শর্ট সেলের আদ্যোপান্ত

শেয়ারবাজার রিপোর্ট: বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশন (বিএসইসি) শর্ট সেল রুলস,২০১৯ প্রণয়ন করতে যাচ্ছে। যেহেতু সামনে ডেরিভেটিভ মার্কেটে আসছে এবং এই ডেরিভেটিভের অন্যতম শর্ত হচ্ছে শর্ট সেলের সুযোগ থাকা, তাই শর্ট সেলের বৈধতা নিয়ে নতুন আইন তৈরি করা হচ্ছে। শেয়ারবাজার শিক্ষার আজকের এই পর্বে শর্ট সেলের বিস্তারিত তুলে ধরা হয়েছে। আন্তর্জাতিক ওয়েবসাইট Investopedia এবং দেশি-বিদেশি বিভিন্ন পত্র-পত্রিকা, ম্যাগাজিন এবং ইউটিউব থেকে নিম্নোক্ত তথ্যগুলো নেয়া হয়েছে।

শর্ট সেল কি:

মুনাফার আশায় মানুষ শেয়ার ব্যবসায় প্রবেশ করে। কোনো নির্দিষ্ট কোম্পানির শেয়ারে বিনিয়োগকারীদের এই বিনিয়োগকে বলা হয় ‘লং পজিশন’। আমাদের দেশে চালু না হলেও চতুর্থ আরেকটি অপশন রয়েছে বিনিয়োগকারীদের হাতে, তা হলো শর্ট সেলিং। ধরা যাক, কোনো একটি কোম্পানির শেয়ার দর বৃদ্ধি পাচ্ছে কিন্তু সে কোম্পানির শেয়ার আপনার কাছে নেই। অথচ আপনার কাছে শেয়ার কেনার মতো টাকা আছে। সামনে কোম্পানিটির শেয়ার দর কমতে পারে মনে করে আপনি সে টাকা দিয়ে শেয়ার কিনলেন না। উল্টো আপনার সিকিউরিটিজ হাউজে নির্দিষ্ট সুদের মাধ্যমে কারো কাছ থেকে শেয়ার ধার নিয়ে সেগুলো বিক্রি করে দিলেন। শর্ত হচ্ছে, মালিক যখন ফেরত চাইবেন কিংবা দাম যখন কমে যাবে, তখন আপনার টাকা দিয়ে আবার শেয়ারটি কিনে নেবেন। এক্ষেত্রে যিনি শর্ট সেল করেন তার মুনাফা হচ্ছে, {বিক্রয়মূল্য-(ক্রয়মূল্য+ট্রেডিং কমিশন+মার্জিন ঋণের সুদ+ ডিভিডেন্ড ও রাইট শেয়ার (যদি থাকে)}=শর্ট সেলারের মুনাফা। আপনি যখন শর্ট সেলিংয়ে অংশগ্রহণ করবেন তখন বাজারে আপনার অবস্থানটিকে বলা হবে ‘শর্ট পজিশন’।

শর্ট সেলের উৎপত্তি:

সপ্তদশ শতকের শুরুর দিকে ডাচ্ ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির শেয়ার শর্ট সেল দিয়ে শেয়ারবাজারে শর্ট সেলের ধারণার প্রথম প্রয়োগ ঘটিয়েছিলেন আমস্টারডামের বিনিয়োগকারী আইজ্যাক ল্য মেয়ার। পরের শতকে লন্ডনে এবং ঊনবিংশ শতকে নিউইয়র্কে এর বহুল চর্চা হয়। অতিস্ফীতির পর বাজার যখন পতনোন্মুখ, তখন বুদ্ধিমান একদল বিনিয়োগকারী নিজের শেয়ার বিক্রি করে মুনাফা তুলে নেন। তারপর তারা ব্রোকারের সহায়তা নিয়ে অন্যদের ধরে রাখা শেয়ারগুলোও একসময় ফেরত দেয়ার শর্তে বিক্রি করে দেন। দরপতনে সবাই যখন দিশাহারা, তখন তারা আনন্দে আত্মহারা। মানবিক দৃষ্টিকোণ থেকেই সম্ভবত শর্ট সেল শেয়ারবাজারে সমালোচনার বিষয়বস্তু। ওয়াল স্ট্রিটে ১৯২৯-এর ধস ও পরবর্তী মন্দার পেছনে শর্ট সেলারদের দিকেই অভিযোগের আঙুল তুলেছেন শেয়ারবাজারের ইতিহাস পর্যালোচনাকারীরা। তাদের বিরুদ্ধে সামষ্টিক দুঃসময়ে দায়িত্বহীন কার্যক্রমের অভিযোগও তুলে আসছেন অন্যরা। দরপতন আরো তীব্র করে বলে সব দেশে রেগুলেটররা শর্ট সেলকে খুব কঠোর নজরে রাখে। ধসের সময়টায় শর্ট পজিশন নিষিদ্ধ করে দিয়ে বাজারে সরবরাহ কমানোর প্রবণতাও সুপ্রতিষ্ঠিত।

