যেমন গেল ২০১৯ সালের পুঁজিবাজার

শেয়ারবাজার রিপোর্ট:  সরকারের ধারাবাহিকতা এবং দেশের অর্থনীতির সকল ক্ষেত্রেই ইতিবাচক অবস্থার মধ্য দিয়ে অনেক প্রত্যাশা নিয়ে শুরু হয় ২০১৯ সাল। নতুন বছরের শুরুতেই বাজারও গতিময় হয়ে উঠে৷ লেনদেনও হাজার কোটি টাকা ছাড়িয়ে যায়৷ কিন্ত তা দীর্ঘস্থায়ী হয়নি৷ প্রত্যাশার সঙ্গে বাস্তবতার কোন মিল খুঁজে পাওয়া যায়নি। অস্থিতিশীল ও দরপতনের মধ্য দিয়ে ২০১৯ সালের পুরো সময়ই বাজারের সবকটি সুচকের দরপতন ঘটে৷  বিনিয়োগকারীদের আশা ভঙ্গের মধ্য দিয়েই কেটেছে ২০১৯ সাল৷ জানুয়ারির উর্ধ্বগতি আর দু-একবার সাময়িক দরবৃদ্ধি বাদ দিলে সারা বছরই মন্দা পরিস্থিতি বিরাজ করে শেয়ারবাজারে।

বছর জুড়েই বাজারের গতি মন্দা থাকলেও ডিএসই বাজার উন্নয়নে বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশন (কোয়ালিফাইড ইনভেস্টর অফার বাই স্মল ক্যাপিটাল কোম্পানিজ) রুলস ২০১৮ এর অধীনে  পণ্যের বহুমূখীতায় বহুল প্রতিক্ষিত “ডিএসই এসএমই প্লাটফর্ম” চালু করে৷ যা উদ্বোধন করেন অর্থমন্ত্রী জনাব আ হ ম মোস্তফা কামাল৷ যার মাধ্যমে স্বল্প মূলধনী ব্যবসা প্রতিষ্ঠান ডিএসইতে তালিকাভুক্তির মাধ্যমে প্রয়োজনীয় মূলধন সংগ্রহের নতুন ও সম্ভাবনাময় দ্বার উন্মোচিত হয়েছে৷ এতে পুঁজিবাজারে পণ্যের বৈচিএতার পাশাপাশি অর্থনৈতিক উন্নয়নের এক নতুন দিগন্ত উন্মোচিত হবে৷ “ডিএসই এসএমই প্লাটফর্ম উদ্বোধনের পর থেকেই ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জ লিঃ এই প্লাটফর্মের মাধ্যমে অর্থায়নের সুযোগ তৈরীর জন্য পরিকল্পনা মাফিক কাজ করে যাচ্ছে৷ যেহেতু পুঁজিবাজার তথা দেশের অর্থনীতিতে এসএমই প্লাটফর্ম নতুন এক সংযোজন, সেহেতু এর প্রচার ও সচেতনতাও অত্যাবশ্যকীয় একটি কাজ৷ ইতিমধ্যেই প্রচার এবং সচেতনতার জন্য কাজ শুরু হয়েছে৷ এরই অংশ হিসেবে ক্ষুদ্র ও মাঝারি কোম্পানিগুলোকে কর্পোরেট গভর্ন্যান্সের মানোন্নয়নের পাশাপাশি এসএমই প্লাটফর্মের তালিকাভুক্তির ক্ষেত্রে বিভিন্ন করণীয় সম্পর্কে বিভিন্ন ইস্যু ম্যানেজার, অডিটর এবং অন্যান্য স্টেক হোল্ডারদের সাথে এই প্লাটফর্মের সুযোগ সুবিধার বিভিন্ন দিক নিয়ে আলোচনা শুরু হয়েছে৷ এরই মধ্যে ইস্যু ম্যানেজাররা দশটি এসএমই কোম্পানির পুঁজি উত্তোলন ও তালিকাভূক্তির জন্য কাজ শুরু করেছে৷ আশা করা যাচ্ছে আগামী জানুয়ারী ২০১৯ এর মধ্যে স্বল্প মূলধনী কোম্পানির পুঁজি উত্তোলন এবং তালিকাভুক্তির মাধ্যমে এসএমই কোম্পানির ট্রেডিং চালু করা সম্ভব হবে৷

