রিংসাইন টেক্সটাইল নিয়ে এতো বিভ্রান্তি কেন?

কথায় আছে ঘর পোড়া গরু সিঁদুরে মেঘ দেখলে ভয় পায়। তালিকাভুক্ত টেক্সটাইল খাতের বেশিরভাগ কোম্পানির অবস্থা খারাপ থাকায় এখন টেক্সটাইলের কোন কোম্পানি বাজারে আসলেই বিনিয়োগকারীদের মনে এক ধরণের আতঙ্ক তৈরি হয়। সম্প্রতি ফিক্সড প্রাইস পদ্ধতিতে ১৫ কোটি শেয়ার ছেড়ে ১৫০ কোটি টাকা উত্তোলন করেছে রিংসাইন টেক্সটাইলস লিমিটেড। কোম্পানিটির শেয়ার এখন লেনদেন শুরুর অপেক্ষায় রয়েছে। পরিশোধিত মূলধন ও শেয়ার সংখ্যা অনেক বেশি হওয়ায় ফেসবুক থেকে শুরু করে বাজারের বিভিন্ন মহলে রিং সাইন নিয়ে নেতিবাচক প্রচারণা চলছে। এছাড়া লেনদেন শুরুর আগে কোম্পানিটি ১৫ শতাংশ স্টক ডিভিডেন্ড দেওয়ার সুপারিশ করায় সার্কিট ব্রেকার থাকা না থাকা নিয়ে বিভ্রান্তি তৈরি হয়েছে।

কারণ নিয়মানুযায়ী করপোরেট ঘোষণার পর যেদিন প্রথম লেনদেন হবে সেদিন শেয়ার দর বাড়া বা কমার কোন লিমিট (সার্কিট ব্রেকার) থাকে না। আবার অন্যদিকে নতুন আইপিও’র কোম্পানির লেনদেনের প্রথম দিনে সার্কিট ব্রেকার ইস্যু মূল্যের ৫০% বেঁধে দেওয়া হয়েছে। এখন রিংসাইন একদিকে আইপিও’র নতুন কোম্পানি হিসেবে লেনদেন শুরু করবে অন্যদিকে কোম্পানিটির করপোরেট ঘোষণা রয়েছে। তাই এর সার্কিট ব্রেকার ৫০% হবে নাকি কোন লিমিট থাকবে না সে নিয়ে বাজারে এক ধরণের বিভ্রান্তি তৈরি হয়েছে। এই বিভ্রান্তি কাটানোর জন্য নিয়ন্ত্রক সংস্থার নির্দেশনা পর্যন্ত চাওয়া হয়েছে।

কিন্তু একটু গভীরভাবে বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, বিদ্যমান অন্যান্য কোম্পানির সার্কিট ব্রেকার শেয়ার মূল্য অনুযায়ী নির্ধারণ করা আছে। ২০০ টাকার নিচে শেয়ার দরের কোম্পানির জন্য ১০%, ২০০-৫০০ টাকা শেয়ার দরের জন্য ৮.৭৫%, ৫০০-১০০০ টাকা পর্যন্ত ৭.৫০%, ১০০০-২০০০ টাকা পর্যন্ত ৬.২৫%, ২০০০-৫০০০ টাকা পর্যন্ত ৫% এবং ৫ হাজার টাকার ওপরে শেয়ার দরের কোম্পানির জন্য ৩.৭৫% সার্কিট ব্রেকার রয়েছে। এসব কোম্পানির অর্থাৎ তালিকাভুক্ত অন্যান্য কোম্পানির যার যত সার্কিট ব্রেকারই থাকুক না কেন করপোরেট ঘোষণা হলে কোন সার্কিট ব্রেকার থাকে না। তেমনিভাবে রিংসাইন টেক্সটাইলের সার্কিট ব্রেকার হচ্ছে ৫০%। এখন কোম্পানিটির করপোরেট ঘোষণা হয়েছে তাই যেদিন কোম্পানিটির শেয়ার লেনদেন হবে সেদিন কোন সার্কিট ব্রেকার থাকবে না। এক্ষেত্রে  আইপিও কোম্পানির হলেও করপোরেট ঘোষণার কারণে রিংসাইন টেক্সটাইলের প্রথম দিন কোন সার্কিট ব্রেকার থাকবে না। আইপিও কোম্পানির দ্বিতীয় দিনের সার্কিট ব্রেকার হচ্ছে প্রথম দিনের ক্লোজিং প্রাইসের ৫০%। তাই রিংসাইনের প্রথম দিন নো লিমিটের যে দরে ক্লোজিং হবে দ্বিতীয় দিন সেই ক্লোজিং প্রাইসের ৫০% সার্কিট ব্রেকার থাকবে। তৃতীয় দিন থেকে অন্যান্য কোম্পানির মতো সার্কিট ব্রেকারের আওতায় থাকবে রিংসাইন। তাই এ নিয়ে বিভ্রান্তি হওয়ার কিছু নেই এবং নিয়ন্ত্রক সংস্থারও আলাদা কোন নির্দেশনা জারি করার প্রয়োজন রয়েছে বলেও মনে হয় না। এরপরেও ডিএসইর কাছে কনফিউজড মনে হলে কমিশনের সঙ্গে যোগাযোগ করে বিষয়টির দ্রুত সমাধান করতে পারে।

