শেয়ারবাজার ঠিকভাবে চলছে না, ব্যাংকের কাছে বীমা জিম্মি: নুরুল হক

ইন্স্যুরেন্স সেক্টরে এবিএম নুরুল হক একজন প্রথিতযশা ব্যক্তিত্ব। দীর্ঘ কর্মজীবনে তিনি ইন্স্যুরেন্সের উন্নয়নে অনেক দায়িত্ব পালন করেছেন। তৃণমূল থেকে কাজ শুরু করে আজ জীবনের প্রান্তবেলায় এসে একজন সফল বীমাবিদ হিসাবে সুখ্যাতি অর্জন করেছেন। আমাদের দেশে হাতেগোনা যে কয়েকজন অভিজ্ঞ বীমাবিদ এখনো তাদের কর্মচাঞ্চল্য দিয়ে গোটা বীমা পেশাকে উজ্জীবিত করে চলেছেন এবিএম নূরুল হক তাদের মধ্যে অন্যতম। তরুণ প্রজন্মকে ইন্স্যুরেন্সের প্রতি আকৃষ্ট করতে ইতিমধ্যে তিনি বেশ কিছু বইও লিখেছেন। বর্তমানে তিনি মেঘনা ইন্স্যুরেন্স কোম্পানিতে উপদেষ্টা হিসেবে কর্মরত রয়েছেন। সম্প্রতি পেশাগত ও ব্যাক্তিগত বিভিন্ন বিষয় নিয়ে শেয়ারবাজারনিউজ ডট কমের স্টাফ রিপোর্টার আহসান হাবীবের সাথে তার খোলামেলা আলাপ হয়। সেখানে তিনি তার জীবনের একান্ত বিষয়গুলোসহ বীমা পেশার অনিয়ম এবং পুঁজিবাজারের অতীত বর্তমান ও ভবিষ্যত নিয়ে আলোচনা করেন। শেয়ারবাজার ডট কমের পাঠকদের জন্য সাক্ষাতকারটির মূল বিষয়বস্তু প্রকাশ করা হলো।

বীমা ব্যবসায় কিভাবে এবং কেন এসেছেন?

১৯৬৩ সালে আমি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে এম. এ পাশ করি। এরপরে কিছুদিন শিক্ষকতা করি ক্যান্টনমেন্ট বোর্ড স্কুলে। তারপর একদিন পত্রিকায় তৎকালীন পাকিস্তানের সবচেয়ে বড় ইন্স্যুরেন্স কোম্পানি ইস্টার্ন ফেডারেল ইউনিয়ন ইন্স্যুরেন্সে কোম্পানির একটি নিয়োগ বিজ্ঞপ্তি দেখি। সে অনুযায়ী কোম্পানিটির মহা-ব্যবস্থাপক খোদা বক্সের সাথে দেখা করি। সেসময় খোদা বক্স সাহেব একজন বীমাবিদ হিসেবে সুপ্রসিদ্ধ ছিলেন। তাঁর সাথে অফিসে দেখা করার পর তিনি আমাকে পছন্দ করলেন এবং পরদিন রোববার সকালে তাঁর বাসায় আমাকে যেতে বললেন। তখন রোববার সরকারি ছুটি ছিল। তাঁর বাসায় যথাসময়ে যাওয়ার পর তিনি স্বস্নেহে আমার সাথে কথা বললেন। তিনি বললেন তোমাকে আমি ব্যাংকেও চাকরি দিতে পারি। আবার ইন্স্যুরেন্সেও চাকরি দিতে পারি। তুমি কোনটা করবে? আমি বললাম আপনি যেহেতু ইন্স্যুরেন্সে রয়েছেন, তাই আমিও ইন্স্যুরেন্সে চাকরি করবো অর্থাৎ আপনার সঙ্গে থাকবো। তিনি সেইদিনই আমাকে তার কোম্পানিতে স্পেশাল রিপ্রেসেন্টেটিভ হিসেবে নিয়োগপত্র দেন। এখানে কিছুদিন কাজ করার পর আমি সিএসএস পরীক্ষা দিতে চেয়েছিলাম তখন তিনি আমাকে ইন্স্যুরেন্সেই থেকে যেতে বললেন। তার কথামতো ইন্স্যুরেন্সেই থেকে গেলাম। এরপর খোদা বক্স সাহেব কোন কারণে চাকরি ছেড়ে দিয়ে নিজে ফেডারেল লাইফ অ্যান্ড জেনারেল নামের একটি কোম্পানি গঠন করেন। তিনি না থাকায় আমিও ইস্টার্ন ফেডারেল ইন্স্যুরেন্সের চাকরি ছেড়ে দিয়ে তার সাথে দেখা করি। এরপর ১৯৬৯ সালে তিনি তার কোম্পানির সেক্রেটারি হিসেবে আমাকে নিয়োগ দেন। তখন আমার বেতন ধরা হয়েছিল এক হাজার টাকা, যা তখনকার দিনে অনেক বড় ব্যাপার। আসলে খোদা বক্সের মাধ্যমেই আমার ইন্স্যুরেন্সের যাত্রা শুরু এবং তার কাছ থেকেই ইন্স্যুরেন্সের অনেক কিছু শিখেছি।

