কেডিএস এক্সেসরিজ: পুঁজিবাজারে বড় গ্রুপগুলোর জালিয়াতি

KDS Accessoriesশেয়ারবাজার রিপোর্ট: অতিরিক্ত প্রিমিয়াম ও অপেক্ষাকৃত দুর্বল আর্থিক ভিত নিয়ে পুঁজিবাজারে আসছে কেডিএস এক্সেসরিজ লিমিটেড। ১৯.৬৩ টাকা শেয়ার প্রতি সম্পদ মূল্য (এনএভি) হওয়া সত্ত্বেও কোম্পানিটি প্রতিটি শেয়ারের বিপরীতে নিচ্ছে ২০ টাকা (১০ টাকা প্রিমিয়াম)। এছাড়া কোম্পানিটি পুঁজিবাজার থেকে ২৪ কোটি টাকা উত্তোলন করবে। যার প্রায় ৩০ শতাংশ দিয়ে কোম্পানির ঋণ পরিশোধ করা হবে। অর্থাৎ বিনিয়োগকারীদের টাকা দিয়ে কোম্পানির তৈরি করা ঋণ পরিশোধ করা হবে। আর কোম্পানির তৈরি করা ঋণ বিনিয়োগকারীরা কেন দেবে এমন প্রশ্ন বাজার সংশ্লিষ্টদের।
এদিকে এ কোম্পানির আইপিও পূর্ববর্তী পরিশোধিত মূলধনের পরিমাণ ৪০ কোটি টাকা। আইপিও’র পর কোম্পানির পরিশোধিত মূলধনের পরিমাণ দাঁড়াবে ৫২ কোটি টাকা।
অন্যদিকে ৩১ ডিসেম্বর ২০১৩ সমাপ্ত অর্থবছরের হিসাব অনুযায়ী কেডিএস এক্সসরিজের দীর্ঘমেয়াদি ঋণের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ১৪ কোটি ১৭ লাখ ৪৩ হাজার ৮৫১ টাকা। এছাড়া স্বল্পমেয়াদি ঋণের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ৮৬ কোটি ৫৮ লাখ ৭ হাজার ৪৪১ টাকা। এক্ষেত্রে কোম্পানির মোট ১০০ কোটি ৭৫ লাখ ৫১ হাজার ২৯২ টাকা ঋণের ভারে জর্জরিত।
অর্থাৎ পরিশোধিত মূলধনের প্রায় দ্বিগুন রয়েছে কেডিএস এক্সেসরিজের ঋণ।
এদিকে ৩১ ডিসেম্বর ২০১৩ সমাপ্ত অর্থবছরে কোম্পানিটি মুনাফা দেখিয়েছে ৮ কোটি ৫৮ লাখ ৭১ হাজার ৬৪ টাকা। এতো স্বল্প মুনাফা করা কোম্পানি বিনিয়োগকারীদের কাছ থেকে নেবে ২৪ কোটি টাকা। এছাড়া মাত্রাতিরিক্ত ব্যাংক ঋণের জর্জরিত এ কোম্পানির ভবিষ্যত নিয়ে আশঙ্কা থেকেই যাচ্ছে। কারণ পরিশোধিত মূলধনের প্রায় দ্বিগুন দাঁড়িয়েছে ব্যাংক ঋণ।
এদিকে কেডিএস এক্সেসরিজ কেডিএস গ্রুপের সাবসিডিয়ারি কোম্পানি। এ গ্রুপের কেডিএস টেক্সটাইল ও কেডিএস গার্মেন্টস নামে আরো দুটি কোম্পানি রয়েছে। এ দুই কোম্পানি কেডিএস এক্সেসরিজের চেয়ে ভালো মৌলভিত্তি সম্পন্ন। কোম্পানিগুলোর টার্নওভার, মুনাফা কেডিএস এক্সসরিজের চেয়ে বেশি হয়। অর্থাৎ ভালো মৌলভিত্তির দুটি কোম্পানি রেখে অপেক্ষাকৃত দুর্বল কোম্পানিকে পুঁজিবাজারে তালিকাভুক্ত করাচ্ছে কেডিএস গ্রুপ।
আর এতেই নানা প্রশ্ন উঠে এসেছে বাজার সংশ্লিষ্টদের মনে।
তারা বলছেন, দেশের পুঁজিবাজারে বড় গ্রুপগুলোর অপেক্ষাকৃত দুর্বল আর্থিক ভীত সম্পন্ন কোম্পানির তালিকাভুক্তির প্রবনতা বাড়ছে। গ্রুপের অন্যান্য ভালো কোম্পানি পুঁজিবাজারে না এনে দুর্বল কোম্পানি তালিকাভুক্ত করানো হচ্ছে। এতে তুলনামুলক কম মুনাফায় ও কম মূলধনের এসব প্রতিষ্ঠানের অল্প সময়ের মধ্যেই অবস্থা খারাপ হতে শুরু করে। এতে দীর্ঘমেয়াদে ক্ষতিগ্রস্ত হন বিনিয়োগকারীরা। বেশিরভাগ গ্রুপ অব কোম্পানিজের মালিকপক্ষ নীতিবাক্য ও জবাবদিহিতার বুলি আওড়ালেও আদতে এর কোনো ভিত্তি পাওয়া যায়না। কর্পোরেট গভর্নেন্স বা পরিচালন দক্ষতা এসব কোম্পানির অধিকাংশের ক্ষেত্রেই অনুপস্থিত। গ্রুপের অন্য কোম্পানি যেগুলো পুঁজিবাজারে নেই সেগুলো বাজারে রমরমা ব্যবসা করলেও মুদ্রার অপর পৃষ্ঠে রয়েছে অন্ধকার। পুঁজিবাজারে তালিকাভুক্ত কোম্পানিগুলোকে নিয়ে যেন মালিকপক্ষের কোনো মাথাব্যাথাই নেই।