রিংসাইনের আরেকটি নেতিবাচক ইস্যু হচ্ছে কোম্পানির পেইড আপ অনেক বড়, শেয়ার সংখ্যা অনেক বেশি। তারওপর প্রথম বছরেই ১৫ শতাংশ স্টক ডিভিডেন্ডের সুপারিশ। অন্যান্য টেক্সটাইল কোম্পানি যেখানে ভালো অবস্থায় নেই সেখানে রিংসাইনের টিকে থাকা নিয়ে বেশ সন্দেহ সৃষ্টি হয়েছে। এখানে কিছু তথ্য তুলে ধরা দরকার। কারণ রুঁই মাছের তুলনা কখনোই পুঁটি মাছের সঙ্গে করলে হবে না। তালিকাভুক্ত অন্যান্য টেক্সটাইল কোম্পানির টার্নওভার ও রিং সাইন টেক্সটাইল কোম্পানির টার্নওভারের চিত্র দেখলেই যে কেউ সহজেই বুঝবে রিং সাইন অনেক বড় কোম্পানি। পুঁজিবাজারের টেক্সটাইল খাতের মধ্যে স্কয়ার টেক্সটাইল, এনভয় টেক্সটাইলকে অনেক বড় কোম্পানি হিসেবে ধরা হয়। ২০১৭-২০১৮ অর্থবছরের স্কয়ার টেক্সটাইলের টার্নওভার হয়েছে ৬৩৬ কোটি ৭০ লাখ টাকা এবং কোম্পানির পরিশোধিত মূলধন ১৯৭ কোটি ২৫ লাখ ২০ হাজার টাকা। অর্থাৎ স্কয়ার টেক্সটাইলের টার্নওভার তার পরিশোধিত মূলধনের ৩.২৩ গুন। এছাড়া এনভয় টেক্সটাইলের টার্নওভার ৭৫৫ কোটি ৮৪ লাখ ৩২ হাজার ৪১৬ টাকা। অন্যদিকে রিং সাইন টেক্সটাইলের টার্নওভার প্রায় ১ হাজার কোটি টাকা এবং প্রজেক্ট বাস্তবায়নের মাধ্যমে এই টার্নওভারের পরিমাণ দাঁড়াবে ১৪’শ থেকে ১৫’শ কোটি টাকা। কোম্পানির বর্তমান পরিশোধিত মূলধন ৪৩৫ কোটি টাকা। অর্থাৎ রিং সাইনের পরিশোধিত মূলধনের তিনগুণেরও বেশি টার্নওভারের পরিমাণ। স্কয়ার টেক্সটাইল, এনভয় টেক্সটাইল থেকেও রিংসাইন বড় কোম্পানি। আর বড় কোম্পানি হিসাব নিকাশ বড় হবে সেটাই স্বাভাবিক। তাই একটির সঙ্গে অন্য কোম্পানির তুলনা করতে হয় তথ্যভিত্তিক তুলনা করতে হয়।

বিনিয়োগকারীরা দীর্ঘদিন ধরে বাজারে বড় কোম্পানি আসার দাবি জানিয়ে আসছে যাতে স্বল্প মূলধনী কোম্পানি নিয়ে যে কেউ সহজেই কারসাজি করতে না পারে। কোম্পানির শেয়ার যত বেশি হবে কারসাজি তত কম হবে। আমরাই দাবি জানাই বাজারে বড় কোম্পানি আসুক; আবার বড় কোম্পানি আসলে আমরাই যদি তার জাত গুষ্ঠি উদ্ধার করে ছাড়ি, কমিশনের বারোটা বাজিয়ে ছাড়ি তাহলে কেমনে হবে?

 

শেয়ারবাজারনিউজ/ম.সা

আপনার মন্তব্য

One Comment;

  1. M.H. Reza said:

    অনেক ভালো লাগলো তথ্য, সঠিক তথ্য দেয়ার জন্য ধন্যবাদ।

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.

Top