শর্ট সেলের পক্ষে যুক্তি:

চাহিদা আর সরবরাহের ওপর দাঁড়িয়ে থাকা শেয়ারবাজারে একদল দায়িত্বহীন মানুষ যখন অস্বাভাবিক সব দামে শেয়ার কিনে বাবল  সৃষ্টি করে, তখন তাদের লং পজিশন নিষিদ্ধ না করলে শর্ট পজিশনও নিষিদ্ধ করা ঠিক না। মৌলভিত্তি দেখে যারা শেয়ার ধরে রাখতে বা ছেড়ে দিতে চান, তারা বাজারের অতিমূল্যায়নের জন্য দায়ী না। বরং আরো বেশি মুনাফার স্পেকুলেশনই বাজারকে অতিমূল্যায়িত করে। স্পেকুলেশন দুদিকেই সমানতালে চলতে পারে। এতে বরং বাজার ভারসাম্যপূর্ণ অবস্থায় থাকে।

শর্ট সেলের ভালো দিক:

শর্ট সেল বাজারকে কিছু ভালো বিষয় উপহার দেয়, যা নিয়ে বিতর্ক করেন না কেউই। কার্যকর শেয়ারবাজারের জন্য চাই বেশি বেশি ক্রয়াদেশ আর বিক্রয়াদেশ। আপনি যখন কিনতে চাইবেন, তখন বাজারে যথেষ্ট শেয়ার থাকবে আর যখন বেচতে চাইবেন তখন যথেষ্ট ক্রেতা থাকবে। এটিকে বাজারের পরিভাষায় বলা হয় লিকুইডিটি বা তারল্য।

অবস্থান দাম বেশি থাকার সময় শর্ট সেলাররা বিক্রির সময় বাজারে সরবরাহ বাড়ান আর সেগুলো কিনে ফেরত দেয়ার সময় (কভার) চাহিদাও বাড়ান। এর অর্থ, দাম বেশি থাকার সময় শর্ট সেলাররা সরবরাহ বাড়িয়ে বাজারের অতিমূল্যায়ন নিরুৎসাহিত করেন। অন্যদিকে দাম কমে গেলে অন্য ট্রেন্ড ট্রেডাররা যেখানে এগোনোর চিন্তাও করেন না, শর্ট সেলাররা সেখানে ক্রয়াদেশ দিয়ে অস্বাভাবিক অবমূল্যায়ন নিরুৎসাহিত করেন। সমস্যা হয়ে যায়, সবাই যদি একই কৌশল অবলম্বন করতে শুরু করে তখন। চরম চাঙ্গা বাজারে সবাই শেয়ার কেনায় ব্যস্ত হয়ে পড়লে যেমনটা হয়, ঠিক তেমনই। শুধু লং আর শর্ট পজিশন।

বিনিয়োগকারীর আকাশকুসুম প্রত্যাশাকে কার্যত চ্যালেঞ্জ করেন শর্ট সেলাররা। বাজারের জন্য এটি যে কত গুরুত্বপূর্ণ, তা আমরা সবাই জানি।

প্রাইস ডিসকভারি অ্যান্ড মার্কেট এফিসিয়েন্সি মূলধনি মুনাফা এমনই জিনিস, অনেক বিনিয়োগকারী অতিমূল্যায়িত দরকে স্বাভাবিক ধরে নেয়ার জন্য তাদের ভ্যালুয়েশন মডেল বা গবেষণার পদ্ধতি বদলাতেও দ্বিধা করেন না। শর্ট সেলারের কাছ থেকে আসা সরবরাহ তাদের সবাইকে সজাগ করে এবং বাজার একটি ভারসাম্যপূর্ণ দর বেছে নিতে উদ্বুদ্ধ হয়। প্রকৃত মূল্য আর বাজারমূল্যের দূরত্ব কম থাকা এফিসিয়েন্ট মার্কেটের একটি বড় বৈশিষ্ট্য।

শর্ট সেলারদের মুভমেন্ট:

পতনশীল বাজারেই শর্ট সেলারদের জন্য সবচেয়ে বড় মুনাফার হাতছানি, লং পজিশন হোল্ডারদের জন্য ঠিক যেমনটি থাকে ঊর্ধ্বমুখী বাজারে। কিন্তু ধসের সময় লোকসানের মানবিক গল্প সমাজ ও নীতিনির্ধারকদের এত বেশি নাড়া দেয় যে, সে সময়টায় তারা শর্ট সেলারদের আটকে রাখেন।

আবার পুরো বাজার হয়তো কমছে না, কিন্তু নির্দিষ্ট খাত বা কোম্পানির মৌলভিত্তির ক্রমাবনতি ঘটতে থাকলেও সেখানে শর্ট সেলাররা সক্রিয় হন। টেকনিক্যাল চার্ট যখন নিম্নমুখী প্রবণতা নিশ্চিত করে, তখন কিছু মুনাফা করে নেয়ার সুযোগ হাতছাড়া করতে চান না অনেক শর্ট সেলার। টানা দরবৃদ্ধি আর হাস্যকর অতিমূল্যায়নের পর দরপতনের সম্ভাবনা দেখলে অনেকে শর্ট পজিশন নিতে শুরু করেন।

