পুঁজিবাজারে ফ্লোর প্রাইজের সার্থকতা


বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশনের (বিএসইসি) বিগত কমিশন দীর্ঘ ৯ বছর পুঁজিবাজার নিয়ন্ত্রণের দায়িত্ব পালন করে। এই সময়কালে কমিশনের কর্মকাণ্ড নিয়ে বিনিয়োগকারীদের মধ্যে অনেক ধরনের বিতর্ক থাকলেও কমিশনের মেয়াদকালের শেষ সময়ে বিনিয়োগকারীদের পুঁজি রক্ষার্থে যে ফ্লোর প্রাইজের বাস্তবায়ন করে তা বেশির ভাগ বিনিয়োগকারী স্বতঃস্ফূর্ত ভাবে গ্রহন করে।

গত কয়েক বছর থেকেই বিনিয়োগকারীরা বাজারের তলা বা নিম্নসীমা খুজে যাচ্ছিলেন। কিন্তু অত্যন্ত পরিতাপের বিষয় হচ্ছে বেশিরভাগ কোম্পানির শেয়ারের দাম ৭০ থেকে ৮০ শতাংশ কমে গেলেও বাজার তার কাঙ্ক্ষিত তলা বা নিম্নসীমা খুজে পাচ্ছিল না । তাই অনেক বিশেষজ্ঞগন বাংলাদেশের পুঁজিবাজারকে তলা ছাড়া ঝুড়ি বলেছেন।

গত এক দশক থেকে বিনিয়োগকারীরা শুনে আসছেন পুঁজিবাজার তার নিজস্ব শক্তিতে ঘুরে দাঁড়াবে। কিন্তু দুঃখজনক হলেও সত্য বাজার নিজস্ব শক্তিতে ঘুরে দাঁড়ায়নি। সত্য বলতে বাজারের নিজস্ব শক্তি বলে কিছু নেই। এটি একদম বাজে কথা। প্রকৃতপক্ষে শিক্ষিত বিনিয়োগকারী এবং বাজারে আইনের শাসন হচ্ছে বাজারের শক্তি। আইনের শাসন এবং জবাবদিহিতার অভাবে গত দশ বছরেও আমাদের পুঁজিবাজার ঘুরে দাঁড়াতে পারেনি। বেশির ভাগ বিনিয়োগকারী হয়েছে নিঃস্ব।

শাব্দিক অর্থে ফ্লোর অর্থ মেঝে বা তলা, আর প্রাইজ অর্থ দাম। পুঁজিবাজারের ক্ষেত্রে ফ্লোর প্রাইজ অর্থ হচ্ছে শেয়ার গুলোর দামের নিম্নসীমা নির্ধারণ করে দেওয়া। ফ্লোর প্রাইজ নির্ধারণের ফলে ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জ দীর্ঘ ১০ বছর পর তার নিম্নসীমা খুজে পেলো। এখন থেকে শেয়ার গুলোর দাম উঠা-নামা করবে ফ্লোর প্রাইজের উপরে গিয়ে।

পুঁজিবাজারে ফ্লোর প্রাইজের প্রয়োগ বাংলাদেশেই প্রথম নয়। এর আগে পাকিস্তানে এর প্রয়োগ করা হয়েছিল। ২০০৮ সালে পাকিস্তানের করাচী ইনডেক্স ১৬৯৫৫ থেকে কয়েক মাসের ব্যবধানে ৯১৮০ নেমে আসে। তখন পাকিস্তান সরকার ফ্লোর প্রাইজ নির্ধারণ করে বাজারের পতন রোধ করেছিল।

গত ১৯ মার্চ পুঁজিবাজারে ফ্লোর প্রাইজ নির্ধারণ করে দেয় বিএসইসি। এর আগের চার কার্যদিবসের কিছু পরিসংখ্যান তুলে ধরছি। মার্চের ১১ তারিখ ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জের ইনডেক্স ছিল ৪২৩১। এর পরের দিন ১২ তারিখ ইনডেক্স কমে ১০২ পয়েন্ট। পরের কার্যদিবস ১৫ তারিখ ইনডেক্স কমে ১৬০ পয়েন্ট। ১৬ তারিখ ইনডেক্স কমে ১৯৭ পয়েন্ট। পরের কার্যদিবস ১৮ তারিখ ইনডেক্স ১৮৪ পয়েন্ট কমে ৩৫৮৮ পয়েন্টে দাঁড়ায়। অর্থাৎ মাত্র ৪ কার্যদিবসে ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জ ইনডেক্স হারায় ৬৪৩ পয়েন্ট। আরও অবাক করা বিষয় ছিল এই ৪ দিনে অধিকাংশ কোম্পানির শেয়ারের কোন ক্রেতা ছিল না। তাই যারা ভাবছেন ফ্লোর প্রাইজ তুলে দিলে বা শেয়ারের দাম কমলেই ক্রেতা চলে আসবে তারা ভুল ভাবছেন।

অনেকেই ভাবতে পারেন বাজারকে বাজারের মতন চলতে দেয়া উচিত। দাম নির্ধারণের দায়িত্ব ক্রেতা বিক্রেতার উপর ছেড়ে দেওয়া উচিত। এই ধরনের চিন্তা ভাবনা যারা করছেন তাদের বলবো পুঁথিগত শিক্ষার বাইরে এসে বাস্তবতা বোঝার চেষ্টা করুন।

