প্লেসমেন্ট নিয়ে ভুল তথ্যে বাজারে প্যানিক সৃষ্টি হয়েছে- আহমেদ রশীদ লালী

“সম্প্রতি প্লেসমেন্ট নিয়ে যে বক্তব্য দেয়া হয়েছে সেটা অনাকাঙ্খিত। ডিএসই’র বোর্ড প্লেসমেন্টের বিষয়ে যে সিদ্ধান্ত নিয়েছে সেটা বিএসইসিতে জমা দিয়েছে। এ বিষয়ে যে কথাগুলো বলা হয়েছে সেটা একেবারেই আন- জাস্টিফাইড হয়েছে। প্লেসমেন্ট শেয়ার বিক্রি সংক্রান্ত কিছু তথ্য দেওয়াতে বাজারে প্যানিক সৃষ্টি হয়েছে। এ বিষয়টি আমি একদমই বিরোধীতা করি। ডিএসই যে সিদ্ধান্ত নিয়েছে সেটা নিয়ে কোনো দ্বিমত নেই। কিন্তু যে স্টেটমেন্ট দিয়েছে আমি সেটার বিরোধীতা করি।” সম্প্রতি শেয়ারবাজারনিউজ ডটকমের সঙ্গে একান্ত আলাপকালে এসব কথা বলেন ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জের (ডিএসই) সাবেক পরিচালক ও সিনিয়র ভাইস প্রেসিডেন্ট,ডিবিএ’র সাবেক প্রেসিডেন্ট এবং রশিদ ইনভেস্টমেন্ট সার্ভিসেস লিমিটেডের ব্যবস্থাপনা পরিচালক আহমেদ রশীদ লালী

শেয়ারবাজারনিউজের সঙ্গে আলাপের চুম্বক অংশ নিম্নে পাঠকদের উদ্দেশ্যে তুলে ধরা হলো:

শেয়ারবাজারনিউজ: প্লেসমেন্ট শেয়ার বিক্রিতে তিন বছরের লকইন রাখার প্রস্তাব করেছে ডিএসই। এটি বাজারের জন্য কতটুকু ইতিবাচক ভূমিকা রাখবে?

আহমেদ রশীদ লালী:  উনারা তিন বছরের যে লকইন দেয়ার কথা বলছেন সেটা হলে প্রাইমারি মার্কেটটা থমকে পড়বে। কারণ একটি কোম্পানির প্লেসমেন্ট শেয়ার নেয়ার পর থেকে তালিকাভুক্তি পর্যন্ত অন্তত দুই বছর সময় লেগে যায়। যদি আরো তিন বছর লকইন রাখা হয় তাহলে ইনভেস্ট ফিরে পেতে মোট ৫ বছর সময় লেগে যাবে। এতে বিনিয়োগে অনুৎসাহ চলে আসবে। আমাদের একটা ভালো প্রাইমারি মার্কেট আছে। এই মার্কেটে ভাইব্রেন্ট আছে। যদি প্লেসমেন্ট শেয়ার বিক্রির লকইন তিন বছর করা হয় তাহলে এটা বাজারের জন্য সুখকর হবে না। লকইনটা একবছরই হওয়া উচিত।

শেয়ারবাজারনিউজ:   যদিও আইনে প্লেসমেন্ট বলতে কিছু নেই, রয়েছে ক্যাপিটাল রেইজিংয়ের কথা। তবুও তালিকাভুক্তির আগে মূলধন উত্তোলনকে আমরা প্রি-আইপিও প্লেসমেন্ট বলে জানি। এক্ষেত্রে তালিকাভুক্তির আগে প্লেসমেন্ট শেয়ার ইস্যুর গুরুত্ব কতটুকু?