তখন বীমা বিষয়ে পড়াশোনা করার মতো পরিবেশ ছিল কি?

তখন বীমা বিষয়ে লেখাপড়া করার জন্য ভাল সুযোগ ছিল না। কারণ এদেশে বীমা ছিল সম্পূর্ণ অপরিচিত। শহরকেন্দ্রিক গুটিকয়েক মানুষ বীমা বিষয়ে জানতো। তবে আমার পড়াশোনার প্রতি খুব ঝোঁক ছিল। তাই আমি ব্যক্তিগতভাবে বিভিন্ন জায়গায় খোঁজ নিয়ে দেখলাম বিহারী একজন ভদ্রলোক ইন্স্যুরেন্সের ওপর এসিআইআই করছে। তিনি মোহাম্মদপুর থাকতেন। তার কাছ থেকে ইন্স্যুরেন্সের বইপত্র ধার করে এনে পড়াশোনা করেছি।

প্রথমদিকে ইন্স্যুরেন্সে কাজ করতে গিয়ে কী ধরনের প্রতিবন্ধকতার মুখে পড়েছিলেন?

আমি প্রথমদিকে জীবন বীমায় কাজ করেছি। তখন জীবন বীমার প্রতি মানুষের অনীহা ছিল। এছাড়া ইন্স্যুরেন্স সম্পর্কে মানুষের জানাশোনাও অনেক কম ছিল। কিন্তু তখন মানুষের মধ্যে ইন্স্যুরেন্স সম্পর্কে সচেতনতা এবং এর প্রয়োজনীয়তার উপলব্ধি গড়ে উঠছিল। যদিও এ সচেতনতা যতোটা হওয়া উচিত ততোটা ছিল না। মানুষজন সহজে ইন্স্যুরেন্স করতো না। কারণ মানুষজনের মধ্যে ইন্স্যুরেন্স সম্পর্কে আস্থার অভাব ছিল। তাছাড়া ধর্মীয় বাধাও ছিল। কারণ আমাদের দেশ একটি মুসলিম দেশ এবং মুসলিম ধর্মানুসারীদের অনেকেই বলতেন ইন্স্যুরেন্স হারাম। তবে মানুষের মধ্যে ইন্স্যুরেন্সের গ্রহণযোগ্যতা বাড়ছিল।

কর্মজীবনের শুরুতে ইন্স্যুরেন্স পেশায় এসেছেন। সুতরাং সে সময় ইন্স্যুরেন্সের প্রতি আপনার পরিবারের মনোভাব কেমন ছিল?