এছাড়াও শেনঝেন ও সাংহাই স্টক এক্সচেঞ্জের সম্মিলিত কনসোর্টিয়ামের সঙ্গে ডিএসই’র কৌশলগত চুক্তির আওতায় ইস্যুয়ার ও Qualified Investor দের মধ্যে সংযোগ স্থাপনে V-Next প্লাটফর্মে বাংলাদেশ উইন্ডো উদ্বোধন হয়৷ V-Next প্লাটফর্ম হচ্ছে ১টি অনলাইন প্লাটফর্ম৷ যা বিদেশী বিনিয়োগ আকর্ষণের জন্য বাংলাদেশী কোম্পানি ও প্রকল্পগুলোর সঙ্গে চীনসহ অন্যান্য দেশের বিনিয়োকারীদের সেতুবন্ধন রচনা করেছে শেনঝেন স্টক এক্সচেঞ্জ ও ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জ৷ বিনিয়োগযোগ্য কোম্পানি বা প্রকল্পের অনুসন্ধানে এখন পর্যন্ত বিশ্বের ৩৯টি দেশের বিনিয়োগকারীরা চায়না V-Next প্লাটফর্মে নিবন্ধিত হয়েছেন৷

ডিএসই’র সেকেন্ডারি মার্কেটে সরকারী বন্ডসমূহ ট্রেডেবল করার জন্য বিএসইসি, বাংলাদেশ ব্যাংক এবং ডিএসই একটি কার্যকর কমিটি গঠন করেছে৷ কমিটি সম্মিলিতভাবে এক্সচেঞ্জ প্লাটফর্মে বন্ডের লেনদেন প্রক্রিয়া ত্বরান্বিত করার জন্য জোড়ালোভাবে কাজ করছে৷ বন্ড মার্কেট প্রানবন্ত করার জন্য ডিএসই প্লাটফর্মে খুব শীঘ্রই বন্ড মার্কেটকে সক্রিয় করা হবে৷ এ বিষয়ে  কমিটি খুব শীঘ্রই তাদের রিপোর্ট জমা দিবে এবং যথাযথ কর্তৃপক্ষের অনুমোদন সাপেক্ষে নতুন বছরের প্রথম প্রান্তিকেই বন্ডের লেনদেন ডিএসই’র সেকেন্ডারি মার্কেটে শুরু হবে বলে আশা করা যাচ্ছে৷

৯০ দশকের শেষের দিকে পুঁজিবাজারে সংযোজিত হয়েছে অটোমেশন৷ এর পর বিনিয়োগকারীদের শেয়ার সুরক্ষায় প্রতিষ্ঠিত হয়েছে সেন্ট্রাল ডিপোজিটরি বাংলাদেশ লিমিটেড (সিডিবিএল)৷ এরপর ২০১০ পরবর্তী পুঁজিবাজারের পুর্নগঠন বা সংস্কারের অংশ হিসেবে ‘দা এক্সচেঞ্জস ডিমিউচ্যুয়ালাইজশেন এ্যাক্ট-২০১৩’ এর মাধ্যমে এক্সচেঞ্জগুলো ডিমিউচ্যুয়ালাইজড স্টক এক্সচেঞ্জ রূপান্তরিত হয়। পরবর্তী সময়ে ডিমিউচ্যুয়ালাইজশেন স্কিম অনুযায়ী দীর্ঘ কর্মকান্ডের পর চীনা কনসোর্টিয়ামের (শেনজেন স্টক এক্সচেঞ্জ ও  সাংহাই স্টক এক্সচেঞ্জ) কাছে ডিএসই’র ২৫ শতাংশ শেয়ার হস্তান্তর করে৷ পুঁজিবাজারের অব্যাহত আধুনিকায়ন ও সক্ষমতা বৃদ্ধির অংশ হিসেবে ডিএসই, বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশন (ক্লিয়ারিং এন্ড সেটেলমেন্ট) বিধিমালা, ২০১৭ এর অধীনে ডিএসই, সিএসই ও সিডিবিএল এর যৌথ ২০১৯ সালের জানুয়ারি মাসে Central Counterparty Bangladesh Ltd. নামে একটি কোম্পানির নিবন্ধন সম্পন্ন হয়েছে৷ আশা করা যাচ্ছে ২০২০ সালের মধ্যে পুরোমাএায় এই কোম্পানির কার্যক্রম চালু হবে৷ সিসিবিএল চালু হলে পুঁজিবাজার পরিচালনায় নতুন মানদন্ড স্থাপিত হবে, যার মাধ্যমে মাল্টি এ্যাসেট ট্রেডিংসহ বৈদেশিক বিনিয়োগ যেমন বাড়বে তেমনি বিনিয়োগকারীদের আস্থা অর্জন ও পুঁজিবাজারে তারল্য সংকট দূরীকরণে সহায়ক হবে৷

