বিনিয়োগকারীর কথা: পুঁজিবাজার রক্ষার্থে ৮টি পদক্ষেপ নিন

আজ থেকে ১০ বছর আগে ১৬ই নভেম্বর ২০০৯ সালে বাংলাদেশের পুঁজিবাজার প্রথমবারের মতন ৪ হাজার ইনডেক্স স্পর্শ করেছিল। কিন্তু অত্যন্ত দুঃখের সাথে বলতেই হয় ১০ বছর অতিবাহিত হয়ে যাওয়ার পরও আমাদের ইনডেক্স সেই ৪ হাজারে অবস্থান করছে। বর্তমানে ভারতের পুঁজিবাজারের ইনডেক্স ৪০ হাজারের উপরে। শুনলে অবাক হবেন যে পাকিস্তানকে নিয়ে আমরা তুচ্ছ তাচ্ছিল্য করি সেই পাকিস্তানের ইনডেক্সও ৪০ হাজারের উপরে। বাংলাদেশের চেয়ে ১০ গুন বেশি পাকিস্তানের ইনডেক্স।

গত ১০ বছরে বেশিরভাগ কোম্পানির মূলধন দ্বিগুণ হয়েছে। নুতন করে আরও ১১৯ টি কোম্পানি এবং মিউচুয়াল ফান্ড পুঁজিবাজারে তালিকাভুক্ত হয়েছে। এতো কিছুর পরও ইনডেক্স ৪ হাজারে অবস্থান করায় একটি বিষয় পরিস্কার, আর তা হচ্ছে ২০০৯ সালের সাথে তুলনা করলে বাজার এখন ২০০০ ইনডেক্সে অবস্থান করছে। বিষয়টি আরও পরিস্কার হয়ে যায় যখন আমরা শেয়ার গুলোর দামের দিকে তাকাই। বর্তমানে ৩৫৮টি কোম্পানি এবং মিউচুয়াল ফান্ড পুঁজিবাজারে তালিকাভুক্ত আছে। এর মধ্যে ৯৫টির দাম এখন ১০ টাকার নিচে অর্থাৎ অভিহিত মূল্যের নিচে আছে। যা বাজারে তালিকাভুক্ত মোট কোম্পানির ২৭ শতাংশ। পুঁজিবাজারের ইতিহাসে এতো বিপুল সংখ্যক কোম্পানি এর আগে কখনও অভিহিত মূল্যের নিচে ছিল না।

পুঁজিবাজার ধ্বসের জন্য অনেকেই গ্রামীণফোনকে দায়ী করছে। যদিও বাস্তবতা সম্পূর্ণ ভিন্ন। প্রকৃত পক্ষে গ্রামীণফোনের শেয়ারের দাম বাজারের অন্যান্য কোম্পানির তুলনায় অনেক কম হ্রাস পেয়েছে। বাজারে ৩৫৮টি কোম্পানি এবং মিউচুয়াল ফান্ডের মধ্যে প্রায় ২০০টির উপর কোম্পানি গুনে গুনে দেখানো যাবে যে গুলোর দাম গত ৩ বছরে ৭০% কমে গেছে। যেমনঃ আমান ফিড ৯০ টাকা থেকে ২৮ টাকা, বিএসআরএম লিমিটেড ১৫০ টাকা থেকে ৪৮ টাকা, আমরা টেকনোলজি ১২০ টাকা থেকে ৩৮ টাকা, এসিআই লিমিটেড ৬০০ টাকা থেকে ১৮৫ টাকা, বিবিএস কেবলস ১৩০ টাকা থেকে ৫৮ টাকা, একটিভ ফাইন ৪৫ টাকা থেকে ১৩ টাকা, সিটি ব্যাংক ৫০ টাকা থেকে ১৮ টাকা, লঙ্কাবাংলা ৫০ টাকা থেকে ১৬ টাকা ,ইফাদ অটো ১২০ টাকা থেকে ৩৮ টাকা, হাইডেলবার্গ সিমেন্ট ৬০০ টাকা থেকে ১৫০ টাকা। গ্রামীণফোনের মূল্য সংশোধন অন্য কোম্পানি গুলোর তুলনায় অনেক কম হয়েছে। ৫০০ টাকা থেকে এখন ২৬০ টাকা। প্রকৃত সত্য হচ্ছে গ্রামীনফোন, স্কয়ার ফার্মা এবং মাল্টিন্যাশনাল কোম্পানি গুলো বাজারের অন্যান্য কোম্পানির তুলনায় এখনও ভালো দামে অবস্থান করছে। অন্যান্য কোম্পানিগুলোর মতন গ্রামীনফোন, স্কয়ার ফার্মা এবং মাল্টিন্যাশনাল কোম্পানিগুলোর দামের সংশোধন হলে বাজার এখন ৩০০০ ইনডেক্সের আশপাশে থাকতো। বর্তমান পুঁজিবাজারে তালিকাভুক্ত অধিকাংশ কোম্পানি তার ইতিহাসের সর্বনিম্ন দামে অবস্থান করছে। কিন্তু তারপরও প্রতিদিন শেয়ারের দাম কমে যাচ্ছে। এর পেছনে একটিই কারন। আর তা হচ্ছে আস্থার অভাব। আর এই আস্থার অভাবের জন্য অর্থ সংকট দেখা দিয়েছে। আস্থার সংকট দূর করতে হলে মুখের কথায় আর কাজ হবে না। দরকার কিছু দৃশ্যমান পদক্ষেপ।

