আজ: বুধবার, ২০ অক্টোবর ২০২১ইং, ৪ঠা কার্তিক, ১৪২৮ বঙ্গাব্দ, ১২ই রবিউল আউয়াল, ১৪৪৩ হিজরি

সর্বশেষ আপডেট:

০৩ জুলাই ২০২১, শনিবার |



kidarkar

স্ট্যাবিলাইজেশন ফান্ড: শেয়ার কেনাবেচায় যেভাবে ব্যবহ্নত হবে এই অর্থ

শেয়ারবাজার ডেস্ক: পুঁজিবাজারে তালিকাভুক্ত বিভিন্ন কোম্পানি ও মিউচুয়্যাল ফান্ডের বিতরণ না হওয়া ডিভিডেন্ড ২০ হাজার কোটি টাকারও বেশি অর্থে গঠন করা হচ্ছে ‘ক্যাপিটাল মার্কেট স্ট্যাবিলাইজেশন ফান্ড’। ফান্ডটির অর্থ কীভাবে ব্যবহার করা হবে বা কোথায় বিনিয়োগ করা হবে, সেটি ২৭ জুন, ২০২১ তারিখে জারি হওয়া প্রজ্ঞাপনে সুনির্দিষ্ট করে দেওয়া হয়েছে।

তহবিলের উৎস:
এই তহবিলে তিন বছর ধরে অদাবিকৃত ডিভিডেন্ড আর আইপিও আবেদনের অফেরত টাকা যুক্ত হবে।

তহবিলের আকার:
এই তহবিল কত টাকার হবে, সেটি এখনও চূড়ান্ত হয়নি। তবে তহবিলের আকার কয়েক হাজার কোটি টাকার বেশি, সেটি নিশ্চিত। অবণ্টিত ডিভিডেন্ড যতো, তহবিলের আকার ততো।

টাকার অঙ্কে ডিএসইতে তালিকাভুক্ত কোম্পানিগুলোর অবণ্টিত বোনাস ডিভিডেন্ডের পরিমাণ ১১ হাজার কোটি টাকা ও ক্যাশ ডিভিডেন্ডের পরিমাণ ৬৩৪ কোটি টাকা। সিএসইতে তালিকাভুক্ত কোম্পানিগুলোর মধ্যে অবণ্টিত বোনাস ডিভিডেন্ডের পরিমাণ ৮ হাজার ৮৮১ কোটি টাকা এবং ক্যাশ ডিভিডেন্ডের পরিমাণ ৩২১ কোটি টাকা। সব মিলিয়ে ক কমবেশি ২০ হাজার ৮৩৬ কোটি টাকা।

তালিকাভুক্ত কোম্পানিগুলোর মধ্যে সবচেয়ে বেশি ৮ হাজার ৮০৯ কোটি ৪৫ লাখ টাকার অদাবিকৃত ডিভিডেন্ড রয়েছে তামাক খাতের বহুজাতিক কোম্পানি ব্রিটিশ আমেরিকান টোব্যাকো বাংলাদেশ কোম্পানি লিমিটেড-বিএটিবিসিতে। শুধু এই কোম্পানিতেই ৮ হাজার ৪০৩ কোটি টাকা বোনাস ডিভিডেন্ড এবং ৬ কোটি ৪৫ লাখ টাকা ক্যাশ ডিভিডেন্ড অবণ্টিত রয়েছে।

উপরোক্ত হিসাব ২০২০ সালের ডিসেম্বর পর্যন্ত। ২০২০ সালের পর ৩ বছর অবণ্টিত থাকলেই তা তহহিলে যোগ হবে। ফলে তহবিলের আকার ক্রমেই বড় হতে থাকবে।

বিনিয়োগের সুনির্দিষ্ট দিকসমূহ:
১) এই তহবিলের ৯০ শতাংশই সরাসরি পুঁজিবাজারে ব্যবহার করা হবে।
ক) তহবিলের ৪০ শতাংশ টাকা বিনিয়োগ করা হবে পুঁজিবাজারে তালিকাভুক্ত শেয়ারে।
খ) তহবিলের ৫০ শতাংশ অর্থে বিনিয়োগকারীদের মার্জিন ঋণ বাবদ ব্যবহার করা হবে।

