মেয়াদ ১০ বছর বাড়াতে চাপ অর্থ মন্ত্রণালয়ের: বিএসইসি’র জবাব বোধগম্য নয়

শেয়ারবাজার রিপোর্ট: পুঁজিবাজারে তালিকাভুক্ত যেসব মিউচুয়াল ফান্ডের মেয়াদ ২০২৩ সালের মধ্যে শেষ হচ্ছে তাদের সময় আরো ১০ বছর বাড়ানোর প্রস্তাব করেছে অর্থ মন্ত্রণালয়। তবে পুঁজিবাজার নিয়ন্ত্রক সংস্থা বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশন (বিএসইসি) এ বিষয়ে এখনও কোনো সিদ্ধান্ত নেয়নি।

অর্থ মন্ত্রণালয় সূত্রে জানা গেছে, চলতি বছরের ৩১ মে সরকারের একটি বিশেষ সংস্থা পুঁজিবাজারের উন্নয়নে করণীয় বিষয়ে একটি প্রতিবেদন মন্ত্রণালয়ে পাঠায়। এতে ২০১১ সালের পুঁজিবাজারের ধস-পরবর্তী সময়ে বাজার স্থিতিশীল রাখার ক্ষেত্রে যেসব মিউচুয়াল ফান্ড গুরুত্বপূর্ণ ও ইতিবাচক ভূমিকা রেখেছে, সেগুলোর মেয়াদ ১০ বছর বাড়ানোর সুপারিশ করা হয়। এর জন্য প্রয়োজনে প্রজ্ঞাপন জারির মাধ্যমে নীতিমালা পরিবর্তনের কথা বলা হয়।

এর প্রেক্ষিতে মিউচ্যুয়াল ফান্ডের মেয়াদ ১০ বছর বাড়ানোর অনুরোধ জানিয়ে গত ২৮ জুন বিএসইসির চেয়ারম্যান এম খায়রুল হোসেনের কাছে অর্থমন্ত্রীর স্বাক্ষর করা একটি চিঠি পাঠানো হয়। চিঠিতে ২০১১ সালের পুঁজিবাজারের ধস-পরবর্তী সময়ে বাজার স্থিতিশীল রাখার ক্ষেত্রে যেসব মিউচুয়াল ফান্ড গুরুত্বপূর্ণ ও ইতিবাচক ভূমিকা রেখেছে তাদের কথা বলা হয়েছে।

অর্থমন্ত্রীর চিঠির জবাবে বিএসইসির চেয়ারম্যান জানান, ২০১০ সালের ২৪ জানুয়ারি মেয়াদি মিউচুয়াল ফান্ডের মেয়াদ ১০ বছর নির্ধারণ করে একটি প্রজ্ঞাপন জারি করা হয়। প্রজ্ঞাপন জারির পর থেকে এ পর্যন্ত ৪৬৩ কোটি ৯৬ লাখ টাকার ১০টি মিউচুয়াল ফান্ড মেয়াদি থেকে বেমেয়াদিতে রূপান্তরিত হয়েছে। আর ৪১৮ কোটি ৬২ লাখ টাকার চারটি মেয়াদি মিউচুয়াল ফান্ড ১০ বছরের মেয়াদ শেষে অবসায়ন হয়েছে। এর মধ্যে সম্পদ ব্যবস্থাপনা প্রতিষ্ঠান এইমস পরিচালিত গ্রামীণ ওয়ান: স্কিম ওয়ান ফান্ডের অবসায়ন হয়েছে সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগের রায়ের মাধ্যমে।

মেয়াদি মিউচুয়াল ফান্ডের বিদ্যমান স্থিতি তুলে ধরে বিএসইসির চেয়ারম্যানের চিঠিতে বলা হয়, ২০১৮ থেকে ২০২৮ সাল পর্যন্ত ৩৬টি মেয়াদি মিউচুয়াল ফান্ড বেমেয়াদি ফান্ডে রূপান্তরিত হবে কিংবা অবসায়নে যাবে। এ ফান্ডগুলোর আকার প্রায় ৫ হাজার ৩০২ কোটি টাকা।

মেয়াদি মিউচুয়াল ফান্ডের মেয়াদ বৃদ্ধির বিষয়টি ফান্ডগুলোর ট্রাস্ট দলিলের পরিপন্থী উল্লেখ করে চিঠিতে বলা হয়, এক্ষেত্রে উচ্চ আদালতে মামলা হতে পারে। তাই সামগ্রিক প্রেক্ষাপট বিবেচনায় ২০১৮ থেকে ২০২৮ পর্যন্ত বিদ্যমান ৩৬টি মেয়াদি মিউচুয়াল ফান্ডের কোনটির মেয়াদ কত সময় পর্যন্ত বাড়ানো হবে সে বিষয়ে মন্ত্রণালয়ের কাছে সুনির্দিষ্ট নির্দেশনা চাওয়া হয়।

বিএসইসির চেয়ারম্যানের চিঠির জবাবে আর্থিক প্রতিষ্ঠান বিভাগ মেয়াদি মিউচুয়াল ফান্ডের মেয়াদ বৃদ্ধির বিষয়ে অর্থমন্ত্রীর কাছে একটি সারসংক্ষেপ পাঠায়। এতে বলা হয়, বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশন আইন ১৯৯৩-এর ২৩ ধারা অনুসারে কমিশন প্রয়োজন মনে করলে কিংবা জনগণের স্বার্থ সংরক্ষণের জন্য প্রজ্ঞাপন জারির মাধ্যমে সিকিউরিটিজ ক্রয়-বিক্রয় কিংবা এ-সংক্রান্ত অন্য কোনো বিষয়ে এ আইনের ১০(১) ধারার বিধান পরিপালনের বাধ্যবাধকতা থেকে যেকোনো ব্যক্তি বা সংস্থাকে অব্যাহতি প্রদান করতে পারবে। সিকিউরিটিজ আইনে এ ধরনের ক্ষমতা থাকা সত্ত্বেও বিএসইসির পক্ষ থেকে সরকারের কাছে সুনির্দিষ্ট নির্দেশনা চাওয়ার কারণ মন্ত্রণায়লের কাছে বোধগম্য নয় বলে সারসংক্ষেপে উল্লেখ করা হয়।

