খারাপ মার্কেটই ভালো শেয়ার কেনার উৎকৃষ্ট সময়- মো: মনিরুজ্জামান

শেয়ারবাজার রিপোর্ট: বিনিয়োগকারীদের পুরো টাকা শেয়ারবাজারে বিনিয়োগ করার চেয়ে ব্যালেন্ড পোর্টফোলিও তৈরি করতে হবে। কিছু ফিক্সড ডিপোজিট থাকবে, কিছু শেয়ারবাজারে বিনিয়োগ থাকবে। বিনিয়োগকারীরা যদি কোনো কোম্পানিকে বিশ্বাস করে তারা যদি লো রেটে শেয়ার কিনতে চায় তাহলে খারাপ মার্কেট থেকেই তাদেরকে কম রেটে শেয়ার কিনতে হবে এবং বর্তমানে সেই সুযোগ রয়েছে বলে মনে করেন আইডিএলসি ইনভেষ্টমেন্ট লিমিটেডের ব্যবস্থাপনা পরিচালক মো: মনিরুজ্জামান। সম্প্রতি শেয়ারবাজারনিউজ ডট কমের সঙ্গে একান্ত সাক্ষাতকারে তিনি এসব কথা বলেন। সম্পূর্ণ সাক্ষাতকারটি শেয়ারবাজারনিউজ পাঠকদের উদ্দেশ্যে নিম্নে তুলে ধরা হলো:

শেয়ারবাজারনিউজ: বাংলাদেশে বেষ্ট ইনভেষ্টমেন্ট ব্যাংক হিসেবে সম্প্রতি আইডিএলসি ইনভেষ্টমেন্ট লিমিটেড ইউরোমানি অ্যাওয়ার্ডে ভূষিত হয়েছে ব্যাপারে আপনার অভিব্যক্তি জানতে চাচ্ছি

মো: মনিরুজ্জামান : ইউরোমানি অ্যাওয়ার্ড ওয়ার্ল্ডে একটি প্রেস্টিজাস অ্যাওয়ার্ড। বাংলাদেশে বেষ্ট ইনভেষ্টমেন্ট ব্যাংক হিসেবে এবার আমরা পেয়েছি। ওরা বছরে একবার এই অ্যাওয়ার্ড  দেয়। এখানে প্রসেসটা হচ্ছে তারা বিভিন্ন ইন্ডাষ্ট্রি প্লেয়ারদের কাছ থেকে সাবমিশন নেয়। তারপর তারা ইন্টারভিউ করে। প্রত্যেকটা দেশে তারা দুটো অ্যাওয়ার্ড দেয়। একটি হচ্ছে বেষ্ট ব্যাংক এবং আরেকটি হচ্ছে বেষ্ট ইনভেষ্টমেন্ট ব্যাংক। বছর তাদের ক্রাইটেরিয়া অনুযায়ী আমরা সব ক্রাইটেরিয়া সম্পূর্ণ করি এবং নির্বাচিত হই। এটি আইডিএলসি ইনভেষ্টমেন্টের জন্য অনেক বড় পাওয়া

শেয়ারবাজারনিউজ: কোন কোন ক্রাইটেরিয়ার ভিত্তিতে আপনারা অ্যাওয়ার্ড পেলেন? অন্যরা কেনো পেলো না?

মো: মনিরুজ্জামানএখানে তারা তিনটি ক্রাইটেরিয়া বিবেচনা করে পুরষ্কার দিয়েছে। প্রথমত: প্রফিটিবিলিটি রেশিও অর্থাৎ মুনাফার হার দেখা হয়। দ্বিতীয়ত: কম্পারেটিভ সিনারিও অর্থাৎ অন্যান্য যারা এই ব্যবসায় রয়েছে তাদের তুলনায় আমাদের অবস্থান কোথায়। আমাদের গত বছরে কর পরবর্তী মুনাফা হয়েছে ২৭ কোটি ৫০ লাখ টাকা। লংকাবাংলা ইনভেষ্টমেন্টের ৪০ লাখ টাকা মুনাফা হয়েছে। ব্রাক ইপিএলের ৪৯ কোটি টাকা লোকসান হয়েছে। সিটি ব্যাংক ক্যাপিটালের ২০ কোটি টাকা মুনাফা করেছে। শীর্ষ কোম্পানির তালিকায় আইডিএলসি এগিয়ে ছিলো

