রাইটের টাকা এফডিআর! বঞ্চিত বিনিয়োগকারীরা

investigation-630x286 copyআহসান হাবীব : রাইট ইস্যুর মাধ্যমে পুঁজিবাজার থেকে অর্থ উত্তোলন করে তা কোম্পানির কাজে ব্যবহার না করে এফডিআর করা হয়েছে বলে অভিযোগ উঠেছে তালিকাভুক্ত ১৭টি নন লাইফ বীমা কোম্পানির  বিরুদ্ধে। এ কোম্পানিগুলো রাইট ইস্যুর আগে ভাল ডিভিডেন্ড দিলেও রাইট উত্তোলনের পরে অজ্ঞাত কারণে ডিভিডেন্ড দেয়ার হার কমিয়ে দিয়েছে। সংশ্লিষ্টদের অভিমত, এর ফলে রাইটের মাধ্যমে টাকা উত্তোলনের মূল উদ্দ্যেশ্যই ব্যহত হচ্ছে।

 

এ বিষয়ে বাংলাদেশ ইন্স্যুরেন্স এসোসিয়েশনের (বিআইএ) সভাপতি শেখ কবির হোসেন শেয়ারবাজারনিউজ ডটকমকে বলেন, বিগত রাজনৈতিক অস্থিরতার কারণে বীমা ব্যবসা কমেছে। এদিকে বিনিয়োগ পরিস্থিতিতে মন্দাভাব থাকায় বীমা কোম্পানিগুলোও লাভজনক খাতে বিনিয়োগ করতে পারেনি। তাছাড়া বীমায় বিনিয়োগ নীতিমালা চূড়ান্ত না হওয়ায় কোম্পানিগুলোও যথাযথভাবে বিনিয়োগ করতে পারছে না। যে কারনে তারা নগদ অর্থকে ঝুকির মধ্যে না রেখে এফডিআর করছে।

প্রাপ্ত তথ্যানুযায়ী, পুঁজিবাজারে তালিকাভুক্ত বীমা খাতের ৪৬টি কোম্পানির মধ্যে ১৭টি কোম্পানি ব্যবসায়িক মূলধন বাড়াতে বিভিন্ন সময়ে রাইট শেয়ার ইস্যু করেছে। এ কোম্পানিগুলোর মধ্যে এশিয়া ইন্স্যুরেন্স  (১আর:১) ২০১১ সালে; এশিয়া পেসিফিক (১আর:১) ২০১০ সালে; বাংলাদেশ জেনারেল ইন্স্যুরেন্স (১আর:২) ২০০৫ ও (১আর:১) ২০০৯ সালে; সেন্ট্রাল ইন্স্যুরেন্স (১আর:২) ২০০৫, (১আর:৫) ২০০৯ ও (১আর:২) ২০১২ সালে; সিটি জেনারেল ইন্স্যুরেন্স (১আর:১) ২০১১ সালে; কন্টিনেন্টাল ইন্স্যুরেন্স (১আর:২) ২০১১ সালে; ইস্টার্ন ইন্স্যুরেন্স (১আর:১) ২০১১ সালে; ইস্টল্যান্ড ইন্স্যুরেন্স (১আর:২) ২০০৫ সালে; ফেডারেল ইন্স্যুরেন্স (২আর:১) ২০১১ সালে; জনতা ইন্স্যুরেন্স (২আর:১) ২০১১ সালে; কর্ণফুলি ইন্স্যুরেন্স (১আর:১) ২০১০ সালে; মার্কেন্টাইল ইন্স্যুরেন্স (১আর:১) ২০১১ সালে পিপলস ইন্স্যুরেন্স (১আর:১) ২০১০ সালে; পাইওনিয়ার ইন্স্যুরেন্স (১আর:৫) ২০১১ সালে; পূরবী জেনারেল ইন্স্যুরেন্স (২আর:১) ২০১৩ সালে এবং রূপালী ইন্স্যুরেন্স (১আর:১) ২০১২ সালে রাইট ইস্যুর মাধ্যমে পুঁজিবাজার থেকে অর্থ সংগ্রহ করেছে।