নিম্নে উল্লেখিত ৮টি পদক্ষেপ সরকারকে জরুরি ভিত্তিতে নিতে হবে। তবেই বাজার ঘুরে দাঁড়াবে।

১) আগামি ১ বছরের জন্য সকল ধরনের ফোর্স সেলের মাধ্যমে শেয়ার বিক্রি বন্ধের জন্য সার্কুলার জারি করুন।

২) বিনিয়োগকারীরা মার্চেন্ট ব্যাংক বা ব্রোকারেজ হাউজ থেকে যে ঋণ নেয় সেই ঋণের সুদ আগামি ৫ বছরের জন্য ৭% করে দিন। বর্তমানে মার্চেন্ট ব্যাংক বা ব্রোকারেজ হাউজগুলো ৩ মাসের জন্য ১৫% সুদে টাকা দিয়ে থাকে। যা চক্রবৃদ্ধি হারে বাৎসরিক সুদের হার দিয়ে দাড়ায় ২০%।

৩) বিএসইসিকে ঢেলে সাজান। বিএসইসিতে কর্মরত যে সকল ব্যাক্তি দুর্নীতির সাথে জড়িত তাদের কঠিন শাস্তির আওতায় আনুন। পুঁজিবাজার সম্পর্কে স্পষ্ট ধারনা রাখেন এমন ব্যক্তিদের নিয়ে বিএসইসি সাজান। পাশাপাশি সবার কাছে ক্লিন ইমেজ আছে এমন ব্যাক্তিদের নিয়োগ দিন।

৪) প্রত্যেক পরিচালকদের জন্য কোম্পানির ন্যূনতম ৩% এবং বোর্ডের জন্য নুন্যতম ৪৫% শেয়ার ধারন করার বাধ্যবাধকতা এনে সার্কুলার জারি করুন। তাদের জন্য ৬ মাসের সময় বেধে দিন। যদি উক্ত সময়ের মধ্যে ৪৫% শেয়ার ধারন করতে ব্যর্থ হয় তবে ঐ বোর্ড ভেঙ্গে দিন। এবং যাদের হাতে শেয়ার আছে তাদের নিয়ে ৪৫% শেয়ার ধারন সাপেক্ষে নুতন বোর্ড গঠন করুন। ৩০% শেয়ার ধারন করা বোর্ড কখনও ৭০% ধারণ করা বিনিয়োগকারিদের ভাগ্য নির্ধারণ করতে পারে না। আর যদি করে তবে তা কোম্পানি এবং বাকি ৭০% বিনিয়গকারিদের জন্য ভালো কিছু বয়ে আনতে পারেনা।

৫) পুঁজিবাজার সম্পর্কে স্পষ্ট ধারনা রাখে সেই সাথে সকলের কাছে ক্লিন ইমেজ আছে এমন ব্যক্তিদের নিয়ে একটি শক্তিশালী কমিটি গঠন করুন। তাদের নিকট ক্ষমতা ন্যাস্ত করুন। যে কমিটির কাজ হবে বিএসইসি, ডিএসই, বাংলাদেশ ব্যাংক, সরকারী বিনিয়োগ সংস্থা এবং অর্থ মন্ত্রালয়ের মধ্যে সমন্বয় সাধন করে পুজিবাজারের সমস্যা গুলো দূর করা।

৬) সরকারী বিনিয়োগ সংস্থা আইসিবিকে ঢেলে সাঁজাতে হবে। অনেক দিন থেকেই আইসিবির কর্মকাণ্ড প্রশ্নবিদ্ধ। পুঁজিবাজারকে সাপোর্ট দেয়ার জন্য সরকারী বিনিয়োগ সংস্থা আইসিবির পাশাপাশি আর ২টি সরকারী বিনিয়োগ সংস্থা গঠন করুন।

৭) বর্তমান বাজারে চাহিদার তুলনায় শেয়ারের যোগান অনেক বেশি। তাই হাতে গোনা কিছু মাল্টিন্যাশনাল কোম্পানি ছাড়া আগামি ২ বছর আইপিও বন্ধ রাখুন।

৮) যত দ্রুত সম্ভব পুঁজিবাজারে অর্থের যোগান দিন। সে ক্ষেত্রে মার্চেন্ট ব্যাংক এবং ব্রোকারেজ হাউজগুলোকে দীর্ঘ মেয়াদী ঋণ দিয়ে পুঁজিবাজারে অর্থের যোগান দিন।

দেখছি, দেখবো, বিবেচনায় আছে এই ধরনের শব্দ পুঁজিবাজারের জন্য আর প্রযোজ্য নয়। একজন বিনিয়োগকারী হিসেবে এটুকু বলতে পারি উপরে উল্লেখিত পদক্ষেপগুলো যতো দ্রুত বাস্তবায়ন হবে বাংলাদেশের পুঁজিবাজার ততো দ্রুত ঘুরে দাঁড়াবে।

লেখক: মাসুদ হাসান, শেয়ার বিনিয়োগকারী

উত্তরা, ঢাকা।

 

শেয়ারবাজারনিউজ/ম.সা

আপনার মন্তব্য

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.

Top