সংশয়ে সিকিউরিটিজ হাউজ: চলছে ছাটাই বাড়ছে আতঙ্ক

শেয়ারবাজার রিপোর্ট: পুঁজিবাজারের ধারাবাহিক মন্দায় ব্যবসায়িক কার্যক্রম পরিচালন নিয়ে সংশয়ে পড়েছে অধিকাংশ সিকিউরিটিজ হাউজ। বিগত বছরগুলোতে নানা উদ্যোগ নিলেও বাজার স্বাভাবিক পর্যায়ে আসেনি। ফলে অধিকাংশ কার্যদিবসে লোকসান গুনতে গুনতে তলানিতে এসে ঠেকেছে হাউজগুলোর আর্থিক হিসাব। লোকসান কমাতে অধিকাংশ হাউজগুলোতে কর্মী ছাটাইয়ের কাজ চলছে। এদিকে গত বছরের তুলনায় এ বছর বিও খোলার প্রবণতা কমেছে উল্লেখযোগ্যহারে। নতুন করে হিসাব না খোলায় বিনিয়োগকারীর সংখ্যা বাড়ছে না। অন্যদিকে যেসব বিনিয়োগকারীদের পোর্টফলিওর ইক্যুইটি মাইনাসে চলে এসেছে তারা লেনদেন করতে পারছে না। ফলে হাউজগুলো কমিশন থেকে বঞ্চিত হচ্ছে। লংকাবাংলা সিকিউরিটিজ হাউজসহ বড় বড় হাউজগুলোতে দেদারছে কর্মী ছাটাই চলছে। ডিএসই ও সিএসইর তালিকাভুক্ত অধিকাংশ সিকিউরিটিজ হাউজের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের সঙ্গে আলাপ করে এসব তথ্য জানা গেছে।

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক সিকিউরিটিজ হাউজের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা জানান, অধিকাংশ বিনিয়োগকারী লোকসানে থাকায় লেনদেন করতে পারছে না। নিটিং করে লোকসান সমন্বয় করার মতো পুঁজিও তাদের কাছে নেই। অন্যদিকে প্রতিমাসে হাউজ ভাড়া,কর্মকর্তা-কর্মীচারীদের বেতন-ভাতা দিতে হচ্ছে। বিগত বছরে আয়ের চেয়ে ব্যয় বেড়েছে দ্বিগুন। যার ফলে ব্যবসায় টিকে রাখতে কর্মী ছাটাই করতে হচ্ছে।

তিনি আরো বলেন, নতুন বিও অ্যাকাউন্ট খোলা হলে সেখান থেকে নতুন বিনিয়োগে কিছু লোকসান কাটতো। কিন্তু বিও খোলার প্রবণতা কমে যাওয়ায় তা হচ্ছে না। এদিকে মো. আনিসুর রহমান নামে এক হাউজের কর্মকর্তা জানান, তাদের হাউজের ১৫ জনকে ছাটাই করা হয়েছে। তার সঙ্গে আরো বেশ কয়েকজনের চাকরী হারানো আশঙ্কা রয়েছে। তিনি বলেন, বাজার পরিস্থিতি ভালো না হলে তাদের চাকরী ছাড়তে হবে। স্ত্রী,সন্তানদের নিয়ে পথে বসতে হবে। এ অবস্থায় সরকারকে অনতিবিলম্বে বাজার পরিস্থিতি স্বাভাবিক করার আহবান জানান তিনি।

