পিপলস লিজিংয়ের অবসায়ন: বাংলাদেশ ব্যাংকের আনুষ্ঠানিক ঘোষণা


শেয়ারবাজার রিপোর্ট: পুঁজিবাজারে তালিকাভুক্ত আর্থিক খাতের পিপলস লিজিং অ্যান্ড ফিন্যান্সিয়াল সার্ভিসেস লিমিটেডকে(পিএলএফসিএল) অবসায়নের আনুষ্ঠানিক ঘোষণা দিয়েছে বাংলাদেশ ব্যাংক। তবে এ নিয়ে আমানতকারীদের আতঙ্কিত না হওয়ার পরামর্শ দিয়েছে কেন্দ্রীয় ব্যাংক।

বুধবার (১০ জুলাই) বিকেলে বাংলাদেশ ব্যাংকে আয়োজিত এক আনুষ্ঠানিক সংবাদ সম্মেলনে এসব তথ্য জানান কেন্দ্রীয় ব্যাংকের নির্বাহী পরিচালক ও মুখপাত্র মো. সিরাজুল ইসলাম। এ সময় বাংলাদেশ ব্যাংকের আরেক নির্বাহী পরিচালক শাহআলম উপস্থিত ছিলেন।

সিরাজুল ইসলাম বলেন, সরকারের অনুমতিক্রমে এবং হাইকোর্টের নির্দেশের আলোকে পিপলস লিজিংকে অবসায়নের পদক্ষেপ নিয়েছি। প্রতিষ্ঠানটিতে এখনো আমানতের তুলনায় সম্পদের পরিমাণ বেশি রয়েছে। সেক্ষেত্রে সরকারের নির্দেশ মোতাবেক এবং হাইকোর্টের নির্দেশনা অনুযায়ী আমানতকারীদের অর্থ ফেরত দেয়া হবে, যাতে করে তারা ক্ষতিগ্রস্ত না হন।

তিনি বলেন, ‘২০১৫ সালের ৯ জুন বাংলাদেশ ব্যাংকের পরিদর্শনে পিপলস লিজিংয়ের ম্যানেজমেন্টের দুর্বলতা উঠে আসে। কোম্পানিটির উদ্যেক্তারা স্ব-নামে বেনামে ঋণ নিয়ে এটিকে দুর্বল করে ফেলে। এটি বাংলাদেশে ব্যাংকের পরিদর্শনে উঠে এলেও পরিচালনা পর্ষদ ভেঙে দিয়ে পরবর্তীতে পর্যবেক্ষক নিয়োগ দেওয়া হয়। তারপরেও অবস্থার উন্নতি না হয়ে পরিস্থিতি আরও খারাপের দিকে যাচ্ছিল। এ অবসস্থায় প্রতিষ্ঠানটির অবসায়ন করার বিষয়ে গত ২১ মে অর্থমন্ত্রণালয়কে চিঠি দেয় বাংলাদেশ ব্যাংক। গত ২৬ জুন সরকারের নির্দেশনা মোতাবেক এবং হাইকোর্টের নির্দেশনার আলোকে পিপলস লিজিংকে অবসায়ন করা হচ্ছে।’
কেন্দ্রীয় ব্যাংকের মুখপাত্র আরও বলেন, ‘পিপলস লিজিংয়ে আমানতের পরিমাণ ২ হাজার ৩৬ কোটি ২২ লাখ টাকা। আমানতের বিপরীতে সম্পদের পরিমাণ ৩ হাজার ২৬৯ কোটি ৯৮ লাখ টাকা। ফলে আমানতের তুলনয় সম্পদের পরিমাণ বেশি।’

এক প্রশ্নের জবাবে মো. শাহআলম বলেন, ‘কোম্পানির কতিপয় পরিচালকের বিধিবর্হিভূতভাবে ঋণ নেওয়ায় প্রতিষ্ঠানটি দুর্বল হয়ে পড়ে। এর ফলে বাংলাদেশ ব্যাংক কোম্পানির পরিচালনা পর্ষদ ভেঙে দেয় এবং নতুর পর্ষদ গঠন করে। পাশাপাশি যে সব পরিচালক ও ঋণগ্রহিতা ঋণ নিয়ে পরিশোধ করেননি তাদের কাছ থেকে টাকা আদায় করতে আইনি প্রক্রিয়ার মাধ্যমে যা যা দরকার ছিল, আমরা সবই করেছি। তারপরও প্রতিষ্ঠানটিকে রক্ষা করা যায়নি।’

