ঔষধ শিল্পের জন্য আরও একটি সুখবর 

দেশের রফতানি খাতকে চাঙা ও বৈশ্বিক বাজারে প্রতিযোগিতায় টিকে থাকতে আরও ৯টি নতুন পণ্যে ভর্তুকি বা নগদ সহায়তা দেবে সরকার। ২০১৮-১৯ অর্থবছরে পণ্য রপ্তানির বিপরীতে এই সুবিধা পাবে রপ্তানিকারকেরা। বাংলাদেশ ব্যাংকের বৈদেশিক মুদ্রানীতি বিভাগ সোমবার(১০ সেপ্টেম্বর) এই সংক্রান্ত একটি প্রজ্ঞাপন জারি করেছে। ভর্তুকি বা নগদ সহায়তা পাওয়া নুতন ৯টি পণ্যের মধ্যে একটি হচ্ছে ফার্মাসিউটিক্যালস পণ্য বা ঔষধ।

বাংলাদেশের স্বাধীনতার আগে এ দেশে ব্যবহৃত ওষুধের বেশির ভাগই আমদানি করা হতো বিদেশ থেকে। সামান্য যে ওষুধ তৈরি হতো দেশে তার গুণগত মান নিয়েও ছিল প্রশ্ন। কিন্তু স্বাধীনতার ৪৭ বছর পর বাংলাদেশ চাহিদার বেশির ভাগ ওষুধই নিজেরা উৎপাদন করছে। বর্তমানে দেশের চাহিদার ৯৮ শতাংশ মিটিয়ে বিশ্বের ১৬০টি দেশে ওষুধ রপ্তানি হচ্ছে। ২০১৮ সালের মার্চ পর্যন্ত বাংলাদেশের ওষুধ খাতের আকার দাঁড়িয়েছে প্রায় ২ হাজার কোটি টাকা। ২০১৭-১৮ অর্থবছরে ১০ কোটি ৩৪ লাখ মার্কিন ডলারের ওষুধ রপ্তানি হয়েছে। দেশি মুদ্রায় এর পরিমাণ ৮৬৮ কোটি টাকা।

বাংলাদেশের ঔষধ শিল্পের জন্য আরও একটি ভালো সংবাদ হচ্ছে আগামী ২০৩৩ সাল পর্যন্ত  মেধাস্বত্বে ছাড়। অনুন্নত দেশ হিসেবে বাংলাদেশের এ সুবিধার প্রয়োজন ছিল। এটা না হলে বর্তমান বাজারে যে ওষুধ চার থেকে পাঁচ টাকায় কিনতে হয় তা ১১০ থেকে ১২০ টাকায় কিনতে হতো। আমাদের দেশের গরিব লোকজনের পক্ষে যা অসম্ভব ছিল। উন্নত দেশে ঔষদের দাম বেশির অন্যতম একটি কারন সেখানে পেটেন্টের জন্য আবিষ্কারক কোম্পানিকে মোটা অংকের টাকা দিতে হয় উৎপাদক কোম্পানিকে। অনুন্নত দেশ হিসেবে বাংলাদেশসহ মোট ৪৮ টি দেশ ২০৩৩ সাল পর্যন্ত পেটেন্ট ফি দেয়া থেকে মুক্ত থাকবে ট্রিপস চুক্তির বদৌলতে। এই চুক্তিতে সুবিধা প্রাপ্ত দেশের সংখ্যা ৪৮ হলেও এদের মধ্যে মাত্র ৪-৫ টি দেশ ঔষধ রপ্তানি করতে পারে। এই অল্প কয়েকটা দেশের মধ্যে আবার বাংলাদেশ প্রথম যারা সারা দুনিয়ায় প্রায় ১৬০ টা দেশে ঔষধ রফতানি করে।

ঔষধ শিল্পের বড় প্রতিবন্ধকতা হচ্ছে এই শিল্পের কাঁচামাল আমদানি নির্ভর। কাঁচামাল যাতে ভবিষ্যতেআমাদানি করতে না হয় সে জন্য দেশেই ওষুধের কাঁচামাল উৎপাদনের জন্য মুন্সীগঞ্জের গজারিয়ায় গড়ে তোলা হচ্ছে প্রথম “ঔষধ শিল্প পার্ক”।বিএএসএস মহাসচিব বলেছেন, আগামী দু-এক মাসের মধ্যে প্রধানমন্ত্রী মুন্সীগঞ্জের এপিআই পার্ক (ঔষধ শিল্প পার্ক) আনুষ্ঠানিক উদ্বোধন করবেন। ২০০ একর জমির ওপর বাস্তবায়ন হচ্ছে প্রকল্পটি। এরই মধ্যে ২৮টি প্রতিষ্ঠানকে ৪২টি প্লট বরাদ্দ দেয়া হয়েছে।

সারা দুনিয়ায় বাংলাদেশের ওষুধের চাহিদা দিন দিন বাড়ার প্রধান কারণ ঔষধের দাম বিশ্ববাজারের তুলনায় অনেক কম। ভারতীয় একটি দৈনিকের প্রতিবেদন বলছে, উন্নত বিশ্বে যে ওষুধের দাম গড়ে ৪২৫ ডলার, বাংলাদেশে এর দাম মাত্র ৩২ ডলার। মানও ভালো। ক্যানসারের ওষুধের সঙ্গে বাংলাদেশ তৈরি করছে হেপাটাইটিস সির ওষুধ। ৮৪ ডোজের চিকিৎসায় ১ ডোজের খরচ ১ হাজার ডলার। পুরো কোর্সে খরচ ৮৪ হাজার ডলার। বাংলাদেশে তৈরি এর ১ ডোজের দাম মাত্র ৮০০ টাকা। কম মূল্যে মানসম্মত ওষুধ সরবরাহ করার কাজকে আরও বেগবান করতে এবং রপ্তানিতে সম্ভাবনার কথা মাথায় রেখে ওষুধকে ‘বর্ষ পণ্য’ হিসেবে ঘোষণা করেছে সরকার।