উল্লেখ্য, পুঁজিবাজারে তালিকাভুক্ত বেশকিছু বড় বড় গ্রুপের কোম্পানি রয়েছে যাদের অবস্থা অন্যান্য অ-তালিকাভুক্ত কোম্পানির চেয়ে খারাপ। এসব কোম্পানির ব্যবসা পর্যালোচনা করলে দেখা যায়, গ্রুপের অন্য কোম্পানিগুলোর ব্যবসা উত্তোরোত্তর প্রবৃদ্ধি ঘটলেও তালিকাভুক্ত কোম্পানিগুলোর অবস্থা ভালো না। বিনিয়োগকারীদের নিয়মিত ডিভিডেন্ড দিতে পারছে না অনেকেই। এমনকি এর মধ্যে অনেকগুলো কোম্পানি বছরের পর বছর ক্রমাগত লোকসান গুনছে। তথ্যানুসন্ধানে এও উঠে আসে যে কিছু ক্ষেত্রে এক কোম্পানির নামে সাধারণ বিনিয়োগকারীদের থেকে টাকা নিয়ে অন্য কোম্পানিতে বিনিয়োগ করা হয়। উৎপাদন সংক্রান্ত অনেক তথ্য বিনিয়োগকারীদের জানানোও হয় না। ফলে পরবর্তি সময়ে শেয়ারগুলো নিয়ে কারসাজি হবার আশঙ্কা থাকলেও ক্ষুদ্র বিনিয়োগকারীদের কিছু করার থাকে না। এসব ব্যাপারে বিএসইসি’র কোনো কার্যকর উদ্যেগ না থাকায় কোম্পানিগুলোও বারবার ছাড় পেয়ে যায়।
অভিযোগ রয়েছে, মূল কোম্পানিগুলোর ভালো মানুষি চেহারার আড়ালে এক্ষেত্রে কাজ করে সম্পদের লিপ্সা। প্রাথমিক গণ প্রস্তাবের (আইপিও) তুলনামূলক দুর্বল কোম্পানিগুলোকে অনুমোদন পাওয়ানোর জন্য প্রথমেই কিছু সময়ের জন্য কোম্পানির আর্থিক অবস্থাকে ফুলিয়ে ফাপিয়ে দেখানো হয়। আর নিয়ন্ত্রক সংস্থা বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশনের (বিএসইসি) বিদ্যমান আইনি কাঠামোর মধ্যে নিয়ে আসার পর কিছুদিনের মধ্যেই কোম্পানির ভিত্তি খারাপ হতে শুরু করে। আর এরপরই শুরু হয় কারসাজি।
সেই ধারাবাহিকতায় কেডিএস গ্রুপ তাদের অপেক্ষাকৃত দুর্বল কোম্পানি কেডিএস এক্সেসরিজকে তালিকাভুক্ত করানোর অনুমোদন পেয়েছে। তারওপর উত্তোলিত টাকার প্রায় ৩০ শতাংশ (২৯.১৭) ব্যাংক লোন পরিশোধ করার জন্য।
উল্লেখ্য, ২০১৪ সালের ২৯ অক্টোবর বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশনের (বিএসইসি) ৫৩০তম সভায় সিদ্ধান্ত নেয়া হয় যে কোম্পানিগুলো আইপিও থেকে উত্তোলিত অর্থের এক তৃতীয়াংশের বেশি লোন পরিশোধ করতে পারবে না।
এ ব্যাপারে বিএসইসির সাবেক চেয়ারম্যান ও সাবেক তত্ত্ববধায়ক সরকারের অর্থ উপদেষ্টা এ বি মির্জ্জা আজিজুল ইসলাম বলেন, ‘আইপিও’র মাধ্যমে উত্তোলন করা টাকা কোনভাবেই কোম্পানির ঋণ পরিশোধে ব্যবহার করতে দেয়া যাবে না। এ অর্থে শুধুমাত্র কোম্পানির ব্যবসা সম্প্রসারণ করার অনুমতি পাবে’। তিনি আরও বলেন, ‘যেহেতু একদিকে কোম্পানিগুলোকে বাজারে তালিকাভুক্ত করার জন্য বিএসইসি উৎসাহিত করে এবং একইসাথে কোম্পানিগুলোর নিয়ন্ত্রণও করে, তাই যে কোনো সিদ্ধান্ত নেয়ার ব্যাপারে বিএসইসিকে আরও সতর্ক থাকতে হবে।’
এ প্রসঙ্গে ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জের (ডিএসই) সাবেক সভাপতি রকিবুর রহমান বলেন, ঋণ পরিশোধের জন্য যারা পুঁজিবাজারে তালিকাভুক্ত হতে চায়, তারা মূলত পারিবারিকভাবে ঋণ অবমুক্ত হতে চায়। ঋণগ্রস্ত প্রতিষ্ঠানকে কোনোভাবেই পুঁজিবাজারে তালিকাভুক্তির অনুমোদন দেয়া উচিত নয়। কারণ যেসব প্রতিষ্ঠান নিজস্ব সক্ষমতা দিয়ে প্রতিষ্ঠানের উন্নতি করতে পারে না, তারা বিনিয়োগকারীদের কীভাবে লভ্যাংশ দেবে। আইপিওর মাধ্যমে টাকা তুলে ঋণ শোধ দিয়ে খেলাপির খাতা থেকে নাম বাদ দেবে। শেয়ার ছেড়ে কোম্পানিগুলো ব্যাংক ঋণ পরিশোধ করলে তাতে কোম্পানির আয় বাড়বে এবং শেয়ারহোল্ডাররা লাভবান হবেন। কিন্তু ব্যাংক থেকে ঋণ নিয়ে কোম্পানি তা অপব্যবহার করে কিংবা পরিচালকরা নিজেদের পকেট ভারী করেন, তাহলে বিনিয়োগকারীরা লাভবান হবে না। যেসব কোম্পানি পুঁজিবাজার থেকে অর্থ সংগ্রহ করে ব্যাংক ঋণ শোধ করছে কতখানি যুক্তিযুক্ত এবং তা সঠিকভাবে ব্যবহার হচ্ছে কিনা তা বিশদভাবে খতিয়ে দেখা উচিত।
রকিবুর রহমান আরো বলেন, বছর খানেক আগেও ডিএসইর পক্ষ থেকে এ সংক্রান্ত একটি প্রস্তাব নিয়ন্ত্রক সংস্থার কাছে দেয়া হয়েছিল। আমরা বলেছিলাম, আল্লাহর ওয়াস্তে ঋণ পরিশোধের জন্য কোনো কোম্পানিকে তালিকাভুক্ত করবেন না। কারণ বিগত সময়ে যারা এভাবে টাকা উত্তোলন করেছে, তাদের ফলাফল শূন্য। এখন এটা পরিষ্কার যে, কোম্পানিগুলো কৌশলে বিনিয়োগকারীদের সঙ্গে প্রতারণা করছে।