যেহেতু তখনকার সময়ে ইন্স্যুরেন্স পেশা ততোটা আকর্ষণীয় ছিল না পাশাপাশি অন্য অনেক আকর্ষণীয় পেশায় যাওয়ার সুযোগ ছিল, তাই পরিবারের অনেকেই আমার মতের সাথে দ্বিমত পোষণ করেছিল। তারপরও তারা আমার সিদ্ধান্তের প্রতি আস্থা রেখেছিলেন। যেহেতু আমি পরিবারের বড়ো ছেলে ছিলাম। বিশেষ করে আমার বাবাও খুব শিক্ষিত ছিলেন। তিনি আমার সিদ্ধান্তের প্রতি আস্থা রেখেছিলেন। তাছাড়া ছোট বেলা থেকে আমার মধ্যে একটি অভ্যাস গড়ে উঠেছিল, যেটা হচ্ছে কোন বিষয়ে একবার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়ে গেলে সেটা থেকে আর বিচ্যুত হতাম না। এ অভ্যাসটির কারণে পরবর্তীতে অনেক ক্ষেত্রে আমার লাভও হয়েছে আবার লোকসানেও পড়েছি। তবে ইন্স্যুরেন্সে বর্তমানে আমি যে অবস্থায় আছি অর্থাৎ এখনো আমি কাজ করছি অথচ আমার সাথের অনেকেই এখন অবসরে চলে গিয়েছেন। সব মিলিয়ে এ বয়সে এসে আমি এবং আমার পরিবারের সবাইকে নিয়ে সুখে আছি।

বর্তমান সময়ে বীমা ব্যবসার অগ্রগতি কিভাবে মূল্যায়ন করছেন?

বীমা ব্যবসার উন্নয়ন যেভাবে হওয়া উচিত সেখান থেকে এখনো আমরা পিছিয়ে আছি। একটা দেশের অর্থনীতিতে দুটি সেক্টরের অংশগ্রহণ সবচেয়ে বেশি প্রয়োজন। একটি হচ্ছে ব্যাংক অপরটি ইন্স্যুরেন্স। অর্থনীতিতে ব্যাংক পুঁজি সরবরাহ করে। অপরদিকে ইন্স্যুরেন্স পুঁজি তৈরি করে। ইন্স্যুরেন্স কোম্পানিগুলো দেশের জনগণের কাছ থেকে পলিসির মাধ্যমে প্রিমিয়াম বাবদ অর্থ সংগ্রহ করে। সে অর্থ ব্যাংকের কাছে আমানত হিসেবে রাখা হয় এবং ব্যাংক এ আমানত বিনিয়োগ করে। আবার ইন্স্যুরেন্স কোম্পানিগুলোও সরাসরি দেশীয় উন্নয়নমূলক ব্যবসায় বা বিভিন্ন খাতে বিনিয়োগ করে। কিন্তু পুঁজি তৈরির ক্ষেত্রে ইন্স্যুরেন্স কোম্পানিগুলোতে যেভাবে বিনিয়োগ করা প্রয়োজন সেটা এখনও পর্যন্ত হয়নি। যেমন জীবন বীমায় এক হাজার মানুষের মধ্যে সর্বোচ্চ চারজন বীমা করছে। আর সাধারণ বীমা ক্ষেত্রে ব্যাংক থেকে ঋণ নিয়ে ব্যবসা করতে হলে অর্থাৎ ইন্ডাস্ট্রি গড়তে হলে ইন্স্যুরেন্স বাধ্যতামূলক করতে হয় আবার আমদানি রপ্তানি করতে হলেও ইন্স্যুরেন্স করতে হয়। কিন্তু প্রাইভেট সেক্টরে অর্থাৎ মানুষের নিজস্ব সম্পত্তি যেমন বাড়ি ঘরসহ অন্য