৫ বছরেই দারাজ বাংলাদেশের বাজিমাত: মাত্র ৫ জন কর্মী থেকে এখন সাড়ে ৩ হাজার

দারাজ হল চীনা মালিকানাধীন অনলাইন মার্কেটপ্লেস যেটি দক্ষিণ এশিয়ায় কার্যক্রম পরিচালনা করে থাকে। এটি ২০১২ সালে জার্মান কোম্পানি রকেট ইন্টারনেটের মালিকানায় প্রতিষ্ঠিত হয়। ২০১৮ সালের মে মাসে চীনা কোম্পানি আলিবাবা গ্রুপ দারাজ কিনে নেয়। ২০১২ সালে পাকিস্তানে প্রতিষ্ঠিত হয়। ২০১৫ সালে এটি বাংলাদেশ ও মিয়ানমারে কার্যক্রম শুরু করে। ২০১৫ সালের সেপ্টেম্বর মাসে কোম্পানিটি  যুক্তরাজ্যের রাষ্ট্রীয় মালিকানাধীন ডেভেলপমেন্ট ফাইন্যান্স ইন্সটিটিউট থেকে ৫০ মিলিয়ন ইউরো বিনিয়োগ লাভ করে। ২০১৬ সালের জুলাই মাসে দারাজ কায়মুকে অধিগ্রহণ করে। ২০১৮ সালের মে মাসে আলিবাবা গ্রুপ দারাজকে কিনে নেয়। দারাজ গ্রুপ ৫ টি দেশে ব্যবসা পরিচালনা করে। দেশগুলোতে ৪৬ কোটিরও অধিক মানুষ বাস করে, যাদের মধ্যে ৬০% এর বয়স ৩৫ এর নিচে। বাংলাদেশে এটি দারাজ বাংলাদেশ নামে বহুল পরিচিত।

খুবই ছোট পরিসরে ই-কমার্স ব্যবসা চালু করে দারাজ বাংলাদেশ। মাত্র ৫ বছরের ব্যবধানে ব্যবসায় এতোটা সাফল্য অর্জন করা যায় তার অন্যতম দৃষ্টান্ত সৃষ্টি করেছে দারাজ। মাত্র ৫ জন কর্মী থেকে যাত্রা শুরু করা দারাজের এখন সাড়ে ৩ হাজার কর্মী রয়েছে। ৫০-১০০টি অর্ডার থেকে এখন দারাজের অর্ডার ৫০ হাজার ছাড়িয়েছে। বাংলাদেশে দারাজের ব্যবসার সফলতা ও সামগ্রিক বিষয়ে নিয়ে শেয়ারবাজারনিউজ ডটকমের সঙ্গে খোলামেলা আলোচনা করেছেন দারাজের চীফ কমার্শিয়াল অফিসার ফুয়াদ আরেফিন তন্ময়। নিম্নে তার সঙ্গে আলাপের চুম্বক অংশ পাঠকদের উদ্দেশ্যে তুলে ধরা হলো:

শেয়ারবাজারনিউজ:  মাত্র ৫ বছরের ব্যবধানে স্বল্প পরিসর থেকে কিভাবে দারাজ এতোদূর এগিয়ে গেল?

ফুয়াদ আরেফিন তন্ময়:   মাত্র ৫ জন কর্মী নিয়ে খুব ছোট পরিসরে আমাদের যাত্রা শুরু। শুরুর সময় আমরা দিনে ৫০-১০০টি অর্ডার পেতাম। এখন সেখানে আমরা প্রায় ৩০ হাজার অর্ডার পাই। ৫০ হাজারের মতো প্যাকেজ পাই। যেখানে ১০০ প্যাকেজ ছিল সেখানে এখন ৫০ হাজারে চলে আসছে। আমরা আস্তে আস্তে বড় হলাম। গত বছরের মে মাসে দারাজ বাংলাদেশকে আলিবাবা কিনে নেয়। আলিবাবা কিনে নেওয়ায় আমাদের বেশ সুবিধা হয়েছে। আলিবাবার যে টেকনোলজি আছে, যে সিস্টেম আছে সবগুলোই আমরা পাচ্ছি। এতে করে কাস্টমাররা অনেক ভালো সার্ভিস পায়। আগে অর্ডার দিলে কিছু দ্বিধা থাকলেও আলিবাবা আসার পর সেটা কেটে গেল, নির্ভরযোগ্যতা বাড়ল। ৫ জন কর্মী থেকে সাড়ে ৩ হাজার কর্মী এখন দারাজে কাজ করছে। মাত্র ৫ বছরের ব্যবধানে এই সফলতা অর্জন করা সম্ভব হয়েছে। ৫০টা অর্ডার থেকে এখন ৫০ হাজার অর্ডার পাওয়া যাচ্ছে। এখন ৩০টি জেলায় আমাদের ৪০টি হাব আছে অর্থাৎ একই সঙ্গে নিজেদের অফিস, কালেকশন পয়েন্ট রয়েছে। এ বছর দ্বিতীয় বারের মতো ইলেভেন ইলেভেন ক্যাম্পেইন করা হলো। এটি আলিবাবার তৈরি করা একটি ক্যাম্পেইন। এ বছর ইলেভেন ইলেভেনে একদিনেই ১২৮ কোটি টাকা বিক্রি করা হয়েছে। যেটা অন্যান্য দিনের চেয়ে ৩০-৩৫গুন বেশি। একদিনে ৬ লাখের মতো প্যাকেজ পেয়েছি। আমাদের ওয়েবসাইটে এখন প্রায় ৭০ লাখের মতো প্রডাক্ট রয়েছে।

