অর্থ ও পুঁজিবাজারের স্বার্থে এডি রেশিও সমন্বয়ের সময় পেছানোর দাবী

শেয়ারবাজার রিপোর্ট: নতুন সরকার গঠনের পর বড় বিনিয়োগের চাহিদা তৈরি হয়েছে। এর জন্য ব্যাংকে ভিড় করছেন বৃহৎ উদ্যোক্তারা। তারল্য বাড়াতে ব্যাংকাররাও ছুটছেন আমানত সংগ্রহে। এদিকে মন্দা কাটিয়ে উল্লম্ফন হয়েছে পুঁজিবাজারে। তবে অর্থবাজার (মানি মার্কেট) ও পুঁজিবাজারের (ক্যাপিট্যাল মার্কেট) এ পরিস্থিতি আগামীতে কেমন থাকবে, তা অনেকটাই নির্ভর করছে ঋণ-আমানত অনুপাত (এডি রেশিও) সমন্বয়ের ওপর। এজন্য কেন্দ্রীয় ব্যাংকের সিদ্ধান্তের দিকে তাকিয়ে আছে অর্থবাজার ও পুঁজিবাজার।

তাই ব্যাংকাররা বলছেন, আগামী ৩১ মার্চের মধ্যে এডি রেশিও সমন্বয় করতে হবে ব্যাংকগুলোকে। এজন্য আমানত সংগ্রহে ছুটছেন তারা। বেশি সুদে এক ব্যাংকের আমানত অন্য ব্যাংকের নিয়ে আসার ঘটনাও ঘটছে। এতে বেড়ে যাচ্ছে আমানতের সুদহার। ১০ শতাংশ সুদ প্রস্তাব করেও অনেক ক্ষেত্রে আমানত পাওয়া যাচ্ছে না। পরিস্থিতি স্বাভাবিক করতে হলে এডি রেশিও সংশোধন অথবা সমন্বয়ের সময়সীমা বাড়াতে হবে।

এরই মধ্যে ব্যাংকের শীর্ষ নির্বাহীরা এডি রেশিও সমন্বয়ের সময়সীমা পেছানোর দাবি তোলা শুরু করেছেন। চলতি অর্থবছরের দ্বিতীয়ার্ধের মুদ্রানীতি প্রণয়নের জন্য গত সোমবার দেশের অর্থনীতিবিদ, সাবেক গভর্নর, ব্যাংকারসহ বিশিষ্টজনদের সঙ্গে সংলাপে বসে বাংলাদেশ ব্যাংক। সেখানে এডি রেশিও সমন্বয়ের সময়সীমা পেছানোর দাবি তোলেন মিউচুয়াল ট্রাস্ট ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক (এমডি) আনিস এ খান। অনুষ্ঠানে ব্যাংক নির্বাহীদের সংগঠন অ্যাসোসিয়েশন অব ব্যাংকার্স বাংলাদেশের (এবিবি) সাবেক এ চেয়ারম্যান বলেন, মুদ্রানীতি প্রণয়নের আগে সরকার দেশের ব্যাংকিং খাত থেকে আগামী এক বছরে কত টাকা ঋণ নেবে তার পরিসংখ্যান জানা দরকার। বেসরকারি খাতে এ মুহূর্তে কী পরিমাণ ঋণ প্রস্তাব আছে, আগামী এক বছরে কী পরিমাণ বিনিয়োগ প্রস্তাব আসবে সেটিও হিসাব করতে হবে। সরকারি-বেসরকারি খাতে ঋণের চাহিদার ভিত্তিতে মুদ্রানীতিতে ঋণ বিতরণে প্রবৃদ্ধির প্রাক্কলন করতে হবে। একই সঙ্গে বাড়াতে হবে ব্যাংকগুলোর এডি রেশিও সমন্বয়ের সময়সীমা।

এডি রেশিও সমন্বয়ের সময়সীমা পেছানোর দাবি তুলবে বেসরকারি ব্যাংক উদ্যোক্তাদের সংগঠন বাংলাদেশ অ্যাসোসিয়েশন অব ব্যাংকসও (বিএবি)। সংগঠনটির চেয়ারম্যান মো. নজরুল ইসলাম মজুমদার বলেন, বাজারে তারল্য সংকট আছে। আমরা মনে করি, পরিস্থিতি বিচারে বাংলাদেশ ব্যাংকই এডি রেশিও সমন্বয়ের সময়সীমা পেছানোর উদ্যোগ নেবে। নির্বাচনের পর রাজনৈতিক অনিশ্চয়তার বিষয়টি কেটে গেছে। এখন উদ্যোক্তারা নতুন নতুন বিনিয়োগ করবেন। উদ্যোক্তাদের চাহিদা অনুযায়ী ঋণ দেয়া না গেলে দেশের উন্নতি-অগ্রগতি বাধাগ্রস্ত হবে।

