ঋণ শোধের নতুন নির্দেশনায় ব্যাংকগুলোর নিট মুনাফা বেড়ে যাওয়ার সম্ভাবনা

শেয়ারবাজার রিপোর্ট: কভিড-১৯ পরিস্থিতিতে ব্যাংকঋণের কিস্তি পরিশোধের সময় আরেক দফা বা‌ড়ি‌য়ে‌ছে কেন্দ্রীয় ব্যাংক। এ‌ সু‌বিধা আগে ৩০ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত ছিল। যা এখন বাড়িয়ে করা হয়েছে আগামী ৩১ ডিসেম্বর পর্যন্ত। আর এতে এ সময়ের মধ্যে কোনো ঋণগ্রহীতা ঋণ শোধ না করলেও খেলাপির তালিকায় দেখানো যাবে না। এর ফলে পুরো বছরের জন্যই কিস্তি পরিশোধে ছাড় পেলেন যেমন ঋণগ্রহীতারা  তেমনি এ বছরে মন্দ ঋণ বাড়বে না এবং এ জন্য প্রভিশনিং ব্যয় হ্রাস পাবে। যাতে করে ব্যাংকগুলোর মুনাফায় ইতিবাচক প্রভাব পড়বে।

দুই দফায় ৩০ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত ছাড় দিয়েছিল কেন্দ্রীয় ব্যাংক। তবে ব্যবসায়ীরা ডিসেম্বর পর্যন্ত কিস্তি স্থগিত রাখার দাবি জানিয়ে আসছিলেন। একই দাবি ছিল খেলাপি ঋণ কম এমন ব্যাংকগুলোর শীর্ষ নির্বাহীদেরও। কিছুটা দ্বিধাগ্রস্ত থাকলেও শেষ পর্যন্ত তাদের এ দাবি মেনে নিয়ে ব্যাংকের ঋণগ্রহীতাদের জন্য আবারো সুসংবাদ দিল কেন্দ্রীয় ব্যাংক। নতুন নির্দেশনা অনুযায়ী, চলতি বছরের ৩১ ডিসেম্বর পর্যন্ত কোনো গ্রাহক ঋণের কিস্তি পরিশোধ না করলে তাকে খেলাপি দেখানো যাবে না।

করোনায় বিধ্বস্ত অর্থনৈতিক দুর্যোগে ব্যবসায়ীদের সুরক্ষা দিতে সবার আগে ঋণের কিস্তি পরিশোধ শিথিল করে বাংলাদেশ ব্যাংক। চলতি বছরের জানুয়ারি থেকে জুন পর্যন্ত কিস্তি পরিশোধ না করলেও কোনো ঋণ খেলাপি না করার নির্দেশনা দেয়া হয় মার্চের শেষ সপ্তাহেই। পরে এ সময়সীমা বাড়িয়ে ৩০ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত নির্ধারণ করা হয়। সে সময়সীমা শেষ হওয়ার আগেই ঋণ পরিশোধের মেয়াদে আরো ছাড় দিয়ে গতকাল প্রজ্ঞাপন জারি করেছে বাংলাদেশ ব্যাংক।

শ্রেণীকরণের সময়সীমা ডিসেম্বর পর্যন্ত স্থগিত করার বিষয়ে কিছু কিছু বেসরকারি ব্যাংকের কর্মকর্তা জানান, দেশের অর্থনীতি ও ব্যবসায়ীদের স্বার্থের কথা বিবেচনায় রেখে ঋণ পরিশোধে বাধ্যবাধকতার সময়সীমা ডিসেম্বর পর্যন্ত স্থগিত করা হয়েছে। ব্যবসায়ীদের স্বার্থের কথা চিন্তা করলে এ নির্দেশনা ভালো। কিন্তু সমস্যা হলো, নতুন নির্দেশনার ফলে এ বছর কোনো ঋণ খেলাপি হওয়ার সুযোগ থাকল না। এতে সমস্যাগ্রস্ত ঋণগুলো চিহ্নিত হবে না। ব্যাংকগুলোর জন্য বড় চ্যালেঞ্জ হবে ২০২১ সালে। আগামী বছর খেলাপি ঋণ এক লাফে দ্বিগুণ হয়ে যাওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।