শেয়ারবাজারনিউজ: বাংলাদেশে ব্যবসা করার ক্ষেত্রে আপনাদের যেসব সমস্যার মুখোমুখি হতে হয়েছে সেগুলো সম্পর্কে কিছু বলুন।

ফুয়াদ আরেফিন তন্ময়: শুধু প্রথম দিকে নয় গতবছরও আমাদের অনেক সংগ্রাম করতে হয়েছে। আমাদেরতো মার্কেট প্লেসের ব্যবসা। আমরা কোন স্টক বহন করি না। আমরা যখন অনেক কোম্পানির প্রডাক্ট আমাদের ওয়েবসাইটে দেখাতে চাই অনেক প্রতিষ্ঠান এতে স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করতো না। আজকে আর সেটা হয় না। বড় বড় ব্রান্ডরাই আমাদের কাছে আসে প্রডাক্ট বিক্রি করার জন্য। তাদের ই-কমার্সে ব্যবসা করার জন্য। তাই আগে এরকম ছিল এখন পুরো ব্যাপারটাই অন্যরকম হয়ে গেছে। এখন আমাদেরকে সবাই চেনেন। আমরা ব্রান্ড থেকে অনেক বেশি সাপোর্ট পাই।

শেয়ারবাজারনিউজ: আরো ই-কমার্স প্রতিষ্ঠান রয়েছে। সেক্ষেত্রে প্রতিযোগিতা কেমন হয়?

ফুয়াদ আরেফিন তন্ময়: আসলে এখন ই-কমার্সে যারাই আছেন তাদেরই কাউকেই আমরা প্রতিযোগি হিসেবে দেখি না। আমরা চাই সবার মধ্যেই একটি সু-সম্পর্ক বজায় থাকুক। দারাজ ব্যবসা করতে করতে চায় যে মার্কেটটিও যেন ডেভেলপ হয়। মার্কেট যতদিন ডেভেলপ না হবে ততদিন কোন ই-কমার্স কোম্পানি এদেশে টিকে থাকতে পারবে না। মানুষকে জানতে হবে, বুঝতে হবে যে ই-কমার্স থেকে কিনলে কি সুযোগ-সুবিধা পাওয়া যায়।

শেয়ারবাজারনিউজ: অনলাইনে প্রডাক্ট কিনলে জন সাধারণেরতো প্রতারণা হওয়া সম্ভাবনা বেশি থাকে। এক্ষেত্রে কি বলবেন?

ফুয়াদ আরেফিন তন্ময়: এখন প্রতারণা হবার কোন সুযোগ নেই। একটি পণ্য যখন গ্রাহকের পছন্দ অনুযায়ী না হয় সেক্ষেত্রে আমরা রিটার্ন পলিসি রেখেছি। আপনার প্রডাক্ট পছন্দ না হলে ৭ দিনের মধ্যে ফেরত দেওয়ার ব্যবস্থা রয়েছে। যদিও ঢাকার পর চিটাগং এ ব্যবসা বেশি হয় কিন্তু সারাদেশের ৬৪ জেলাতেই আমরা ব্যবসা করছি এবং বেশ ভালো সাড়া পাচ্ছি। আমরা কিছুদিন আগে ৬৪ জেলায় ক্যাম্পেইন করেছি। দারাজ সবসময়ই গ্রাহকের বিশ্বস্ততাকে ধরে রেখে সর্বোচ্চ সেবা দেওয়ার চেষ্টা করে।

শেয়ারবাজারনিউজ: ৫ বছরতো কেটে গেলে। এখন সামনের পরিকল্পনা কি?