আরেকটি তাদের ক্রাইটেরিয়া ছিলো সেটা হচ্ছে প্রডাক্ট ইনোভেশন বা চেঞ্জিং মার্কেট সিনারিওতে আমরা কি করেছি সেখানেও আমরা এগিয়ে রয়েছি। আমরা ইজি ইনভেষ্টমেন্ট নিয়ে এসেছি। আমাদের দেখাদেখি অন্যান্য কোম্পানিরাও উদ্বুদ্ধ হয়েছে। সব ক্রাইটেরিয়াতেই আমরা প্রথম অবস্থানে রয়েছি

শেয়ারবাজারনিউজ: পুরোপুরি মার্চেন্ট ব্যাংকিংয়ে কোন কাজটিতে আপনাদের মুনাফা বেশি আসে?

মো: মনিরুজ্জামান: আমাদের ইস্যু ম্যানেজমেন্ট সবচেয়ে বড় কাজ। নতুন নতুন কোম্পানিকে বাজারে তালিকাভুক্তিতে সহায়তা করা। কিছু অ্যাডভাইজরি কাজ করা হয়। যেমন কর্পোরেট জগতে মার্জার, অ্যাকুইজেশন, ক্যাপিটাল রাইজিং ইত্যাদি। মার্জিন লোন একটি পুরনো প্রডাক্ট। এটাতে আমাদের সবচেয়ে বেশি রিভিনিউ আসে। আর আমাদের পোর্টফোলিও ম্যানেজমেন্টের কাজ যেখানে ক্লায়েন্টরা আমাদের টাকা দেয় আমরা তাদের পোর্টফোলিও ম্যানেজ করে দেই। এই পোর্টফোলিও ম্যানেজমেন্ট সেগমেন্টে আমরা ইজি ইনভেষ্টমেন্ট নামে নতুন প্রডাক্ট নিয়ে আসছি যেখানে ক্ষুদ্র বিনিয়োগকারীরা মাত্র হাজার টাকা দিয়ে অ্যাকাউন্ট খুলতে পারে। মাসে মাসে তারা তাদের সঞ্চয়ের একটি অংশ শেয়ারবাজারে বিনিয়োগ করতে পারে

শেয়ারবাজারনিউজ:  ইস্যু নির্বাচনের ক্ষেত্রে আপনারা কোন বিষয়ে ওপর গুরুত্ব দেন?

মো: মনিরুজ্জামান:  আমরা সাধারণত যেগুলোর মূলধন অনেক বড়, দেশে প্রতিষ্ঠিত,যথেষ্ট সুনাম রয়েছে সেসব কোম্পানি বাজারে নিয়ে আসার জন্য চেষ্টা করি। বর্তমানে রানার অটোমোবাইলস নিয়ে কাজ করছি। কোম্পানিটি তাদের ব্যবসায়িক জগতে টপ প্লেয়ারদের একটি। তাদের ৮০সিসি যে বাইক রয়েছে সেখানে তারা বাংলাদেশে মার্কেট লিডার হিসেবে কাজ করছে। অন্যান্য সেগমেন্টেও তারা কাজ করছে। এছাড়াও পপুলার ফার্মাসিউটিক্যালস নামে আরেকটি আইপিও অনুমোদনের জন্য বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশনে (বিএসইসি) জমা রয়েছে

আমরা আসলে একেবারে যে ছোট কোম্পানিগুলো এই সেগমেন্টে কাজ করি না। আমরা চেষ্টা করি বুক বিল্ডিংয়ের মাধ্যমে বড় বড় কাজ হাতে নেওয়ার। আমাদের কোম্পানি সিলেকশনের ফিল্টারিং আছে। যে কোম্পানিগুলো সুনামের সাথে, কর্পোরেট গভর্ন্যান্স মেনে ব্যবসা করে এবং ব্যালেন্স সিটে সেটার প্রতিফলন দেখাচ্ছে আমরা শুধুমাত্র সেসব কোম্পানির জন্যই কাজ করি। সকল কোম্পানি আসলেই যে আমরা ইস্যু ম্যানেজার হিসেবে রাজি হয়ে যাই এটাও না। আমাদের পছন্দের কিছু ব্যাপার আছে

