সীমান্তে নিরাপত্তা সত্ত্বেও থেমে নেই রোহিঙ্গাদের স্রোত

শেয়ারবাজর ডেস্ক: মিয়ানমার সীমান্তে প্রবেশে বাঁধা তৈরির লক্ষ্যে কড়াকড়ি সত্ত্বেও দেশটি থেকে আশ্রয়প্রার্থীদের আসা থেমে নেই। তারা কিভাবে ঢুকছে এ নিয়ে চিন্তিত বাংলাদেশ। এছাড়া জাতিসংঘ শরণার্থী সংস্থার (ইউএনএইচসিআর) তথ্য অনুযায়ী, চলতি বছরের শুরু থেকে গত ১৫ মে পর্যন্ত (সাড়ে চার মাস) অন্তত ৯৯০ জন রোহিঙ্গা বাংলাদেশে এসেছে। ফলে বাংলাদেশে মিয়ানমার থেকে আসা রোহিঙ্গার সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ৯ লাখ ১০ হাজার ৬১৯ জন।

সোমবার (২০ মে) সন্ধ্যায় বলা হয়, ইউএনএইচসিআরের এই হিসাবের চেয়ে বাস্তবে রোহিঙ্গার সংখ্যা আরও কয়েক লাখ বেশি বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা।

এ বিষয়ে ইউএনএইচসিআরের মুখপাত্র স্টিফেন প্যাটিসন গণমাধ্যমকে বলেন, এ বছর মিয়ানমারের ৯৯০ জন বাসিন্দা কক্সবাজারে আশ্রয় শিবিরে ঢুকেছে। ২০১৮ সাল থেকে মিয়ানমারের বাসিন্দাদের বাংলাদেশমুখী ঢলে ধীরগতি এলেও কম সংখ্যায় আসা অব্যাহত রয়েছে।

এদিকে এ বছর সংকটে যৌথ সাড়াদান পরিকল্পনার আওতায় আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের কাছে ৯২ কোটি ডলারের তহবিল চাওয়া হয়েছিল। এর বিপরীতে গত ১৬ মে পর্যন্ত মিলেছে ১৬ কোটি ৭০ লাখ ডলার, যা প্রত্যাশিত তহবিলের মাত্র ১৮ শতাংশ। এর আগে ২০১৭ সালে যৌথ সাড়াদান পরিকল্পনার আওতায় প্রত্যাশিত ৪৩ কোটি ৪০ লাখ ডলারের মধ্যে ৩১ কোটি ৭০ লাখ ডলার (৭৩%) এবং গত বছর ৯৫ কোটি ১০ লাখ ডলারের প্রত্যাশিত তহবিলের ৬৫ কোটি ৫০ লাখ ডলার (৬৯%) অর্জিত হয়েছিল। এ বছরের তহবিলের খাতওয়ারী হিসাবে দেখা গেছে, স্থানীয় সম্প্রদায়ের সঙ্গে যোগাযোগ খাতে এক কোটি ১০ লাখ ডলার, লজিস্টিক খাতে ২৮ লাখ ডলার ও জরুরি টেলিযোগাযোগ খাতে ১১ লাখ ডলার চাওয়া হয়েছিল। এসব খাতে বিশ্ব সম্প্রদায় এখনো কোনো অর্থসহায়তা করেনি।

সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা জানান, ২০১৭ সালের ২৫ আগস্ট মিয়ানমার থেকে বাংলাদেশে রোহিঙ্গার ঢল নামার আগের বছরের অক্টোবর মাস থেকে প্রায় ৮৪ হাজার রোহিঙ্গা বাংলাদেশে আসে। তারও আগে শরণার্থী হিসেবে নিবন্ধিত প্রায় ৩০ হাজার রোহিঙ্গার পাশাপাশি অনিবন্ধিত প্রায় তিন লাখ রোহিঙ্গা ছিল। অন্যদিকে ইউএনএইচসিআরের হিসাব অনুযায়ী, ২০১৬ সালের ৯ অক্টোবরের আগে বাংলাদেশে আসা রোহিঙ্গার সংখ্যা ছিল মাত্র ৭৪ হাজার ৩৭৮ জন।

