দয়া করে একবার যান অর্থমন্ত্রীর কাছে

Editorial-Logoশেয়ার বাজারে তালিকাভুক্ত ব্যাংকগুলোর এক্সপোজার লিমিট পরিপালনের দিনক্ষণ নিয়ে বিনিয়োগকারীদের মধ্যে একটা উদ্বিগ্নভাব লক্ষ্য করা যাচ্ছে। পুঁজিবাজারে শীর্ষ খাত হিসাবে পরিচিত ব্যাংকগুলোতেই শেয়ার হোল্ডারের সংখ্যা সর্বাধিক। অধিকাংশ সময়ই এই খাতের লেনদেন এবং সূচকের গতির সাথে গোটা শেয়ার বাজারের লেনদেন ও সূচকের গতি নির্ভরশীল থাকে। আরো একটু পরিষ্কার করে বললে বলা যায় যে, ব্যাংকের শেয়ার নেই এমন পোর্টফোলিও খুঁজে পাওয়া প্রায় অসম্ভব। অথচ এমনি একটি সেক্টরকে নিয়ে খেলছেন বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর ড.আতিউর রহমান। এক্সপোজার লিমিট নিয়ে তার এক ঘোষণায় ২০১০ সালে শেয়ার বাজারের ওপর দিয়ে সুনামি বয়ে যায়। তারপর একাদিক্রমে শেয়ার বাজার নিয়ে তার নেতিবাচক মন্তব্যে এখন বিনিয়োগকারীরা ধরেই নিয়েছেন- এই লোক যতদিন গভর্নর থাকবেন ততদিন আর বাজার ভালো হবেনা। ব্যক্তিগতভাবে বয়স এবং ব্যস্ততার কারণে ডিএসইতে আমার কম যাওয়া পড়ে। কিন্তু যেদিনই যাই সেদিনই বিনিয়োগকারী পুরোনো বন্ধুবান্ধবরা ওই একই প্রশ্ন জিজ্ঞাসা করেন, ভাই ওই চাষার ব্যাটাটা আর কতদিন থাকবে? নানা কারণে আমি নিজে গভর্নর মহোদয়ের একজন ভক্ত। ওনার কষ্টকর জীবন এবং অগ্রগতিতে আমি মুগ্ধ। গভর্নর হওয়ার আগ পর্যন্ত ওনার গবেষণা প্রতিষ্ঠানের প্রায় প্রতিটি অনুষ্ঠানে থেকে আমি নিউজ কভার করার চেষ্ঠা করেছি। সেই সুবাদে বেশ ভালো সম্পর্কও ছিলো। কিন্তু গভর্নর হওয়ার পরে ইআরএফের (অর্থনৈতিক রিপোর্টারদের সংগঠন) অনুষ্ঠান ছাড়া দেখা-সাক্ষাত এবং কথাবার্তা নেই। তারপরও শেয়ার বাজারকে যে দৃষ্টিতে তিনি মূল্যায়ন করেন শুধু আমি নই এই বাজারের লাখ লাখ মানুষ তার বিরোধী। বছর কয়েক আগে কোনো এক মুদ্রানীতি ঘোষণাকালে আমার উপস্থিতিতেই তিনি বলেছিলেন, শেয়ার বাজারের বিনিয়োগকারীদের চেয়ে ব্যাংকের আমানতকারীদের স্বার্থ দেখা আমার কাছে বেশি গুরুত্বপূর্ণ। তখন এ নিয়ে তাকে আমি প্রশ্নও করেছিলাম। (শেয়ারবাজার সংশ্লিষ্ট একটি দৈনিক পত্রিকায় আমার লেখা এ সংক্রান্ত রিপোর্ট প্রকাশিত আছে) ওনার এই বক্তব্যের পরপরই বাংলাদেশের ইতিহাসে ব্যাংক খাতের বড় বড় কেলেঙ্কারীর ঘটনাগুলো ফাঁস হয়েছে। সে কারণে তখন অনেকেই প্রশ্ন করেছেন, পুঁজিবাজারের বিনিয়োগকারীদের সুনামিতে ডুবিয়ে উনি ব্যাংক খাতকে কোথায় নিয়ে গেছেন। কেউ কেউতো বলেই ফেলেছেন হলমার্ক, বিসমিল্লাহ, বেসিক ব্যাংকসহ ওনার আমলে যত কেলেঙ্কারী হয়েছে ব্যাংকগুলোর অভিভাবক হিসাবে কোনোটির দায় থেকেই তিনি মুক্ত নন। কিন্তু আমাদের প্রশ্ন সেটি নয়। আমাদের জানতে ইচ্ছা করে শেয়ার বাজারের ব্যাপারে ওনার ব্যক্তি বিরোধিতার বিষয়টি লাখ লাখ বিনিয়োগকারীর ওপর চাপিয়ে দিচ্ছেন কেনো? এ প্রশ্নটি একারনেই এসেছে যে, কয়েকদিন আগে বাংলাদেশ ব্যাংকের সম্মেলন কক্ষে বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশন (বিএসইসি), বীমা উন্নয়ন ও নিয়ন্ত্রণ কর্তৃপক্ষ (আইডিআরএ), রেজিস্টার অব জয়েন্ট স্টক কোম্পানিজ অ্যান্ড ফার্মস (আরজেসি) এবং মাইক্রোক্রেডিট রেগুলেটরি অথরিটির (এমআরএ) প্রতিনিধিদের নিয়ে আয়োজিত এক অনুষ্ঠানে ডেপুটি গভর্নর এস কে সুর চৌধুরী এক্সপোজার লিমিটের সময়সীমা নিয়ে বলেছেন, সরকার যদি মনে করে তবে আইন সংশোধন করে এর মেয়াদ ২০২৪ সাল পর্যন্তও করতে পারে। সরকার আইন পাশ করলে বাংলাদেশ ব্যাংক তা পালন করতে বাধ্য। শুধু এস কে সুর চৌধুরীই নন বাংলাদেশের সব বড় বড় অর্থনীতিবিদগন সম্প্রতি অনুষ্ঠিত এক আলোচনায় এক বাক্যে শেয়ার বাজারকে রক্ষায় এবং বিনিয়োগকারীদের ক্ষতি আর না বাড়াতে এক্সপোজার লিমিট নিয়ে সৃষ্ট যাবতীয় সঙ্কটের আশু সুরাহা কামনা করেছেন।