শেয়ারবাজারনিউজ: বিএসইসি প্রণীত কর্পোরেট গভর্ন্যান্স কোডে প্রতিটি কোম্পানির আর্নিংস কলের বিষয়ে বলা হয়েছে। আপনি নিজেও একসময় এই আর্নিং কল আয়োজন করার দাবি তুলে আসছিলেন। বিষয়ে কিছু বলুন

মো: মনিরুজ্জামান: এটা খুবই ভালো একটি উদ্যোগ। যদিও বাংলাদেশের প্রেক্ষিতে সবাইকে এটি বাধ্য করে করানো যাবে না। তবে একটা কালচার যদি তৈরি হয়, একটা যাত্রা যদি শুরু হয় সেখান থেকে ভালো কিছু আসবে। বিএসইসির আইনেই রয়েছে লিষ্টিং রেগুলেশনেও রয়েছে, আর্থিক প্রতিবেদনে সিগনিফিকেন্ট পার্থক্য হলে তার ব্যাখ্যা দিতে হবে। কিন্তু এখনো পর্যন্ত আমরা এর ফল দেখতে পাইনি। এটা কমপ্লাই খুব কম কোম্পানি করছে। এটা অজ্ঞতারও একটি ব্যাপার রয়েছে

শেয়ারবাজারনিউজ: বর্তমান মার্কেট কিভাবে মূল্যায়ন করছেন?

মো: মনিরুজ্জামান :  মার্কেটে প্রাইস আর্নিং রেশিও যদি দেখেন ১৫১৬ কাছাকাছি রয়েছে। কিন্তু ব্লু চিপস স্টক গুলোর প্রাইস পড়ে গেছে। কোম্পানিগুলোর আর্নিং ফল করছে, কমে গেছে। এর মধ্যে স্বল্প মূলধনী কোম্পানিগুলোর শেয়ার দর অতিরিক্ত বেড়ে গেছে। বিদেশি বিনিয়োগকারীরা নির্বাচনের আগে বাজার পর্যবেক্ষণ করছে। কেউ কেউ বের হয়ে যাচ্ছেন। বর্তমান বাজার পরিস্থিতি ব্যক্তি বিনিয়োগকারীদের জন্যও সুখকর নয়। আর প্রাতিষ্ঠানিক বিনিয়োগকারীরাও যে খুব একটা ভালো অবস্থানে রয়েছে তা নয়

শেয়ারবাজারনিউজ: মার্কেটেতো এখন ঝুঁকিপূর্ণ শেয়ারগুলোর কদরই বেশি দেখা যাচ্ছে। বিষয়ে কিছু বলুন

মো: মনিরুজ্জামান: শেয়ারবাজার আসলে সামষ্টিক অর্থনীতির একটি প্রতিফলন। অর্থনীতির গতি এবং কোম্পানির প্রফিটিবিলি সেটাকে রিফ্লেক্ট করে। এখন স্মল ক্যাপ, মিড ক্যাপ এই কোম্পানিগুলোর শেয়ার খুব কম থাকে, অল্প শেয়ার ট্রেড হয়, যার ফলে এগুলোর শেয়ার দর রাতারাতি বেড়ে যায় আবার কমেও যায়। এটা নতুন কিছু নয়, আগেও হয়েছিল এখনো হচ্ছে। কিন্তু সম্প্রতি এধরণের কার্যক্রম চোখে পড়ার মতো হয়ে গেছে। আসলে এটা ওপেন মার্কেট, যে কেউ লেনদেন করতে পারে। যাদের ঝুঁকি নেওয়ার ক্ষমতা আছে, যাদের ইচ্ছে আছে তারা সে ঝুঁঁকি নিচ্ছে। কিন্তু আমরা আসলে ধরণের ঝুঁকিপূর্ণ শেয়ারে বিনিয়োগ করতে পারি না। এমনকি আমরা করতে চাইও না। আমাদের বিনিয়োগের কিছু ক্রাইটেরিয়া রয়েছে সেগুলো পূরণ না হলে আমরা বিনিয়োগে যাই না

