দুধ-দধি-ঘি খাবেন আর গরুটিকে এক মুঠো ঘাসও খাওয়াবেন না সেটা অমানবিক

Editorialসব কিছু ঠিকঠাক থাকলে আগামি ৪ জুন সংসদে উপস্থাপিত হবে জাতীয় বাজেট। বাজেটের আকার, ধরণ এবং বিষয়বস্তু ঠিক করতে এপ্রিল মাসের শুরু থেকেই দৌড়ঝাপ শুরু করেছেন অর্থমন্ত্রী এবং এ সংশ্লিষ্ট প্রধান প্রতিষ্ঠান জতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর)। কয়েক লক্ষকোটি টাকার বাজেট নিয়ে দীর্ঘ সময় ধরে এবং ব্যাপক আকারে আলোচনা এবং হিসাব নিকেষ হবে এটাই স্বাভাবিক। এ নিয়ে আমাদের কোন মাথা ব্যাথা নেই। কিন্তু এই বড়ত্বের মাঝে অর্থনীতির সর্ববৃহৎ খাত এবং বিশাল জনগোষ্ঠীর অংশীদারীত্ব কতটুকু স্থান পেল, নাকি উপেক্ষিত হলো আমাদের দুশ্চিন্তা সেটি নিয়ে। এর আগের একাধিক সম্পাদকীয়তে আমি বুঝাতে চেয়েছি লেনদেনের দিক দিয়ে শেয়ার বাজারের চেয়ে আর বড় কোন খাত বাংলাদেশে নেই। কারণ এই একটি মাত্র বাজার যেখানে বর্তমানে প্রতিদিন কমবেশি ৫০০ কোটি টাকা এবং অতীতে দুই থেকে তিন হাজার কোটি টাকা পর্যন্ত লেনদেন হয়েছে। আর এই বাজারটি এমন একটি জায়গা যেখানে দেশটির মোট জনগোষ্ঠির ১২ থেকে ১৫ শতাংশ মানুষ প্রত্যক্ষ কিংবা পরোক্ষভাবে জড়িত। সরাসরি রিপোর্টিংয়ে সম্পৃক্ত থাকায় আমাকে বেশ কয়েক বছর বাজেট অধিবেশন কভার করতে হয়েছে। বর্তমানেও প্রতিবছর মন্ত্রী মহোদয়ের বক্তৃতার বইখানি আলোচনা পর্যালোচনা করতে হয়। সে অভিজ্ঞতার আলোকে আমি যতটুকু দেখেছি ওনার (মন্ত্রী মহোদয়ের) পঠিত পুস্তকের মাত্র কয়েকটি লাইন থাকে শেয়ার বাজার নিয়ে। আর গত কয়েক বছর যাবত বাজেট বইয়ের আকার বাড়িয়ে পরিমাণে দুখানি করায় এখন সাকুল্যে একটি প্যারা সংযোজনের রেওয়াজ তৈরী হয়েছে। অথচ বিগত অনেক বছর ধরে দেখে আসছি এই বাজারের লক্ষ লক্ষ মানুষ বাজেটের দিন চাতক পাখির মতন তাকিয়ে থাকেন আমাদের মাননীয় বাজেট মন্ত্রী তার বক্তৃতায় কি আশার বানী বলেন তা শোনার জন্য। এমনও দু-একটি বছর গেছে তার বক্তৃতা শেষে বহু মানুষ টেলিফোন করে পত্রিকা অফিসে জানতে চেয়েছেন শেয়ার বাজার নিয়ে অর্থমন্ত্রী কি বললেন? অর্থাৎ বিশাল বাজেট বক্তৃতায় মন্ত্রী মহোদয় শেয়ার বাজার নিয়ে এতো ক্ষুদ্র সময় দিয়েছেন যে পাঠককূল তা উদ্ধারে সক্ষম হননি।

