কেন ধনী আরো ধনী হয়?

কেন ধনী আরো ধনী হয়? কেন কিছু লোক অনেক ধনী ব্যক্তিতে পরিণত হয়? আবার কেন বেশিরভাগ মানুষ দরিদ্র কিংবা মধ্যবিত্তেই পড়ে থাকে?

“রিচ ড্যাড, পুর ড্যাড” নামে রবার্ট টি, কিওসাকি’র একটি বিখ্যাত বইয়ে এই প্রশ্নগুলোর খুব সুন্দর উত্তর দেওয়া হয়েছে। রবার্ট নামে একজন ছেলে ছিলো যার দুইজন বাবা ছিলো। অন্যকিছু মনে করবেন না। প্রথমটি তার নিজের বাবা এবং দ্বিতীয়টি তার বন্ধুর বাপ যাকে তিনি বাবা বলে মনে করতেন। প্রথমজন পিএইচডি করেছেন কিন্তু দ্বিতীয়জন কখনোই ৮ম শ্রেণী পাশ করেননি। দুজনেই খুব স্মার্ট এবং হার্ড ওয়ার্কিং ছিলো। কিন্তু দুজনের চিন্তা-ধারণায় অনেক পার্থক্য ছিলো। তাই দুজনেই রবার্টকে আলাদা আলাদা কথা শেখাতেন। প্রথম বাবা বলতেন যে সব পাপের মূল হলো টাকা।কিন্তু দ্বিতীয় বাপ বলতেন সব পাপের মূল হচ্ছে টাকা না হওয়া

প্রথম বাবা রবার্টকে সবসময় দামি জিনিষপত্র কিনতে বারণ করতেন এবং বলতেন যে ঐটা তাদের সামর্থের বাইরে। কিন্তু রবার্টের দ্বিতীয় বাবা বলতেন, চিন্তা করো এবং আলাদা আলাদা রাস্তা বের করো যাতে তুমি ঐসব দামি জিনিষপত্র কিনতে পারো। এই চিন্তা করতে পারলে তার মেধার বিকাশ ঘটবে এবং নিত্য নতুন আইডিয়া বের করতে পারবে।

প্রথম বাবা রবার্টকে বলতো খুব পরিশ্রম করো, ভালো করে পড়াশুনা করো যাতে তোমার বড় কোম্পানিকে চাকরি হয় এবং তুমি বড় মানুষ হতে পারো। দ্বিতীয় বাবা রবার্টকে বলতো, তুমি খুব পড়াশুনা করো, পরিশ্রম করো কিন্তু অন্যের চাকরি করার চেয়ে নিজের কোম্পানি খুলো যাতে তুমি নিজে অন্যকে চাকরি দিতে পারো।

রবার্ট তার নিজের চোখে তার দুজন বাবাকেই তাদের আলাদা আলাদা চিন্তা ধারণা এবং তাদের প্রবৃদ্ধি দেখতে পেলেন। রবার্টের দ্বিতীয় বাবা পরবর্তীতে মায়ামি ফ্লোরিডা’র সবচেয়ে ধনী ব্যক্তিতে পরিণত হন এবং তার শেখানো কথায় রবার্ট নিজে কোটি কোটি টাকা অর্জন করেন। অন্যদিকে তার প্রথম বাবা জীবনভর মধ্যবিত্তেই থেকে যায়।

এর মধ্যে রবার্ট তার ধনী পিতার কাছ থেকে যা শিখলেন তা হচ্ছে ফিন্যান্সিয়াল লিটারেসি। এর অর্থ হচ্ছে সম্পদ ও দায়ের পার্থক্য জানা। একটু মনোযোগ দিয়ে বুঝুন, এটি নরমাল অ্যাকাউন্টিংয়ের ভাষায় যে মিনিং বলা হয়েছে তার থেকে একটু ব্যতিক্রম। রবার্ট খুব সহজভাবেই এর অর্থ বের করেছেন। যেমন: অ্যাসেট বা সম্পদ আপনার সেই বস্তু যা আপনাকে টাকা বানিয়ে দেবে অথবা আপনার পকেটে টাকা ঢালবে। অন্যদিকে লায়াবিলিটি বা দায় ঐ বস্তু যা আপনার পকেট থেকে টাকা নিয়ে নেবে অথবা আপনার টাকা শেষ করে দেবে। কিছু লোক এ কারণেই ধনী হয় কারণ সে তার অ্যাসেট বাড়াতে থাকে, অন্যদিকে মিডল ক্লাস লোক শুধু লায়াবিলিটিতে খরচ করে থাকে। 

