অস্তিত্ব হারাচ্ছে বায়োনিক সী ফুড: যত ভোগান্তি বিনিয়োগকারীদের!

শেয়ারবাজার রিপোর্ট: উৎপাদন বন্ধ,ব্যাংক ঋণ,মামলা সংক্রান্ত জটিলতা,দীর্ঘ লোকসানের ঘানি ইত্যাদি কারণে অস্তিত্ব হারাতে বসেছে ওভার দ্য কাউন্টার (ওটিসি) মার্কেটের খাদ্য ও আনুষঙ্গিক খাতের কোম্পানি বায়োনিক সী ফুড। অন্যদিকে এ কোম্পানিতে বিনিয়োগ করে তীব্র ভোগান্তির মধ্যে রয়েছেন বিনিয়োগকারীরা।
তথ্যানুসন্ধানে জানা যায়, দীর্ঘদিন ধরে এ কোম্পানির উৎপাদন বন্ধ রয়েছে। যার ফলে বিগত ১১ বছর ধরে কোম্পানিটি লোকসানে রয়েছে। অন্যদিকে ব্যাংক ঋণ এ কোম্পানিকে আরো আষ্টে পিষ্টে বেঁধে ফেলেছে। রাষ্ট্রয়াত্ত প্রতিষ্ঠান রূপালী ব্যাংক,শামস বিল্ডিং ব্রাঞ্চ,খুলনা থেকে এ কোম্পানি ২০ কোটি ৪ লাখ ১৪ হাজার ৯৮০ টাকা ঋণ নিয়েছে। যা এখনো পরিশোধ করা হয়নি। ঋণের সঙ্গে চক্রবৃদ্ধিহারে সুদ বেড়ে বর্তমান দায়ের পরিমাণ কোম্পানির পরিশোধিত মূলধনের ৩ গুন। এ কোম্পানির পরিশোধিত মূলধন ১০ কোটি টাকা। যাবতীয় স্থাবর – অস্থাবর সম্পত্তি রূপালী ব্যাংকের নিকট দায়বদ্ধ। যেকোন সময় ব্যাংক কোম্পানিকে বিক্রি করে তাদের পাওনা বুঝে নিতে পারে। কোম্পানি কর্তৃপক্ষের মতে, তাদের উৎপাদিত যেসব ভোগ্যপণ্য ছিল তা এখন ব্যবহার উপযোগী নয়। এগুলো মেয়াদ ইতিমধ্যে শেষ হয়ে গেছে। তারা বাংলাদেশ অ্যাকাউন্টিং স্ট্যান্ডার্ড (ব্যাস) এর নিয়ম কানুন মেনে ব্যবসায় পরিচালনা করেনি বলে জানায় কর্তৃপক্ষ। এদিকে কোম্পানির সম্পদ পুনর্মূল্যায়নের পর তাদের যাবতীয় সম্পত্তির দর বর্তমানে ২০ লাখ ৪ লাখ ১৪ হাজার ৯৮০ টাকা। যা রূপালী ব্যাংকের হস্তক্ষেপে রয়েছে। এদিকে ২০০২ সালে বায়োনিক সী ফুড ফেডারেল ইন্স্যুরেন্সের সঙ্গে ২৪ কোটি ৭ লাখ ৭০ হাজার টাকার ক্লেইম ইন্স্যুরেন্স করে। এ সংক্রান্ত বিষয় নিয়ে আদালতে মামলা চলছে। কোম্পানি কর্তৃপক্ষ বলছে, যদি আদালত কোম্পানির বিপক্ষে যায় তাহলে বিপুল পরিমাণ লোকসানে পড়বে বায়োনিক। এ বিষয়টি নিয়ে খুবই দুশ্চিন্তার মধ্যে রয়েছে খোদ কোম্পানি কর্তৃপক্ষ। এদিকে ২০০৩ সালে বিনিয়োগকারীদের জন্য ৬ শতাংশ ক্যাশ ডিভিডেন্ড ঘোষণা করলেও তা সময়মতো প্রদান করেনি কোম্পানি। ১৯৮৭ সালে সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশন আইনে ঘোষিত ডিভিডেন্ড ৬০ দিনের মধ্যে প্রদান করার নিয়ম থাকলেও তা পালন করেনি কোম্পানি। টাকার অংকে ডিভিডেন্ডের পরিমাণ ৫ লাখ ৭৯ হাজার ৪০০ টাকা। কোম্পানির অনাদায়ী পাওনার পরিমাণ ৪ কোটি ৪২ লাখ ৬৪ হাজার ১০৫.২০ টাকা। কোম্পানির যেসব উৎপাদিত পণ্য নষ্ট হয়ে গেছে তার পরিমাণ ৮ কোটি ৩৬ লাখ ৮০ হাজার ১৫৫ টাকা।