ফুয়াদ আরেফিন তন্ময়: ৫ বছরতো পার করে ফেললাম। আগামী ৫ বছরে টার্গেট হচ্ছে নিজেদেরকে এমন জায়গায় প্রতিষ্ঠিত করা যাতে সবাই এক নামে চিনে এবং নাম্বার ওয়ান পছন্দের ব্রান্ড হিসেবে দারাজ প্রতিষ্ঠিত হয়। কোম্পানিকে আরো বড় করা, ক্যাপিটাল মার্কেটে লিস্টেড হওয়ার সম্ভাবনা তৈরি করা।

শেয়ারবাজারনিউজ: গ্রাহকের অভিযোগ কেমন পান? অভিযোগের সমাধান কিভাবে করেন?

ফুয়াদ আরেফিন তন্ময়: গ্রাহকের অনেক অভিযোগ থাকে। এখানে মূল সমস্যা হচ্ছে আন্ডারস্ট্যাডিং। মানুষজনকে জানতে হবে যে ই-কমার্সের প্রডাক্ট কিনলে ডেলিভারি পেতে সময় লাগে। মানুষের প্রধান অভিযোগ এখন দুটি। একটি হচ্ছে ডেলিভারি পেতে সময় বেশি লাগে, অন্যটি হচ্ছে যে প্রডাক্টটি তারা দেখেছিল সেই প্রত্যাশিত প্রডাক্ট তারা পাচ্ছে না। যেকোন জায়গায় দেখেন না কেন একটি প্রডাক্ট পেতে ৮-১০ দিন সময় লাগে, ৩-৫ দিন সময় লাগে। তাই মানুষজনকে বুঝতে হবে যে ই-কমার্সে আজকে অর্ডার করে কালকেই পাওয়া সম্ভব না। এটা খুবই কঠিন। তাই মানুষকে একটি ধৈর্য্য ধরতে হবে যে আমরা যে সময় ডেলিভারি দেওয়ার প্রতিশ্রুতি দিয়েছি এর মধ্যেই দিয়ে দেবো। এতে ৩-৫ দিন সময় লাগবে। আমরা বেশকিছু প্রডাক্ট নিয়ে কাজ করছি যেগুলো ২৪ ঘন্টা, ৪৮ ঘন্টার মধ্যে ডেলিভারি দেওয়ার চেষ্টা করবো। আরেকটি অভিযোগ হচ্ছে যেরকম প্রডাক্ট দেখেছিলাম সেরকম প্রডাক্ট পাচ্ছি না। সেটির জন্য কোয়ালিটি ঠিক করার জন্য আমাদের বিভিন্ন মনিটরিং করা হচ্ছে। কাস্টমারদের সেবা দেওয়ার জন্য আমরা সর্বাত্মক চেষ্টা করছি। কেউ প্রাইস ম্যানুপুলেশন করতে না পারে সেটির জন্য আমরা খুব সতর্ক রয়েছি।

শেয়ারবাজারনিউজ: গ্রাহকদের উদ্দেশ্যে কিছু বলুন।

ফুয়াদ আরেফিন তন্ময়: সামনে আগামী ২৮ নভেম্বর ফাটাফাটি ফ্রাইডে ক্যাম্পেইন শুরু হবে। এরপর সামনে আগামী ১২ ডিসেম্বর টুয়েলভ টুয়েলভ ক্যাম্পেইন শুরু হবে। প্রতিবছরই  এ ধরণের ক্যাম্পেইন করা থাকে। গ্রাহকদের ক্যাম্পেইনে অংশগ্রহন করার আহবান রইল। পাশাপাশি দারাজকে এগিয়ে নিতে আমাদের যেসব স্টেকহোল্ডাররা নিরলস পরিশ্রম করে যাচ্ছেন সবাইকে আন্তরিক ধন্যবাদ ও দারাজের পাশে থাকার অনুরোধ রইল।

শেয়ারবাজারনিউজ:  এতোক্ষণ সময় দেওয়ার জন্য আপনাকে ধন্যবাদ।

ফুয়াদ আরেফিন তন্ময়:  আপনাকেও ধন্যবাদ।

 

 

শেয়ারবাজারনিউজ/ম.সা

 

আপনার মন্তব্য

Top