পৃথিবীর সব ধরনের বাজারে সরকারের কম-বেশি নিয়ন্ত্রণ থাকে। সেটি কাঁচা বাজার হতে পারে আবার পুঁজিবাজারও হতে পারে। বাজার যখন স্বাভাবিকতা হারিয়ে ফেলে তখন সরকার বাধ্য হয়েই তার শক্তি প্রয়োগ করে বৃহত্তর স্বার্থে। বর্তমান সময়কালে ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তরকে আমরা খুব সক্রিয় দেখি। জনগণ যেন সরকার নির্ধারিত দামে পণ্য কিনতে পারে সেই লক্ষ্যে এই সংস্থা কাজ করে। শুধু চাহিদা-যোগানের ভিত্তিতে দাম নির্ধারণের জন্য বাজারকে ছেড়ে দিলে পেঁয়াজ আমাদের ৪০০ টাকায় কিনতে হতো। কারন আমাদের দেশের বেশির ভাগ ব্যবসায়ী সিন্ডিকেটের মাধ্যমে ব্যবসা করে।

ফ্লোর প্রাইজ নিয়ে অনেক ধরনের সমালোচনা থাকতে পারে। অনেকের হয়তো টাকার দরকার। ফ্লোর প্রাইজে ক্রেতা না থাকায় শেয়ার বিক্রি করতে পারছেন না। ভাবছেন দাম কমলে হয়তো ক্রেতা পাওয়া যাবে। আসলে এই ভাবনা সঠিক না। ফ্লোর প্রাইজ তুলে দিলে দাম কমার সাথে সাথে ঋণ নিয়ে শেয়ার কেনা বেশির ভাগ বিনিয়োগকারীর ফোর্স সেল শুরু হয়ে যাবে। যা এই দুর্যোগকালে বাজারের পক্ষে মোকাবেলা করা সম্ভব হবে না। তাছাড়া খুব অল্প পরিমান শেয়ার লেনদেন করে কোটি কোটি শেয়ারের দাম কমে যেতে থাকবে। এতে ব্যক্তিগত বিনিয়োগকারীর পাশাপাশি, প্রাতিষ্ঠানিক বিনিয়োগকারী, কোম্পানির পরিচালক, ব্রোকারেজ হাউজ, মার্চেন্ট ব্যাংক সহ পুঁজিবাজারের সাথে সংশ্লিষ্ট সকলেই বড় ধরনের ক্ষতির সম্মুখীন হবে।

অধিকাংশ কোম্পানির শেয়ারের দাম গত ২ বছরে ৭৫% কমে গেছে। বর্তমানে বেশির ভাগ শেয়ারের দাম অবমূল্যায়িত। তারপরও শেয়ার গুলোর ক্রেতা পাওয়া যাচ্ছে না। পুঁজিবাজার আগে থেকেই মুমূর্ষু ছিল এর মধ্যে করোনা ভাইরাসের জন্য সৃষ্ট বিশ্ব পরিস্থিতির চাপ বাংলাদেশের পুঁজিবাজার নিতে পারেনি। ক্ষুদ্র স্বার্থকে ভুলে গিয়ে বৃহত্তর স্বার্থে বিনিয়োগকারীদের পুঁজি রক্ষার্থে বর্তমান ফ্লোর প্রাইজ যথেষ্ট গুরুত্ব রাখে। তাই বাজারের স্বাভাবিক গতি ফিরে না আসা পর্যন্ত বর্তমান বিএসইসির কমিশনকে ফ্লোর প্রাইজ বহাল রাখার জন্য বিশেষ ভাবে অনুরোধ করবো।

লেখক: মাসুদ হাসান
শেয়ার বিনিয়োগকারী
উত্তরা,ঢাকা।

শেয়ারবাজারনিউজ/ম.সা

আপনার মন্তব্য

৬ Comments

  1. Anonymous said:

    আমাদের অতিশিক্ষিত কিছু অমানুষ আছে বিএসইসি আর ডিএসসি তে যারা ধ্বংস এটার অনুধাবন করতে চেষ্টাই করে না।।। ধ্বংস করতে জানে আর নিজের আখের গুছাতে ব্যাস্ত থাকে।

  2. নুর মুহাম্মদ said:

    মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর দিক নির্দেশনাই বি এস ই সি এর সঠিক সিদ্ধান্তে পুজিবাজারের ফ্লোর প্রাইস নিধারনের কারনেই পুঁজি বাজারে সাধারন বিনিয়োগকারীদের বিরাট ক্ষতি থেকে রক্ষা পেয়েছে। যত দিন পুঁজি বাজার সাভাবিক না হবে ততদিন ফ্লোর প্রাইস বলবত রাখার জন্য আহবান জানাচ্ছি।

  3. Anonymous said:

    ক্ষুদ্র বিনিয়োগকারী দের প্রধান দাবি, মার্কেট ঠিক না হওয়া পর্যন্ত যাতে ফ্লোর প্রাইস বহাল থাকে।

  4. Anonymous said:

    এই লোক নিশ্চই অতিমূল্যে শেয়ার কিনেছে, এখন ফ্লোর প্রাইস রাখার জন্য কান্নাকাটি করছে !

  5. মোহাম্মদ আব্দুল কাহার। said:

    আমি একমত

  6. Anonymous said:

    Floor price must be 10 Tk for all companies share because per unit share value selected 10Tk by the authority. The company which one is not able to hold price at least 10Tk need to kick them out from share market.

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.

Top