এদিকে ভুয়া টেলিফোন নাম্বার দিয়ে বিনিয়োগকারীসহ সংশ্লিষ্টদের ভোগান্তি করে চলেছে খাদ্য ও আনুষঙ্গিক খাতের বায়োনিক সী ফুড। এছাড়া ফেসভ্যালুর ৮০ শতাংশ কমে বর্তমান বাজার দর, দীর্ঘদিন উৎপাদন ও লেনদেন বন্ধ থাকায় চিন্তিত হয়ে পড়েছে সাধারণ বিনিয়োগকারীরা। এদিকে এ কোম্পানিতে বিনিয়োগকারীদের ৩৬ লাখ ৭৪ হাজার শেয়ার আটকে রয়েছে। যার দর কয়েক কোটি টাকা। তবে এতসব অভিযোগের তীর খোদ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ (এসইসি) কমিশনের ঘাড়ে ফেলছেন বাজার সংশ্লিষ্টরা। তারা বলছেন, পুঁজিবাজারে তালিকাভুক্ত বেশকিছু কোম্পানি রয়েছে যেগুলোর অস্তিত্ব বিলীন হতে চলেছে। অথচ নির্বিকার ভূমিকা পালন করছে এসইসি। তারা আরো বলেন, এসইসি মাঝে মধ্যে কিছু কোম্পানিকে শোকজ, জরিমানা করে। কিন্তু এতে সাধারণ বিনিয়োগকারীদের কোনো লাভ হয় কি ? তাদের আটকে থাকা কোটি কোটি টাকা উত্তোরণের কোনো ব্যবস্থা নেয়া হচ্ছে। অনেক কোম্পানির পরিচালকরা বিনিয়োগকারীদের টাকা আত্মসাৎ করে পালিয়েছেন। তাদের ধরার কোনো ব্যবস্থা নেয়া হচ্ছে না। বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশনের (বিএসইসি) নজরদারির অভাবে কোম্পানিগুলো বিনিয়োগকারীদের কাছ থেকে টাকা নিয়ে এখন লাপাত্তা। তবে এ সমস্যা দ্রুত সমাধান করা জরুরি বলে মনে করছেন বাজার সংশ্লিষ্টসহ বিনিয়োগকারীরা। জানা গেছে, বায়োনিক সী ফুডের যোগাযোগের জন্য টেলিফোন নাম্বার দেয়া হয়েছে ৭২১০৪৫ ও ৭২৫৭৫২। মান্ধাতা আমলের সেই নাম্বারে শতবার যোগাযোগ করা হলে শুধু বন্ধই পাওয়া গেছে। এদিকে ১০ টাকা ফেসভ্যালুর এ শেয়ারের বর্তমান দর ২ টাকা। এ কোম্পানির মোট ১ কোটি শেয়ার রয়েছে। যার মধ্যে সাধারণ বিনিয়োগকারীদের রয়েছে ৩৬.৭৪ শতাংশ বা ৩৬ লাখ ৭৪ হাজার। তথ্যানুসন্ধানে জানা যায়, বিগত ৮ বছর ধরে কোম্পানিটি প্রতিবছর লোকসান গুনছে। কোম্পানিটি সর্বশেষ ২০১২ সালের তৃতীয় প্রান্তিক আর্থিক প্রতিবেদন জমা দিয়েছে। তারপর থেকে এখন পর্যন্ত কোম্পানিটি কোনো আর্থিক প্রতিবেদন প্রকাশ করেনি। সর্বশেষ প্রকাশিত সেপ্টেম্বর ২০১২ সালের তৃতীয় প্রান্তিক আর্থিক প্রতিবেদন অনুযায়ী, এ কোম্পানির নিট লোকসান হয়েছে ৯২ লাখ ৩০ হাজার টাকা এবং শেয়ার প্রতি লোকসান ০.৯২ টাকা। ১১ বছর ধরে কোম্পানিটি বিনিয়োগকারীদের কোনো প্রকার ডিভিডেন্ড দেয়নি। ২০০০ সালের পুঁজিবাজারে তালিকাভুক্ত হওয়া বায়োনিক সী ফুডের অনুমোদিত মূলধন ৩০ কোটি টাকা ও পরিশোধিত মূলধন ১০ কোটি টাকা।

 

আপনার মন্তব্য

*

*

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.

Top