নিয়ন্ত্রণে ব্যস্ত আইডিআরএ: লোকসান গুণছে বিনিয়োগকারীরা

IDRA___শেয়ারবাজার রিপোর্ট : বাংলাদেশে বীমা ব্যবসার ইতিহাস পুরাতন হলেও এ খাতে এখনো যথাযথ উন্নয়ন ও প্রসার হয়নি। আর উন্নয়ন ও নিয়ন্ত্রণহীন বীমা ব্যবসার নিয়ন্ত্রণের লক্ষ্যে নিয়ন্ত্রক সংস্থা আইডিআরএ’র গঠন। কিন্তু সংস্থাটি বীমা ব্যবসার উন্নয়নে মনোযোগী না হয়ে নিয়ন্ত্রণের দিকে জোর দিচ্ছে বেশি। আর নিয়ন্ত্রণ করতে গিয়ে সংস্থাটি সংশ্লিষ্টদের সাথে আলোচনা ছাড়াই কোম্পানিগুলোর স্বাভাবিক কার্যক্রমে অযাচিত হস্তক্ষেপের পাশাপাশি সামান্য অনিয়মের কারণে সর্বোচ্চ জরিমানা; ব্যবসা স্থগিত এমন কি লাইসেন্স বাতিলের মতো বড় ধরনের শাস্তির ঘোষণা দিচ্ছে, যা বীমা ব্যবসার উপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে।

এর জের ধরে, সর্বশেষ ২০১৪ অর্থবছরে অধিকাংশ বীমা কোম্পানির প্রিমিয়াম আয় কমেছে। পরিণতিতে কোম্পানিগুলো গ্রাহক ও শেয়ারহোল্ডারদের দেয়া ডিভিডেন্ড এর পরিমাণ আগের বছরের তুলনায় কমেছে। তাছাড়া দেশের সকল সম্পদের বীমা নিশ্চিতকরণের জন্য প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ গ্রহণ করতে পারেনি নিয়ন্ত্রণকারী এ সংস্থাটি। আর এতে বিনিয়োগকারী ও পলিসিহোল্ডারদেরকেই লোকসান গুনতে হচ্ছে।

সংশ্লিষ্টরা বলছেন, আইডিআরএ গঠনের পর থেকে নানাবিধ সমস্যায় ধুকছে। এখন পর্যন্ত সংস্থাটির কোন অর্গানোগ্রাম নেই। পরিণতিতে নিয়ন্ত্রণকারী সংস্থার কার্যক্রম পরিচালনা করার মতো যোগ্য লোকবল নিয়োগ করা সম্ভব হয়নি। বর্তমানে মাত্র অর্ধশত লোকবল নিয়ে সংস্থাটি ৭৮টি বীমা কোম্পানির নিয়ন্ত্রণ করছে। এছাড়া সংস্থাটিতে কর্মরত উর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে বিভিন্ন অনিয়ম দুর্নীতির অভিযোগ রয়েছে। এছাড়া বীমা খাতের উন্নয়নে এখনো কোন কার্যক্রম গ্রহণ করতে পারেনি সংস্থাটি। বিশেষ করে বীমার উন্নয়নে সহায়ক প্রবিধান যেমন শরীয়াহ ভিত্তিক বীমা ব্যবসা ও ইসলামি বীমার বিনিয়োগ, লাইফ ফান্ডের যুগপোযুগী বিনিয়োগ নীতিমালা, এজেন্ট লাইসেন্সে স্বচ্ছতা নিশ্চিত, বীমা সার্ভেয়ার আচরণবিধি, বাস্তবতার স্বাপেক্ষে মূখ্য নির্বাহী কর্মকর্তা বিধিমালা, জীবন বীমায় প্রিমিয়ামের হার যুগপোযুগীকরণ ইত্যাদি গুরুত্বপূর্ণ প্রবিধান প্রণোয়ন করতে পারেনি। এছাড়া গ্রাহক ভোগান্তির নিরসনে এখনো বিরোধ নিস্পত্তি কমিটি এবং আইডিআরএ’র কার্যক্রমে স্বচ্ছতা আনয়নে উপদেষ্টা কমিটি গঠন করতে পারেনি সংস্থাটি। উপরন্তু সংস্থাটি বীমা ব্যবসার বাস্তব চিত্র যাচাই না করেই শুধুমাত্র রাজনৈতিক বিবেচনায় একের পর এক বীমা কোম্পানিকে লাইসেন্স দিয়ে গেছে। এতে বীমা ব্যবসায় বিশৃঙ্খল ও অসম প্রতিযোগীতার সৃষ্টি হয়েছে।