২) বাকি ১০ শতাংশ পুঁজিবাজারের বাইরেও বিনিয়োগ করা যাবে।
ক) ১০ শতাংশ অর্থ অতালিকাভুক্ত কোম্পানি বা সরকারি সিকিউরিটিজ, স্থায়ী আমানত ও বেমেয়াদী মিউচ্যুয়াল ফান্ডে বিনিয়োগ করা যাবে।

৩) কোথাও বিনিয়োগ করে লোকসান হলে সমপরিমাণ অর্থ অন্য বিনিয়োগের মুনাফা থেকে সঞ্চিতি হিসেবে সংরক্ষণ করতে হবে।

তহবিলের কার্যক্রমের তারিখ:
কবে থেকে তহবিলের কাজ শুরু হবে- এমন প্রশ্নের উত্তরে পুঁজিবাজার নিয়ন্ত্রক সংস্থা বিএসইসির মুখপাত্র রেজাউল করিম বলেন, ‘যেহেতু প্রজ্ঞাপন হয়ে গেছে, ধরে নিন শুরু হয়ে গেছে।’

তহবিল ব্যবস্থাপক:
এই তহবিলের ব্যবস্থাপনায় থাকবে রাষ্ট্রীয় বিনিয়োগ সংস্থা ইনভেস্টমেন্ট করপোরেশন অব বাংলাদেশ বা আইসিবি।

তহবিলের শিরোনাম:
পুঁজিবাজার স্থিতিশীলতা ফান্ড নামে একটি ব্যাংক হিসাব খোলা হবে। একই নামে থাকবে একটি বিও হিসাব।

তহবিলের ব্যাংক হিসাব:
তহবিলের জন্য একটি ব্যাংক হিসাব থাকবে। ইতিমধ্যে একটি ব্যাংক হিসাব খোলা হয়েছে এবং সেখানে কিছু অর্থ জমা পড়েছে বলে জানিয়েছে বিএসইসি।

তহবিলের ধারণা:
তহবিলের ধারণা নেয়া হয়েছে বিভিন্ন দেশ যেমন, ভারতে অবণ্টিত ও দাবিহীন ডিভিডেন্ড সাত বছর পর্যন্ত সাসপেন্ডেড থাকতে পারে। এরপর সেটা চলে যায় বিনিয়োগকারী সুরক্ষা তহবিলে। কিন্তু বাংলাদেশের ওই ধরনের কোনো তহবিল বা নীতিমালা এতদিন ছিল না।

বিশেষজ্ঞদের মত:
পুঁজিবাজার বিশ্লেষক অধ্যাপক আবু আহমেদ এ বিষয়ে বলেন, ‘এই ফান্ডের ওপর পুঁজিবাজারে পুরোপুরি স্থিতিশীলতা হবে বা এই ফান্ডের মাধ্যমে পুঁজিবাজার আবার ঘুরে দাঁড়াবে, এটা বলা ঠিক হবে না। তবে এর মাধ্যম পুঁজিবাজারে তারল্য সমস্যা কিছুটা কাটবে।’

মার্জিন ঋণের সুদহার কত:
বিএসইসি মার্জিন ঋণের সর্বোচ্চ সুদহার ১২ শতাংশ নির্দিষ্ট করে দিয়ে আরও একটি শর্ত দিয়েছে যে, কস্ট অব ফান্ডের চেয়ে ঋণের সুদহার ৩ শতাংশ বেশি হতে পারবে না। দুইবার পিছিয়ে এই সুদহার কার্যকর আগামী জানুয়ারি থেকে করেছে বিএসইসি।