ইতোমধ্যে শেনঝেন স্টক এক্সচেঞ্জ এবং সাংহাই স্টক এক্সচেঞ্জের কনসোর্টিয়াম ব্যবসায়িক ও প্রযুক্তিগত সহযোগিতার বিভিন্ন প্রস্তাবনা উপস্থাপন করেছেন৷ ব্যবসায়িক সহযোগিতার মধ্যে রয়েছে এসএমই বোর্ডের উন্নয়ন, পণ্যের বৈচিত্র্যকরণ৷ প্রযুক্তিগত সহযোগিতার প্রস্তাবনাগুলোর মধ্যে রয়েছে-মধ্য ও দীর্ঘমেয়াদি প্রযুক্তিগত পরিকল্পনার পাশাপাশি স্বাধীন ও শক্তিশালী রিসার্চ টিম গঠন, ট্রেডিং সিস্টেম কেন্দ্রীভূতকরণ, ব্যবসায়িক ব্যবস্থাপনা প্ল্যাটফর্মের উন্নয়নকে ত্বরান্বিতকরণ ও তথ্য প্রকাশের অটোমেশন পদ্ধতির উন্নয়ন, ডাটা সেন্টার নির্মাণের পরিকল্পনা, যোগাযোগ ব্যবস্থা শক্তিশালীকরণ ও সক্ষমতার উন্নয়ন৷ ডিএসই আশা করছে ২০২০ সালের মধ্যে কনসোর্টিয়ামের ব্যবসায়িক ও প্রযুক্তিগত সহযোগিতার বিভিন্ন দিক যাচাই করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করবে৷

পারস্পরিক উন্নয়নের ক্ষেত্রে সহযোগিতার জন্য ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জ লিমিটেড ও কলম্বো স্টক এক্সচেঞ্জ লিমিটেড এর মধ্যে সমঝোতা স্মারক স্বাক্ষরিত হয়েছে৷ এই সমঝোতা স্মারক অনুযায়ী, উভয় স্টক এক্সচেঞ্জের তথ্য বিনিময়, পণ্য উন্নয়ন, সক্ষমতা বৃদ্ধি ও মূলধন উত্তোলন বৃদ্ধির বিষয়ে বাংলাদেশ ও শ্রীলংকা যৌথ উদ্যোগে স্টক এক্সচেঞ্জের অগ্রগতি সাধনে কাজ করবে৷ এছাড়াও দুই দেশের অর্থনীতি ও বাণিজ্যিক সম্পর্ক উন্নয়নে অবদান রাখার পাশাপাশি দক্ষিণ এশিয়া অঞ্চলে পুঁজিবাজারের উন্নয়ন প্রচেষ্টার অগ্রগতি অব্যাহত রাখবে৷ ডিএসই ও সিএসইর মধ্যে এই সমঝোতা স্মারক উভয় স্টক এক্সচেঞ্জের যৌথ উন্নয়ন প্রচেষ্টাগুলোকে আরও দক্ষ করে তুলবে, যাতে দক্ষিণ এশিয়া অঞ্চলে উভয় স্টক এক্সচেঞ্জ নেতৃস্থানীয় স্টক এক্সচেঞ্জে পরিণত হতে পারে৷

এছাড়াও পুঁজিবাজারে পণ্যের বৈচিএতা আনয়নে পুঁজিবাজার নিয়ন্ত্রক সংস্থা বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশন পুঁজিবাজার ও বিনিয়োগকারীদের স্বার্থে ২০১৯ সালে (অল্টারনেটিভ ট্রেডিং বোর্ড) বিধিমালা, ২০১৯ অনুমোদন দিয়েছেন৷ এতে অতালিকাভুক্ত সিকিউরিটিজ যেমন-অতালিকাভুক্ত কোম্পানির শেয়ার, যে কোন ধরনের বন্ড, ডিবেঞ্চার, সুকুক, বে-মেয়াদী মিউচ্যুয়াল ফান্ড এবং বিকল্প বিনিয়োগ তহবিল নির্ধারিত শর্ত সাপেক্ষে এ বোর্ডে অন্তর্ভুক্তির সুযোগ সৃষ্টি হয়েছে এবং সব ধরনের তালিকাচ্যুত সিকিউরিটিজ এবং ওটিসি মার্কেটে থাকা কোম্পানি নির্ধারিত শর্ত পূরণ সাপেক্ষে এ বোর্ডে অন্তর্ভুক্তিরও সুযোগ তৈরী হয়েছে৷