শেয়ারবাজারনিউজ:  সম্প্রতি রহিমা ফুড মডার্ন ডাইংকে ডিলিষ্টিং করা হয়েছে। অন্যদিকে স্মল ক্যাপ মার্কেট গঠনের জন্যও নীতি নির্ধারণী মহলের জোর তৎপরতা চলছে। বিদ্যমান ছোটো মূলধনী কোম্পানিগুলোকে নিয়ে স্মল ক্যাপ মার্কেটে গঠন করা যায় কিনা?

মো: মনিরুজ্জামান:  আসলে ডিলিষ্টিংয়ের চাইতে স্মল ক্যাপ মার্কেটে পাঠানোই উত্তম। একেবারে ডিলিষ্টিং করে দিলেতো যারা বিদ্যমান সেকেন্ডারি মার্কেটের বিনিয়োগকারী রয়েছে তাদের বের হওয়ার সুযোগ থাকছে না। স্মল ক্যাপে গেলে তাদের জন্য একটি বের হওয়ার সুযোগ থাকলো

শেয়ারবাজারনিউজ: এক্ষেত্রে বিনিয়োগকারীদের করণীয় কি?

মো: মনিরুজ্জামান: ধরণের কোম্পানিতে যারা বিনিয়োগ করছেন তাদের সচেতন হতে হবে। কোম্পানির কিছু ব্যাসিক ইনফরমেশন যেমন: তাদের ব্যবসা আছে কি না এগুলো জানাটা মৌলিক ব্যাপার। আমাদের বিনিয়োগকারীদের যদি সচেতনতা না বাড়ে তাহলে দিন দিন তারা প্রবঞ্চিত হবেন। তাদের কষ্ট করে হলেও শিখতে হবে, বুঝতে হবে। আর যদি তাদের শেখা,বুঝার সময় না হয় তাহলে তার যে বিনিয়োগ রয়েছে সেগুলো নিয়ে ব্রোকারেজ হাউজ বা মার্চেন্ট ব্যাংক তাদের সঙ্গে পরামর্শ করতে পারে। আর যদি সে মনে করে সে তার ফান্ডকে একটি প্রফেশনাল ফান্ড ম্যানেজারের হাতে ছেড়ে দিতে চায় তাহলে তাদের উচিত মার্চেন্ট ব্যাংকে একটি ডিসক্রিশনারি অ্যাকাউন্ট খোলা বা পোর্টফোলিও ম্যানেজমেন্ট অ্যাকাউন্ট খোলা অথবা মিউচ্যুয়াল ফান্ডে যারা ভালো পারফর্ম করছে তাদের মিউচ্যুয়াল ফান্ডের ইউনিট কেনা

শেয়ারবাজারনিউজ: নির্বাচনের বছরে বিনিয়োগকারীদের আপনার পরামর্শ

মো: মনিরুজ্জামান বিনিয়োগকারীদের পুরো টাকা শেয়ারবাজারে বিনিয়োগ করার চেয়ে ব্যালেন্ড পোর্টফোলিও তৈরি করতে হবে। কিছু ফিক্সড ডিপোজিট থাকবে, কিছু শেয়ারবাজারে বিনিয়োগ থাকবে। বিনিয়োগকারীরা যদি কোনো কোম্পানিকে বিশ্বাস করে তারা যদি লো রেটে শেয়ার কিনতে চায় তাহলে খারাপ মার্কেট থেকেই তাদেরকে কম রেটে শেয়ার কিনতে হবে এবং বর্তমানে সেই সুযোগ রয়েছে।

শেয়ারবাজারনিউজ: এতোক্ষণ শেয়ারবাজারনিউজকে সময় দেওয়ার জন্য আপনাকে ধন্যবাদ

মো: মনিরুজ্জামান: আপনাকেও ধন্যবাদ

 

শেয়ারবাজারনিউজ/.সা

আপনার মন্তব্য

*

*

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.

Top