এই তহবিলের মার্জিন ঋণের সুদহার কতো হবে, সেটি অবশ্য প্রজ্ঞাপনে বলা নেই। তবে এর কস্ট অব ফান্ড প্রায় শূন্য থাকায় সুদহারও কম হওয়া উচিত বলে মনে করেন পুঁজিবাজার বিশ্লেষক ও ব্র্যাক ইপিএল ইনভেস্টমেন্ট লিমিটেডের সাবেক প্রধান গবেষণা কমর্কতা দেবব্রত কুমার সরকার। তিনি বলেন, ‘এই ফান্ড ব্যবহার করা হলেও কিন্ত দাবিদারদের টাকা পরিশোধ করতে হবে। ফলে খালি চোখে কস্ট অব ফান্ড দেখা না গেলেও কিছুটা তো ম্যাইনটেন্যান্স কস্ট থাকবে। তাই একেবারে ফ্রিও বলা যাবে না।’ তিনি মনে করেন, বিএসইসি যে মার্জিন ঋণের সর্বোচ্চ সুদহার ১২ বেঁধে দিয়েছে, সেটি নিশ্চিত করতে এই তহবিলকে ব্যবহার করা যায়। তিনি বলেন, ‘এখান থেকে কম সুদে ঋণ নিয়ে বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান তারা ১২ শতাংশের শর্ত বাস্তবায়ন করতে পারবে। এতে এই ফান্ডের বিনিয়োগের ঝুঁকিও কমবে। এখান থেকে তারা নিশ্চিত আয় পাবে।’

অধ্যাপক আবু আহমেদ বলেন, ‘যেহেতু এটি একটি ফান্ড, তাই কিছু হলেও সুদ থাকবে, এটাই স্বাভাবিক। তবে সুদের বাজারের সঙ্গে প্রতিযোগিতা করে এই ফান্ডের সুদ হার নমনীয় রাখা উচিত।

বিনিয়োগের সিদ্ধান্ত কারা নেবে?
প্রজ্ঞাপন অনুযায়ী তহবিল পরিচালনার জন্য ১১ সদস্যের একটি বোর্ড থাকবে। তহবিল ব্যবস্থাপনার সুবিধার্থে এই বোর্ড একাধিক কমিটি তৈরি করবে যেমন: পরিচালন ব্যবস্থাপনা কমিটি, নিরীক্ষা ও হিসাব ব্যবস্থাপনা কমিটি এবং ঝুঁকি ব্যবস্থাপনা কমিটি।

তাছাড়া, প্রয়োজন বোধ করলে আরও সাব কমিটি তৈরি করতে পারবে বোর্ড। তহবিল পরিচালন ব্যবস্থাপনা কমিটিই শেয়ার কেনাবেচা, বিনিয়োগ, পুঁজিবাজারকে সাপোর্ট দিতে ঋণ বা অন্য যেকোনো কাজ করবে।

তহবিল পরিচালনা বোর্ড:
প্রজ্ঞাপন অনুযায়ী তহবিল পরিচালনা করবে ১১ সদস্যের একটি বোর্ড। এই বোর্ডের চেয়ারম্যান ও তিন জন সদস্যকে নিয়োগ দেবে বিএসইসি। একজন সদস্য হবেন একজন চার্টার্ড অ্যাকাউন্টেন্ট, যাকে মনোনয়ন দেবে কমিশন।

একজন করে সদস্য মনোনয়ন দেবে ঢাকা ও চট্টগ্রাম স্টক এক্সচেঞ্জ কর্তৃপক্ষ। একজন সদস্য মনোনয়ন দেবে সেন্ট্রাল ডিপোজিটরি বাংলাদেশ লিমিটেড বা সিডিবিএল, একজন মনোনয়ন দেবে সেন্ট্রাল কাউন্টারপার্টি বাংলাদেশ লিমিটেড বা সিসিবিএল, একজন সদস্য মনোনয়ন দেবে বাংলাদেশ অ্যাসোসিয়েশন অব পাবলিকলি লিস্টেড কোম্পানি বিএপিএলসি।

তহবিলের চিফ অফ অপারেশন বা সিইও হবেন একজন সাবেক সরকারি কর্মকর্তা। এই সদস্যের সবার পুঁজিবাজার, হিসাববিজ্ঞান, ফিনান্স ও অর্থনীতির বিভিন্ন খাতে ১০ বছরের অভিজ্ঞতা থাকতে হবে। আর অন্তত ৫ বছর অবশ্যই পুঁজিবাজার নিয়ে কাজ করতে হবে। এই সদস্যদের কারও পুঁজিবাজারে তালিকাভুক্ত কোম্পানির শীর্ষ পদে পূর্ব ইতিহাস থাকা চলবে না।