পুঁজিবাজার নিয়ন্ত্রক সংস্থা বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশন (ইনভেস্টমেন্ট সুকুক) রুলস, ২০১৯ প্রণয়ন করেছে৷ এর আওতায় স্টক এক্সচেঞ্জের উন্নয়নে দেশি বিদেশি ইস্যুয়ার ও বিনিয়োগকারীদের ইসলামিক বন্ডের অনুকূল পরিবেশ তৈরি করতে ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জ সুকুক কাঠামো প্রবর্তনের জন্য কাজ করছে৷ টেকসই বিনিয়োগের সুবিধার্থে বুরসা মালয়েশিয়া ইতিমধ্যে সুকুককে বিশ্বব্যাপী জনপ্রিয় করেছে৷ বৈশ্বিক সুকুক বাজারে মালয়েশিয়া শীর্ষস্থানীয় অবস্থানের সাথে তাল মিলিয়ে ডিএসই টেকসই বিনিয়োগ ও ইসলামিক ফাইনান্সের কেন্দ্র হিসাবে এক্সচেঞ্জের মান বাড়াতে সুকুক কাঠামো তৈরিতে বুরসা মালয়েশিয়া সহায়তা নিতে সমঝোতা স্মারক সই করার উদ্যোগ নিয়েছে৷

এছাড়াও বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশন (পাবলিক ইস্যু রুলস) ২০১৫ এর সংশোধন, বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশন (রিস্ক বেজড ক্যাপিটাল এডিকোয়েসি) রুলস, ২০১৯, বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশন (এক্সচেঞ্জ ট্রেডেড ডেরিভেটিভস) রুলস ২০১৯ এবং বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশন (শর্ট-সেল) রুলস, ২০১৯ প্রণয়ন করেছে৷

পুঁজিবাজার তথা বিনিয়োগকারীদের স্বার্থে প্রাথমিক গণপ্রস্তাবের (আইপিও) মাধ্যমে তালিকাভুক্ত সব কোম্পানির ইস্যু করা শেয়ারের লক-ইনের সময় প্রসপেক্টাস ইস্যুর তারিখের পরিবর্তে স্টক এক্সচেঞ্জে লেনদেন শুরুর তারিখ থেকে কার্যকর৷ লক-ইনের পাশাপাশি তালিকাভুক্ত কোম্পানির শেয়ার দর অতিমুল্যায়িত এবং অবমুল্যায়িত হওয়া ঠেকাতে সার্কিট ব্রেকার সংক্রান্ত আগের নিয়ম সংশোধন করে স্লাবভিওিক সার্কিট ব্রেকার আরোপ করেছে৷ অন্যদিকে আইপিওর শেয়ার লেনদেনের শুরুর দিন কোন সার্কিট  ব্রেকার না থাকলেও নতুন আদেশে সার্কিট ব্রেকার আরোপ করা হয়েছে৷ আইপিওর শেয়ার লেনদেনের প্রথম দিন ইস্যুমূল্যের ওপর ৫০ শতাংশ হারে সার্কিট ব্রেকার প্রজোজ্য হবে৷ দ্বিতীয় দিন আগের দিনের সমাপণী দরের ওপর ৫০ শতাংশ হারে সার্কিট ব্রেকার প্রযোজ্য হবে৷ আর তৃতীয় দিন থেকে স্লাবভিওিক সার্কিট ব্রেকার প্রযোজ্য হবে৷

মিউচুয়াল ফান্ডের ক্ষেত্রে লভ্যাংশ প্রদানের ক্ষেত্রে পুন:বিনিয়োগ (Re-Investment) পদ্ধতি বাতিল করা হয়েছে৷ যার ফলে বে-মেয়াদী এবং মেয়াদী উভয় ধরনের ফান্ডের ক্ষেত্রেই কেবল মাত্র নগদ লভ্যাংশ প্রদান করতে পারবে এবং বে-মেয়াদী ফান্ডের ক্ষেত্রে মেয়াদ ফান্ডের মত উদ্যোক্তার অংশ ফান্ড গঠনের তারিখ থেকে ০১ (এক) বছর পর্যন্ত সংরক্ষণ এবং তৎপরবর্তীতে উক্ত ধারণকৃত অংশের অন্তত: ১০ (দশ) শতাংশ উদ্যোক্তা কর্তৃক ফান্ডের অবসায়ন পর্যন্ত সার্বক্ষণিকভাবে সংরক্ষণ করিতে হইবে৷

