শেয়ারে লকইন কি আসলেই বাজারের জন্য ভালো?

বর্তমান বাজারের আলোচিত সমস্যা হচ্ছে তিনটি। প্রথমত বাজারের বেশিরভাগ কোম্পানির শেয়ার দর তলানিতে। দ্বিতীয়ত টাকার অভাব। আর সর্বশেষে প্লেসমেন্ট শেয়ার নিয়ে অভ্যন্তর আলোচনা। এসব আলোচনায় বাজার এক পা এগোয় তো তিন পা পেছোয়।

চলতি বছরের প্রায় সময়েই বাজারে অতিরিক্ত সেল প্রেসার তৈরি হয়েছে বলে অনেকে আলোচনা করেন। চার লক্ষ কোটি টাকার বাজারে ৩০০ কোটি টাকা দৈনিক লেনদেন হয় এবং আলোচকরা বলেন সেল প্রেসার, এটাকে সেল প্রেসার বলা যায় কিনা? পরিচালক ও প্লেসমেন্ট শেয়ারহোল্ডারদের শেয়ার বিক্রিই এই অতিরিক্ত সেল প্রেসারের অন্যতম কারণ বলে বিভিন্ন মহল থেকে মত প্রকাশ করা হয়েছে। পাশাপাশি লকইনের সময় বাড়ানোর দাবি জানানো হয়েছে। যার ফলাফল হিসেবে দেখা গেছে, বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশন (বিএসইসি) পাবলিক ইস্যু রুলস সংশোধন করে স্পন্সর, পরিচালক, প্লেসমেন্ট শেয়ারহোল্ডারদের শেয়ার বিক্রিতে লকইনের নতুন নিয়ম চালু করেছে। কিন্তু এই শেয়ার বিক্রিতে লকইন বেঁধে দেওয়া বাস্তবে বাজারের জন্য কতটুকু ফলপ্রসু তা চিন্তা সাপেক্ষ বিষয়।

বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশন (পাবলিক ইস্যু) রুলস,২০১৫ এর সর্বশেষ সংশোধনীতে লকইনের বিষয়ে বলা হয়েছে, স্পন্সর, পরিচালক এবং ১০ শতাংশ বা তার বেশি শেয়ারহোল্ডারদের জন্য শেয়ার বিক্রির লকইন তিন বছর রাখতে হবে। বিদ্যমান স্পন্সর, পরিচালকরা শেয়ার ট্রান্সফার করলে সেই শেয়ারের লকইন থাকবে তিন বছর। স্পন্সর, পরিচালক, ১০% শেয়ারহোল্ডার ছাড়া অন্যান্য শেয়ারহোল্ডারদের কাছে যদি পাবলিক ইস্যুর ৪ বছর বা তার আগে শেয়ার বরাদ্দ দেওয়া হয় সেক্ষেত্রে লকইন থাকবে এক বছর। অলটারনেটিভ ইনভেস্টমেন্ট ফান্ডের জন্য লকইন এক বছর। এসব শেয়ারহোল্ডার ছাড়া বাকি শেয়ারহোল্ডারদের জন্য লকইন কার্যকর থাকবে দুই বছর। আর এই লকইন গণনা ট্রেডিংয়ের প্রথম দিন থেকে শুরু হবে বলে সর্বশেষ সংশোধিত পাবলিক ইস্যু রুলসের বলা হয়েছে। যদিও আগে ছিল অনুমোদনের তারিখ থেকে।

বাজারের বাস্তব চিত্রে দেখা যায়, একটি কোম্পানি বাজারে আসার পর শুধুমাত্র যে পরিমাণ শেয়ার আইপিওতে ছাড়া হয় তার একটি অংশ (আনুমানিক ৫০-৬০%) লেনদেনযোগ্য হয়। সাধারণত প্রথম ছয় মাস জেনারেল পাবলিকের প্রাপ্ত শেয়ার ও ইন্সটিউটিশনের ৫০% শেয়ার লেনদেন হতে দেখা যায়। অন্যদিকে কোম্পানির স্পন্সর, পরিচালক, প্লেসমেন্ট শেয়ারহোল্ডারদের হাতে থাকা শেয়ার লকইন থাকায় বিক্রি করা যায় না। এতে মাত্র অল্পকিছু শেয়ার বাজারে লেনদেনের সুযোগ পায়। যে কারণে এক শ্রেণীর বড় বিনিয়োগকারী অধিক পরিমাণ শেয়ার কিনে কৃত্রিম সংকট তৈরি করে। এতে শেয়ারের যতটুকু মূল্য হওয়া দরকার তার চেয়ে অতিরিক্ত দরে বিক্রি হয়। অন্যদিকে ইন্সটিটিউটের বাকি ৫০ শতাংশ শেয়ার অফলোড হওয়া এবং প্লেসমেন্ট শেয়ারহোল্ডারদের লকইনের সময় শেষ হওয়ার পর শেয়ারগুলো বাজারে আসতে থাকে। এতে করে আগের কৃত্রিম সংকট কেটে যায়। শেয়ারের দরও আর কথিত কারসাজি চক্র ধরে রাখতে পারে না। যে কারণে অতিরিক্ত সেল প্রেসার তৈরি হয়। যার নেতিবাচক প্রভাব সংশ্লিষ্ট শেয়ার দরের ওপর পড়ে। এতেই বিনিয়োগকারীরা ক্ষতির সম্মুখীন হন। আর দোষ পড়ে সেই লকইন থেকে মুক্ত হওয়া শেয়ারগুলোর ওপর। অথচ গোঁড়াতেই যে সমস্যাটি তৈরি হয়েছিল সেটির বিষয়ে কোন আলোচনা হয় না।