মূল্যবান সম্পত্তির কিংবা প্রতিষ্ঠানের  ইন্স্যুরেন্স করার কোন আইনগত ব্যবস্থা আমাদের দেশে নেই। এমনকি এসবের ইন্স্যুরেন্স করার বিষয়ে কেউ চিন্তাও করে না। কিন্তু বিদেশে ব্যাপারটি ভিন্ন। তারা জীবন এবং ব্যক্তিগত মূল্যবান সকল সম্পদের বীমা নিজে সচেতন হয়ে করছে। অথচ বাংলাদেশে ইন্স্যুরেন্স সেক্টরের উন্নয়নের যথেষ্ট সুযোগ আছে কিন্তু সুযোগটার মূল্যায়ন হচ্ছে না। এর পেছনে সবচেয়ে বড়ো কারণ হচ্ছে মানুষের মধ্যে ইন্স্যুরেন্স বিষয়ে সচেতনতা গড়ে উঠছে না। এর জন্য সরকারের ভূমিকা রাখা উচিত। ইন্স্যুরেন্সের দিকে সরকারের মনোযোগ দেওয়া উচিত, প্রচার প্রচারণা চালানো উচিত যাতে জনগণের মধ্যে ইন্স্যুরেন্সের উপকারিতা বিষয়ে স্বচ্ছ ধারণা তৈরি হয়। কিন্তু সেগুলো আমাদের এখানে হয় না। এছাড়া ইন্স্যুরেন্স কোম্পানিগুলোরও এ বিষয়ে দায়িত্ব রয়েছে। যেমন পলিসি গ্রাহকের ক্লেইম যথাসময়ে মিটিয়ে দেয়া, প্রিমিয়াম আনা নেয়ার ক্ষেত্রে সাধারণ মানুষকে সহায়তা করা, ছোটখাটো ত্রুটিতে গ্রাহককে হয়রানি না করা প্রভৃতি বিষয়ে সতর্ক থাকা উচিত। কোম্পানিগুলোর প্রয়োজন মানুষকে স্বচ্ছতার সঙ্গে ইন্স্যুরেন্সের উপযোগিতা বুঝানো। তবে ক্লেইম বা বীমা দাবী পরিশোধের ক্ষেত্রে কোম্পানিগুলোকে গ্রাহকদের আস্থা ধরে রাখতে আরো স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা বজায় রাখা জরুরী। অপরদিকে ইন্স্যুরেন্সে দক্ষ জনবল তৈরির কাজটিকেও এগিয়ে নেয়া প্রয়োজন। দেশ স্বাধীন হওয়ার পর এই ৪০ বছরেও সত্যিকার অর্থে এখনো ইন্স্যুরেন্স সেক্টরে দক্ষ জনবল তৈরি হয়নি। কারণ আমরাই ইন্স্যুরেন্স বিষয়ে নতুনদের দক্ষ করে গড়ে তোলার জন্য পরিবেশ তৈরি করতে পারিনি। তাদেরকে ভালভাবে ট্রেইন-আপ করাতে পারিনি। কারণ ১৯৭২ থেকে ১৯৮৪ পর্যন্ত রাষ্ট্রায়ত্ব দুই বীমা কর্পোরেশনে ভাল লোকবল নিয়োগ হয়নি। তাহলে এ সেক্টরে উন্নয়ন এবং ভাল লোক আসবে কী করে? অথচ পার্শ্ববর্তী দেশ ভারতেও অনেক হাই-প্রোফাইল লোক কাজ করে। আমাদের ইন্স্যুরেন্স পেশায় টেকনিকালি প্রফেশনাল, ডাইনামিক প্রফেশনাল লোকের অভাব রয়েছে। আর যোগ্য ব্যক্তি যারা রয়েছে তারা এ পেশায় আসছে না কিংবা আমরা তাদের নিচ্ছি না।