উদ্যোক্তা এবং পরিচালকদের শেয়ার হোল্ডিং সম্পর্কে স্টক এক্সচেঞ্জে তালিকাভুক্ত কোন কোম্পানির স্বতন্ত্র পরিচালক ব্যতীত সকল উদ্যোক্তা এবং পরিচালকদের সবসময় কোম্পানির পরিশোধিত মূলধনের নূন্যতম ৩০ (ত্রিশ) শতাংশ শেয়ার ধারণ করতে হবে৷ যদি কোন উদ্যোক্তা এবং পরিচালকবৃন্দ উল্লেখিত পরিমান শেয়ার ধারণে ব্যর্থ হন, তাহলে শেয়ার অধিগ্রহণ না করা পর্যন্ত কোন প্রকার বিক্রয় স্থানান্তর বা শেয়ারের বন্ধকীকরণ কার্যকর করতে পারবেন না৷ এছাড়াও সংশ্লিষ্ট কোম্পানি রাইট শেয়ার প্রদান অথবা পাবলিক অফারের পুনরাবৃত্তি বা বোনাস শেয়ার বা কোম্পানির একত্রীকরণ বা মূলধন উত্থাপনের অন্য কোন পদ্ধতির মাধ্যমে মূলধন সংগ্রহ করতে সক্ষম হবে না। তালিকাভুক্ত কোম্পানির স্বতন্ত্র পরিচালক ব্যতীত প্রত্যেক পরিচালকদের পরিশোধিত মূলধন নূন্যতম ২% (দুই শতাংশ) শেয়ার রাখতে হবে৷ অন্যথায় পরিচালকের পদ শুন্য থাকতে হবে। তবে শর্ত থাকে যে, যে কোন কোম্পানির পরিচালকের প্রতিটি পদের বিপরীতে যে কোন ব্যক্তিকে মনোনীত করার জন্য তালিকাভুক্ত কোম্পানির প্রদত্ত মূলধনের নূন্যতম ২% (দুই শতাংশ) শেয়ার ধারন করতে হবে। অন্যথায় পরিচালকের পদ শুন্য থাকতে হবে। সিকিউরিটিজ আইনের বিধান মেনে এই ধরনের শুন্য পদের জন্য ৩০ (ত্রিশ) কার্যদিবসের মধ্যে পরিশোধিত মূলধনের ২% (দুই শতাংশ) বা তার বেশি শেয়ার প্রাপ্তহোল্ডারদের থেকে শূণ্য পদ পূরণ করতে হবে৷ আশা করা যাচ্ছে নতুন বছরে এসব অজর্নের মাধ্যমে পুঁজিবাজারের এক নতুন মাত্রা যোগ হবে৷

অর্থমন্ত্রী বলেছেন, একটি শক্তিশালী অর্থনীতির জন্য প্রয়োজন একটি শক্তিশালী পুঁজিবাজার৷ একটি দেশের অর্থনীতি যত শক্তিশালী সেই দেশের পুঁজিবাজারও স্বাভাবিক নিয়মেই শক্তিশালী থাকবে৷ সরকার চায় দেশের জন্য একটি শক্তিশালী অর্থনীতি৷ শিল্প বিনিয়োগে দীর্ঘমেয়াদী ঋণ সংগ্রহের আদর্শ মাধ্যম হচ্ছে পুঁজিবাজার৷ সরকার পুঁজিবাজার হতে দীর্ঘমেয়াদী ঋণ সংগ্রহে ঋণ গৃহীতাদের উৎসাহ প্রদানে কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহণ করবেন বলে আশাবাদ ব্যক্ত করেন৷ মাননীয় অর্থমন্ত্রীর এই আশাবাদের সাথে ডিএসই একমত পোষণ করেন৷ মাননীয় অর্থমন্ত্রী বিগত দিনে অর্থমন্ত্রণালয় সম্পর্কিত স্থায়ী কমিটির সভাপতি হিসেবে দেশের অর্থনীতির চালিকাশক্তি হিসেবে খ্যাত দেশের পুঁজিবাজার উন্নয়নে বহুমুখি উন্নয়নমূলক পদক্ষেপ গ্রহণ ও বাস্তবায়ন করেছেন৷ আগামী দিনেও এই উন্নয়নের ধারাবাহিকতা অব্যাহত থাকবে৷ পুঁজিবাজারের উন্নয়ন ও বিকাশে সারা বিশ্বে নীতি-সমর্থন এবং প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষ সম্পৃক্ততার মাধ্যমে সরকারের যে বলিষ্ঠ ভূমিকা থাকে৷ দীর্ঘমেয়াদি মূলধন সংগ্রহের অন্যতম প্রধান মাধ্যম হলো দেশের পুঁজিবাজার৷ আগামীতে অর্থনৈতিক উন্নয়ন পরিকল্পনার অংশীদার হিসেবে দেশের পুঁজিবাজারকে সরকার কাংক্ষিত লক্ষ্যে এগিয়ে নিয়ে যাবে৷ বিএসইসি কর্তৃক বহুবিদ আইনি সংস্কার এবং ডিএসই পণ্যের বহুমূখীতায় অবকাঠামোগত বেশ কিছু উন্নয়নের মাধ্যমে ২০১৯ বিদায় নেয়৷