এবার আসি সুরেশ ও রমেশের কথায়। এই দুইজন বন্ধু একই পজিশন ও একই বেতনে চাকরি করতেন। যখন তাদের বেতন হতো তখন রমেশ তার বেতন থেকে নতুন জামা, নতুন ফোন, বাইক বা কার এমন জিনিষ ক্রয় করতেন যা তাকে ধনী ব্যক্তিদের ফিলিংস দিতো। কিন্তু সে এটা বুঝতো না যে এসব কিছু তার দায়। কারণ দিনের পর দিন তার থেকে জিনিষ কেনা মারফত টাকা নিয়ে নেওয়া হচ্ছে। শুধু তাই নয় পরবর্তীতে এগুলোর মেইনটেনেন্সের জন্যও টাকা নেওয়া হচ্ছে। যেগুলো দিন যত যাবে তত এগুলোর ভ্যালু কমতে থাকবে।

কিন্তু সুরেশ এমন ছিলো না। সে তার বেতনের টাকা দিয়ে খুব জরুরি প্রয়োজন ছাড়া রমেশের মতো এতো জিনিষ কিনতো না। সে টাকা জমাতো এবং অ্যাসেটসে বা সম্পদে খরচ করতো। যেমন: স্টক, বন্ড, রিয়েল স্টেট এবং নিজের জ্ঞান অর্জনে বিভিন্ন ট্রেনিং যা তাকে সামনে আরো এগিয়ে নিতে সহায়তা করবে। কয়েক বছর পর সুরেশ কোটিপতি হয়ে গেলো। অন্যদিকে রমেশ সেইখানেই পড়ে রইল এবং তার বেতন কম হওয়াকে সে দোষারোপ করতে লাগলো এবং বলতে লাগলো কম বেতনই তার মিডল ক্লাস হওয়ার মূল কারণ।

একজন গরীব ব্যক্তির ক্যাশ ফ্লো এরকম হয়ে থাকে যেমন: তার টাকা আসে এবং সে টাকা তার জরুরি কাজে ব্যয় হয়ে যায়। একজন মধ্যবিত্তের ক্যাশ ফ্লো কিছুটা আলাদা হয়। তার টাকা আসে এবং সে টাকা তার জরুরি কাজ এবং লায়াবিলিটিতে খরচ করে ফেলে। এ কারণে মিডল ক্লাস এবং গরীবের মধ্যে তেমনটা পার্থক্য পরিলক্ষিত হয় না।

মিডল ক্লাস লোকদের ভাবনা হচ্ছে তার ঘড়-বাড়ি তার অ্যাসেট। কিন্তু প্রকৃত অর্থে তা কিন্তু নয়। আপনার ঘর আপনাকে টাকা বানিয়ে দেয় না যতক্ষণ না আপনি ঐটাকে ভাড়ায় দিচ্ছেন।

অন্যদিকে ধনী ব্যক্তিদের ক্যাশ ফ্লো একটু ভিন্নরকম হয়। তাদের টাকা আসে এবং সে টাকা দিয়ে প্রথমেই সে কিছু অ্যাসেট বানিয়ে ফেলে এবং সেই অ্যাসেট থেকে আসা টাকা থেকে খরচ করতে থাকে। এ কারণেই সে ধনী থেকে আরো ধনী ব্যক্তিতে পরিণত হয়। কারণ দিনের পর দিন তার সোর্স বৃদ্ধি পেতে থাকে। যদি আপনাকে ধনী হতে হয় তাহলে এই কথাটি সবসময় মনে রাখতে হবে। আপনি কতো টাকা ইনকাম করেন সেটি কোনো বিষয় নয় বরং আপনি ঐ টাকাকে কিভাবে এবং কোথায় খরচ করছেন সেটিই সবচেয়ে বেশি গুরুত্বপূর্ণ।

আপনাকে ভোগের চিন্তা থেকে বের হয়ে বিনিয়োগের মেনটালিটি তৈরি করতে হবে। মানুষ মনে করে তার খারাপ কন্ডিশনের কারণ তার কম বেতন দায়ি এবং বেতন বৃদ্ধি পেলে সে আরো আরামে থাকবে। কিন্তু সমস্যা হলো ইনকাম বাড়ার পর লোকদের খরচও অনেক বেড়ে যায়। কারণ বেশি টাকা বেশি দামি জিনিষ কিনতে অনেক সময় বাধ্য করে। যেমন: দামি মোবাইল, গাড়ি, ফ্ল্যাট ইত্যাদি যার সবই লায়াবিলিটি এবং এগুলো আপনাকে কখনোই ধনী হতে দেবে না।

 

 

শেয়ারবাজারনিউজ/ম.সা

আপনার মন্তব্য

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.

Top