এদিকে রাইট ইস্যুর মাধ্যমে মূলধন বাড়ানো কোম্পানিগুলোর মধ্যে একমাত্র পাইওনিয়ার ইন্স্যুরেন্সের মুনাফা কমলেও ডিভিডেন্ডের হার বেড়েছে। ২০১১ সালে রাইট ইস্যু করা কোম্পানিটি ২০১১ সালে মুনাফা করেছে ১৭ কোটি টাকা ও এই সময়ে ডিভিডেন্ড দিয়েছে ৩০ শতাংশ স্টক, ২০১৩ সালে মুনাফা করেছে ১২ কোটি ৮০ লাখ টাকা ও ডিভিডেন্ড দিয়েছে ১০ শতাংশ ক্যাশ এবং ২০ শতাংশ স্টক, ২০১৪ সালে ১০ কোটি ২৮ লাখ টাকা ও ডিভিডেন্ড দিয়েছে ৫ শতাংশ ক্যাশ এবং ২৫ শতাংশ স্টক। রাইট ইস্যুর আগে কোম্পানিটি ২০০৯ ও ২০১০ সালে সর্বোচ্চ ২৫ শতাংশ স্টক ডিভিডেন্ড দিয়েছিল।

অপরদিকে ১৭টি কোম্পানির মধ্যে মুনাফা কমেছে ৫টি কোম্পানির। কোম্পানিগুলো হলো: জনতা ইন্স্যুরেন্স, কর্ণফুলি ইন্স্যুরেন্স, পিপলস ইন্স্যুরেন্স, পূরবী জেনারেল ইন্স্যুরেন্স এবং রূপালী ইন্স্যুরেন্স।

এছাড়া বাকী ১১টি কোম্পানির মুনাফা বাড়লেও মুনাফা অনুযায়ী ডিভিডেন্ডের পরিমাণ বাড়েনি।

এশিয়া ইন্স্যুরেন্স কোম্পানিটি রাইট ইস্যুর পরের বছর ৭ কোটি টাকা মুনাফা করেছে এবং ডিভিডেন্ড দিয়েছে ১০ শতাংশ ক্যাশ ৫ শতাংশ স্টক। অথচ কোম্পানিটি রাইট শেয়ার ইস্যুর বছর ২০১১ সালে মুনাফা করেছিল ৪ কোটি টাকা এবং ডিভিডেন্ড দিয়েছিল ১৫ শতাংশ ক্যাশ এবং ১৫ শতাংশ স্টক। এদিকে, ২০১৫ সালের জুন মাস পেরিয়ে গেলেও ২০১৪ হিসাব বছরের জন্য বিনিয়োগকারীদের এখনো ডিভিডেন্ড দিতে পারেনি কোম্পানিটি।

এশিয়া প্যাসিফিক ইন্স্যুরেন্স কোম্পানিটি রাইট ইস্যুর পরের বছরগুলোতে মুনাফা করেছে  ২০১১ সালে ৬ কোটি ৩০ লাখ টাকা, ২০১২ সালে ৭ কোটি ৭৯ লাখ টাকা, ২০১৩ সালে ৬ কোটি ৫৬ লাখ টাকা। ২০১১ সালে কোম্পানিটি ১০ শতাংশ ক্যাশ ডিভিডেন্ড দিলেও পরের বছরগুলোতে ১২ শতাংশ করে ক্যাশ ডিভিডেন্ড দেয়। অথচ রাইট শেয়ার ইস্যুর আগে কোম্পানিটি সর্বোচ্চ ৩ কোটি টাকা মুনাফা করলেও ডিভিডেন্ড ১০ শতাংশ হারেই দিয়েছিল। সর্বশেষ ২০১৪ হিসাব বছরে কোম্পানিটি বিনিয়োগকারীদের ১০ শতাংশ ক্যাশ ডিভিডেন্ড দিয়েছে। অর্থাৎ রাইটের মাধ্যমে কোম্পানিটি বিনিয়োগকারীদের কাছ থেকে টাকা নিয়ে লাভবান হলেও বিনিময়ে নামমাত্র ডিভিডেন্ড দিয়ে পার পেয়ে যাচ্ছে কোম্পানিটি।

