ধৈর্যের ফল মধুর: অনেক সুখবর আসছে বিনিয়োগকারীদের জন্য

Editorial১৯৯৬ সালে মতিঝিলের সোনালী ব্যাংকের সামনে থেকে ইত্তেফাকের মোড় পর্যন্ত যখন শেয়ার কেনাবেচার হাট বসেছিল তখন আমি সহ সম্পাদক হিসাবে কাজ করছি জাপা নেতা এরশাদের দৈনিক জনতায়। মানিক নগরে বাসা হওয়ায় অফিসের তেজগাঁও কার্যালয়ে যাওয়ার জন্য বলাকা বাস ধরতে আমাকে প্রতিদিনই হাজির হতে হতো ইত্তেফাকের মোড়ে। সেখান থেকে আড়াই টাকায় নাবিস্কো। পরে বাকি পথ হেটে অফিসে।

তখন আমার বেতন ছিল চুক্তিভিত্তিক সর্ব সাকুল্যে ৩ হাজার ৭৫০ টাকা। আড়াই জনের সংসারের জন্য তা যথেষ্ট না হলেও চলে যেতো।  হঠাৎ করে মতিঝিলের কার্ব মার্কেটটি জমে ওঠার পর আর ইত্তেফাকের মোড় থেকে বাসে উঠতে পারিনি। সেখান থেকে কার্ব মার্কেটের জনতা ঠেলে সোনালী ব্যাংকের সামনে এসে গাড়িতে উঠতাম। কয়েকদিন দেখলাম লোকজন কি করে? কাজটি খুব সহজ মনে হলো। একটি কাগজ হাতে উচিয়ে চিৎকার করে বলতে হবে আশরাফ, আশরাফ কিংবা কাশেম কাশেম। এরপর দরাদরি করে বিক্রি। একদুদিনের মধ্যে বিষয়টি আয়ত্তে এনে ধারদেনা করে ৫ হাজার টাকা যোগাড় করে শেয়ার কেনা শুরু করলাম। শেয়ার কিনলেই লাভ। সকালে কিনলে বিকালে লাভ আর বিকালে কিনলে সকালে লাভ। লাভের ব্যাপারটি একেবারেই নিশ্চিত। লেখার শুরুতে আমার বেতনের কথাটি যেহেতু উল্লেখ করেছি তাই এখানে নতুন প্রজন্মের ব্যবসায়ীদের জন্য দুদিনের লাভের বিষয়টি উল্লেখ করতে চাই।
একদিন বাসা থেকে বেড়িয়ে ইত্তেফাকের মোড়ে এসে ৬০ টাকা দরে ২০০ আশরাফ টেক্সটাইলের শেয়ার সার্টিফিকেট কিনি ১২ হাজার টাকায়। কিনে একটু সামনে এগোনোর পর থেকেই উচিয়ে যখন বিক্রি বিক্রি বলছি তখন দেখলাম ক্রেতারা আস্তে আস্তে দাম শুধু উঠাচ্ছেন। আমিও কিছু না বুঝেই ৬০ টাকার শেয়ার ১৮০ টাকা দাম হাকিয়ে আস্তে আস্তে সোনালী ব্যাংকের দিকে এগোতে থাকলাম। কারন আমাকেতো সোনালী ব্যাংকের সামনে গিয়েই গাড়িতে উঠতে হবে। তাই এই দ্বিগুনেরও বেশি দাম হাকানো। অবশেষে আলিকো বিল্ডিংয়ের সামনে এসে ১৪০ টাকা দরে ২০০ শেয়ার বিক্রি করে ১২০০০ টাকা পুঁজি খাটিয়ে ১৬০০০ টাকা মুনাফা করে অফিসে যাই। তখন আমাদের শিফট ইনচার্জ আহসানউল্লাহ ভাই। যিনি এখন দৈনিক জনতার সম্পাদক। তাকে ম্যানেজ করা এবং আমার লাভে সকলকে অংশীদার বানানোর কাহিনী জায়গা স্বল্পতায় আরেকদিনের জন্য থাকলো।