জানা গেছে, গত বছরের প্রথমদিকে যেখানে বিও অ্যাকাউন্টের সংখ্যা ছিল প্রায় ২৮ লাখ। সেখানে গত ৫ ফেব্রুয়ারি বৃহস্পতিবার পর্যন্ত পর্যন্ত বিও অ্যাকাউন্টের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ২৫ লাখ ৭৮ হাজার। প্রাপ্ত তথ্যে আরো জানা যায়, ২০১০ সালে পুঁজিবাজারের ব্যাপকহারে সূচক, লেনদেন ও বিও হিসাব বৃদ্ধি পায়। সে সময় ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জের (ডিএসই) দৈনিক লেনদেন বেড়ে ২ হাজার ৫০০ কোটি টাকা থেকে ৩ হাজার কোটি টাকা পেরিয়ে যায়। ধারাবাহিকভাবে লেনদেন বৃদ্ধি পাওয়াতে ব্রোকারেজ হাউজ ও মার্চেন্ট ব্যাংকগুলো ব্যবসা সম্প্রসারণ করে। দেশের প্রত্যন্ত অঞ্চলে স্থাপন করা হয় ব্রোকারেজ হাউজ। এরই ধারাবাহিকতায় প্রতিষ্ঠানগুলোর বিভিন্ন বিভাগে নতুন লোকবল নিয়োগ দেয়া হয়। সে সময় গড়ে প্রতিটি ব্রোকারেজ হাউজ ও মার্চেন্ট ব্যাংকে ২০ থেকে ৩০ কোটি টাকা লেনদেন হয়। কিন্তু বর্তমানে ডিএসইতে গড়ে লেনদেন হচ্ছে ৪০০ কোটির নিচে। এর ফলে ব্রোকারেজ হাউজ ও মার্চেন্ট ব্যাংকের দৈনন্দিন লেনদেনও কমে গিয়েছে।

বাজার বিশ্লেষণে দেখা গেছে, গত বছরের ফেব্রুয়ারি মাস থেকে পুঁজিবাজারের দৈনন্দিন লেনদেন ব্যাপকহারে হ্রাস পায়। এতে গত বছরের মোট কার্যদিবসের মধ্যে মাত্র ১২ কার্যদিবস ডিএসইতে লেনদেন হয়েছে এক হাজার কোটি টাকার ওপরে। এর মধ্যে কোন কার্যদিবসেই ডিএসইর লেনদেন বার’শ কোটি টাকা ছাড়ায়নি। অন্যদিকে গত ১ বছরেরও বেশি সময় ডিএসইর লেনদেন হাজার কোটি টাকায় পৌছায়নি।

এ বিষয়ে বাজার বিশ্লেষকরা বলেন, দীর্ঘদিন ধরে বাজারের লেনদেন কম হচ্ছে। এতে হাউজগুলোর আয় কমে গেছে। কারণ বিও হিসাবের ওপর বার্ষিক ফি ছাড়া লেনদেনের ওপর নির্দিষ্ট হারে কমিশনই ব্রোকারেজ ও মার্চেন্ট ব্যাংকগুলোর মূল আয়। এক সময় প্রতিদিন গড়ে ১০ কোটি টাকার মতো লেনদেন হলেও বর্তমানে ১ কোটি টাকার নিচে নেমে গেছে। এভাবে চলতে থাকলে ভবিষ্যত বাজার পরিস্থিতি নিয়ে বেশ আতঙ্ক বিরাজ করছে।

জানা গেছে, লেনদেন কম হওয়ায় যে পরিমাণ কমিশন পাওয়া যায় তা দিয়ে হাউজ ভাড়া, বিভিন্ন অপারেটিং বিল, কর্মকর্তা-কর্মচারীদের বেতন ইত্যাদি খরচ যোগানো প্রায় অসম্ভব হয়ে পড়েছে। বাধ্য হয়েই কর্মী ছাটাই করতে হচ্ছে। বেশিরভাগ সিকিউরিটিজ হাউজ ও মার্চেন্ট ব্যাংক বর্তমানে লোকসান গুনছে। এদিকে অব্যাহত পতনের ফলে সাধারণ বিনিয়োগকারীদের পাশাপাশি প্রাতিষ্ঠানিক বিনিয়োগকারীদের শেয়ার ক্রয়ের ক্ষমতা কমে যাওয়ায় এ ধরনের অবস্থা সৃষ্টি হয়েছে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা। বাজার সংশ্লিষ্ট অর্থাৎ বিনিয়োগকারী,হাউজ কর্মকর্তা,মালিক পক্ষ ইত্যাদি প্রত্যেকেরই প্রাণের দাবি উঠেছে শেয়ারবাজার স্থিতিশীল করা। এজন্য সরকারসহ নীতিনির্ধারণী মহলের যুগপোযোগী সিদ্ধান নিয়ে অনতিবিলম্বে বাজার স্থিতিশীল করার পদক্ষেপ নেয়ার আহবান জানান তারা।

 

 

শেয়ারবাজারনিউজ/ম.সা

আপনার মন্তব্য

Top