ভালো কোম্পানি বিনিয়োগকারীদের দেউলিয়া করবে না

আমি আগেও অনেকবার বলেছি দীর্ঘ মেয়াদে প্রতিটি শেয়ার তার প্রকৃত অবস্থানে ফিরে আসবে, আর এটাই শেয়ারের ধর্ম। বাজারের বর্তমান অবস্থা একদিনে সৃষ্টি হয়নি। এর জন্য নিয়ন্ত্রক সংস্থা যেমন দায়ী ঠিক তেমনি আমরা বিনিয়োগকারীরাও সমান ভাবে দায়ী।

গত ১০ বছরে অস্তিত্ব বিহীন কোম্পানিগুলো তালিকাভুক্ত করে নিয়ন্ত্রক সংস্থা যেমন বাজারের অস্তিত্বকে সংকটে ফেলে দিয়েছে। ঠিক তেমনি নিয়ন্ত্রক সংস্থার দুর্বলতাকে কাজে লাগিয়ে বাজারের কিছু অসৎ বিনিয়োগকারী অস্তিত্ব বিহীন কোম্পানিগুলোকে গত ২ থেকে ৩ বছরে ৫০০% থেকে ৬০০% দাম বৃদ্ধি করেছে। আর বিনিয়োগকারীরাও অধিক লাভের আশায় ঐ সকল কোম্পানিতে বিনিয়োগ করেছে। গত ২ বছরে বিনিয়োগকারীদের ভাষা ছিল “যে কোম্পানি লাভ দেয় সেটাই ভাল কোম্পানি। সেই কোম্পানির অস্তিত্ব না থাকলেও চলবে।” অস্তিত্ব বিহীন কোম্পানি কিনতে কিনতে তারাও যে এক সময় অস্তিত্ব বিহীন হয়ে যেতে পারেন সেই বিষয়টি তারা বেমালুন ভুলে গিয়েছিল।

২০০৮ সালের কথা। একটি কোম্পানিতে বিনিয়োগ করবো ভেবে কোম্পানির খোজ খবর নেয়ার জন্য সেই কোম্পানিতে যাই। কোম্পানির অফিস কাওরান বাজার। নিচে দাড়িয়ে আছি হঠাৎ এক মধ্য বয়সী লোক এসে আমাকে জিজ্ঞেস করলো ভাই আমি শেয়ার কিনতে এসেছি। শুনলাম এইখানে নাকি শেয়ার পাওয়া যায়। আমি অনেকটা বিস্মিত হয়ে তাকে জিজ্ঞেসা করলাম আমি আপনার কথা ঠিক বুজলাম না। উত্তরে সে বলল ভাই আমি গ্রাম থেকে টাকা নিয়ে এসেছি শেয়ার কিনতে। শুনেছি শেয়ার কিনলে নাকি লাভ হয়। ফার্মগেট এলাকায় খুজাখুজি করছিলাম একজন এই বিল্ডিং দেখিয়ে বলল, এই বিল্ডিংয়ে শেয়ার পাওয়া যায়। ঘটনাটি অবিশ্বাস্য মনে হলেও সত্য। ২০০৮ সালের সেই অবস্থার বিন্দু মাত্র পরিবর্তন হয়নি। ২০১৯ সালেও অনেক বিনিয়োগকারী রয়েছে যারা আমানতকারী এবং বিনিয়োগকারীর মধ্যে পার্থক্য জানে না। বাজারে এখনও হাজার হাজার বিনিয়োগকারী রয়েছে যারা শেয়ার তো কেনা-বেচা করে ঠিকই কিন্তু শেয়ার সম্পর্কে স্পষ্ট ধারনা নেই। যদি ধারনা থাকতো তাহলে বন্ধ কোম্পানিগুলোতে তারা তাদের কষ্টের টাকা বিনিয়োগ করতে পারতো না।

গত ৩ বছরে বাজারে অস্তিত্ব বিহীন কিছু কোম্পানি নিয়ে যে জুয়া খেলা হয়েছে তার ফলাফল বর্তমানে দেখতে পাচ্ছে বিনিয়োগকারীরা। ৩ বছর আগেও যে শেয়ার গুলো ২০ থেকে ৪০ টাকা ছিল সেই শেয়ার গুলো কোন কারন ছাড়াই ৪০০-৫০০ টাকা হয়ে গিয়েছিল। এখন আবার সে তার আগের অবস্থানে ফিরে যাচ্ছে। আর সেই আগের অবস্থানে ফিরে যাওয়ার পথে সে বাজারে এক ধরনের পেনিক সৃষ্টি করেছে। বাজারে যেহেতু ভীতির সৃষ্টি হয়েছে তাই কোম্পানি গুলোর নাম উল্লেখ করা থেকে বিরত থাকলাম।

