয়োগে যাবেন এমন আশা করা বাতুলতা মাত্র। তাহলে কাদের স্বার্থে এমন সিদ্ধান্ত?
সুদ কমানোর সিদ্ধান্ত যদি সত্যিকার ভাবেই বাস্তবায়ন হয় তাহলে সাধারণ সঞ্চয়কারীরা ব্যাংক থেকে ছুটবেন সঞ্চয়পত্রে। সেখানেও সুদহার কমানোর কথা বলে রেখেছেন অর্থমন্ত্রী মুহিত। এখন ব্যাংকের আমানতের সুদহার ৬ শতাংশে রাখা হলে এর সাথে সঞ্চয়পত্রের সুদহারও সমন্বয় হয়ে এক অংকে নেমে আসতে পারে। তাহলে সঞ্চয়কারীরা যাবেন কোথায়? পথ একটাই, ঝুঁকিপূণ পুঁজিবাজার। তবে কি ব্যাংকের সুদহার কমানোর পিছনে আমানতকারী তথা সঞ্চয়কারী বা সাধারণ বিনিয়োগকারীদের পুঁজিবাজারে নিয়ে যাওয়ার চেষ্টা? সুদহার কমানোর পরদিনই বৃহস্পতিবার পুঁজিবাজারে বড় উত্থান হয়েছে। এই উত্থান সেই প্রচেষ্টারই ইঙ্গিত কিনা, তা হয়তো সময়ই বলে দিবে।
সুদ কমানোর সিদ্ধান্ত বাসÍবায়ন হলে ব্যাংকগুলোকে পরিচালন ব্যয় কমাতে হবে। যেখানে প্রতি বছরই এই ব্যয় বাড়ছে সেখানে কিভাবে তা কমানো হবে? খরচ না কমালে সুদের হার কমবে কিভাবে? ইতিমধ্যে তারল্য সংকটে থাকায় বহু ব্যাংক দুই অংকের সুদহারে আমানত সংগ্রহ করেছে। তাদের পক্ষেতো ঐ সব আমানতের বিপরীতে সুদহার কমানো সম্ভব নয়। সেক্ষেত্রে কি তবে ব্যাংকগুলো তাদের সিএসআর (করপোরেট সোস্যাল রেসপনসিবিলিটি) কার্যক্রম কমিয়ে দিবে? নাকি লাভের অংক কমিয়ে সাংগঠনিক ভাবে নেয়া সিদ্ধান্ত বাস্তবায়ন করবে? যদিও বৃহস্পতিবার কেন্দ্রীয় ব্যাংককে নিজেদের সিদ্ধান্তের কথা জানিয়ে দেয়ার পর বিএবি নেতারা গণমাধ্যমের কাছে বলেছেন, ঋণের সুদহার কমাতে প্রয়োজন হলে তারা লোকসান দিতেও রাজি আছেন।
অনেকের ধারণা মুখে দেয়া ঘোষণা, প্রকৃত অর্থে বাস্তবায়ন হবে না। কাগজে কলমে সুদহার ৯ শতাংশ দেখালেও প্রকৃত পক্ষে ১২/১৩ শতাংশই নেয়া হবে। এক্ষেত্রে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের উচিত হবে, বিষয়টি সরেজমিন পরীক্ষা করে দেখা। এছাড়া লাভের অংক না কমিয়ে বরং সিদ্ধান্ত বাস্তবায়নে ব্যাংকগুলো সার্ভিস চার্জ বাড়িয়ে দিতে পারে। এর বাইরে গোপন করতে পারে খেলাপিঋণের তথ্য। এই ঋণের বিপরীতে যে অর্থ জমা রাখতে হয় (প্রভিশন) সে বাবদ ব্যাংকগুলোর অনেক টাকা চলে যায়। এসব কিছুই যদি না হয় তাহলে সুদ কমানোর সিদ্ধান্ত কখনোই বাস্তবায়ন করা সম্ভব হবে না।