এ ব্যাপারে যোগাযোগ করা হলে কোম্পানির প্রধাণ অর্থ কর্মকর্তা বিপ্লব কান্তি বনিক শেয়ারবাজারনিউজ ডট কমকে জানান, ‘গ্রুপের অন্যান্য কোম্পানির তুলনায় এক্সেসরিজ দূর্বল এ কথা ঠিক না। এ কোম্পানি অন্যান্য কোম্পানির তুলনায় টেকসই বলেই এ কোম্পানিকে পুঁজিবাজারে আনা হচ্ছে।’

কোম্পানির শেয়ার প্রতি সম্পদ মূল্য (এনএভি) মাত্র ১৯.৬৩ টাকা হওয়া সত্ত্বেও শেয়ার প্রতি ২০ টাকা প্রিমিয়াম নেয়ার যৌক্তিকতা কি এ প্রশ্ন করা হলে তিনি বলেন, ‘আমরা তো আরও্ বেশি প্রিমিয়াম চেয়েছিলাম। আর সব বিবেচনা করেই তো নিয়ন্ত্রক সংস্থা অনুমোদন দিয়েছে। আরেকটি ব্যাপার হচ্ছে প্রাইসিং করার সময় আমি দায়িত্বে ছিলাম না। তাই সঠিকভাবে বলতে পারবো না। এটা ইস্যু ম্যানেজার ভালো বলতে পারবে। আমি এ ব্যপারে কিছু জানি না।’

শেয়ারবাজারনিউজ/ওহ.শি/আহাতু/রু/সা

আপনার মন্তব্য

*

*

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.

Top