সারসংক্ষেপে পুঁজিবাজারের বর্তমান পরিস্থিতির বিষয়টি তুলে ধরে বিএসইসির বিবেচনার জন্য কিছু বিষয় তুলে ধরা হয়। এতে বলা হয়েছে, বাজার স্থিতিশীলতায় বিভিন্ন ধরনের প্রশাসনিক সংস্কার সত্ত্বেও এ বছরের শুরু থেকে ডিএসইর সূচক এক হাজার পয়েন্ট কমেছে। তাছাড়া লেনদেন ও বাজার মূলধনের পরিমাণও কমেছে। পুঁজিবাজার বিনিয়োগকারী জাতীয় ঐক্য ফাউন্ডেশনের পক্ষ থেকে মেয়াদি মিউচুয়াল ফান্ডের মেয়াদ দীর্ঘমেয়াদে ১০ থেকে ২০ বছর বাড়ানোর প্রস্তাব করা হয়েছে। পুঁজিবাজারকে শক্তিশালী করতে ইকুইটিনির্ভর বাজারের পরিবর্তে ডেরিভেটিভস, বন্ড ও মিউচুয়াল ফান্ডের ওপর নির্ভরশীলতা বাড়ানো প্রয়োজন। ২০০৯ থেকে ২০১১ সাল পর্যন্ত যেসব মিউচুয়াল ফান্ড গঠিত হয়েছে সেগুলোর অবসায়ন কিংবা রূপান্তর প্রক্রিয়া ২০২১ সালের মধ্যে সম্পন্ন হবে। এতে এ সময়ের মধ্যে বড় অংকের মিউচুয়াল ফান্ড অবসায়নের শঙ্কা তৈরি হয়েছে, যা প্রাতিষ্ঠানিক বিনিয়োগ বাড়ানোর পরিকল্পনার সঙ্গে অসঙ্গতিপূর্ণ।

তাছাড়া মেয়াদি মিউচুয়াল ফান্ডের অবসায়ন ক্ষুদ্র বিনিয়োগকারীদের জন্য ক্ষতিকর উল্লেখ করে বলা হয়, ফান্ডের অবসায়ন কিংবা সংকোচন হলে বিনিয়োগকারীরা তাদের পুঁজি ন্যায্যমূল্যে ফেরত পাবে এমন নিশ্চয়তা নেই। কারণ মেয়াদি ফান্ডগুলো অবসায়নে গেলে বাজারে বড় ধরনের সেল প্রেসার হবে এবং এতে সার্বিকভাবে পুঁজিবাজারের সূচকে নিম্নমুখী চাপ তৈরি হবে। এতে মিউচুয়াল ফান্ডের পাশাপাশি বিনিয়োগকারীদের সার্বিক পোর্টফোলিও বিনিয়োগ ক্ষতিগ্রস্ত হবে। অন্যদিকে মেয়াদি মিউচুয়াল ফান্ডের মেয়াদ বাড়ানো হলে পুঁজিবাজারের অস্বাভাবিক উত্থান-পতনের সময় এগুলো মার্কেট মেকারের ভূমিকা পালন করতে পারবে।

এছাড়া, এক বছর করে দুই দফায় আইসিবি ইউনিট ফান্ডের মেয়াদ ২০১৯ সালের ডিসেম্বর পর্যন্ত বাড়ানোর বিষয়টি তুলে ধরে সারসংক্ষেপে বলা হয়, পুঁজিবাজারের সমসাময়িক পরিস্থিতিসহ সার্বিক বিষয় বিবেচনায় ২০২৩ সালের ডিসেম্বর পর্যন্ত যেসব মিউচুয়াল ফান্ডের মেয়াদ পূর্তি হবে সেগুলোর প্রতিটির মেয়াদ পরবর্তী এক মেয়াদের (১০ বছর) জন্য বাড়ানোর বিষয়টি বিবেচনা করতে পারে বিএসইসি।

অর্থ মন্ত্রণালয় সূত্র জানিয়েছে, অর্থমন্ত্রী কর্তৃক সারসংক্ষেপ অনুমোদনের পর এ-সংক্রান্ত একটি চিঠি বিএসইসির কাছে পাঠানো হয়েছে। তবে এ বিষয়ে এখন পর্যন্ত বিএসইসির পক্ষ থেকে কোনো সিদ্ধান্ত মন্ত্রণালয়কে জানানো হয়নি।

এ বিষয়ে বিএসইসির দায়িত্বশীল কোনো কর্মকর্তা মন্তব্য করতে রাজি হননি। তবে সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, মন্ত্রণালয়ের চিঠি পাওয়ার পর এ বিষয়ে করণীয় নির্ধারণে কাজ করছে কমিশন। মেয়াদি মিউচুয়াল ফান্ডের মেয়াদ বৃদ্ধির আইনি দিকসহ পুঁজিবাজার ও ইউনিট হোল্ডারদের স্বার্থ বিবেচনা করে সিদ্ধান্ত নেবে কমিশন।

 

শেয়ারবাজারনিউজ/আ

আপনার মন্তব্য

Top