আহমেদ রশীদ লালী: কোম্পানির ক্যাপিটাল রেইজ করার একাধিক কারণ রয়েছে। প্রথমত; একটি কোম্পানি বাজারে আসতে চাচ্ছে; তাকে কেউ চেনে না,তাকে কেউ জানে না। তাই সেই কোম্পানি তার ফ্রেন্ডস, রিলেটিভদের কিছু প্লেসমেন্ট শেয়ার ইস্যু করে টাকা নেয়। দ্বিতীয়ত; একটা কোম্পানি আবেদন করার পর ধরে নেয়া হয় যে কোম্পানিটি বাজারে আসতে দুই বছর সময় লাগবে। এই যে লম্বা একটা সময় লেগে যাচ্ছে, কোম্পানির এই সময়েতো আর বসে থাকলে চলবে না। তাকে ব্যবসা এগিয়ে নিতে যেতে হবে। তখন কোম্পানি প্লেসমেন্টে শেয়ার ছেড়ে কার্যক্রম চালিয়ে নেয়। আরেকটু গভীরভাবে যদি বলি, একটি কোম্পানি যখন তার ব্যবসায়িক কার্যক্রম চালিয়ে নেয় তখন তাকে মাথায় রাখতে হয় যে, লিস্টিংয়ের এক বছর পর তাকে ডিভিডেন্ড দিতে হবে। এখন কোম্পানি যদি তার কার্যক্রম চালিয়ে না নেয় তাহলে এক বছর পর সে কিভাবে ডিভিডেন্ড দেবে। আরেকটি বিষয় হচ্ছে, এখানে ভ্যালুয়েশন ইফেক্ট রয়েছে। যদি কোনো কোম্পানির পেইড আপ ১০০ কোটি টাকা থাকে এবং সে আইপিও’র মাধ্যমে বাজার থেকে আরো ১০০ কোটি তোলার পর তার ২০০ কোটি টাকা পেইড আপ হয়ে যাচ্ছে। এক্ষেত্রে আগে ইপিএস ১০ টাকা থাকলে পরে ডাইলুয়েশন হয়ে তা ৫ টাকা হয়ে যাবে। এই ডাইলুয়েশন এর পর ইপিএস আগের মতো রাখার জন্য কোম্পানিকে আগে থেকেই প্রস্তুতি নিতে হয়। এ কারণেই প্লেসমেন্টটা অনিবার্য।

শেয়ারবাজারনিউজ: প্লেসমেন্ট শেয়ারের অপব্যবহারওতো হচ্ছে…

আহমেদ রশীদ লালী: প্লেসমেন্ট শেয়ারের অপব্যবহার হচ্ছে তা ঠিক। সেজন্য যে সমস্ত জায়গায় মিসইউজ হয় সেখানে ঠিক করতে হবে। সেই সকল জায়গাকে স্টপ করা উচিত যাতে মিসইউজ না হয়। প্লেসমেন্টের নামে যে বাণিজ্য কার্ব মার্কেটে চলে সেই কার্ব মার্কেটটাকে নিয়ন্ত্রণ করতে হবে।

শেয়ারবাজারনিউজ: এই কার্ব মার্কেটকে কিভাবে নিয়ন্ত্রণ করা যাবে?

আহমেদ রশীদ লালী:  যেহেতু প্লেসমেন্ট আন-লিস্টেড কোম্পানিতে বিনিয়োগ করা হয় তাই এটিকে কয়েকভাবে নিয়ন্ত্রণ করা যেতে পারে। প্রথমত: যখন কোনো বিনিয়োগকারী প্লেসমেন্টের অফার পান তখন সেই বিনিয়োগকারীর প্রয়োজন হবে বিএসইসি বা ডিএসই’র একটি কনফারমেশন নেয়া যে এইরকম কোনো কোম্পানির আইপিও  আবেদন জমা পড়েছে কিনা। এই জিনিসটা যদি না করা হয় তাহলে এটা নিয়ন্ত্রণ করা কঠিন। দ্বিতীয়ত হলো: একটা এগ্রিমেন্ট যদি কোম্পানি ও বিনিয়োগকারীর মধ্যে হয় তাহলে সেই এগ্রিমেন্টের কপি ডিএসইকে দিয়ে জানানো যে, অমুক কোম্পানির প্লেসমেন্ট শেয়ার কেনা হয়েছে। তখন বিএসইসি বা ডিএসই সেটার ওপর তদন্ত করে বিষয়গুলো ঠিক করার চেষ্টা করবে।

