মূল্য সংবেদনশীল তথ্য নিয়ে সোনাগাঁওয়ের মিথ্যাচার

170আমিরুল ইসলাম অপু: পুঁজিবাজারে তালিকাভূক্ত বস্ত্রখাতের কোম্পানি সোনারগাঁও টেক্সটাইলের উৎপাদন বন্ধ হয়ে গেলেও সাধারন বিনিয়োগকারীদের জানানোর প্রয়োজন বোধ করেনি কোম্পানি । উল্টো নিয়ন্ত্রক সংস্থার ওপর দোষ চাপিয়ে পার পেতে চাচ্ছে কর্তৃপক্ষ। কমিশনকে মৌখিকভাবে জানানো হয়েছে এমন দাবি করলেও কমিশন বলছে এভাবে জানানোর কোনো নিয়ম ও আইন নেই।

এদিকে নয় দিন থেকে উৎপাদন বন্ধ থাকলেও এখন পর্যন্ত কমিশন, স্টক এক্সচেঞ্জ কেউই এ খবর নিয়মানুযায়ী পায়নি বলে জানা যায়। উৎপাদন সংক্রান্ত যে কোনো তথ্য মূল্য সংবেদনশীল তথ্য হিসেবে বিনিয়োগকারীদের জানানোর আইনি বাধ্য-বাধকতা থাকলেও কোম্পানি কর্তৃপক্ষ কমিশন বা স্টক এক্সচেঞ্জ কাউকেই এ তথ্য না জানিয়ে বিনিয়োগকারীদের সাথে প্রতারণার পাশাপাশি কমিশনকে নিয়েও মিথ্যাচার করছে বলে অভিযোগ উঠেছে।  উৎপাদন বন্ধের ব্যাপারে কোম্পানি সচিব আলাউদ্দিন এর সাথে যোগাযোগ করা হলে, উৎপাদন বন্ধের ব্যাপারে কমিশনকে জানানো হয়েছে বলে দাবি করেন। কমিশনের কার সাথে কথা হয়েছে এ প্রশ্নের জবাব না দিয়েই তিনি যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন করে দেন। আর কোন আইনের অধীনে ফ্যাক্টরি বন্ধের তথ্য মূল্য সংবেদনশীল তথ্য হিসেবে দেখানো হচ্ছে না সে ব্যাপারেও কোনো গ্রহনযোগ্য ব্যাখ্যা দিতে পারেনি।

অন্যদিকে, বিএসইসির মুখপাত্র ও নির্বাহী পরিচালক সাইফুর রহমানকে এ ব্যাপারে প্রশ্ন করা হলে তিনি বলেন, ‘কোনো লিস্টেড কোম্পানির উৎপাদন বন্ধ হলে তা মূল্য সংবেদনশীল তথ্য হিসেবে কমিশন, স্টক এক্সচেঞ্জ এবং সাধারন বিনিয়োগকারীকে জানাতে হবে।’ কমিশনকে মৌখিকভাবে জানিয়ে পার পাওয়ার কোনো নিয়ম আছে কি না এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, ‘এভাবে জানানোর কোনো নিয়ম নেই। কিছু কোম্পানির মধ্যে কমিশনের ওপর দোষ চাপিয়ে পার পেয়ে যাওয়ার প্রবনতা এখনও রয়ে গেছে। এমন কোনো ঘটনার দায়িত্ব কমিশন নেবে না।’ এর বিপরীতে আইনি ব্যাবস্থা নেয়া হবে কি না এ প্রসঙ্গে তিনি জানান, ‘ যে কোনো ধরনরে আইন ভঙ্গের ব্যাপারে আইনি ব্যবস্থা নেয়ার ব্যাপারে কমিশন তৎপর আছে। কেউ এমন করে থাকলে ইতিমধ্যে আইন লঙ্ঘন করে ফেলেছে। এ ব্যপারে যাচাই-বাছাই করে কমিশন আইনি ব্যবস্থা নেবে।’

খানসন্স গ্রুপের সোনারগাঁও টেক্সটাইল গত বছর থেকেই লোকসানে রয়েছে। এ বছরও কোম্পানিটি তৃতীয় প্রান্তিক শেষে প্রায় ১ কোটি ৬৬ লাখ টাকা লোকসান করেছে এবং শেয়ার প্রতি লোকসানের পরিমান দাঁড়িয়েছে ০.৬৩ টাকা।