 

২০১৯ সালের বাজারচিত্র:

আইপিও

শিল্প উদ্যোক্তারা ২০১৯ সালে বাজার থেকে ১টি বন্ড সহ মোট ৮টি সিকিউরিটিজ প্রাথমিক গণপ্রস্তাব বা আইপিও’র মাধ্যমে ৬১৪ কোটি টাকা ৬৭ লাখ টাকা মূলধন সংগ্রহ করে৷ এর মধ্যে ২টি কোম্পানি প্রিমিয়াম বাবদ ২০১ কোটি ১৭ লাখ টাকা উওোলন করে। অপরদিকে ২০১৮ সালে ১টি মিউচ্যুয়াল ফান্ড সহ মোট ১৪টি সিকিউরিটিজ প্রাথমিক গণপ্রস্তাব বা আইপিও’র মাধ্যমে মোট ৬০১ কোটি টাকা মূলধন সংগ্রহ করে৷ এর মধ্যে ২টি কোম্পানি প্রিমিয়াম বাবদ ২৩৩ কোটি ১২ লাখ টাকা উওোলন করে৷

তালিকাভুক্তি

২০১৯ সালে ১টি গ্রোথ ফান্ডসহ মোট ১০টি সিকিউরিটিজ ১৪৪৩ কোটি ৯৫ লাখ টাকার পরিশোধিত মূলধন নিয়ে ডিএসইতে তালিকাভুক্ত হয়৷ অপরদিকে ২০১৮ সালে ১টি মিউচ্যুয়াল ফান্ড সহ মোট ১২টি সিকিউরিটিজ ১২১২ কোটি ৩৫ লাখ টাকা পরিশোধিত মূলধন নিয়ে ডিএসইতে তালিকাভুক্ত হয়৷

রাইট শেয়ার ইস্যু

২০১৯ সালে ২টি কোম্পানি ২০ কোটি ৭৭ লাখ ৩৯ হাজার ১৮২টি রাইট শেয়ার ইস্যুর মাধ্যমে মোট ২৩১ কোটি ৩০ লাখ ০৫ হাজার ৫০০ টাকা মূলধন সংগ্রহ করে৷ এর মধ্যে ১ কোম্পানি প্রিমিয়াম বাবদ ২৩ কোটি ৫৬ লাখ ১৩ হাজার ৬৮০ টাকা মূলধন সংগ্রহ করে৷ অপরদিকে ২০১৮ সালে ৩টি কোম্পানি ৩৬ কোটি ৭০ লাখ ৭৫ হাজার ৬৫ টি রাইট শেয়ার ইস্যুর মাধ্যমে মোট ৩৬৭ কোটি ০৭ লাখ ৫০ হাজার ৬৫০ টাকা মূলধন সংগ্রহ করে৷

লেনদেন টাকা

২০১৯ সালে মোট লেনদেনের পরিমাণ দাঁড়ায় ১১৩,৮২১ কোটি ৮৮ লাখ টাকা৷ যা গতবছরের চেয়ে ১৯,৭৬৯ কোটি ৪৪   কোটি টাকা বা ১৪.৮১ শতাংশ কম৷ ২০১৯ সালে ২৩৭ দিন লেনদেন হয়৷ যার গড় লেনদেন ছিল ৪৮০ কোটি ২৬ লাখ টাকা৷ অপরদিকে ২০১৮ সালে ২৪২ কার্যদিবসে মোট লেনদেনের পরিমান ছিল ১৩৩,৫৯১ কোটি ৩৩ লাখ টাকা এবং গড়ে লেনদেনের পরিমান ছিল ৫৫২ কোটি ০৩ লাখ টাকা৷

ডিএসই’র মূল্য সূচক সমুহ

ডিএসই ব্রড ইনডেক্স (ডিএসইএক্স)

ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জের প্রধান মূল্য সূচক ডিএসই ব্রড ইনডেক্স (ডিএসইএক্স) আগের বছরের চেয়ে ৯৩২.৭১ পয়েন্ট বা ১৭.৩২ শতাংশ হ্রাস পেয়ে ৪৪৫২.৯৩ পয়েন্টে অবনিত হয়৷ ২০১৯ সালে ডিএসইএক্স মূল্য সূচক সর্বোচ্চ ৫,৯৫০.০১ পয়েন্টে উন্নিত হয় এবং সর্বনিম্ন ছিল ৪৪১৭.৯৫ পয়েন্ট৷ ২০১৩ সালের ২৮ জানুয়ারি ৪,০৯০.৪৭ পয়েন্ট নিয়ে এ সূচকের যাএা শুরু হয়৷

ডিএসই ৩০ সূচক (ডিএস৩০)

ডিএসই ৩০ সূচক (ডিএস৩০) ৩৬৭.৪৪ পয়েন্ট বা ১৯.৫৪ শতাংশ হ্রাস পেয়ে ১৫১৩.৩৫ পয়েন্টে দাঁড়ায়৷ ২০১৯ সালে ডিএস৩০ মূল্য সূচক সর্বোচ্চ ২,০৪৯.০০ পয়েন্টে উন্নিত হয় এবং সর্বনিম্ন ছিল ১২১৭.০৪ পয়েন্ট৷ ২০১৩ সালের ২৮ জানুয়ারি ১,৪৭৩.০১ পয়েন্ট নিয়ে এ সূচকের যাএা শুরু হয়৷

ডিএসইএক্স শরীয়াহ্ সূচক (ডিএসইএস)

একই বছর ডিএসইএক্স শরীয়াহ্ সুচক (ডিএসইএস) ২৩২.৯৯ পয়েন্ট বা ১৮.৯০ শতাংশ হ্রাস পেয়ে ৯৯৯.৮৩ পয়েন্টে অবনিত হয়৷ ২০১৯ সালে (ডিএসইএস)মূল্য সূচক সর্বোচ্চ ১,৩৩১.৬৩ পয়েন্টে উন্নিত হয় এবং সর্বনিম্ন ছিল ৯৮৬.৪৭ পয়েন্ট৷ ২০১৪ সালের ২০ জানুয়ারি ৯৪১.২৮ পয়েন্ট নিয়ে এ সূচকের যাএা শুরু হয়৷

বাজার মূলধন

২০১৯ সালে ডিএসই বাজার মূলধন আগের বছরের তুলনায় ৪৭,৭৪৪ কোটি টাকা বা ১২.৩৩ শতাংশ হ্রাস পেয়ে ৩ লাখ ৩৯ হাজার কোটি টাকায় অবনিত হয়৷ ২০১৯ সালে বাজার মূলধন সর্বোচ্চ ৪ লাখ ২১ হাজার কোটি টাকায় উন্নিত হয় এবং সর্বনিম্ন ছিল ৩ লাখ ৩৭ হাজার কোটি৷

মার্কেট পিই

২০১৯ সালের শেষে ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জ লিঃ এ তালিকাভুক্ত সিকিউরিটিজ সমুহের মূল্য আয় অনুপাত বা মার্কেট পিই দাঁড়ায় ১১.৪৮৷ খাতওয়ারী সর্বনিম্ন অবস্থানের দিক থেকে মূল্য আয় অনুপাত বা মার্কেট পিই ছিল ব্যাংকিং খাতের, যার মার্কেট পিই ৭.৭৬, মিউচ্যুয়াল ফান্ডের মার্কেট পিই ৯.৫৯, ইঞ্জিনিয়ারিং খাতের মার্কেট পিই ১০.৬৭, ফুয়েল এন্ড পাওয়ার খাতের ১০.৬৭, সার্ভিসেস এন্ড রিয়েল এস্টেট খাতের মার্কেট পিই ১১.১৩, টেলিকমিউনিকেশন খাতের মার্কেট পিই ১১.২৩, টেক্সটাইল খাতের মার্কেট পিই ১১.৫১, পেপার এন্ড প্রিন্টিং খাতের মার্কেট পিই ১১.৫৩, আর্থিক খাতের পিই ১১.৬৭, ট্যানারি খাতের মার্কেট পিই ১৩.৯৬, ইন্সুরেন্স খাতের মার্কেট পিই ১৪.৯৭, ফার্মাসিউটিক্যালস এন্ড কেমিক্যালস খাতের মার্কেট পিই ১৫.৪২, ফুড এন্ড এ্যালাইড প্রোডাক্ট খাতের মার্কেট পিই ১৭.৬৭, বিবিধ খাতের মার্কেট পিই ২০.০৯, আইটি-খাতের মার্কেট পিই ২০.৯৭, সিরামিক খাতের মার্কেট পিই ২১.৪৩, সিমেন্ট খাতের মার্কেট পিই ২১.৪৩ এবং জুট খাতের মার্কেট পিই ৪৪.৬০৷ অপরদিকে ২০১৮ সালের শেষে সামগ্রিক বাজার মূল্য আয় অনুপাত বা মার্কেট পিই ছিল ১৫.০৯৷