শেয়ারবাজারনিউজ: প্লেসমেন্ট শেয়ার কেনার ঝুঁকিওতো রয়েছে…

আহমেদ রশীদ লালী:  আমাদের আইনে প্লেসমেন্ট বলতে কিছু নাই। আমাদের আইনে আছে, ইস্যুয়েন্স অব ক্যাপিটাল, ক্যাপিটাল রেইজ করা। এখন ক্যাপিটাল রেইজ করার জন্য বিএসইসি একটা কনসেন্ট লেটার দেয়। তখন কোম্পানিগুলো ক্যাপিটাল রেইজ করার জন্য টাকাগুলো নেয় এবং এটাকে আমরা চলতি ভাষায় প্রি-আইপিও প্লেসমেন্ট বলে থাকি। বলাবাহুল্য, যখন ইনভেস্ট করা হয় তখন কিন্তু আন-লিস্টেড কোম্পানিতে ইনভেস্ট করা হয়। তাই লিস্টিং পাওয়া বা না পাওয়া নিয়ে রিস্ক থেকে যায়। বিএসইসি ফান্ড রেইজিংয়ের জন্য কনসেন্ট দেয় তখন তারা নিচে লিখে দেয় লিস্টিং হবে কিনা সে রেসপনসিবিলিটি কমিশন নিচ্ছে না। এই ঝুঁকির বিষয়টি বিনিয়োগকারীদের মাথায় রাখতে হবে।

শেয়ারবাজারনিউজ: পাশ্ববর্তী দেশের প্লেসমেন্ট সংক্রান্ত আইনের সঙ্গে আমাদের আইন সামঞ্জস্য কিনা?

আহমেদ রশীদ লালী:  আমরা যদি ভারতের দিকে তাকাই কিংবা পাকিস্তানের দিকে তাকাই তাহলে দেখবো, ইন্ডিয়াতে  ডিসক্লোজার অ্যান্ড ইনভেস্টর প্রটেকশন গাইডলাইন ২০০০’ এ বলা হয়েছে যে, প্লেসমেন্টের জন্য এক বছরের লকইন থাকবে। ২০০২ সালে এই আইনে সংশোধন এনে কিছু প্রাতিষ্ঠানিক বিনিয়োগকারীকে ছাড় দেওয়া হয়। পরবর্তীতে ২০০৬ সালে পুনরায় এই আইনে সবার জন্যই প্লেসমেন্টের লকইন একবছর করা হয় এবং এই লকইন প্রসপেক্টাস সাবমিশনের পর থেকেই গণনা শুরু হয়। অন্যদিকে আমাদের লকইন পিরিয়ড শুরু হয় প্রসপেক্টাস অনুমোদন এর পর থেকে।

শেয়ারবাজারনিউজ: বর্তমান মার্কেটে নেতিবাচক প্রভাব পড়ার প্রধানতম কারণ দেখানো হচ্ছে প্লেসমেন্ট শেয়ারকে কেন্দ্র করে। অথচ চলতি জানুয়ারি মাসে মার্কেট ইতিবাচক ছিলো। ফেব্রুয়ারি মাসেই তার বিপরীত চিত্র দেখা গেছে। এক্ষেত্রে মার্কেট খারাপ হওয়া পেছনে কি আসলেই প্লেসমেন্ট দায়ী নাকি অন্যকিছু?

আহমেদ রশীদ লালী:  জানুয়ারি মাসে যখন বাজারটা ঘুরে দাঁড়ালো এবং ইনডেক্সটা যখন প্রায় ৬ হাজারের ছুঁই ছুই ছিলো তখন আমরা দেখলাম যে, আমাদের অনেকগুলো স্পন্সররা শেয়ার সেল করতে চলে এসেছে। এছাড়া প্রাতিষ্ঠানিক বিনিয়োগকারীদেরও অনেক সেল প্রেসার ছিলো। এখন এই সেল প্রেসার বাজারটা নিতে পারেনি। তাই বাজারে দরপতন হয়েছে। এটিই মূলত ফেব্রুয়ারি মাসে বাজারে মন্দাবস্থার মূল কারণ।

শেয়ারবাজারনিউজ: স্পন্সর-পরিচালকদের শেয়ার বিক্রির ঘোষণা আসার পরপরই সংশ্লিষ্ট শেয়ার দরে নেতিবাচক প্রভাব পড়তে দেখা যায়। এ বিষয়ে কোনো পদক্ষেপ নেয়া যায় কিনা?