আগ্রাসী বিনিয়োগের কারণে ২০১৭ সালে দেশের বেশির ভাগ বেসরকারি ব্যাংকের এডি রেশিও নির্ধারিত সীমা অতিক্রম করে। এ পরিস্থিতিতে ব্যাংকগুলোর বিনিয়োগের লাগাম টানতে এডি রেশিও কমিয়ে আনে বাংলাদেশ ব্যাংক। ২০১৮ সালের ৩০ জানুয়ারি জারি করা বাংলাদেশ ব্যাংকের প্রজ্ঞাপনে এডি রেশিও কমিয়ে আনা হয়। ওই প্রজ্ঞাপনে বলা হয়, প্রচলিত ধারার ব্যাংকগুলো পরবর্তী নির্দেশ না দেয়া পর্যন্ত আমানতের সর্বোচ্চ ৮৩ দশমিক ৫০ শতাংশ ঋণ বিতরণ করতে পারবে। এর আগে এ ধারার ব্যাংকগুলোর এডি রেশিওর সর্বোচ্চ হার ছিল ৮৫ শতাংশ। সে হিসেবে সাধারণ ব্যাংকগুলোর এডি রেশিও ১ দশমিক ৫ শতাংশীয় পয়েন্ট কমানো হয়।

দেশের ইসলামী ধারার ব্যাংকগুলো আমানতের সর্বোচ্চ ৯০ শতাংশ পর্যন্ত ঋণ বিতরণ করতে পারত। বাংলাদেশ ব্যাংকের নতুন নির্দেশনা অনুযায়ী এ ব্যাংকগুলোর সর্বোচ্চ এডি রেশিও হবে ৮৯ শতাংশ। সে হিসেবে এ ধারার ব্যাংকগুলোর এডি রেশিও ১ শতাংশীয় পয়েন্ট কমানো হয়। প্রজ্ঞাপন অনুযায়ী, ব্যাংকগুলোকে নতুন নির্দেশনা কার্যকর করার জন্য বিদায়ী বছরের ৩০ জুন পর্যন্ত সময় দেয়া হয়েছিল। কিন্তু ব্যাংকগুলোর আপত্তি ও পুঁজিবাজারে ব্যাপক দরপতনের মুখে ওই নির্দেশনা বাস্তবায়নের সময়সীমা দুই দফায় পেছানো হয়। সর্বশেষ প্রজ্ঞাপন অনুযায়ী, ২০১৯ সালের ৩১ মার্চের মধ্যে ব্যাংকগুলোর এডি রেশিও সমন্বয় করার কথা। যদিও এখন পর্যন্ত ১৫টির মতো ব্যাংকের এডি রেশিও নির্ধারিত সীমার উপরে আছে। আমানত সংকটের কারণে এ ধরনের ব্যাংকের সংখ্যা ক্রমেই বাড়ছে।

নতুন এডি রেশিও বাস্তবায়নের পরিস্থিতি এখনো তৈরি হয়নি বলে মনে করেন এবিবি চেয়ারম্যান ও ঢাকা ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক সৈয়দ মাহবুবুর রহমান। তিনি বলেন, আমানতের সুদহার এখনো ঊর্ধ্বমুখী। এডি রেশিও সমন্বয়ের চাপে ক্রমেই আমানতের সুদহার বাড়ছে। আমরা চেষ্টা করছি, এডি রেশিও নির্ধারিত সীমার মধ্যে নামিয়ে আনতে। জানুয়ারি শেষে তারল্য পরিস্থিতি সম্পর্কে স্বচ্ছ ধারণা পাওয়া যাবে।

ব্যাংকের এডি রেশিওর সঙ্গে পুঁজিবাজারের প্রত্যক্ষ সম্পর্ক না থাকলেও পরোক্ষ সম্পর্ক রয়েছে। এডি রেশিও কমানো হলে ব্যাংকের বিনিয়োগযোগ্য অর্থের পরিমাণ কমে যায়। ফলে ব্যাংকগুলো গ্রাহকদের আকৃষ্ট করতে আমানতের সুদের হার বাড়িয়ে দেয়। আমানতের সুদের হার বেড়ে গেলে বিনিয়োগকারীদের মধ্যে পুঁজিবাজার থেকে বিনিয়োগ তুলে নেয়ার প্রবণতা বেড়ে যায়। এতে পুঁজিবাজারে বিনিয়োগযোগ্য অর্থের বড় একটি অংশ ব্যাংকে চলে যাওয়ার পরিস্থিতি তৈরি হয়। এর নেতিবাচক প্রভাব পড়ে সূচক ও লেনদেনে।