বিশাল একটা কিছু থাকতে হবে সেটা আমরাও বলিনা। শেয়ার বাজার নিয়ে অনেকগুলো পৃষ্ঠা তিনি ব্যয় করবেন আমরা সেটাও বলিনা। আমাদের বক্তব্য সরকার যেন এই বাজারটিকে দয়া করে গুরুত্ব দেন। বিশাল রাজস্ব আশা করবেন অথচ একবার খোঁজখবরও নেবেননা এটাই আমাদের কাছে অসহনীয়। দুধ খাবেন দধি খাবেন ঘী খাবে মাখন খাবেন অথচ এর উৎপাদনকারী গরুটিকে এক মুঠো ঘাস খাওয়াবেন না সেটা মেনে নেয়া যায়না। বিশ্বের বড় বড় দেশের রাষ্ট্র প্রধানগণ শেয়ার বাজার ধস মোকাবেলায় নিজেরাই মাঠে নেমেছেন। সরাসরি হস্তক্ষেপ করেছেন। বিনিয়োগকারীদের সাথে কথা বলেছেন। আবার বাজারকে ঘুরিয়েও দিয়েছেন। অথচ আমাদের দেশের বাজারের ওপর দিয়ে এতবড় সুনামি বয়ে গেল যার প্রচন্ড ছোবলে কিছু লোক প্রাণও হারিয়েছে এবং পথে বসেছে অগনিত মানুষ। তার একটু খোঁজ পর্যন্ত না নিলেন আমাদের প্রধানমন্ত্রী, না নিলেন অর্থমন্ত্রী। উল্টো বাজার ভালোর জন্য কেউ প্রতিবাদ করতে নামলে শুনেছি তাদের পেছনে পুলিশ লেলিয়ে জেল জুলুম পর্যন্ত করা হয়েছে। এখন শোনা যাচ্ছে পুলিশের ভয়েই নাকি প্রতিবাদকারী বিনিয়োগকারীরা বাজার মাটিতে মিশে যাওয়ার পরও রাস্তায় নামতে সাহস পাচ্ছেন না। হুমকি দেয়া হচ্ছে রাস্তায় নামলেই জামাত শিবির বলে চালান করে দেয়া হবে। আমরা নিশ্চিত নই এ অভিযোগ কতটুকু সত্য। যদি এমনটি হয়েই থাকে তাহলে ধরেই নিতে হবে আমরা কোন এক বর্বর দেশের নাগরিক হয়ে গেছি।

আমরা বিশ্বাস করি উপরের সবগুলোই এখন অতীত। আর সে কারণে অতীত নিয়ে না ঘেটে আগামি বাজেটে এই অসহায় বিনিয়োগকারীদের জন্য কি করা যায় তা নিয়ে প্লিজ একটু ভাবুন। একটু নজর দিন। আপনারা লাভবান হবেন। বাজারটি ঘুরে দাঁড়ালেই আপনাদের বাক্স সবার আগে ভরবে। বাজারের স্টেক হোল্ডারগণ আপনার কাছে হাতে গোনা কয়েকটি প্রস্তাব দিয়েছে। যার মধ্যে আছে ৫০ হাজার টাকা পর্যন্ত নগদ লভ্যাংশ করমুক্ত রাখা, ডিমিউচ্যুয়ালাইজেশন স্কিমের আওতায় স্টক এক্সচেঞ্জের চলমান কর অবকাশ সুবিধা আগামী পাঁচ বছরের জন্য শতভাগ অব্যাহতি দেয়া, ক্যাপিটাল গেইন ট্যাক্স কর্তনের ভার ব্রোকারেজ হাউস, মার্চেন্ট ব্যাংক বা সদস্য কোম্পানিগুলোর আওতামুক্ত রাখা, শেয়ার, ডিবেঞ্চার, মিউচ্যুয়াল ফান্ড, বন্ড বা অন্য সিকিউরিটিজ হস্তান্তরের ক্ষেত্রে স্টক এক্সচেঞ্জের সদস্যদের দশমিক ০৫ শতাংশ হারে কর কর্তনের পরিবর্তে বর্তমান বাজার পরিস্থিতি বিবেচনায় নিয়ে  এটি কমিয়ে দশমিক ০১৫ শতাংশ নির্ধারণ করা এবং পুঁজিবাজারে নিবন্ধিত কোম্পানিগুলোর আয়ের ওপর ৩৭ দশমিক ৫ শতাংশ হারে করপোরেট কর কমিয়ে ২৫ শতাংশ নির্ধারণ করা।

এর বাইরে আমরা বিনিয়োগকারীদের স্বার্থে শেয়ার বাজার নিউজ ডটকমের পক্ষ থেকে ব্যাংক সুদ হার কমানো, ব্যাংকের এক্সপোজার লিমিট সংক্রান্ত জটিলতার নিরসন, সিআরআর কমিয়ে দেয়াসহ বাজার ভালোর জন্য বিনিয়োগকারীদের এ যাবত দেয়া দাবীগুলো বিবেচনায় নেয়ার আহবান জানাচ্ছি। আমরা মনে করি পুঁজিবাজার ভালো হলে দেশের অর্থনীতি ভালো হতে বাধ্য। আর এই সহজে ভালো হওয়ার রাস্তাটি যত দ্রুত বাস্তবায়িত হবে আমাদের ধারণা দেশবাসী তত দ্রুতই মঙ্গল লাভ করতে পারবে।

 

শেয়ারবাজারনিউজ/সা/তু

আপনার মন্তব্য

Top