রোহিঙ্গাদের স্বেচ্ছায়, নিরাপদ ও সম্মানজনক প্রত্যাবাসনে বাংলাদেশ ও মিয়ানমার ২০১৭ সালের ২৩ নভেম্বর চুক্তি সই করার পরও উল্লেখযোগ্যসংখ্যক রোহিঙ্গা বাংলাদেশে আশ্রয় নিয়েছে। ইউএনএইচসিআরের হিসাব অনুযায়ী, ২০১৭ সালের ২৫ আগস্ট থেকে ৩১ ডিসেম্বর পর্যন্ত এ দেশে আসা রোহিঙ্গার সংখ্যা সাত লাখ ২৩ হাজার ৭৭১ জন। এই সংখ্যা ভুটানের মোট জনসংখ্যার কাছাকাছি। ২০১৮ সালে এ দেশে রোহিঙ্গা এসেছে অন্তত ১৬ হাজার ৮১৬ জন।

জানা গেছে, আশ্রিত রোহিঙ্গাদের ৬৭ শতাংশই এসেছে মিয়ানমারের রাখাইন রাজ্যের মংডু টাউনশিপ থেকে। বাকি ৩৩ শতাংশের ২৬ শতাংশ বুথিডং ও পাঁচ শতাংশ রাথিডং টাউনশিপ থেকে এসেছে। মাত্র ২ শতাংশ এসেছে রাখাইনের অন্যান্য অঞ্চল থেকে। মংডু, বুথিডং, রাথিডং—তিনটি টাউনশিপই বাংলাদেশ সীমান্তের কাছে। নারীদের গণধর্ষণ ও নিধনযজ্ঞ চালিয়ে সুকৌশলে ওই তিনটি টাউনশিপ থেকে রোহিঙ্গাদের বিতাড়িত করা হয়েছে বলে ধারণা করা হয়।

জানা গেছে, বর্তমানে বাংলাদেশে আশ্রিত রোহিঙ্গাদের মধ্যে ৩৪ হাজার ১৭২ জন শরণার্থী হিসেবে নিবন্ধিত। অবশিষ্ট ৯৬ শতাংশ রোহিঙ্গাকে বাংলাদেশ আনুষ্ঠানিকভাবে ‘শরণার্থী’ হিসেবে স্বীকৃতি না দিলেও ইউএনএইচসিআরসহ আন্তর্জাতিক বিভিন্ন সংস্থা তাদের শরণার্থী হিসেবে অভিহিত করছে। কূটনৈতিক সূত্রগুলো বলছে, ওই রোহিঙ্গাদের ‘শরণার্থী’ মর্যাদার দাবিতে বিভিন্ন মহল তৎপরতা শুরু করেছে। শরণার্থী মর্যাদা দিলে তাদের অধিকার আরো সুরক্ষিত হবে-এমন যুক্তিও তুলে ধরা হচ্ছে।

এদিকে বাংলাদেশে আশ্রয় নেওয়া রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠীর ৫৫ শতাংশই শিশু। বাকি ৪৫ শতাংশের মধ্যে ৪২ শতাংশ প্রাপ্তবয়স্ক ও ৩ শতাংশ প্রবীণ। আশ্রিত রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠীর ৫২ শতাংশ নারী ও ৪৮ শতাংশ পুরুষ। বিশেষ করে ১৮ থেকে ৫৯ বছর বয়সীদের মধ্যে নারীর সংখ্যাই বেশি। মোট দুই লাখ ১০ হাজার ১১৮টি পরিবারের মধ্যে সবচেয়ে ঝুঁকিতে আছে ‘সিঙ্গেল মাদাররা’।

এক হিসাবে দেখা গেছে, রোহিঙ্গা শিবিরে ‘সিঙ্গেল ফিমেল প্যারেন্ট’ আছে ৩২ হাজার ৯৮৩ জন। অন্যদিকে মা-হারা সন্তান নিয়ে শিবিরে আশ্রয় নেওয়া বাবার সংখ্যা এক হাজার ৭৫০ জন।

শেয়ারবাজারনিউজ/মু

আপনার মন্তব্য

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.

Top