কেন্দ্রীয় ব্যাংকের নির্দেশনা অনুযায়ী ৩১ মার্চের মধ্যে এডি রেশিও সমন্বয় করতে হলে পুঁজিবাজারে যে গতিশীলতা তৈরি হয়েছে, তা ব্যাহত হতে পারে বলে মনে করেন ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জের (ডিএসই) পরিচালক মিনহাজ মান্নান ইমন। তিনি বলেন, জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে কেন্দ্র করে গত বছর পুঁজিবাজারের সূচক ও লেনদেনে নিম্নমুখী প্রবণতা লক্ষ করা গেছে। তবে নির্বাচনের পর পুঁজিবাজারে গতি ফিরে এসেছে। বিনিয়োগকারীরা স্বতঃস্ফূর্তভাবে লেনদেনে অংশগ্রহণ করছেন। এ অবস্থায় মার্চের মধ্যে যদি এডি রেশিও সমন্বয় করতে হয়, তাহলে মুদ্রাবাজারে অস্থিরতার পাশাপাশি পুঁজিবাজারের গতিশীলতাও ব্যাহত হবে। এ অবস্থায় এডি রেশিও সমন্বয়ের সময়সীমা না বাড়ানো হলে বাজারে একটি চাপ তৈরি হবে। তবে আমার বিশ্বাস, নতুন সরকার ও নতুন অর্থমন্ত্রী পুঁজিবাজারের স্থিতিশীলতা নষ্ট হয় এমন কোনো পদক্ষেপ নেবেন না। কারণ বাজারের স্থিতিশীলতা নষ্ট হয় কারোরই তা কাম্য নয়।

তিনি আরো বলেন, আমাদের নতুন অর্থমন্ত্রী একজন পেশাদার ও বিচক্ষণ ব্যক্তি। একই সঙ্গে তিনি পুঁজিবাজারবান্ধব। আগামী সপ্তাহে আমরা অর্থমন্ত্রীর সঙ্গে দেখা করব। সেখানে এডি রেশিও সমন্বয়সহ পুঁজিবাজারসংশ্লিষ্ট বিভিন্ন বিষয় নিয়ে আলোচনা হবে। আশা করছি আগের ধারাবাহিকতায় পুঁজিবাজারের স্থিতিশীলতার স্বার্থে এডি রেশিও সমন্বয়ের সময়সীমা আবারো নবায়ন করা হবে।

পরিস্থিতির বিচারে এডি রেশিও সমন্বয়ের সময়সীমাকে উদার দৃষ্টিতে দেখছে বাংলাদেশ ব্যাংকও। কেন্দ্রীয় ব্যাংকের কর্মকর্তারা বলছেন, মানি মার্কেটের তারল্য সংকটের বিষয়টি বাংলাদেশ ব্যাংকের নজরে রয়েছে। সামগ্রিক বিচারে এডি রেশিও সমন্বয়ের সীমা বাড়িয়ে দেয়ার বিষয়টিও আলোচনায় আছে। তবে সবকিছুই নির্ভর করছে বাজার পরিস্থিতির ওপর।

বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, দেশের ব্যাংকিং খাতে বিনিয়োগযোগ্য আমানত রয়েছে ৮১ হাজার ৮৪৪ কোটি টাকা। এ আমানতের অর্ধেকের বেশি রয়েছে রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকগুলোর হাতে। ২০১৮ সালের অক্টোবর শেষে এ ব্যাংকগুলোর হাতে বিনিয়োগযোগ্য আমানত ছিল ৪৫ হাজার ৭৯১ কোটি টাকা। একই সময়ে বেসরকারি খাতের ব্যাংকগুলোর হাতে মাত্র ২০ হাজার ৯১৩ কোটি টাকার বিনিয়োগযোগ্য আমানত ছিল। অর্থাৎ গড়ে একটি বেসরকারি ব্যাংকের হাতে ৫০০ কোটি টাকার আমানতও নেই। নির্বাচন ঘিরে অক্টোবর-পরবর্তী তিন মাসে ব্যাংকগুলো থেকে বড় অংকের আমানত তুলে নিয়েছেন গ্রাহকরা। এতে ব্যাংকিং খাতে আমানত সংকট আরো তীব্র হয়েছে, যা তারল্য সংকট আরো বাড়িয়ে তুলেছে।

শেয়ারবাজারনিউজ/আ

আপনার মন্তব্য

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.

Top