এ বিষয়ে প্রধানমন্ত্রীর অর্থনৈতিক উপদেষ্টা ড. মসিউর রহমান বলেন, ‘সাবসিডিয়ারি কোম্পানিতে ব্যাংকগুলোর বিনিয়োগকে এক্সপোজার লিমিটের অন্তর্ভুক্ত করা ইল্লিগ্যাল। সাবসিডিয়ারি কোম্পানি একটি স্বতন্ত্র বা আলাদা সত্তা ও আলাদা ব্যবসা। তাই সাবসিডিয়ারিতে বিনিয়োগকে এক্সপোজারে অন্তর্ভুক্ত করা ঠিক না।’

অর্থনীতিবিদ ড. এবি মির্জ্জা আজিজুল ইসলাম বলেন, ‘পুঁজিবাজারের স্বার্থে ব্যাংকগুলোর এক্সপোজার লিমিটের সময় বাড়ানো দরকার। এ ছাড়া এক্সপোজার লিমিটে অ-তালিকাভুক্ত কোম্পানিকে অন্তর্ভুক্ত করা বোধগম্য না।’

বিএসইসির সাবেক চেয়ারম্যান ফারুক আহমেদ সিদ্দিকী বলেন, ‘বাংলাদেশ ব্যাংকের এক্সপোজার লিমিটের নির্দেশনা যাই থাকুক না কেনো বর্তমানে ব্যাংকগুলোর এক্সপোজার লিমিট খুব বেশি হলে সময়সীমা বাড়ানো যেতে পারে। ’

ইনভেস্টমেন্ট করপোরেশন অব বাংলাদেশের (আইসিবি) এমডি মো. ফায়েকুজ্জামান বলেন, ‘ব্যাংকগুলোর এক্সপোজার লিমিটের সময়সীমা বাড়ানো দরকার। ’

আমরা উল্লেখিত অর্থনীতিবিদদের মধ্যে কে বড় কিংবা কে বড় নয় এ বিতর্কে যাব না। আমরা অনুরোধ জানাবো নি:স্ব হয়ে যাওয়া বিনিয়োগকারীদের বাঁচাতে সমন্বিত একটি উদ্যোগ নেয়ার জন্য। উদ্যোগটি এক্সপোজার লিমিটের আওতা এবং পরিপালনের দিনক্ষণ। আমরা মনে করি এই বিষয়টির ওপর শেয়ার বাজারের অনেককিছু নির্ভর করে। আমার অভিজ্ঞতা বলছে, এমন একটি ঘোষণা যদি আসে, সরকার আইন সংশোধন করে এক্সপোজার লিমিটের সীমার মেয়াদ ২০২৪ সাল পর্যন্ত না হোক অন্তত ২০২০ পর্যন্ত বাড়িয়েছে। সঙ্গে সঙ্গে বাজারের চিত্র পাল্টে যাবে। আর এটা যদি হয় লাখ লাখ বিনিয়োগকারী উপকৃত হবে ক্ষতিতো কারোরই হবেনা। বিষয়টি আমরা যেমন করে বুঝেছি বিএসইসি, ডিএসই, সিএসইও ঠিক তেমনিই বুঝেছে বলেই আমাদের ধারনা এবং আমরা এটাও বিশ্বাস করি যে এই প্রতিষ্ঠান তিনটির নেতৃবৃন্দ একত্র হয়ে যদি অর্থমন্ত্রীর কাছে যান তাহলে ঠিকই এক্সপোজার সংকটের সমাধান করে আসতে পারবেন। সেই বিশ্বাস রেখেই বিনিয়োগকারীদের পক্ষ থেকে তাদের প্রতি অনুরোধ, দয়াকরে একটি বারের জন্য অর্থমন্ত্রীর কাছে যান। তিনি রাজনৈতিক ব্যক্তিত,¡ আপনাদেরকে তিনি ফেলে দেবেননা। সমাধান যেহেতু তার হাতে তাই সব বাদ দিয়ে তার কাছে যাওয়াই সকল যুক্তির উর্ধে।

 

শেয়ারবাজারনিউজ/ও.র/তু

আপনার মন্তব্য

*

*

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.

Top