সরকারিভাবে বীমার উন্নয়ন হযনি কিন্তু বেসরকারি খাতেও কি বীমার উন্নতি হয়েছে?

আমার একটি ধারণা ছিল সরকারিভাবে কোন উদ্যোগ না থাকায় বীমার উন্নযন হচ্ছে না। কিন্তু এ পর্যায়ে এসে আমার ধারণা কিছুটা বদলেছে। কারণ এখন অনেক বেসমরকারি বীমা কোম্পানি রয়েছে। আর প্রায দুই যুগ ধরে তারা বীমা ব্যবসা করছে। কিন্তু বেসরকারিভাবেও বীমার তেমন উন্নয়ন ঘটেনি। কারণ কোম্পানিগুলোও তাদের কর্মকর্তা এবং এজেন্টদের দক্ষতা বাড়ানোর জন্য যথাযথ প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করছে না।

পুঁজিবাজার সম্পর্কে আপনার মূল্যায়ন কী ? শেয়ার বাজারে বীমার বর্তমান অংশগ্রহণ কতোটা নিরাপদ?

বর্তমান পুঁজিবাজার পর্যবেক্ষণ করে আমার মনে হয় পুঁজিবাজার ঠিক নিয়মতান্ত্রিকভাবে চলছে না। যার কারণে বাজারে প্রতিনিয়ত অস্থিরতা ছড়াচ্ছে। অপরদিকে প্রত্যেক বীমা কোম্পানিকে আইপিও’র মাধ্যমে পুঁজিবাজারে বাধ্যতামূলক আসতে হবে। অবশ্য অধিকাংশ বীমা কোম্পানি পুঁজিবাজারে তালিকাভুক্ত হয়েছে। বাকিগুলো পাইপলাইনে রয়েছে। আর যেহেতু বীমা কোম্পানি পুঁজি সংগ্রহ করে সুতরাং পুঁজিবাজারে পুঁজি সরবরাহের ক্ষেত্রে বীমা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করতে পারে। কিন্তু এখানে একটা বিষয় দেখতে হবে বাংলাদেশের পুঁজিবাজার এখনো স্থিতিশীল পর্যায়ে আসেনি। এখানে অবাধে বিনিয়োগ করা খুবই ঝুঁকিপূর্ণ। আর বীমা কোম্পানির ফান্ড সম্পূর্ণ গ্রাহকের টাকা। তাই পুঁজিবাজারে বীমার অবাধ অংশগ্রহণের অবস্থা এখনো তৈরি হয়নি।

এখন আপনারা বীমার ফান্ড কোথায় বিনিয়োগ করছেন?

যেখানে বিনিয়োগ করা হলে অধিক মুনাফা পাওযা যাবে এবং বিনিয়োগটা উন্নয়ন ও উৎপাদনমুখী কাজে লাগবে সেখানেই তো ফান্ডের বিনিয়োগ করা উচিত। কিন্তু এখানে আইনেরও কিছু বাধ্যবাধকতা রয়েছে। বীমা কোম্পানিগুলো চাইলেও যত্রতত্র ফান্ড বিনিয়োগ করতে পারবে না। তাকে আইনের মধ্য দিয়ে বিনিয়োগ করতে হবে। বর্তমানে আমরা ফান্ডের অধিকাংশ অর্থই ব্যাংকে আমানত হিসেবে বিনিয়োগ করছি। এতে আমাদের রিস্ক একেবারেই নেই। আর আমানত হিসেবে প্রতিবছর কর বাদ দিয়ে ৮-১০ শতাংশ ইন্টারেস্ট পাচ্ছি। কিন্তু ব্যাংকে এভাবে আমানত হিসেবে বিনিযোগ করে রাখা অর্থনীতির জন্য ভাল না। কারণ ব্যাংকে যদি এভাবে হাজার কোটি টাকা অলস পড়ে থাকে তাহলে অর্থনীতিতে স্থবিরতা নেমে আসবে। কারণ ব্যাংকের কাজ হচ্ছে বিনিয়োগ সচল রেখে ব্যবসা ও উৎপাদনের ধারা চালু রাখা।

ব্যাংকের মাধ্যমেই জেনারেল ইন্স্যুরেন্সের সবচেয়ে বেশি ব্যবসা আসে। আর এ সুযোগে ব্যাংকগুলো বীমা কোম্পানিকে এফডিআর করে অর্থ রাখতে বাধ্য করছে। তা না হলে ব্যাংক তাকে ব্যবসা দিচ্ছে না। বিষয়টি আপনি কিভাবে দেখছেন?

জেনারেল ইন্স্যুরেন্সে একটা সিস্টেম আছে যে, আমরা যখন পাকিস্তান আমলে ইন্স্যুরেন্সে কাজ করতাম তখন ব্যবসাটা ক্লায়েন্ট বেজ ছিল অর্থাৎ ব্যবসাটা ক্লায়েন্টের মাধ্যমে আসতো। এখানে ব্যাংকের কোন অংশগ্রহণ ছিল না। কিন্তু এখন সিস্টেমটা উল্টো হয়ে গেছে। এখন ইন্স্যুরেন্সের ৮০-৯০ শতাংশ ব্যবসা ব্যাংকের মাধ্যমে আসে। আর ব্যাংক থেকে ইন্স্যুরেন্স ক্লায়েন্ট পেতে হলে ব্যাংকের সাথে ইন্স্যুরেন্স কোম্পানির নাম নিবন্ধন করতে হবে। আর নিবন্ধন করার শর্ত হচ্ছে সংশ্লিষ্ট ব্যাংকে কোম্পানির ফান্ডের টাকা এফডিআর করে রাখতে হবে। তা না হলে ব্যাংক ব্যবসা দিবে না। অর্থাৎ বর্তমান জেনারেল ইন্স্যুরেন্স ব্যাংকের কাছে জিম্মি হয়ে আছে। আর এ সিস্টেমটাও ঠিক না। আর এর কোন আইনি ভিত্তিও নেই।