আহমেদ রশীদ লালী:  যখন স্পন্সর শেয়ার সেল হতে আসে তখন বাজারটা যদি সেলের প্রেসারে কমে যায় তাহলে কিন্তু আমাদের ইনভেস্টরদের প্রটেকশনের জন্য কিছু করণীয় নেই। এক্ষেত্রে ইনভেস্টরদের প্রটেকশনের জন্য কয়েকটা কাজ করা যেতে পারে। প্রথমত: যখন কোনো স্পন্সরদের কাছ থেকে সেল আসবে তখন অন্তত ৭ দিন ব্লক করে রাখতে হবে। এই ৭দিন কেন দরকার?  এই ৭ দিনে ইনভেস্টররা চিন্তা করবে যে উনি একজন স্পন্সর হয়ে শেয়ার সেল কেন করছেন? এখানে কয়েকটা কারণ থাকতে পারে। একটা হতে পারে কোম্পানিতে কোনো খারাপ নিউজ আছে। আরেকটি হতে পারে নেক্সট কোয়ার্টার খারাপ হতে পারে। আরেকটা হতে পারে কোম্পানির ফিন্যান্সিয়াল অবস্থা ভালো না। এরকম কিছু কারণ থাকতে পারে।

একজন বিনিয়োগকারীর ৭ দিন সময় প্রয়োজন এই কারণে যে, বিনিয়োগকারীরা  যেন সিদ্ধান্ত নিতে পারে সংশ্লিষ্ট শেয়ারে সে থাকবে কি থাকবে না। তাহলে স্পন্সর পরিচালকরা সেল করার আগে সে নিরাপদে বের হয়ে যেতে পারবে। তাই স্পন্সরদের শেয়ার সেল আসার পর ৭ দিন অন্তত ব্লক করে রাখতে হবে। এই ৭ দিন স্টক এক্সচেঞ্জকে বিনিয়োগকারীদের সুযোগ দিতে হবে।

দ্বিতীয়ত: সেই স্পন্সর ডিএসইকে কারণ দেখাবে কেন সে শেয়ার বিক্রি করতে চায়। তৃতীয়ত: বিএসইসির নির্দেশনার মাধ্যমে কোনো স্পন্সরের শেয়ার বিক্রির কারণে যদি সেই কোম্পানির ১০ টাকার শেয়ার ৮ টাকায় নেমে আসে তখন তাকে বাইব্যাক করে ১০ টাকায় নিয়ে আসতে হবে। এক্ষেত্রে যত খুশি সেল করুক, কোনো সমস্যা হবে না। কিন্তু যখনই ২০% এর নিচে শেয়ার দর নেমে যাবে তখনই তাকে বাইব্যাক করাতে হবে। এতে করে সেই কোম্পানির ইনভেস্টররা ক্ষতিগ্রস্ত হবে না। এটা ভারতের শেয়ারবাজার নিয়ন্ত্রক সংস্থা সেবি করেছে। ২০০৫ সালে রিল্যায়েন্সের একটা বিশাল অঙ্কের সেল আসছে তখন সেবি’র কারণ দর্শানোর জবাবে রিল্যায়েন্স নতুন প্রজেক্ট করবে বলে উত্তর দিয়েছিল। অতপর: সেবি ২০% এর নিচে শেয়ার দর নেমে গেলে বাইব্যাক করার শর্তে তা অনুমোদন করেছিল। কাজেই বিএসইসি এই জাতীয় একটা নিয়ম করতে পারে।

শেয়ারবাজারনিউজ: তালিকাভুক্ত কোম্পানিগুলোর বোনাস শেয়ার ইস্যুর প্রবণতা মাত্রাতিরিক্ত বেড়েছে। এ বিষয়টি কিভাবে দেখছেন?