বৈদেশিক বিনিয়োগকারীদের লেনদেন  

২০১৯ সালে বিদেশী বিনিয়োগকারীদের মোট লেনদেনের পরিমাণ দাঁড়ায় ৭,৮৪৫ কোটি ৪৫ লাখ টাকা৷ যা মোট লেনদেনের ৬.৮৯ শতাংশ। ২০১৯ সালে ক্রয়কৃত সিকিউরিটিজের পরিমাণ ছিল ৩,৬৭৮ কোটি ৬৪ লাখ টাকা এবং বিক্রয়কৃত সিকিউরিটিজের পরিমাণ ছিল ৪,১৬৬ কোটি ৮১ লাখ টাকা৷ অপরদিকে ২০১৮ সালে বৈদেশিক লেনদেনের পরিমাণ ছিল ৯,৫৮৫ কোটি ৬১ লাখ টাকা৷ এর মধ্যে ক্রয়কৃত সিকিউরিটিজের পরিমাণ ছিল টাকায় ৪,৪৯৬ কোটি ২৪ লাখ এবং বিক্রয়কৃত সিকিউরিটিজের পরিমাণ ছিল টাকায় ৫,০৮৯ কোটি ৩৭ লাখ টাকা৷

মোবাইল লেনদেন

বিশ্বের অন্যান্য স্টক এক্সচেঞ্জের সাথে তাল মিলিয়ে ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জ লিমিটেড প্রযুক্তিগত উন্নয়ন করে যাচ্ছে। আধুনিক প্রযুক্তির সর্বোত্তম ব্যবহার নিশ্চিত করে ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জ পুঁজিবাজারের লেনদেনকে করেছে সর্বাধুনিক ও সহজসাধ্য। ডিএসইতে মোবাইল এর মাধ্যমে লেনদেন এই প্রযুক্তিগত উন্নয়নের এক অনন্য উদাহরণ। মোবাইলের মাধ্যমে লেনদেন ক্রমেই জনপ্রিয় হয়ে উঠছে। দেশের পুঁজিবাজার বিকাশের ক্ষেত্রে ৯ মার্চ ২০১৬ তারিখে সংযোজন হয় ডিএসইমোবাইল অ্যাপ। এই অ্যাপ চালুর পর ক্রমবর্ধমান হারে মোবাইলে লেনদেন ব্যবহারকারীর সংখ্যা বেড়েই চলছে যা ২০১৯ সালে ৫১ হাজার ১৯৯ জনে উন্নিত হয়। ২০১৯ সালে মোবাইলের মাধ্যমে মোট ৭০ লাখ ৯৬ হাজার ৮৭৮টি আদেশ প্রেরণ করে৷ এর মধ্যে ৪৯ লাখ ৬১ হাজার ৬২৯টি আদেশ কার্যকর হয়৷ ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জ লেনদেনের ক্ষেত্রে প্রযুক্তির সর্বোত্তম সুবিধা বিনিয়োগকারীর দোরগোড়ায় পৌঁছাতে সর্বদা সচেষ্ট।

ওটিসি মার্কেট

২০১৯ সালে ওটিসি মার্কেটে শেয়ার লেনদেন আগের বছরের তুলনায় হ্রাস পেয়েছে ৬৮.২৫ শতাংশ৷ এই বছরে ওটিসি মার্কেটে মোট ১ কোটি ৫৩ লাখ ৭৬ হাজার ৪৭৪টি শেয়ার লেনদেন হয়৷ যার মূল্য ২২ কোটি ৩২ লাখ ২৫ হাজার ৮৯২ টাকা৷ অপরদিকে গত বছরে শেয়ার লেনদেনের পরিমান ছিল ২ কোটি ১৬ লাখ ৮৭ হাজার ৬৩৪ টি শেয়ার৷ যার মূল্য ছিল ৭০ কোটি ৩১ লাখ ৬৩ হাজার ৬২২ টাকা৷

 

শেয়ারবাজারনিউজ/ম.সা

আপনার মন্তব্য

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.

Top