বিনিয়োগকারীদের বেকায়দায় ফেলা কোম্পানি বেশিদিন টিকে না

আমাদের দেশে এখনো কোনো বহুজাতিক কোম্পানি তৈরি হয়নি। যার প্রধান কারণ, কোম্পানির মালিক পক্ষ কখনোই দক্ষ পেশাজীবীদের হাতে কর্তৃত্ব দিতে রাজি হয়নি। উন্নত দেশের বহুজাতিক কোম্পানিগুলোর ব্যবস্থাপনা পর্ষদে ভুঁড়ি ভুঁড়ি দক্ষ পেশাজীবী রয়েছে যারা কোম্পানিকে এগিয়ে নিয়ে যাচ্ছে। কোম্পানির প্রতিটি বিভাগেই কর্পোরেট সুশাসন চোখে পড়ার মতো।

আমাদের দেশেও কর্পোরেট সুশাসনের আইন রয়েছে তবে তা নিছক মন্দের ভালো ছাড়া কিছু নয়। একদিন ওইম্যাক্স ইলেকট্রোডস কোম্পানির সিএফও’র সঙ্গে আলাপচারিতার এক পর্যায়ে জিজ্ঞেস করেছিলাম, আপনাদের ইন্ডিপেন্ডেড ডিরেক্টরকে কিভাবে সম্মানিত করেন। তার খাস জওয়াব, ধুর ভাই, তারা মাসে একদিন আসে, চা-বিস্কুট খাওয়াই, ৮ হাজার টাকা ধরাইয়া দেই, কোনো কথা বলে না, চলে যায়। তালিকাভুক্ত বেশিরভাগ কোম্পানির স্বাধীন পরিচালকরা এভাবেই চা-বিস্কুট আর ৮ হাজার টাকা মাসিক ভাতা নিয়ে দিন পার করছেন।

যেই দেশে মাসিক ৬-৮ হাজার টাকা ভাড়ায় স্বাধীন পরিচালক মিলতে পারে সে দেশের কোম্পানিতে কি রকম কর্পোরেট সুশাসন বিরাজ করবে সেটা সহজেই অনুমেয়। তারা কোম্পানিকে এমন লুটপাটের রাজ্য বানিয়েছে যেখানে আইনও মানছে আবার নিজেদের কর্তৃত্বে যাতে কেউ বাঁধা দিতে না পারে সেই ব্যবস্থাও করছে।

পরিচালকরা সম্মানি, মিটিং ফি, আপ্যায়ন খরচ, বিবিধ খরচ আরো কতো বাহারি খরচের নাম দিয়ে কোম্পানির কোষাগার দিনের পর দিন যেভাবে লুটপাট করছে তাতে কোম্পানির মুনাফায় ধ্বস নামছে। কিন্তু বলির পাঠা হচ্ছেন বিনিয়োগকারীরা। সম্প্রতি বিনিয়োগকারীদের জন্য নো ডিভিডেন্ড ঘোষণা দিয়ে তীব্র সমালোচনার মধ্যে রয়েছে ইভিন্স টেক্সটাইলের পরিচালনা পর্ষদ। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমগুলোতে এই বড় গ্রুপের চেয়ারম্যানের ছবি দিয়ে যেসব বাজে ভাষা ব্যবহার করতে দেখা গেছে তাতে আনোয়ার-উল আলম চৌধুরীর মান সম্মান সব ধূলোয় মিশে গেছে। স্টক এক্সচেঞ্জ থেকে শুরু করে নিয়ন্ত্রক সংস্থা পর্যন্ত সর্বমহলেই আজ সে ধিকৃত।

প্রফিট থাকা স্বত্বেও নো ডিভিডেন্ড ঘোষণা করে ইভিন্সের পরিচালনা পর্ষদ বিনিয়োগকারীদের বড় সড় বেকায়দায় ফেলেছে। কোম্পানিটির শেয়ার দর ফেসভ্যালুর নিচে নেমে এসেছে। জেড ক্যাটাগরির তকমাতো আছেই। একজন বিনিয়োগকারী যখন ধারাবাহিক মুনাফায় থাকা কোম্পানিতে বিনিয়োগ করে তখন তার শেয়ার দর নিয়ে চিন্তা না করলেও বছর শেষে কোম্পানির কাছ থেকে ডিভিডেন্ড আয় পাবে সেই ভরসায় বসে থাকে। কিন্তু যখন বিনিয়োগকারী দেখে কোম্পানির আয় হওয়ার পরও ডিভিডেন্ড দেয়নি অথচ কোম্পানির পরিচালকরা সম্মানির নামে বিপুল ‍অর্থ ভোগ করেছে, যখন দেখে তার হাতে থাকা শেয়ার দর পড়ে যাচ্ছে তখন উপায় না দেখে প্রথমেই গালি আর অভিশাপ দিতে থাকে।

আর অভিশাপ খুব মারাত্মক জিনিষ। অন্যের অভিশাপ নিয়ে বেশিদিন সুখে থাকা যায় না। কোম্পানির ভবিষ্যত উন্নতির জন্য ডিভিডেন্ড না দিয়ে সেই টাকা রিজার্ভে রাখতে পারে। কিন্তু ইভিন্স টেক্সটাইলের নো ডিভিডেন্ড ঘোষণার পেছনে এমন কোনো উদ্দেশ্য রয়েছে কিনা সে বিষয়ে কোনো ব্যাখ্যা দেয়নি। যে কারণে ক্ষোভের মাত্রাটা অনেক বেশি। কোম্পানিটি কাউকেই পাত্তা দিচ্ছে না। মিডিয়ার লোকজন বারংবার যোগাযোগ করার চেষ্টা চালালেও কোম্পানির পরিচালনা পর্ষদ গোপন অবস্থান করছে। তাই নো ডিভিডেন্ড ঘোষণার পেছনে কোম্পানির যে কোনো সৎ উদ্দেশ্য নেই সেটা বোঝা যায়। বিনিয়োগকারীদের বেকায়দায় ফেলে আজ পর্যন্ত কোনো কোম্পানিকে টিকে থাকতে দেখা যায়নি। যদিও এক কোম্পানি ধ্বংস হলে আরেক কোম্পানি গঠন করা তাদের জন্য মামুলি ব্যাপার। কিন্তু অভিশাপ খুব মারাত্মক জিনিষ যা মানসিক শান্তি কেড়ে নেয়।

 

শেয়ারবাজারনিউজ/ম.সা

আপনার মন্তব্য

Top