পুঁজিবাজার কারসাজি: সেবি পারলে আমরা কেন পারছি না?

১৮ জুন ২০১৬ সালে পুঁজিবাজারে কারসাজি, কর ফাঁকি ও মুদ্রা পাচারের অপরাধে ১১২ টি কোম্পানিকে নিষিদ্ধ করেছে ভারতের নিয়ন্ত্রক সংস্থা সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ বোর্ড অব ইন্ডিয়া (সেবি)। সংস্থাটি জানায়, পুঁজিবাজারে তালিকাভুক্ত এই কোম্পানিগুলো ভুয়া লেনদেনের মাধ্যমে বাজার থেকে ১ হাজার ৬০০ কোটি রুপি হাতিয়ে নিয়েছে। যদিও এদের কোনোটিরই বাণিজ্যিক কার্যক্রমের কোনো হদিস পাওয়া যায়নি। সেবি আরো বলেছে, অতিরিক্ত মুনাফার লোভ দেখিয়ে বিনিয়োগকারীদের বোকা বানিয়েছে কোম্পানিগুলো। ফলে এদের শেয়ারের দাম অস্বাভাবিকভাবে বেড়ে যায়।

এবার বাংলাদেশের শেয়ার বাজার নিয়ে আলোচনায় আসা যাক। গত ২ বছরের বাজার পর্যালোচনা করলে বাংলাদেশের স্টক এক্সচেঞ্জের এক ভয়ংকর চিত্র দেখা যায়।

বেশকিছু কোম্পানি নিয়ে যে পরিমাণ কারসাজি হয়েছে তা বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশন (বিএসইসি) এর অনুসন্ধানেও বের হয়ে এসেছে। কারসাজির পেছনের ব্যক্তিদের বিএসইসি আর্থিক জরিমানা করেছে। প্রশ্ন হচ্ছে আর্থিক জরিমানাকে “শাস্তি” বলা উচিত হবে কি?

কারন মানুষের হাজার কোটি টাকা হাতিয়ে তার থেকে কিছু টাকা জরিমানা দেয়া কি “শাস্তি”? আর্থিক জরিমানা যে কোন শাস্তি হতে পারে না তা কারসাজির সঙ্গে যারা জড়িত তারা আঙ্গুল দিয়ে দেখিয়ে দিয়েছে। যেদিন মুন্নু সিরামিক ইন্ডাস্ট্রিজ লিমিটেড এর কারসাজির জন্য জরিমানা করা হয় সেদিন এই শেয়ারের দাম ছিল ৩৪০ টাকা। অথচ বিএসইসি কে বৃদ্ধ আঙ্গুল দেখিয়ে গত ৫ দিনে শেয়ারটি ১০০ টাকা মূল্য বৃদ্ধি করা হয়েছে। বর্তমানে এর দাম ৪৪০ টাকা। কারসাজি চক্র এই মূল্য বৃদ্ধি করে বাজারে একটি বার্তা দিয়েছে যে বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশন (বিএসইসি) এর চেয়ে কারসাজি চক্র অনেক অনেক বেশি শক্তিশালী। অথচ পাশের দেশ ইন্ডিয়া হলে অর্থ জরিপানার পাশাপাশি জেলে পচতে হতো।

২০১৬ সালে ভারতের নিয়ন্ত্রক সংস্থা সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ বোর্ড অব ইন্ডিয়া (সেবি) ১১২টি কোম্পানিকে নিষিদ্ধ করার পেছনে প্রধান কারণ ছিল বিনিয়োগকারীদের বাজারের প্রতি বিশ্বাসযোগ্যতা যেন কোন ভাবেই নষ্ট না হয়। অথচ বাংলাদেশের পুঁজিবাজারে গত ২ বছরে ভয়াবহ কারসাজি হচ্ছে। দেখার কেউ নেই। গত ২ বছরে ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জ স্বল্প মূলধনী আর Z এর বাজারে পরিণত হয়েছে।

গত ৬ মাস থেকে ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জ ১৪টি কোম্পানি সম্পর্কে বিনিয়োগকারীদের সচেতন করে যাচ্ছে। এই ১৪ টি কোম্পানি গত ৫ বছর থেকে ডিভিডেন্ড দেয়না। একটি কোম্পানিও উৎপাদনে নেই। কোম্পানি গুলোর অস্তিত শুধু কাগজে কলমে রয়েছে। সম্প্রতি ৪টি কোম্পানিকে তালিকাচ্যুত করার জন্য বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশন (বিএসইসি) এর কাছে আবেদনও করেছে। বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশনের এখন সময় এসেছে বিনিয়োগকারীদের ম্যাসেজ দেয়ার। এই বাজার শুধু কাগজ নিয়ে খেলার জায়গা না। যে কোম্পানির অস্তিত্ব নেই সেই কোম্পানির মালিকানা কেনা-বেচা সম্ভব নয়।

বাজারে যতদিন ভাল এবং প্রতিষ্ঠিত কোম্পানি গুলো চালকের আসনে আসতে ব্যর্থ হবে ততদিন বাজার কখনই ভাল হবে না। আর এই জন্য স্বল্প মূলধনী কোম্পানি যেগুলো নিয়ে কারসাজি হচ্ছে সেই কোম্পানির এবং কারসাজি চক্রের বিরুদ্ধে বিএসইসি’র শক্ত অবস্থান নিশ্চিত করতে হবে। তা না হলে কোন বিনিয়োগকারীর অর্থ এই বাজারে বিনিয়োগে এগিয়ে আসবেনা। বর্তমানে যে ব্যক্তি ভাল এবং প্রতিষ্ঠিত কোম্পানির শেয়ার কিনেন তাকে লোকজন পাগল বলে। পাগল বলার কারনও আছে। কারন গত ২ বছরে যেখানে স্বল্প মূলধনী আর z ক্যাটাগরির শেয়ার গুলো ১০ গুন দাম বেড়েছে সেখানে ভাল এবং প্রতিষ্ঠিত কোম্পানির শেয়ার গুলো ২৫% করে মূল্য হ্রাস পেয়েছে।

বিনিয়োগকারীদের স্বার্থ রক্ষার জন্য, বাজারের প্রতি বিশ্বাসযোগ্যতা ফিরিয়ে আনার জন্য সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ বোর্ড অফ ইন্ডিয়া (সেবি) যদি কঠিন পদক্ষেপ নিতে পারে তাহলে আমরা কেন পারছি না? বাজার ভাল করতে হলে ভাল কোম্পানির প্রতি বিনিয়োগকারীদের আস্থা ফিরিয়ে আনতে হলে বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশন (বিএসইসি) কে আরও কঠিন হতে হবে। পরিশেষে ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জকে ধন্যবাদ জানাচ্ছি। দেরিতে হলেও অস্তিত্ব বিহীন কোম্পানি গুলোকে তালিকাচ্যুত করার মতন ভাল একটি উদ্যোগ নেয়ার জন্য।

 

তানভীর আহমেদ

শেয়ার বিনিয়োগকারী

উত্তরা, ঢাকা।

 

শেয়ারবাজারনিউজ/ম.সা

 

আপনার মন্তব্য

Top