উৎপাদন বন্ধ থাকা প্রসঙ্গে কোম্পানি সচিবের সাথে যোগাযোগ করা হলে তিনি বলেন, ‘অবরোধের কারনে কাঁচামাল আনা বন্ধ হয়ে যাওয়ায় উৎপাদন সাময়িকভাবে বন্ধ ঘোষণা করা হয়েছে।’ কিন্তু এ ব্যাপারে বিএসইসিকে কেন জানানো হয়নি এ প্রশ্ন করলে তিনি জানান, ‘এ ব্যাপারে কমিশনের সাথে কথা হয়েছে।’ আইনানুযায়ী মূল্য সংবেদনশীল তথ্য হিসেবে তা কেন দেয়া হয়নি জানতে চাওয়া হলে তিনি নিজের মতো করে আইনের ব্যাখ্যা দিয়ে বলেন, ‘যেহেতু কোম্পানির উৎপাদন বন্ধের এ ঘোষনা সাময়িক তাই তা বিনিয়োগকারীদের জানানো হয়নি।’ অবরোধের কারনেই কাঁচামাল পরিবহন বন্ধ থাকায় উৎপাদন বন্ধ রয়েছে বলে জানান তিনি।

পুঁজিবাজারে ১৯৯৫ সালে তালিকাভূক্ত হওয়া এ কোম্পানিটি সর্বশেষ অর্থবছরে সাধারন বিনিয়োগকারীদের কোনো ধরনের ডিভিডেন্ড না দেয়ায় বর্তমানে ‘জেড’ ক্যাটাগরিতে রয়েছে। কোনো পূর্বঘোষণা ছাড়া হঠাৎ করেই ১০ জানুয়ারি ভোর ছয়টায় কোম্পানির সকল বিভাগের কার্যক্রম বন্ধ ঘোষণা করা হয়। কোম্পানির কার্যক্রম আবার কবে চালু হবে তাও জানানো হয়নি।

বরিশালের সোনারগাঁও টেক্সটাইল মিল কর্তৃপক্ষ ও প্রকল্প পরিচালক স্বাক্ষরিত নোটিশ সূত্রে জানা গেছে, চলমান অবরোধরে কারণে গত সপ্তাহ থেকে কাঁচামাল সরবরাহ বন্ধ রয়েছে। প্রতি সপ্তাহে এ মিলে দেশের বিভিন্ন স্থান থেকে ট্রাকে করে কাঁচামাল (তুলা) আনা হয়। তবে গত কয়েক দিন অব্যাহত অবরোধের কারণে ট্রাক আসতে না পারায় কাঁচামাল সরবরাহ সম্ভব হয় নি বলে নোটিশে উল্লখে করা হয়। তাই বিষয়টি শ্রমিকদের বুঝিয়ে সাময়িক ভাবে মিল বন্ধ ঘোষণা করা হয়েছে। তারপরও শ্রমিকদের মধ্যে শঙ্কা রয়েছে। তবে বন্ধ থাকা অবস্থাতে বাংলাদশে শ্রম আইন ২০০৬ এর ১৬(১) ধারা অনুযায়ী শ্রমকিদের ক্ষতি পূরণ দেওয়া হবে বলে জানিয়েছে মিল কর্তৃপক্ষ।

একসময় এ মিলে গড়ে প্রতিদিন ১০ থেকে ১৫ হাজার পাউন্ড সুতা উৎপাদন হতো। কিন্তু নানান কারণে গত বছর থেকেই উৎপাদন কমে আসছে এ মিলসের।  বিদ্যুৎ বিল ২ কোটি টাকা পরিশোধ করতে না পারায় দুই মাস ধরে বিদ্যুৎ সংযোগ বিচ্ছিন্ন রয়েছে মিলটির। এ কারণে গত দুই মাস থেকে মিলসের ৩ নং ইউনিট বন্ধ ঘোষণা করা হয়। চালু ছিলো শুধূ ১ ও ২ নং ইউনিট। ১৯৯৫ সালে পুঁজিবাজারে তালিকাভূক্ত কোম্পানিটি ২০১১ সালে ১ টি শেয়ারের বিপরীতে ১ টি করে রাইট শেয়ার ইস্যু করে। এ রাইট ইস্যু নিয়েও রয়েছে বিতর্ক। রাইট ইস্যু করার দুই বছর আগেও কোম্পানিটি লোকসানে ছিলো। এর পরও রাইট ইস্যু করার অনুমতি কেন দেয়া হয় তা নিয়ে পরিষ্কার হয়নি সাধারন বিনিয়োগকারীদের কাছে। এর মধ্যেই আবার ডিসেম্বর মাসে কোনো ধরনের অপ্রকাশিত মূল্য সংবেদনশীল তথ্য না থাকলেও শেয়ারের দর বাড়ে। এ ব্যাপারে ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জ কর্তৃপক্ষ কারন জানতে চাইলে, কোনো তথ্য নেই বলে জানায় কোম্পানি কর্তৃপক্ষ।

মাত্র ২৬ কোটি ৫০ লাখ টাকা অনুমোদিত মূলধনের কোম্পানিটির বর্তমান বাজার মূল্য মাত্র ২৯ কোটি ৩৭ লাখ টাকা এবং রিজার্ভে আছে ৫৭ কোটি ২৫ লাখ টাকা।

শেয়ারবাজার/ও

আপনার মন্তব্য

Top