পিপলস লিজিংয়ে অবজারভার নিয়োগের পরেও অবসায়ন করা বাংলাদেশ ব্যাংকের ব্যর্থতা কি না এমন প্রশ্নের জবাবে শাহআলম বলেন, ‘বাংলাদেশ ব্যাংক রেগুলেটর হিসাবে সব সময় সচেষ্ট এবং এখনো আছে। বাংলাদেশ ব্যাংকই এই অনিয়মগুলো উদঘাটন করেছে।’

তিনি বলেন, ‘কোম্পানিটিতে যাতে নতুন বিনিয়োগ হয়, নতুন বিনিয়োগকারীরা যাতে এখানে আসেন কিংবা নতুন কোন ভালো প্রতিষ্ঠান যাতে এটাকে একীভূতকরণ করে নেয়। সে দিকেও আমরা খেয়াল রাখছি। কারণ কোম্পানির অবসায়ন হলো সর্বশেষ প্রক্রিয়া তার আগে যা যা করা দরকার ছিল আমরা সবাই করেছি। কিন্তু প্রতিষ্ঠানটিতে রক্ষা করা যায়নি

আমানতকারীদের টাকা ফেরত পেতে কতদিন সময় লাগবে এবং কবে নাগাদ অবসায়ন প্রক্রিয়া শুরু হবে এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, ‘সরকার থেকে চিঠি পওয়ার পর বাংলাদেশ ব্যাংকের বিভিন্ন বিভাগ অবসায়নের কাজ শুরু করে দিয়েছে। প্রক্রিয়াটি দ্রুত করার জন্য কোম্পানি আইনে অভিজ্ঞ এমন একজন আইনজীবি নিয়োগ দেওয়া হয়েছে। তবে কত সময় লাগবে তা নির্ভর করবে আদালতের সিদ্ধান্তের ওপর।’

আরেক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, ‘আইনী প্রক্রিয়া অবসায়ক নিয়োগ করা হবে, তার কাজ হলো দেনা-পাওনার হিসাব করে পাওনা টাকা উদ্ধার এবং আমানতকারীর টাকা ফেরত দেওয়ার ব্যবস্থা করা।’

আরেক প্রশ্নের জবাবে শাহআলম বলেন, ‘অবসায়ন প্রক্রিয়ার মধ্যে যে সব প্রক্রিয়া রয়েছে সেগুলো অনুসরণ করে আদালত অবসায়ক নিয়োগ করার পর ফাংশনাল অডিট হবে, সেখানে পাওনার তুলনায় সম্পদ বেশি হয় তাহলে পুরো টাকা দিতে কোনো সমস্যা নেই। আর আমানতের তুলনায় সম্পদ কম হলে যে পদ্ধতি বা প্রক্রিয়া আছে তা অনুসরণ করে দেওয়া হবে।’

উল্লেখ্য, ১৯৯৭ সালের ২৪ নভেম্বর পিপলস লিজিং আর্থিক প্রতিষ্ঠান হিসাবে অনুমোদন লাভ করে। ২০০৫ সালে প্রতিষ্ঠানটি শেয়ারবাজারে তালিকাভুক্ত হয়। সাধারণ বিনিয়োগকারীদের শেয়ারের সংখ্যা ৬৮ শতাংশ, উদ্যোক্তাদের শেয়ার ২৩ শতাংশ এবং প্রতিষ্ঠানিক বিনিয়োগকারীদের শেয়ার ৯ শতাংশ। প্রতিষ্ঠানটিতে মোট আমানতের পরিমাণ ২ হাজার ৩৬ কোটি ২২ লাখ টাকা। এর মধ্যে ১ হাজার ৩০০ কোটি টাকা রয়েছে বিভিন্ন ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানের বাকি ৭০০ কোটি টাকা রয়েছে ৬ হাজার সাধারণ গ্রাহকদের আমানত।

প্রতিষ্ঠানটির ঋণের পরিমাণ ১ হাজার ১৩১ কোটি টাকা, এর মধ্যে ৭৪৮ কোটি টাকা খেলাপি ঋণ।

শেয়ারবাজারনিউজ/ম.সা

আপনার মন্তব্য

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.

Top