বর্তমান বাজারে পেনিক ঝড়ের সৃষ্টি হয়েছে। আর তাই বন্ধ কোম্পানিগুলোর পাশাপাশি ভাল কোম্পানিগুলোর দামও কমছে। কারন কি জানেন? কারন হচ্ছে সব কোম্পানিতেই কম বেশি পেনিক সেলার থাকে তাই। তবে লক্ষ্য করলেই দেখবেন বন্ধ কোম্পানি গুলো গত কয়েক দিনে ৫০% পর্যন্ত দাম কমলেও ভাল কোম্পানিগুলো ১৫% এর বেশি দাম পড়েনি। স্কয়ার ফার্মা, সামিট পাওয়ার, ইউনাইটেড পাওয়ার, ইবনেসিনা, বেক্সিমকো ফার্মা, একমি এই শেয়ার গুলো কত টাকা কমেছে তা দেখলেই বুজতে পারবেন।

পুঁজিবাজারের একটি ব্যাকরণ আছে। কিন্তু দুঃখ জনক হলেও সত্য বাজার এখন উল্টো পথে চলে। বর্তমান বাজরে বিনিয়োগকারী নেই, সবাই জুয়াড়ি। সবাই হল্টেড হল্টেড খেলতে চায়। আগে শেয়ার হল্টেড হলে বিনিয়োগকারী শেয়ার বিক্রি করতো, এখন উল্টা। শেয়ার হল্টেড হলে সবাই সেই শেয়ার কেনার জন্য ঝাঁপিয়ে পড়ে। আজব এক বাজার।

গত কয়েক মাসে বাজারের জন্য যে আইনগুলো করা হয়েছে তার সবগুলোই বাজারের জন্য ইতিবাচক। অনেকেই বলতে পারে আইনগুলো যদি ভাল হয় তাহলে বাজার কেন পড়ছে। এর কারন আমি আগেই বলেছি, অতীতের কর্মফল। বর্তমানে যে আইনগুলো করা হয়েছে তার ফলাফল আপনারা দেখতে পারবেন সামনের দিন গুলোতে।

বাজারে তারল্য সংকট আছে এটা সত্য। তার মানে এই না যে স্কয়ার ফার্মার উৎপাদন বন্ধ হয়ে গেছে। আপনি একটি কোম্পানির মালিকানা কিনেছেন আপনি সেই কোম্পানির খোজ খবর নেন। তারল্য সংকটের ধুয়া তুলে স্বল্প মূলধনী শেয়ার কিনার যুক্তি দেখিয়ে নিজের সাথে নিজের প্রতারণা করছে অনেকেই।

যে কোম্পানি গুলো ক্যাশ ডিভিডেন্ড দেয় সেই সাথে ডিভিডেন্ড ইল্ড বেশি সেই কোম্পানিগুলো পেনিক হয়ে সেল দিলে বোকামি হয়ে যাবে। পাশাপাশি মালিক পক্ষের হাতে কত সংখ্যক শেয়ার আছে তাও দেখে নিতে পারেন। কারন মালিকপক্ষের হাতে শেয়ার বেশি থাকলে কোম্পানি নিয়ে বিনিয়োগকারীদের চেয়ে মালিক পক্ষের মাথা ব্যথা বেশি থাকে। আশা করছি ভাল কোম্পানি গুলোর পেনিক সেল খুব তাড়াতাড়ি শেষ হয়ে আসবে। আর সেই সাথে ঘুরে দাঁড়াবে। আর ভাল কোম্পানিগুলো ঘুরে দাঁড়ালে বাজারও ঘুরে দাঁড়াবে। ধন্যবাদ।

 

লেখক:

তানভীর আহমেদ

শেয়ার বিনিয়োগকারী

উত্তরা, ঢাকা।

 

শেয়ারবাজার‌নিউজ/ম.সা

আপনার মন্তব্য

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.

Top