আহমেদ রশীদ লালী:  এই যে বোনাস শেয়ার দিয়ে দিয়ে কোম্পানিগুলো পেইড আপকে ফুলিয়ে ফাঁপিয়ে বাজারকে শেষ করে দিচ্ছে সেটার বিষয়ে জরুরিভিত্তিতে পদক্ষেপ নিতে হবে। যখন বোনাস ঘোষণা করা হয় তখন কোম্পানি রিজার্ভ ফান্ডের ক্যাশ টাকা মূল স্ট্রিমে নিয়ে আসে। এখানে বিএসইসিকে বলতে হবে, আপনি যে ক্যাশটা নিয়ে আসলেন এই ক্যাশ দিয়ে আপনি কি করলেন, নাস্তা করলেন নাকি দুইটা মেশিন কিনলেন? সেটা মনিটর করতে হবে। যখন বোনাস শেয়ার ইস্যু করা হয় তখন বিএসইসির কাছে বলতে হবে বোনাস শেয়ারের টাকাটা দিয়ে তারা কি করবে। আইপিও’র অর্থ ব্যবহারের বিষয়ে যেভাবে প্রতি মাসে কমপ্লায়েন্স দেয় সেভাবে বোনাস শেয়ারের টাকার বিষয়ে কমপ্লায়েন্স দিতে হবে।

শেয়ারবাজারনিউজ: বর্তমান বাজারে আতঙ্কের আরেক নাম ডি-লিস্টিং। ডি-লিস্টিং হলে স্পন্সর পরিচালকদের কিছু হচ্ছে না, ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছেন সাধারণ বিনিয়োগকারীরা। এ বিষয়ে কোনো সমাধান আছে কিনা?

আহমেদ রশীদ লালী:   ডি-লিস্টিং স্টক এক্সচেঞ্জের একটা চলমান প্রক্রিয়া। প্রতিবছর কিছু ডি-লিস্টিং হবে আবার কিছু নতুন কোম্পানি আসবে। কিন্তু এখানে দেখা যায় ডি-লিস্টিংয়ের সময় স্পন্সররা বেঁচে যায় কিন্তু ইনভেস্টররা ক্ষতিগ্রস্ত হয়। কারণ তারা একদিন সকাল বেলা উঠে দেখে তার শেয়ারটা কাগজ হয়ে গেছে। কোনো ভ্যালু নেই। কাজেই ইনভেস্টরদের বাঁচাবার জন্য ইন্ডিয়াতে যে আইনটা রয়েছে সেটা করা দরকার। সেটি হলো: ডি-লিস্টিংয়ের ৬ মাস আগে নোটিশ দিতে হবে। বিএসইসি এইসময়ে একজন ভ্যালুয়ার বসাবেন। সেই ভ্যালুয়ার শেয়ার প্রতি মূল্য নির্ধারণ করবেন। শেয়ার প্রতি মূল্য নির্ধারণ করার পরে বিএসইসি স্পন্সরদের শেয়ারগুলো বাজার থেকে কিনে নেয়ার নির্দেশনা দেবেন। আর অবশ্যই তা কোম্পানির টাকায় নয়, স্পন্সরদের টাকায় কিনতে হবে।

শেয়ার কেনার পর সেই স্পন্সর পরিচালকরা আগামী ১০ বছর পর্যন্ত নতুন কোনো প্রজেক্ট নিয়ে বিএসইসির কাছে যেতে পারবে না। এটা তাদের প্রতি বিএসইসির শাস্তি। এছাড়া তার সঙ্গে সেই কোম্পানির পরিচালকরা যদি অন্য কোনো লিস্টেড কোম্পানির বোর্ডে থেকে থাকে তাহলে তার সেই কোম্পানির ডিরেক্টরশীপ সিজ হয়ে যাবে।

শেয়ারবাজারনিউজ: কোম্পানির ইপিএস অনেক বেড়ে গেলে বা কমে গেলে ব্যাখ্যা দেয়ার আইন থাকলে এর বাস্তবিকতা দেখা যাচ্ছে না। সে বিষয়ে কিছু বলুন।

আহমেদ রশীদ লালী:  আমাদের ২০১৫ সালের লিস্টিং রেগুলেশনে বলা হয়েছে, যখন কোয়াটার্লি রিপোর্ট দেয়া হয় তখন ইপিএস যদি বেড়ে যায় কিংবা কমে যায় সেটার একটা ব্যাখ্যা প্রদান করতে হবে। কিন্তু কোনো কোম্পানি সে ব্যাখ্যাটা দেয় না এবং ডিএসই সেটার বিষয়ে কোনো কথাও বলে না। এছাড়া ব্যাখ্যা জানার জন্য চিঠিও দেয় না। এ বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে দেখতে হবে।

শেয়ারবাজারনিউজ: খবর পাওয়া যাচ্ছে, ট্রেডিংয়ের গোপনীয়তা ফাঁস হয়ে যাচ্ছে। ট্রেডিংয়ের ডাটা পাঁচার হচ্ছে। সে বিষয়ে কি ব্যবস্থা নেয়া যায়?