একজন সদস্য তিন বছরের জন্য দায়িত্ব পাবেন। তবে মেয়াদ বাড়ানো যাবে। নিয়মিত চেয়ারম্যানের অনুপস্থিতিতে বোর্ড সদস্যরা একজনকে চেয়ারম্যান মনোনয়ন দেবেন। একটি অর্থবছরে তারা কমপক্ষে ছয়টি বৈঠক করবেন। তহবিলের জন্য সম্মিলিতভাবে জবাবহিদি করতে হবে বোর্ডকে। আর তারা বিএসইসির কাছেও দায়বদ্ধ থাকবে।

বোর্ড কবে গঠন করা হবে, জানতে চাইলে আইসিবির মুখপাত্র বিভাস সাহা বলেন, ‘গেজেট প্রকাশ করা হয়েছে। এখন সে অনুযায়ী পরিচালনা বোর্ড গঠন করা হবে। বিএসইসি, আইসিবি, ডিএসই, সিএসইসহ সংশ্লিষ্টদের নিয়ে সভা করে বোর্ড গঠন করা হবে।’

অবণ্টিত ডিভিডেন্ড কেউ দাবি করলে?
প্রজ্ঞাপনে বলা হয়েছে, কোনো শেয়ারধারী বা তার উত্তরাধিকার ক্যাশ বা বোনাস ডিভিডেন্ড অথবা রাইট শেয়ার দাবি করলে তাকে ১৫ দিনের মধ্যে শেয়ার বা টাকা পরিশোধ করতে হবে।

বিএসইসি মুখপাত্র রেজাউল করিম বিষয়টিতে বলেন, ‘এজন্য দাবিদারের নামে আলাদা একটি বিও হিসাবে যাচাই বাছাই শেষে দাবিকৃত ডিভিডেন্ড প্রদান করা হবে। এতে জটিলতার কিছু নেই।’

যেভাবে এলো তহবিলের ভাবনা:
যেসব ব্যাংক হিসাব নিয়মিত লেনদেন না করা বা দীর্ঘদিন বিদেশে অবস্থানের কারণে বা মৃত্যু বা অন্য কোনো কারণে বন্ধ বা অকার্যকর হয়ে যায়, সেসব ব্যাংক হিসাবে ক্যাশ ডিভিডেন্ড জমা হয় না।

অন্যদিকে, উপরোক্ত কারণে বিও হিসাব নবায়ন না করলে স্টক ডিভিডেন্ড জমা না হয়ে তা কোম্পানির কাছে ফেরত চলে যায়। কোম্পানি এগুলো সাসপেন্ডেড হিসাবে জমা দেখিয়ে আর্থিক বিবরণী তৈরি করে।

চলতি বছরের শুরুর দিকে ২১ হাজার কোটি টাকার মতো অবণ্টিত ডিভিডেন্ড অব্যবহৃত অবস্থায় পড়ে থাকার খবর আসে। তখন এই অর্থ ব্যবহার করে কীভাবে পুঁজিবাজারকে উন্নত করা যায়, তা নিয়ে চিন্তাভাবনা শুরু হয়।

বিএসইসির ‘ক্যাপিটাল মার্কেট স্ট্যাবিলাইজেশন ফান্ড’ খসড়া নীতিমালার ওপর মতামতের জন্য উন্মুক্ত করে গত ৮ মার্চ। এরপর সংশ্লিষ্ট ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠান নীতিমালার ওপর মতামত প্রদান করে।

খসড়া নীতিমালার ওপর বিএসইসিতে লিখিত প্রস্তাব পাঠায় তালিকাভুক্ত কোম্পানির সমিতি বাংলাদেশ অ্যাসোসিয়েশন অব পাবলিকলি লিস্টেট কোম্পানি-বিএপিএলসি। তাদের বেশ কিছু আপত্তি বিবেচনায় নেয়া হয়।

ফেব্রুয়ারি থেকে মে ২০২১ পর্যন্ত স্টেকহোল্ডারদের মধ্যে নানা আলোচনার পর অবশেষে ২৭ জুন ২০২১ প্রজ্ঞাপন জারির মধ্য দিয়ে এই তহবিল গঠন নিশ্চিত হয়।

৪ উত্তর “স্ট্যাবিলাইজেশন ফান্ড: শেয়ার কেনাবেচায় যেভাবে ব্যবহ্নত হবে এই অর্থ”

আপনার মতামত দিন

Your email address will not be published.

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.