বীমার উন্নয়নে সরকারের পক্ষ থেকে কী রকম পদক্ষেপ নেওয়া উচিত বলে আপনি মনে করেন?

সরকার একটি বীমা নীতি তৈরি করেছে। কিন্তু বীমার উন্নতির ক্ষেত্রে এ নীতি যথেষ্ট নয়। কারণ নীতিটি অনেক বড় ও জটিল। আমাদের সবার প্রথম বীমায় দক্ষ জনবল গড়ে তুলতে হবে। এর জন্য প্রয়োজন বিশ্বমানের একটি বীমা শিক্ষা প্রতিষ্ঠান। যদিও বাংলাদেশে একটি সরকারি বীমা একাডেমি রয়েছে। কিন্তু একে আধুনিকায়নের জন্য ঢেলে সাজাতে হবে। আর ইন্স্যুরেন্সের উন্নয়নের জন্য কার্যকর ও নির্দিষ্ট লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা উচিত। এদিকে সরকারের পক্ষ বীমা ব্যবসা নিয়ন্ত্রণ ও উন্নয়নের জন্য বীমা উন্নয়ন ও নিয়ন্ত্রণ কর্তৃপক্ষ (আইডিআরএ) গঠন করা হয়েছে। বীমা ব্যবসা নিয়ন্ত্রণ এবং গ্রাহক আস্থা ফেরাতে অবশ্যই একটি নিয়ন্ত্রক সংস্থা থাকতে হবে। কিন্তু এর সাথে তাদেরকে উন্নয়নের দায়িত্বও দেওয়া হয়েছে। সুতরাং নিয়ন্ত্রণের পাশাপাশি ইন্স্যুরেন্সের উন্নয়নেও সমান গুরুত্ব দেওয়া প্রয়োজন।

আপনার জীবনের সবচেয়ে স্মরণীয় ঘটনা কী? যা মনে পড়লে আজও আপনার মধ্যে শিহরণ জাগে?

ফেডারেল লাইফ অ্যান্ড জেনারেল ইন্স্যুরেন্সে কাজ করার সময় আমি এবং আমার এক বন্ধু মিলে ঠিক করেছিলাম, বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের সাথে দেখা করবো। তাই রাতের বেলা আমরা তাঁর ধানমণ্ডির ৩২ নম্বরের বাসায় গিয়ে উপস্থিত হই। সেখানে গিয়ে জানতে পারলাম তিনি আজ সারাদিন অনেক ব্যস্ত সময় কাটিয়ে ক্লান্ত হয়ে মাত্র বাসায় এসেছেন। আমরা কী করবো বুঝতে পারছিলাম না, তখন আমাদের বাসার ভেতরে যাওয়ার জন্য বলা হলো। বাসার ভেতরে গিয়ে দেখি বঙ্গবন্ধু আমাদের সাথে দেখা করার জন্য শত ক্লান্তি নিয়েও নিচে নেমে এসেছেন। আমাদের দেখে বললেন, ‘আপনারা এসেছেন দেখে খুব খুশি হয়েছি। সামনে আমাদের কঠিন সময় আসছে সুতরাং আপনাদের কঠিন সময়ের মুখোমুখি হওয়ার জন্য প্রস্তুত থাকতে হবে।’ তখনই বুঝেছি তাঁকে কেন জনগণের নেতা বলা হয়।

 

শেয়ারবাজার রিপোর্ট

আপনার মন্তব্য

*

*

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.

Top