আহমেদ রশীদ লালী:  আমি কোনো শেয়ার কিনলে কিছুক্ষণ পরেই কল আসে যে ভাই আপনি শেয়ার বাই দিলেন, কোনো খবর আছে নাকি। এই যে তাৎক্ষণিকভাবে খবর বের হয়ে যাচ্ছে এটা বর্তমানে মার্কেটের খুব ক্ষতি করছে। এই বিষয়টি কড়াকড়িভাবে নিয়ন্ত্রণ করতে হবে। এটা খুব সেনসিটিভ একটা বিষয়। কারণ বিনিয়োগকারীরা সবসময় একটা গোপনীয়তা চায়। উনাদের গোপনীয়তা যখন থাকে না তখন তারা ডিসকারেজ হয়ে যায়। এখন এই তথ্য পাঁচার যেখানে থেকেই হোক সেটা নিয়ন্ত্রণ করার দায়িত্ব নিতে হবে বিএসইসি এবং ডিএসইকে।

শেয়ারবাজারনিউজ: একটি প্রসপেক্টাস জমা দেয়ার পর আইপিও’র কনসেন্ট পেতে দুই-তিন বছর লেগে যাচ্ছে। এক্ষেত্রে কি শুধু বিএসইসি’র কালক্ষেপণই দায়ী?

আহমেদ রশীদ লালী: আইপিও’র অনুমোদন পেতে যে সময় ব্যয় হচ্ছে সেজন্য আমরা শুধু ঢালাওভাবে বিএসইসিতে দোষ দিতে পারি না। এক্ষেত্রে বিএসইসি কতখানি দায়ী সেটাও ভেবে দেখতে হবে। বিএসইসির পক্ষ থেকে বলা আছে যে, আপনি যখন আবেদন করবেন তখন এই কাগজগুলো দিবেন। তাহলে আমি কম কাগজ কেন দেই? কিংবা আমি এক্সপায়ার্ড কাগজ কেন দেই। যেখানে বিএসইসি সব পরীক্ষা-নিরীক্ষা করার পর দেখা যায় শেষ পর্যায় এসে একটা পয়েন্টে ঠেকে যায়। যখন কোনো কাগজে ঘাটতি থাকে তখন বিএসইসির পক্ষ থেকে চিঠি পাঠানো হয়। তখন সেই কাগজ জমা দিতেও কোম্পানির কয়েকমাস লেগে যায়।

শেয়ারবাজারনিউজ: আইপিও’র কালক্ষেপণ দূর করতে কি করা যেতে পারে?

আহমেদ রশীদ লালী:  বিশ্বের সব জায়গায় আছে, ড্রাফট প্রসপেক্টাসটা প্রথমে স্টক এক্সচেঞ্জের কাছে যাবে। স্টক এক্সচেঞ্জ সেটা পরীক্ষা-নিরীক্ষা করে একটা সার্টিফিকেট দিবে যে এই কোম্পানিকে লিস্টিং দেয়া যেতে পারে অথবা এই কোম্পানি লিস্টিং যোগ্য নয়। কেন নয় সেটার ব্যাখ্যা বলে দেবে। এই চিঠি ছাড়া একটি কোম্পানি বিএসইসির কাছে আবেদনই করতে পারবে না। তাহলে স্টক এক্সচেঞ্জ একটা প্রসপেক্টাসকে ৭-১০দিনের মধ্যে এই কাজ করে এনওসি (নো অবজেকশন সার্টিফিকেট) দিয়ে দিতে পারবে। এই এনওসি নিয়ে যখন বিএসইসিতে আবেদন করবে তখন বিএসইসি আরো ৭-১০ দিন সময় নিতে পারে ডিএসই’র কমেন্টসগুলো পুন:পরীক্ষা করার জন্য। বিশ্বের সব জায়গায় এরকমই হয়। এই কাজগুলো যদি কমিয়ে নিয়ে আসা যায় তাহলে একটি আইপিও দুই থেকে তিন মাসের মধ্যে বাজারে আসতে পারে।