নতুন বিনিয়োগ কখনো উচ্চ সুদহারের জন্য আটকে থাকে না। ব্যাংক ঋণ ছাড়াও বিনিয়োগের ক্ষেত্রে আরো অনেক বিষয় আছে। বাংলাদেশে ব্যবসা শুরুর ব্যয় বেশি। বিশ্বব্যাংকের ডুয়িং বিজনেস সূচকে আমাদের অগ্রগতি নেই। বিশ্বের ১৯০টি দেশের মধ্যে অবস্থান ১৭৭তম এবং ১০০ এর মধ্যে স্কোর ৪০.৯৯। গেল বছর এই সূচকে একধাপ পেছানোর পাশাপাশি দক্ষিণ এশিয়ায় আফগানিস্তানের পর সবচেয়ে পিছিয়ে আছে বাংলাদেশ। আমাদের উৎপাদিত পণ্য সঠিক সময়ে গন্তব্যে পৌঁছাবে কিনা সেই নিশ্চয়তা নেই, কারণ যানজটে আমরা নাকাল। আমদানি-রপ্তানিতে বন্দরগুলোর সক্ষমতা বাড়ছে না। ট্রাক আর কনটেইনার জট বাড়ছেই। পণ্য খালাসে স্বাভাবিকের চেয়ে অনেক বেশি সময় লাগে। গ্যাস, বিদ্যুৎ সংযোগ পাওয়া, জমির রেজিস্ট্রেশন থেকে শুরু করে উদ্যোক্তাদের প্রায় প্রতিটি ক্ষেত্রেই ঘুষ দিতে হয়। এসব খাতে যে ব্যয় হয় সে তুলনায় ঋণের সুদহার কি খুব বেশি?
বাংলাদেশে ঋণের সুদহার বেশি কেন? উত্তর, খেলাপি ও অবলোপন করা ঋণ। এসব ঋণের কারণেই ব্যাংকের খরচ বেড়ে যায় এবং নিজেদের লাভের অংশ ধরে রাখতে ঋণের সুদহার বাড়িয়ে থাকে। চলতি অর্থবছরের মার্চ পর্যন্ত সরকারি বেসরকারি ব্যাংকগুলোতে খেলাপি ঋণের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ৮৮ হাজার ৫৮৯ কোটি টাকা। এর বাইরেও আরো ৪০ হাজার কোটি টাকার বেশি ঋণ আছে যা অবলোপনকৃত অর্থাৎ এই অর্থ ফেরত পাওয়ার খুব একটা আশা নেই। মোট খেলাপি ঋণের ৪২ শতাংশ বা ৩৭ হাজার ২৮৯ কোটি টাকা বেসরকারি ব্যাংকের। যেহেতু খেলাপি ঋণ সুদহার বাড়িয়ে দেয়, তাই ব্যাংক মালিকদের উচিত সুদহার কমানোর নয় বরং খেলাপিঋণ কমিয়ে আনার ঘোষণা দেয়া।
খেলাপি ঋণ বেড়ে যাওয়ার পিছনে ব্যাংকগুলোতে সুশাসনের তীব্র ঘাটতি, নানা অনিয়ম ও দুর্নীতি দায়ী। ব্যাংকগুলোতে রাজনৈতকি হস্তক্ষেপ বেড়ে যাওয়ার পাশাপাশি কিছু অসাধু ব্যাংক পরিচালকও এর জন্য দায়ী। তাদের লুটপাট বন্ধে খুব একটা কঠোর পদক্ষেপ এখনো চোখে পড়েনি। আগের যে কোন সময়ের চেয়ে দেশের ব্যাংক খাত তাই কঠোর সমালোচনার মুখে। বেসরকারি গবেষণা প্রতিষ্ঠান সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগ (সিপিডি) ২০১৭ সালকে ব্যাংক কেলেঙ্কারির বছর বলছে। বড় ধরনের কোন সমস্যার কথা স্বীকার করতে চাইছেন না অর্থমন্ত্রী আবুল মাল আবদুল মুহিত। কিছু সমস্যা মেনে নিয়ে সরকারের চলতি মেয়াদে একটি ব্যাংক কমিশন গঠনের কথা বললেও নির্বাচনকে সামনে রেখে শেষ পর্যন্ত তিনি পিছু হঁটেছেন।

লেখক: ফরহাদ হোসেন,

গণমাধ্যমকর্মী

ই-মেইল: [email protected]

শেয়ারবাজার‌নিউজ/ম.সা

আপনার মন্তব্য

Top