তালিকাভুক্তির পর যদি অতিমূল্যায়িত না হয়ে যথাযথমূল্যে বাজারে লেনদেন শুরু হয় তবে বিনিয়োগকারীর ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার সম্ভাবনা থাকে না। তাই লেনদেন শুরু হওয়ার প্রথম দিনে যাতে অতিমূল্যায়িত না হতে পারে সেজন্য সকল শেয়ার লক-ইন ফ্রি করা উচিত।

যদি শুরু থেকেই লকইন না থাকতো তাহলে কিন্তু শেয়ারের এই কৃত্রিম সংকট সহজে তৈরি হতো না। প্রথমদিন থেকেই বিপুল পরিমাণ শেয়ার লেনদেন হতো। ১০ টাকার শেয়ার ১১ টাকা করতেই একেকজনের ঘাম ছুটে যেতো যা আমেরিকার শেয়ারবাজারে দেখা যায়। বিনিয়োগকারীদের মধ্যে টান টান উত্তেজনা, বিশ্লেষণের পর বিশ্লেষণ, বাজারের গভীর জ্ঞান অর্জনে নিয়মিত ট্রেনিং আর পড়াশুনা, আর কতো কি! এই মার্কেটে যারা পুরাতন বিনিয়োগকারী তারা জানেন যে ১৯৯৮ সাল থেকে ২০০৫ সাল পর্যন্ত শেয়ার বিক্রির কোন লকইন ছিল না। ওই সময়ে লেনদেনের প্রথম দিন থেকেই লক ফ্রি ছিল। যে কারণে শেয়ার দর বাড়ানো অনেক কঠিন ছিল। এমনও দেখা গেছে যে ফেসভ্যালুর নিচে কোম্পানির শেয়ার লেনদেন হয়েছে।

উপরোক্ত বক্তব্যটি হলো বর্তমান বাজারে প্রচলিত বক্তব্য। সত্যিকারে এমন বক্তব্য গুরুত্ব বহন করে না তবে বাজারে নেতিবাচক প্রভাবে সহায়তা করে। আমরা যারা পুঁজিবাজারের বিষয় কথা বলি তার তথ্য-উপাত্ত ও আন্তর্জাতিক অঙ্গনের অবস্থান ইত্যাদি যাচাই-বাছাই সাপেক্ষে বলা উচিত। তাহলে পুঁজিবাজার তথা দেশের অর্থনীতি উপকৃত হবে। বিশ্বের অন্যান্য দেশের পুঁজিবাজারে যা প্রচলিত আছে তা বাদ দিয়ে যদি শুধুমাত্র আমাদের নিজস্ব চিন্তা-ভাবনা প্রয়োগ করি তবে পুঁজিবাজার থমকে যাবে, উন্নয়ন হবে না। তাই বিশ্বের সঙ্গে তাল মিলিয়ে আমাদের চলার পথ ঠিক করতে হবে।

কোম্পানির স্পন্সর, পরিচালকদের শেয়ার ছাড়া অন্যান্য সকল শেয়ার লক ফ্রি থাকলে প্রকৃত দরে শেয়ার কেনা-বেচা হবে। কোম্পানির পারফরমেন্স, ইপিএস, এনএভি ইত্যাদি বিবেচনায় শেয়ারের দর বাড়বে-কমবে। প্লেসমেন্ট শেয়ারহোল্ডাররা বেশি দরে শেয়ার বিক্রির যে আশায় কোম্পানিতে বিনিয়োগ করেন তাও ভেস্তে যাবে।এতে বিনিয়োগকারীরা ক্ষতির হাত থেকে রক্ষা পাবেন।

 

শেয়ারবাজারনিউজ/ম.সা

আপনার মন্তব্য

Top