আরেকদিনের কাহিনী। অফিস থেকে ফেরার পথে সন্ধায় ইত্তেফাক মোড় থেকে রিক্সায় বাসায় ফিরি। ওইদিন রিক্সায় ওঠার ঠিক পূর্বক্ষনে ২৭০ টাকা দরে ১০০ কাশেম ড্রাই সেল কিনি। কিনে বাসায় চলে যাই। সকালে এসেই দেখি লোকজন কাশেম ড্রাই সেল বিক্রির জন্য চাচ্ছে সাড়ে ৩০০ টাকা দর। আমি ৩৭০ চেয়ে চেয়ে ওই আগের মতো সোনালী ব্যাংকের সামনে গিয়ে সাড়ে ৩০০ টাকায় বিক্রি করে ৮০০০ টাকা লাভ নিয়ে অফিসে যাই। এভাবে আমার পাঁচ হাজার টাকার পুঁজি ওই মাসেই ৪২ হাজার টাকায় পৌঁছে। যা আমার মতো পৌনে চার হাজার টাকা বেতনের মাস এনে মাস খাবারের একজন সাংবাদিকের জন্য ছিল বিশাল ব্যাপার। পরের মাসেও লাভ হলো কিন্তু পরিবারের জন্য কিছু কেনাকাটায় প্রায় ৩০ হাজার টাকা খরচ হয়ে যায় ( আমার অনিচ্ছা সত্বেও)। পরে আরো কিছু টাকা সংযুক্ত করে ৫২৫ টাকা দরে ৫০টি বেক্সিমকো ফার্মা এবং ৩৫০ টাকা দরে ৫০টি কাশেম ড্রাইসেল কিনি। সম্ভবত এ দুটি কোম্পানির ইতিহাসে এই দরই ছিল সর্বোচ্চ। এ দুটি শেয়ার আর বেচতে পারলামনা। মানে মুনাফা পাচ্ছিলামনা। প্রতিদিন মতিঝিল যাই কিন্তু দেখলাম চোখের সামনে সেই ৫২৫ টাকার ফার্মা কমতে কমতে ৪’শ, ৩’শ ২’শ ১’শ এমনকি ৫০ থেকে ২০ টাকায় নামলো। কিন্তু বিক্রি আর করিনি। ১৯৯৮/১৯৯৯ সালের পুরোটা সময় জুড়ে এই শেয়ারটি ১৪ টাকা পর্যন্ত দরে কেনাবেচা  হয়েছে। কিন্তু আমার শেয়ারটি আর বিক্রি করা হয়নি। ওই সময় শুধুই আফসোস ছিল টাকা হাতে পেয়ে পরিবারের জন্য কেনো আরো জিনিস কেনা কাটা করলামনা।
২০০১ সালের পট পরিবর্তনের পর যদিও বাজার আস্তে আস্তে বাড়তে থাকে কিন্তু সেই ’৯৬ সালের বাতাস বইতে বইতে ২০০৮/৯ সাল লেগে যায়। যার বিস্ফোরনটি ঘটে ২০১০ সালে। বিনিয়োগকারীদের এই কাহিনী শোনানোর পেছনে আমার প্রধানতম উদ্দেশ্য হচ্ছে ১৯৯৬ সালের পরে আরেকটি ’২০১০ সাল এসেছে ১৪ বছর পর। কিন্তু এই দুয়ের মধ্যে বব্যধান আকাশ আর পাতাল। ’৯৬ সালে শেয়ারের কাগজ বিক্রি করেছি রাস্তায় দাঁড়িয়ে ’১০ সালে অনলাইনে এসি রুমে বসে। অথবা প্রেসক্লাবে কিংবা নিজের অফিসে বসে বসে। শেয়ার কেনার পরে সেটি উত্তোলন, সেটির আসল নকল ভেরিফিকেশন, কোম্পানিতে গিয়ে ১১৭ ফর্ম পূরন করে সার্টিফাইড করে নিজের নামে করে আনাসহ এজাতীয় নানা দুর্ভোগের বিষয় এখন আর নেই। এখন টেলিফোনে বাই অর্ডার টেলিফানেই বিক্রি। সামনের দিনগুলোতে সবটাই হবে অনলাইনে।
কিন্তু আসল যে সুখবর শোনানোর জন্য এই গল্পের অবতরনা তা হলো ১৯৯৬ সালের ধসের পর শেয়ার কেলেঙ্কারীর সাথে জড়িতদের বিরুদ্ধে একটি মামলা ছাড়া আর কিছুই হয়নি। অথচ ২০১০ সালের ঘটনার পর পরই গঠিত হয় একাধিক তদন্ত কমিটি। সেই কমিটির রিপোর্টের আলোকে দুই স্টক এক্সচেঞ্জ এবং নিয়ন্ত্রক সংস্থা বিএসইসি স্বল্প মেয়াদ মধ্য মেয়াদ এবং দীর্ঘ মেয়াদে হাতে নেয় অসংখ্য পরিকল্পনা। যার বাস্তবায়ন শুরু হয়েছে সেই ’১০ সালের পর পরই চলছে এখনো। সরকার উদ্যোগী হয়ে গ্রহন করছে নিত্য নতুন পরিকল্পনা। প্রতি বছরই বাজেটে শেয়ার বাজারের জন্য থাকছে একগুচ্ছ প্রনোদনা। যেমন এবারেই ২০১৫-১৬ অর্থবছরের বাজেটে ঘোষনা করা হয়েছে  কর্পোরেট করহার হ্রাস, আইপিওতে কর রেয়াত, করমুক্ত লভ্যাংশ আয়ের সীমা বৃদ্ধি, মার্চেন্ট ব্যাংক ও ব্রোকারেজ হাউসকে উৎস কর আদায় থেকে অব্যহতিসহ  নানান সুখবর। ক্ষতিগ্রস্তদের দেয়া হচ্ছে নগদ অর্থ, মওকুফ করা হচ্ছে সুদ, কোটায় দেয়া হচ্ছে আইপিওর বরাদ্দ। এত সুখবর ১৯৯৬ সালের পরের ১৪টি বছর ছিলনা। এখন এগুলোর সুফল ভোগ করার জন্য প্রয়োজন শুধু আপেক্ষা আর অপেক্ষা। ধৈর্য ধরে যারা এই অপেক্ষার পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হবেন তারাই এই বাজার থেকে সবচেয়ে বেশি লাভবান হবেন। এটা শুধু আমার কথা নয় বর্তমান সময়ের বাজার সংশ্লিষ্ট সব বিশিষ্ট ব্যক্তিদেরই এই অভিমত।

আপনার মন্তব্য

Top