এ বিষয়ে বীমা কোম্পানিগুলোর পক্ষ থেকে বলা হচ্ছে, বীমা ব্যবসার যথাযথ উন্নয়ন, প্রসার যথাযথ সচেতনতা তৈরি না হওয়ায় কোম্পানিগুলোকে টিকে থাকার স্বার্থে বাধ্য হয়েই অনিয়ম ও দুর্নীতিতে জড়িয়ে পড়তে হচ্ছে।

জানা যায়, শুরু থেকেই সংস্থাটি দেশের বীমা খাতের বিভিন্ন অনিয়ম ও অব্যবস্থাপনা দূর করতে জোরালো ভূমিকা পালন করে আসছে। ফলে পুরোপুরি না হলেও দেশের বীমা খাতটি কিছুটা সচ্ছতার মধ্যে ফিরে আসতে শুরু করেছিল।

কিন্তু বীমা ব্যবসায়িরা মনে করছেন, এখাতের সকল অব্যবস্থাপনা দূর করতে নিয়ন্ত্রক সংস্থা আইডিআরএ গৃহিত বিভিন্ন পদক্ষেপের কারণে হুমকীর মুখে পড়ছে ব্যবসা-বানিজ্য।

তাদের মতে, প্রচলিত বীমা আইনটি বীমা খাতের প্রসারে সহায়ক নয়। আইনের দোহাই দিয়ে সময়ে অসময়ে ছোট খাটো অনিয়মের অভিযোগে এ খাতের কোম্পানিগুলোকে জরিমানার টাকা গুনতে হচ্ছে। এমনকি বীমা কোম্পানিগুলোর লাইসেন্স বাতিল করার মতো বৃহৎ সিদ্ধান্তও নিচ্ছে এ সংস্থা। আর এ সকল শাস্তির কথা ফলাওভাবে গণমাধ্যমে প্রচারের কারণে কোম্পানিগুলোকে পড়তে হচ্ছে মারাত্মক বেকায়দায়। দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকা তাদের অগণিত গ্রাহকের মাঝে এ নিয়ে নেতিবাচক ধারণার সৃষ্টি হচ্ছে। পরিণতিতে এক বিরাট ইমেজ সংকটের মধ্যে পড়ছে বীমা কোম্পানিগুলো।

অনুসন্ধানে জানা যায়, বাকিতে ব্যবসার অভিযোগে আইডিআরএ ২০১২ ও ২০১৩ পাঁচটি বীমা কোম্পানির শাখা বন্ধ করে দিয়েছে। একই সময়ে লাইসেন্স বাতিল করা হয় ৩টি কোম্পানির। সংস্থাটি একই সময়ে ২২টি কোম্পানির এমডি ও শাখা ব্যবস্থাপকদের কাছ থেকে অর্ধকোটি টাকা জরিমানা আদায় করেছে। এছাড়া বর্তমানে তুচ্ছ ঘটনাকে কেন্দ্র করে বেশ কিছু কোম্পানিকে সর্বোচ্চ জরিমানা করে। অতিরিক্ত ব্যবস্থাপনা ব্যয়ের জন্যও বেশকিছু লাইফ বীমা কোম্পানির অ্যাকচ্যুয়ারিয়াল ব্যসিস অনুমোদন স্থগিত করে। অথচ এসব সঙ্কটের সুষ্ঠু সমাধানের কোন উদ্যোগ নেওয়া হয়নি আইডিআরএ’র পক্ষ থেকে। পরিণতিতে এসব কোম্পানির গ্রাহক এবং বিনিয়োগকারীরা বঞ্চিত হচ্ছে ডিভিডেন্ড থেকে। অপরদিকে পুঁজিবাজারে তালিকাভুক্ত হতে না পারার কারণে ১১টি কোম্পানি বছরের পর বছর ধরে প্রতিদিন পাঁচ হাজার টাকা করে জরিমানা দিচ্ছে। এসব বিষয়ের সমাধানে আইডিআরএ’র পক্ষ থেকে যথাযথ উদ্যোগ না থাকায় বীমা খাতে বিশৃঙ্খলা ক্রমেই বাড়ছে। এতে কোম্পানিগুলো ক্ষুব্ধ প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত করে। তারা বলছে, আমাদের যথাযথ কারণ দর্শানোর সুযোগ এবং আলোচনা না করেই এসব জরিমানা দেওয়া হচ্ছে এবং তা গণমাধ্যমগুলোতে ছড়িয়ে দেওয়া হচ্ছে। যা মোটেই স্বাভাবিক কর্ম নয়। এমনিতে বাংলাদেশে অনেক প্রতিকুলতার মধ্যে বীমা ব্যবসা করতে হচ্ছে। এখন এ ধরণের কার্যকলাপ বাড়লে অচিরেই বীমা ব্যবসায় চরম স্থবীরতা বিরাজ করবে।