তিন দশকের বেশি সময় ধরে বাংলাদেশের রপ্তানি খাতে নেতৃত্ব দিচ্ছে তৈরি পোশাক খাত। তবে বিশ্ববাজারে পোশাকের দরপতন এবং যুক্তরাষ্ট্রের বাজারে উচ্চহারে শুল্ক আরোপের ফলে এ খাতটি ক্রমেই বাধার মুখে পড়ছে। আর সেই জন্যই সরকার পোশাক খাতের বিকল্প হিসেবে ঔষধ শিল্পকে এগিয়ে আনতে চাচ্ছে। ২০১৮-১৯ অর্থবছরের বাজেটে ওষুধশিল্পকে বিশেষ সুবিধা দেওয়া হয়েছে। ওষুধের কাঁচামাল উৎপাদনকারী কম্পানিকে ২০৩২ সাল পর্যন্ত শুল্ক মওকুফ করা হয়েছে। এছাড়া ওষুধের কাঁচামাল আমদানিতে শুল্ক ছাড়ের প্রজ্ঞাপন জারি করে সরকার। এর ফলে ওষুধ শিল্পের কাঁচামাল আমদানিতে ২০ শতাংশ শুল্ক ছাড় পাবে আমদানিকারকরা।

নতুন সম্ভাবনার এই হাতছানিকে কাজে লাগানোর জন্যই দেশে প্রতিষ্ঠিত ঔষধ কোম্পানি গুলো প্রচুর পরিমান টাকা বিনিয়োগ করে যাচ্ছে। এই দিক থেকে পুজিবাজারের কোম্পানি গুলো বেশ এগিয়ে আছে। বিশেষ করে-

এসিআই লিমিটেড,

স্কয়ার ফার্মা,

বেক্সিমকো ফার্মাসিউটিক্যালস,

রেনেটা,

একমি,

ইবনেসিনা  কোম্পানি গুলোর নাম উল্লেখ যোগ্য।

এদের মধ্যে এসিআই লিমিটেড এর নাম বিশেষ ভাবে উল্লেখ করতেই হচ্ছে। ইউরোপ-আমেরিকায় ঔষধের মত স্পর্শকাতর পণ্য বাজারে যায় যথাযত মান যাচাইয়ের পর। আমেরিকায় ফুড অ্যান্ড ড্রাগ অ্যাডমিনিস্ট্রেশন বা এফডিএর ছাড়পত্র পাওয়া দুরূহ, সময়সাপেক্ষসেখানে এসিআই লিমিটেড, USFDA (US Food and Drug Administration) নির্দেশনায় গড়ে তুলেছে বিশাল এক নুতন ফার্মাসিউটিক্যালস কোম্পানি। যার নাম রাখা হয়েছে”ACI HealthCare Limited”.নারায়ণগঞ্জ জেলার সোনারগাঁওে গড়ে তোলা “ACI HealthCare Limited”  থেকে তৈরি করা ঔষধ মুলত আমেরিকার বাজারের জন্য তৈরি করা হবে।

যেহেতু এসিআই হেলথ কেয়ারের তৈরিকৃত ঔষধ বিদেশে রপ্তানির জন্য তৈরি করা হবে তাই প্রতিষ্ঠানটি অবকাঠামো বিদেশী ঔষধ কোম্পানি গুলোর আদলে তৈরি করা হয়েছে। এসিআই হেলথ কেয়ারের নির্মাণ কাজ শেষ। আশা করছি অতি সত্তর কোম্পানিটি উৎপাদনে চলে যাবে। এছাড়াও এসিআই হেলথ কেয়ারের পাশে আরও একটি কোম্পানির নির্মাণ কাজ চলছে যার নাম ACI Biotech Ltdযার নির্মাণ কাজ ২০১৯ সালে শেষ হবে। “ACI HealthCare Limited”এবং“ACI Biotech Ltd”২টি কোম্পানিই এসিআই লিমিটেড এর সাবসিডিয়ারি প্রতিষ্ঠান। যার ৯৩% এবং ৮০% অংশীদার এসিআই লিমিটেড।

সব মিলিয়ে বলা যায় যে, বাংলাদেশের অর্থনীতি তথা শিল্প খাতের নিকট ভবিষ্যতের সবচেয়ে সম্ভাবনাময় খাত হচ্ছে ওষুধ শিল্প, যার রফতানি সম্ভাবনা বর্তমানের তৈরি পোশাক শিল্পকে অচিরেই ছাড়িয়ে যেতে সক্ষম হবে বলে আশা করা যায়।অনেকেই ধারনা করছে আগামী কয়েক বছরে ওষুধ রপ্তানিতে ভারতকে ছাড়িয়ে যাবে বাংলাদেশ।

 

তানভীর আহমেদ

শেয়ার বিনিয়োগকারী

উত্তরা,ঢাকা।

 

শেয়ারবাজারনিউজ/ম.সা

আপনার মন্তব্য

*

*

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.

Top