শর্ট সেলারের ঝুঁকি

শর্ট সেলারের ঝুঁকি লং পজিশন হোল্ডারের চেয়ে বেশি। কারণ একটি শেয়ারের দাম কমলে সর্বোচ্চ শূন্য পর্যন্ত নেমে আসতে পারে। কিন্তু শর্ট সেল দেয়ার পর যদি দেখা যায়, শেয়ারটির দাম বাড়তে শুরু করেছে। তখন যদি আপনি কোনো কারণে সেটি কভার করতে না পারেন এবং এর দাম বহু গুণ বেড়ে যায়, তখন আপনার লোকসান অনেক গুণ বেড়ে যাবে। লং পজিশনে সুযোগ বর্ণনা করতে বলা হয়, ‘স্কাই ইজ দ্য লিমিট’। বিপরীত দিক থেকে দেখলে কথাটি শর্ট সেলারের ঝুঁকি বর্ণনা করতে গেলেও বলা যায়।

লভ্যাংশ আর রাইট শেয়ার

আসল মালিক লং পজিশনে থাকলে একটি শেয়ার থেকে যে লভ্যাংশ বা রাইট শেয়ার পান, শর্ট সেলারকে শেয়ার ধার দিলেও তিনি তা বুঝে নেন। কোনো কোম্পানি অস্বাভাবিক উচ্চহারে লভ্যাংশ দিয়ে বসলে তা শর্ট সেলারের ঝুঁকি বাড়ায়।

শর্ট ইন্টারেস্ট

একটি কোম্পানির ফ্রি ফ্লোট শেয়ারের কত শতাংশ শর্ট সেলাররা এরই মধ্যে বিক্রি করেছেন, তা-ই নির্দিষ্ট কোম্পানির শর্ট ইন্টারেস্ট। শর্ট ইন্টারেস্ট যত বেড়ে যায়, বাজারে শেয়ারটির চাহিদাও তত বেড়ে যায়। কারণ তাদের সবাই একদিন এ শেয়ার কিনে ফেরত দিতে বাধ্য। চরম নিম্নমুখী পর্যায় ছাড়া অন্য সময়গুলোয় বাজার যদি বুঝে যায়, নির্দিষ্ট শেয়ারে শর্ট ইন্টারেস্ট রেশিও অস্বাভাবিক বেড়ে গেছে, তাহলে আরেক দল স্পেকুলেটর শুধু কভারিং ক্রয়াদেশদাতার কাছে বেশি দামে বেচার জন্য এ শেয়ার বেশি দামে কিনতে দ্বিধা করেন না।

শর্ট ইন্টারেস্ট রেশিও

প্রতিদিন গড়ে যে পরিমাণ শেয়ার হাতবদল হয়, এর সঙ্গে শর্ট সেলারদের বিক্রি করা মোট শেয়ারের অনুপাতই হচ্ছে শর্ট ইন্টারেস্ট রেশিও। শর্ট ইন্টারেস্ট রেশিও ১০ হলে ধরে নেয়া হয়, সব শর্ট পজিশন ক্লোজ করতে ১০ দিন লাগতে পারে। আর ১০ দিনই যদি ওই শেয়ারের দর টানা বাড়তে থাকে।

শর্ট সেলের সেটলমেন্ট ও নজরদারি

ব্রোকার নির্দিষ্ট কমিশনের বিনিময়ে শর্ট সেলারকে সেবা দেয়। সাধারণত মার্জিন ব্যবহার না করে শর্ট সেল করতে দেয়া হয় না। কারণ ঝুঁকি তুলনামূলক বেশি বলে শর্ট সেলারের মূল অর্থ ব্রোকারের নিরাপত্তার জন্য না বলে ধরে নেয়া হয়। বড় বাজারগুলোয় নির্দিষ্ট সময়ান্তে নির্দিষ্ট সিকিউরিটিজে নিট শর্ট পজিশনের উপাত্ত প্রকাশ করেন। অন্যদিকে রেগুলেটররা সেগুলো প্রতিদিনই নজরে রাখেন।

যুক্তরাষ্ট্রের মতো বাজারগুলোয়ও একসময় দেখা যেত,  অনেক ব্রোকার কারো কাছে শেয়ার ধার না পেয়েও শর্ট সেলার গ্রাহককে সেবা দিয়ে পরে সেটলমেন্টের সময় শেয়ার দিতে পারছে না। তবে বর্তমান নিয়ন্ত্রক সংস্থাগুলো এ দায়িত্বহীনতাকে কঠোরভাবে নিষিদ্ধ করেছে।

 

 

শেয়ারবাজারনিউজ/ম.সা

 

 

আপনার মন্তব্য

Top