এদিকে নতুন অনুমোদন পাওয়া কোম্পানিগুলোর মধ্যে অধিকাংশই ব্যবসা শুরু করতে গিয়ে ক্রমাগত হোচট খাচ্ছে। শুরু করতে না করতেই অনেকের ব্যবসা বন্ধ হওয়ার উপক্রম হয়েছে। অথচ আইনে এসব কোম্পানিতে পর্যবেক্ষক নিয়োগের সুযোগ থাকা সত্ত্বেও আইডিআরএ কোন উদ্যোগ গ্রহণ করছে না। যা বীমা ব্যবসাকে আরো সঙ্কুচিত করে তুলছে।

বাংলাদেশ ইন্স্যুরেন্স অ্যাসোসিয়েশন (বিআইএ) মনে করে, ‘বীমা উন্নয়ন ও নিয়ন্ত্রণ কর্তৃপক্ষের (আইডিআরএ) সাম্প্রতিক কিছু নির্দেশনা এ খাতের ব্যবসা-বাণিজ্য ক্ষতিগ্রস্ত করছে। আইডিআরএ’র এসব নির্দেশনা ও কিছু অতি উৎসাহী কার্যক্রম দেশের বীমা খাতের ব্যবস্থাপনায় সৃষ্টি করছে বিশৃঙ্খলা। এর ফলে আমদানি-রপ্তানিসহ অন্যান্য ব্যবসা-বাণিজ্যে নেতিবাচক প্রভাব পড়ছে। এ জন্য এসব নির্দেশনা স্থগিত করে বীমা ব্যবসায়ীদের সঙ্গে আলোচনার মাধ্যমে সিদ্ধান্ত নেওয়া জরুরি বলে মনে করছে বিআইএ।

একাধিক কোম্পানির ব্যবস্থাপনা পরিচালক এর মতে, বাংলাদেশে প্রয়োজনের তুলনায় বীমা কোম্পানির সংখ্যা অনেক বেশি। তাই বীমা কোম্পানিগুলোর ব্যবসায়িক স্বার্থে টিকে থাকতে বাধ্য হয়েই অনৈতিক প্রতিযোগিতায় নামতে হচ্ছে। বীমার উন্নয়নে সহায়ক বিধি-প্রবিধি না থাকায় এ সঙ্কটের সৃষ্টি হয়েছে। স্বচ্ছতার সাথে যারা ব্যবসা করছেন তারা অসুস্থ প্রতিযোগিতায় টিকতে পারছে না। ফলে বাধ্য হয়ে নীতিবহির্ভূত পথে হাঁটছে অধিকাংশ কোম্পানি। নিজের কোম্পানিরও অতিরিক্ত কমিশন ও বাকি ব্যবসা এবং অতিরিক্ত ব্যবস্থাপনা ব্যয়ের কথা স্বীকার করেছেন এসব কর্মকর্তারা। তবে তারা এ খাতকে স্বচ্ছতায় আনার জন্য সবার প্রথম বীমার প্রসারের লক্ষ্যে জনসচেতনতা বাড়ানোর পাশাপাশি প্রয়োজনীয় বিধি-বিধান প্রণয়নের জন্য আইডিআরএ’র যথাযথ পদক্ষেপ দাবি করেন। একই সাথে বীমা খাতের শৃঙ্খলা ধরে রাখার জন্য নিয়ন্ত্রক সংস্থার পক্ষ থেকে সময়ের সঙ্গে সঙ্গতিপূর্ণ মনিটরিং ব্যবস্থা চালু করার পক্ষে মত দিচ্ছেন তারা।

আইডিআরএ’র সদস্য মো: কুদ্দুস খান এ বিষয়ে শেয়ারবাজারনিউজ ডটকমকে বলেন, ‘অনিয়ম দুর্নীতি বন্ধে আইন অনুযায়ী আইডিআরএ তার দায়িত্ব পালন করছে। এতে সাময়িকভাবে কেউ ক্ষতিগ্রস্ত হলেও দীর্ঘ মেয়াদে এর সুফল পাওয়া যাবে। আর বীমার উন্নয়ন ও প্রসারের জন্য আমরা কাজ করছি। কিন্তু লোকবল সঙ্কটের কারণে কাজে আশানুরুপ গতি আসছে না’।

 

শেয়ারবাজারনিউজ/তু/এম/সা

আপনার মন্তব্য

Top