এদিকে ঋণের কিস্তি ডিসেম্বর পর্যন্ত স্থগিত রাখার দাবি জানিয়ে আসছিলেন ব্যবসায়ীরা। খেলাপি ঋণ কম এমন ব্যাংকগুলোর শীর্ষ নির্বাহীরাও তাই চাচ্ছিলেন। কিন্তু এ দাবি পূরণ করতে গিয়ে কিছুটা দ্বিধায় ছিলেন কেন্দ্রীয় ব্যাংকের কর্মকর্তারা। কারণ ঋণের কিস্তি ডিসেম্বর পর্যন্ত স্থগিত করা হলে চলতি বছর কোনো ঋণই খেলাপি হবে না। ফলে প্রয়োজন হবে না সঞ্চিতি সংরক্ষণেরও। খেলাপি হওয়া কিছু ঋণ আদায় হওয়ায় মুক্ত হবে আগের সঞ্চিতির অর্থ। পুঁজিবাজার চাঙ্গা হওয়ায় এ খাতে আয় বাড়বে ব্যাংকগুলোর। সব মিলিয়ে বছর শেষে করোনা মহামারীতে বিপর্যস্ত অর্থনৈতিক পরিস্থিতিতেও ব্যাংকগুলোর নিট মুনাফা বেড়ে যাওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে।

বাংলাদেশ ব্যাংক কর্মকর্তাদের আশঙ্কা, বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলোর নিট মুনাফা বেড়ে গেলে তা হিতে বিপরীত হবে। বেশি ডিভিডেন্ড দিয়ে পরিচালকরা বেসরকারি ব্যাংক থেকে মুনাফার অর্থ বের করে নেবেন। এতে ব্যাংকগুলোর আর্থিক ভিত দুর্বল হবে। এজন্য সেপ্টেম্বর শেষে ব্যাংকগুলোর মুনাফা পরিস্থিতি দেখেই শ্রেণীকৃত ঋণের সময় গণনা শুরুর সিদ্ধান্ত নেয়ার বিষয়টি ভাবছিল কেন্দ্রীয় ব্যাংক।

এদিকে কিস্তি পরিশোধের বাধ্যবাধকতা শিথিল করায় চলতি বছরের এপ্রিল-জুন প্রান্তিকে ব্যাংকগুলোর ঋণ আদায় অর্ধেকের নিচে নেমে এসেছে। এ সময়ে ব্যাংকগুলো শিল্পের মেয়াদি ঋণ থেকে আদায় করেছে ১০ হাজার ১৮৭ কোটি টাকা। যদিও ২০১৯ সালের এপ্রিল-জুন সময়ে ব্যাংকগুলো এ খাত থেকে ২৩ হাজার কোটি টাকার বেশি ঋণ আদায় করতে পেরেছিল। অর্থ আদায়ে একই পরিস্থিতি ব্যাংকগুলোর অন্যান্য ঋণেও। সিএসএমই, কৃষিসহ ব্যাংকের সব ধরনের ঋণের কিস্তি আদায় অর্ধেকের নিচে নেমে এসেছে। এর ফলে কমেছে ব্যাংকগুলোর ক্যাশ ফ্লো।

প্রসঙ্গত, চলতি বছরের জুন শেষে দেশের ব্যাংকিং খাতে খেলাপি ঋণের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ৯৬ হাজার ১১৬ কোটি টাকা। যদিও ২০১৯ সালে রেকর্ড ৫০ হাজার ১৮৬ কোটি টাকার খেলাপি ঋণ পুনঃতফসিল করে নিয়মিত করেছে ব্যাংকগুলো। বিদায়ী বছর শেষে দেশের ব্যাংকগুলোর খেলাপি, পুনঃতফসিল ও পুনর্গঠনকৃত দুর্দশাগ্রস্ত ঋণের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ২ লাখ ৩৭ হাজার ৪৬ কোটি টাকা। এ ঋণের সঙ্গে অবলোপনকৃত প্রায় ৪৫ হাজার কোটি টাকা ও উচ্চ আদালতের স্থগিতাদেশ থাকা ঋণ যুক্ত হলে ব্যাংকিং খাতের বিপদগ্রস্ত ঋণের পরিমাণ ৩ লাখ কোটি টাকার বেশি। চলতি বছরে কোনো ঋণ খেলাপি হওয়ার সুযোগ না থাকায় কাগজেকলমে দেশের ব্যাংকিং খাতে খেলাপি ঋণ কিছুটা কমবে। কিন্তু ২০২১ সালে ব্যাংকগুলোর খেলাপি ঋণের ধাক্কা সামাল দেয়া কঠিন হবে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।

শেয়ারবাজারনিউজ/এম.আর

আপনার মন্তব্য

Top