শেয়ারবাজারনিউজ: ২০১১ এর পর থেকে ১০৫টি কোম্পানি বাজারে এসেছে। কিন্তু লেনদেন ৫০০ কোটির ঘরেই ঘুরপাক খাচ্ছে। বর্তমান বাজার মূলধনের সঙ্গে দৈনিক লেনদেন সামঞ্জস্য কিনা?

আহমেদ রশীদ লালী:  এই বাজারে ন্যূনতম ১২০০ কোটি টাকা লেনদেন হওয়া দরকার। যেহেতু এটা ইক্যুইটি মার্কেট তাই এখানে লেনদেন ১২০০ কোটি টাকা হওয়া উচিত। এই বাজারে যখন ডেরিভেটিবস আসবে, যখন বন্ড আসবে, তখন তিন হাজার কোটি টাকা ট্রেড হবে। সেটা ভিন্ন প্রসঙ্গ। কিন্তু এখন হাজার থেকে বার’শ কোটি টাকা লেনদেন হতে হবে। ‍দুর্ভাগ্যবশত: নানা কারণে, বাংলাদেশের ব্যাংকের কিছু বিষয় (এক্সপোজার) আছে ইত্যাদি কারণে লেনদেনে গতি আসছে না। এই জিনিসগুলো যদি স্ট্রিম লাইনে না আসে তাহলে বাজারটা ঠিক হতে সময় লাগবে।

শেয়ারবাজারনিউজ: সামনের বাজার কেমন হতে পারে?

আহমেদ রশীদ লালী:  বাজারটা এরকম থাকবে না। অনেক চেঞ্জ সামনে আসবে। আমরা আশা করছি এসএমই (স্বল্প মূলধনী কোম্পানি) যদি এপ্রিল-মে এর দিকে চলে আসে, এসএমই বোর্ড  হয়ে যায়, তাহলে সেখানে কিছু ট্রেড বাড়বে। নতুন বিনিয়োগকারী সেখানেও আসবে। এই ট্রেডিং প্যাটার্নটাও চেঞ্জ হবে, আর ট্রেডিং বলিউমটাও চেঞ্জ হবে। এসএমই বোর্ড আসলে অনেক নতুন লো-পেইড আপ যারা এতোদিন আসতে পারেনি তারা আসবে। এমন অনেক টেকনোলজি কোম্পানি আছে, আইটি কোম্পানি আছে, যাদের মূলধন কম, তারা ৩০ কোটি টাকা মূলধন করতেও পারে না, মার্কেটেও আসতে পারে না। কাজেই আমরা আশা করবো এসএমই বোর্ড গঠন হবার পরে বাজারের ব্যাপ্তিটা আরো বাড়বে।

শেয়ারবাজারনিউজ: বিনিয়োগকারীদের জন্য আপনার পরামর্শ…

আহমেদ রশীদ লালী: বিনিয়োগকারীদের আতঙ্কিত হবার কিছু নেই, প্যানিক হবার কিছু নেই। শুধু বলবো যেই শেয়ার তারা কিনতে আগ্রহী হচ্ছেন সেটার ওপরে যেন বিনিয়োগকারীরা একটু কাজ করেন। একটু সময় দেন, রেউমারের কথা বাদ দেন। সময় যদি দিতে না পারেন তাহলে আপনাদের ব্রোকারদের সঙ্গে পরামর্শ করেন। যদি ভালো শেয়ারে ইনভেস্ট করেন তাহলে তারা রাতে ভালো মতো ঘুমাতে পারবেন,মাথা ব্যাথা হবে না।

শেয়ারবাজারনিউজ: এতোক্ষণ সময় দেওয়ার জন্য আপনাকে ধন্যবাদ।

আহমেদ রশীদ লালী: আপনাকেও ধন্যবাদ।

 

শেয়ারবাজারনিউজ/ম.সা

আপনার মন্তব্য

Top