সতর্ক না হলে জাঙ্ক শেয়ারগুলো বিনিয়োগকারীদের নিঃস্ব করে দিবে

গত কয়েক মাস থেকে বিনিয়োগকারীদের শেয়ার নির্বাচনের মাপকাঠি ছিল শুধু একটি। আর তা হচ্ছে কোন কোম্পানির শেয়ার সংখ্যা কত কম। কোম্পানি গুলো উৎপাদনে আছে নাকি দেওলিয়া হয়ে যাচ্ছে বিনিয়োগকারীদের সেই বিষয়ে কোন মাথা ব্যথা ছিল না।

বিনিয়োগকারীদের এই ধরনের মানসিকতা অবশ্য একদিনে সৃষ্টি হয়নি। এর পেছেনে বড় ধরনের একটি দুষ্ট চক্র অনেক দিন থেকেই কাজ করে যাচ্ছিল। শুধু তাই নয় এই দুষ্ট চক্রের সদস্য ছিল অনেক বন্ধ হয়ে যাওয়া কোম্পানির পরিচালকরাও। এই ধরনের পরিচালকরা জানে তাদের বন্ধ কোম্পানি কাজে না আসলেও বস্তা পচা শেয়ার গুলো যতদিন বাজারে তালিকা ভুক্ত রয়েছে সে গুলো নিয়ে খেলা ধুলা করে যদি কিছু ইনকাম করা যায় তাতেই লাভ। আর এই জন্য মিথ্যা নিউজ দিতেও তারা কার্পণ্য করেনি।

দুর্বল মৌলভিত্তিক জাঙ্ক শেয়ার গুলোতে যারা বিনিয়োগ করে তারা নিজেরাও সব সময় আতঙ্কের মধ্যে থাকে। তার একটি প্রমান দেই। গত কয়েকদিন থেকেই বাজারে গুজব সাইফুল নামের জনৈক একজন ব্রোকরেজ কর্মকর্তা চাকরিচ্যুত হয়েছে। আর এই খবরে দুর্বল মৌলভিত্তিক জাঙ্ক শেয়ার গুলোতে বায়ার খুজে পাওয়া যাচ্ছিলো না। দুঃখের বিষয় হচ্ছে এই বিষয়ে আবার অনেক পত্রিকা নিউজও তৈরি করেছে যে সাইফুল সাহেব তার চেয়ারে ঠিক আছেন।

আসলে সত্যটা কি জানেন? যারা দুর্বল মৌলভিত্তিক জাঙ্ক শেয়ার গুলোতে বিনিয়োগ করেছে তারা সাইফুল সাহেবের জন্য আতংকিত নয় তারা তাদের বিনিয়োগ নিয়ে আতংকিত। বিনিয়োগকারীরা খুব ভালো করেই জানেন তারা যে সকল দুর্বল মৌলভিত্তিক জাঙ্ক শেয়ার গুলোতে বিনিয়োগ করেছে সেই শেয়ার গুলো বর্তমানে তার যৌত্তিক দাম থেকে কম করে হলেও ১৫ থেকে ২০ গুন বেশি দামে অবস্থান করছে। আর তারা এও বিশ্বাস করে যে এই দুর্বল মৌলভিত্তিক জাঙ্ক শেয়ার গুলো যদি একবার কমতে শুরু করে তাহলে সে তার পূর্বের দামে চলে যেতে পারে। দাম কমে যেতে পারে ১০ থেকে ১৫ গুন।

নিম্নে কিছু দুর্বল মৌলভিত্তিক জাঙ্ক শেয়ারের গত ১-২ বছরের দামের চিত্র তুলে ধরা হল। যা দেখলে যে কেউ আঁতকে উঠবে।

⇨ MONNOSTAF বছর খানিক আগেও দাম ছিল ২০০ টাকা সেখান থেকে দুষ্ট চক্রের কল্যাণে ৪৫০০ টাকা

⇨ MONNOCERA বছর খানিক আগেও দাম ছিল ৩৫ টাকা সেখান থেকে দুষ্ট চক্রের কল্যাণে ৩৯০ টাকা

⇨ LEGACYFOOT বছর খানিক আগেও দাম ছিল ২০ টাকা সেখান থেকে দুষ্ট চক্রের কল্যাণে ২০০ টাকা

⇨ BDAUTOCA বছর খানিক আগেও দাম ছিল ৩০ টাকা সেখান থেকে দুষ্ট চক্রের কল্যাণে ৫০০ টাকা

⇨ KAY&QUE বছর খানিক আগেও দাম ছিল ২৫ টাকা সেখান থেকে দুষ্ট চক্রের কল্যাণে ২৫০ টাকা

⇨ AZIZPIPES বছর খানিক আগেও দাম ছিল ৩০ টাকা সেখান থেকে দুষ্ট চক্রের কল্যাণে ২৮৫ টাকা

⇨ SAVAREFR বছর খানিক আগেও দাম ছিল ৩৬ টাকা সেখান থেকে দুষ্ট চক্রের কল্যাণে ২১০ টাকা

উপরে উল্লেখিত শেয়ার গুলোই বলে দিচ্ছে কতটা ভয়ংকর খেলায় মেতে আছে দুষ্ট চক্রটি। উপরের উল্লেখিত শেয়ার গুলো ছাড়াও STYLECRAFT, JUTESPINN, STANCERAM SONALIANSH, RENWICKJA, LIBRAINFU, ANWARGALV, APEXFOODS, AMBEEPHA এবং অধিকাংশ Z গ্রুপের শেয়ার গুলো দাম গত ১ থেকে ২ বছরের মধ্যে ৩ থেকে ৪ গুন পর্যন্ত উঠে গেছে। যা বর্তমানে বিপদজনক অবস্থায় রয়েছে।

ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জকে (DSE) ধন্যবাদ না দিয়ে পারলাম না যে তারা রহিমা ফুড ও মডার্ন ডাইং ২টি উৎপাদন বন্ধ থাকা কোম্পানিকে তালিকাচ্যুতি করেছে। এতে অনেকেই দুঃখ প্রকাশ করেন সেই সকল বিনিয়োগকারীদের জন্য যাদের হাতে ঐ ২ কোম্পানির শেয়ার ছিল। আসলে এখানে দুঃখ করার কিছু নেই। যারা এই ধরনের কোম্পানি গুলোতে বিনিয়োগ করে তারা আসলে জেনে বুঝে জুয়া খেলার জন্য ঐ ধরনের শেয়ার গুলোতে টাকা বিনিয়োগ করে। আর যারা জুয়াতে টাকা বিনিয়োগ করবে তাদের টাকার নিরাপত্তা কেউ দিতে পারবে না।

যে সকল কোম্পানি গুলো ভবিষ্যতে আর উৎপাদনে আসতে পারবে না বা অধিক দিন থেকে বিনিয়োগকারীদের ডিভিডেন্ড দিতে পারছে না সেই সকল কোম্পানি গুলোকে অনতিবিলম্বে DSE থেকে তালিকাচ্যুতি করা উচিত। কারন এই ধরনের শেয়ার গুলো বিনিয়োগকারীদের মৃত্যুর ফাদ। আর দুষ্ট চক্রের টাকা কামানোর হাতিয়ার। শুধু কোম্পানি গুলো তালিকাচ্যুতি করলেই হবে না সেই কোম্পানি গুলোতে যারা পরিচালনায় রয়েছে তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা গ্রহন করতে হবে।

দুর্বল মৌলভিত্তিক জাঙ্ক শেয়ার গুলো কিছু নিদিষ্ট বিনিয়োগকারীদের লাভবান করলেও বেশির ভাগ বিনিয়োগকারীদের লোকসান গুনতে হয়। এই ধরনের শেয়ার গুলো যতই ভেল্কিবাজি দেখাক না কেন দিন শেষে দেখবেন আবার সেই আগের জায়গায় চলে আসবে। দুষ্ট চক্রটি বিনিয়োগকারীদের বোঝানোর চেষ্টা করছে যে “বর্তমান বাজার পরিস্থিতিতে দুর্বল মৌলভিত্তিক জাঙ্ক শেয়ার গুলো যে গুলোর শেয়ার সংখ্যা কম ঐ কোম্পানি গুলো ছাড়া গতি নেই”। কিন্তু একটি বিষয় ভুলে গেলে চলবে না যে “সব কিছুর শেষ আছে”। কাউকে না কাউকে শেয়ার গুলো ধরিয়ে দেয়ার চেষ্টা করবে ঐ দুষ্টু চক্রটি। আর যখন সময় শেষ হয়ে আসবে তখন রহিম বলেন আর সাইফুল বলেন কোন কিছুই ঐ শেয়ার গুলোর দর পতন ঠেকিয়ে রাখতে পারবেনা।

পরিশেষে শুধু একটি কথাই বলবো সামনে জুন ক্লোজিং কোম্পানি গুলো ডিভিডেন্ড দেয়া শুরু করবে তাই দুর্বল মৌলভিত্তিক জাঙ্ক শেয়ার গুলোতে বিনিয়োগে শতবার চিন্তা করুন। যে দুর্বল মৌলভিত্তিক জাঙ্ক শেয়ার গুলো তার ইতিহাসের সর্বোচ্চ দামে অবস্থান করছে তা কিছুটা কমে গেলেও কি তাতে বিনিয়োগ করা বুদ্ধিমানের কাজ হবে?

একবার ঠাণ্ডা মাথায় চিন্তা করুন তো —–১৫ থেকে ২০ বছরের মধ্যে সর্বোচ্চ দামে অবস্থান করা শেয়ার গুলো কিনে যদি একবার ধরা খান তাহলে পুঁজিবাজারকে সালাম দিয়ে চলে যাওয়া ছাড়া কোন উপায় থাকবে না। পুঁজিবাজারে আপনি ততক্ষণ পর্যন্ত টিকে থাকবেন যতক্ষণ পর্যন্ত আপনার হাতে পুঁজি থাকবে। তাই লাভের বিষয় চিন্তার পাশাপাশি পুঁজির সর্বোচ্চ নিরাপত্তার কথা সব থেকে বেশি গুরুত্ব দিতে হবে। বর্তমান সময়ে দুর্বল মৌলভিত্তিক জাঙ্ক শেয়ার গুলোতে যারা বিনিয়োগ করেছে তারা ঘোরের মধ্যে আছে, ঘোর কেটে গেলেই সব কিছু শুন্য শুন্য মনে হবে। গত ১-২ বছরে দুর্বল মৌলভিত্তিক জাঙ্ক শেয়ার গুলো ৩০ টাকা থেকে ৫০০ টাকা নিয়ে গিয়ে যে ধরনের নোংরামি হয়েছে এতে এটা নিশ্চিত যে অনেকেই নিঃস্ব হয়ে যাবে।

 

তানভীর আহমেদ

শেয়ার বিনিয়োগকারী

উত্তরা,ঢাকা।

 

শেয়ারবাজারনিউজ/ম.সা

আপনার মন্তব্য

Top