জনতা ইন্স্যুরেন্স কোম্পানিটি রাইট ইস্যুর পরের বছরগুলোতে মুনাফা করেছে  ২০১২ সালে ২ কোটি ২০ লাখ টাকা, ২০১৩ সালে ১ কোটি ৮২ লাখ টাকা। ২০১২ সালে কোম্পানিটি ১০ শতাংশ স্টক এবং ২০১৩ সালে মুনাফা কমলেও  ১২.৫ শতাংশ স্টক ডিভিডেন্ড দেয়। অথচ কোম্পানিটি রাইট শেয়ার ইস্যুর আগের বছর ২০১০ সালে সর্বোচ্চ ১৫ শতাংশ ডিভিডেন্ড দিয়েছিল। সর্বশেষ ২০১৪ হিসাব বছরে কোম্পানিটি বিনিয়োগকারীদের মাত্র ১০ শতাংশ স্টক ডিভিডেন্ড দেয়।

কর্ণফুলি ইন্স্যুরেন্স কোম্পানিটি রাইট ইস্যুর পরের বছরগুলোতে মুনাফা করেছে  ২০১১ সালে ৭ কোটি ৮২ লাখ টাকা, ২০১২ সালে ৫ কোটি ৭৬ লাখ টাকা, ২০১৩ সালে ৬ কোটি ২৬ লাখ টাকা এবং ২০১৪ সালে ৫ কোটি ৯৫ লাখ টাকা মুনাফা করেছে। ২০১১ সালে কোম্পানিটি ১৫ শতাংশ ক্যাশ, ২০১২ সালে ১২.৫ শতাংশ এবং ২০১৩ সালেও ১২.৫ শতাংশ ডিভিডেন্ড এবং ২০১৪ সালে মাত্র ১২ শতাংশ ডিভিডেন্ড দিয়েছে। অথচ কোম্পানিটি রাইট শেয়ার ইস্যুর বছর ২০১০ সালে সর্বোচ্চ ২০ শতাংশ ডিভিডেন্ড দিয়েছিল।

এভাবে একটি কোম্পানি ব্যাতিত বাকি কোম্পানিগুলো মুনাফা ও ডিভিডেন্ডের বিষয়ে খুবই অনিয়মিত ছিল।

অপরদিকে, ২০১৪ হিসাব বছরে তালিকাভুক্ত সবকয়টি নন-লাইফ বীমা কোম্পানির কর পরিশোধের পর নীট মুনাফা কমেছে। যার প্রভাবে ডিভিডেন্ডের হার আরো কমেছে।

এছাড়া বাজারে বীমা কোম্পানিগুলোর শেয়ার দরে মন্দাভাব থাকায় সাধারণ বিনিয়োগকারীরা এদিক থেকেও ভাল মুনাফা করতে পারছে না।

এ ব্যাপারে আইসিবি এএমসিএলের পরিচালক ও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ফিন্যান্স বিভাগের অধ্যাপক ড. মাহমুদ উসমান ইমাম শেয়ারবাজারনিউজ ডটকমকে বলেন, ‘রাইট শেয়ার ইস্যুর মাধ্যমে কোম্পানির মূলধন বাড়িয়ে ব্যবসায়িক পরিধি বাড়লেও মুনাফা বাড়াতে কোম্পানিগুলো ব্যর্থ হচ্ছে। পরিণতিতে শেয়ারহোল্ডারদের ভাল ডিভিডেন্ড দিচ্ছে না। আবার কিছু কোম্পানির মুনাফা বাড়লেও ডিভিডেন্ড বাড়েনি। ধ্বস পরবর্তী বাজারের মন্দাভাব কাটাতে এবং বিনিয়োগকারীদের ক্ষতি পুষিয়ে উঠার জন্য এসব কোম্পানিতে বিনিয়োগ করেও সাধারণ বিনিয়োগকারীরা যৌক্তিক লভ্যাংশ পাচ্ছে না। পাশাপাশি কোম্পানিগুলো রাইট ইস্যুর অর্থ কিভাবে খরচ করছে এ বিষয়েও সংশ্লিষ্টদের কোন ধারণা না থাকায় একে প্রকার অন্ধকারেই রয়েছে সবাই। পরিণতিতে কোম্পানিগুলোর জবাবদিহিতা না থাকায় এর দ্বারা বিনিয়োগকারীরা ক্ষতিগ্রস্ত হলেও তাদের ক্ষতি নিরাময়ের জন্য দায়িত্বশীলরা নীরব ভূমিকা পালন করছে।’

 

শেয়ারবাজারনিউজ/তু/সা

আপনার মন্তব্য

Top