৭ কোম্পানির অস্তিত্ব নিয়ে শঙ্কায় বিনিয়োগকারীরা

7 companyশেয়ারবাজার রিপোর্ট: পুঁজিবাজারে তালিকাভুক্ত ৭ কোম্পানির অস্তিত্ব নিয়ে বিনিয়োগকারীদের শঙ্কা দিন দিন বাড়ছে। বছর শেষে প্রতিটি কোম্পানির কাছ থেকে ডিভিডেন্ড বা লভ্যাংশ আশা করেন বিনিয়োগকারীরা। অথচ তালিকাভুক্ত এই ৭ কোম্পানি নানা ধরণের সমস্যা দেখিয়ে টানা পাঁচ বছর যাবৎ ডিভিডেন্ড থেকে বঞ্চিত করে আসছে বিনিয়োগকারীদের।

টানা লোকসানে ঋণ ও দায়ের পরিমাণ সম্পদের তুলনায় আশঙ্কাজনক হারে বাড়তে থাকায় দেউলিয়ার পথে রয়েছে কোম্পানিগুলো। এতে বিনিয়োগ হারানোর আশঙ্কায় রয়েছে বিনিয়োগকারীরা।

কোম্পানিগুলো হলো: আজিজ পাইপস, দুলামিয়া কটন, আইসিবি ইসলামী ব্যাংক, মেঘনা পেট, সমতা লেদার, শ্যামপুর সুগার এবং ঝিলবাংলা সুগার মিলস লিমিটেড।

এ কোম্পানিগুলোর বার্ষিক প্রতিবেদনে নীরিক্ষকদের মতামত থেকে জানা যায়, উৎপাদন ক্ষমতা আশঙ্কাজনকহারে কমে যাওয়ায় ব্যবসা হারাচ্ছে কোম্পানিগুলো। অপরদিকে টানা লোকসানে কোম্পানিগুলোর সমন্বিত লোকসান লাগামহীনভাবে বাড়ছে। এর পাশাপাশি ঋণ ও দায়ের পরিমাণ বাড়তে বাড়তে কোম্পানিগুলোর সম্পদমূল্যকেও ছাড়িয়েছে। পরিণতিতে এ কোম্পানিগুলো দায় পরিশোধের ক্ষমতা হারিয়ে বর্তমানে ঋণ খেলাপিতে পরিণত হয়েছে। আর এ কোম্পানিগুলো মুনাফায় না আসতে পারলে ভবিষ্যতে দেউলিয়া হয়ে যাওয়ার জোরাল সম্ভাবনা রয়েছে।

বাজার সংশ্লিষ্টদের মতে, পুঁজিবাজারে কোম্পানিরগুলোর কারসাজির আরেক নাম ‘নো ডিভিডেন্ড’। কোম্পানিগুলো বছরের পর বছর লোকসান দেখিয়ে ডিভিডেন্ড থেকে বঞ্চিত করেছে বিনিয়োগকারীদের। ফলে ন্যায্য অধিকার থেকে বঞ্চিত হচ্ছে এসব কোম্পানির শেয়ারহোল্ডাররা। এসব খেলা বন্ধ করার জন্য আইপিও মাধ্যমে বাজার থেকে টাকা উত্তোলনের ক্ষেত্রে সর্বনিম্ন ১০ শতাংশ ডিভিডেন্ট দেয়া বাধ্যতামূলক করার দাবিও রয়েছে।

জানা যায়, তালিকাভুক্ত এই ৭ কোম্পানির মধ্যে ৬ কোম্পানির পুঁঞ্জিভুত লোকসানের পরিমাণ রয়েছে ২ হাজার ৯০ কোটি ৪৭ লাখ টাকা। এর মধ্যে আইসিবি ইসলামী ব্যাংকের পুঁঞ্জিভুত লোকসানের পরিমাণ রয়েছে ১ হাজার ৫৯৮ কোটি ৯৭ লাখ টাকা। আজিজ পাইপসের ৩৬ কোটি ৫৯ লাখ টাকা। দুলামিয়া কটোনের ৩৩ কোটি ১২ লাখ টাকা। মেঘনা পেটের ১৪ কোটি ৩৯ লাখ টাকা। শাইনপুকুরের ২৩৫ কোটি ৮৪ লাখ টাকা এবং ঝিলবাংলা সুগারের পুঁঞ্জিভুত লোকসানের পরিমাণ রয়েছে ১৭১ কোটি ৫৬ লাখ টাকা। তবে সমতা লেদারের রিজার্ভের পরিমাণ রয়েছে ৫ কোটি ১৪ লাখ টাকা।

এদিকে নিয়ন্ত্রক সংস্থা বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশনের (বিএসইসি) আইন অনুযায়ী টানা লোকসান, উৎপাদন বন্ধ, অনিয়মিত বার্ষিক সাধারণ সভা (এজিএম) ইত্যাদি সমস্যা সঙ্কুল কোম্পানিগুলোকে মূল মার্কেট থেকে সরিয়ে ওভার দ্য কাউন্টার (ওটিসি) মার্কেটে পাঠানোর ক্ষমতা কমিশনের রয়েছে। এছাড়া যে সকল কোম্পানি লোকসানের কারনে বিনিয়োগকারীদের দীর্ঘদিন ধরে ডিভিডেন্ড দিতে পারছে না সেসব কোম্পানির পর্ষদে প্রশাসক বা পর্যবেক্ষক বসানোর ক্ষমতাও কমিশনের রয়েছে।

এ বিষয়ে বিএসইস’র মুখপাত্র মো: সাইফুর রহমান শেয়ারবাজারনিউজ ডটকমকে বলেন, কমিশনে জনবলের ঘাটতি থাকায় আর্থিক ও ব্যবস্থাপনায় দূর্বল কোম্পানিগুলোতে প্রশাসক কিংবা পর্যবেক্ষক বসানো যাচ্ছে না।

তিনি আরও বলেন, তবে কোম্পানিগুলোকে ওটিসেতে পাঠানোর ব্যবস্থা নেওয়া যেতে পারে। কিন্তু এ সকল দূর্বল কোম্পানিগুলোর মধ্যে বেশ কিছু সরকারি কোম্পানি থাকায় ওটিসিতে পাঠানোর ক্ষেত্রে বেশ কিছু জটিলতা রয়েছে। তবে এ সকল কোম্পানির বিরুদ্ধে কি ব্যবস্থা নেওয়া যায় এ বিষয়ে কমিশন কাজ করছে।

এদিকে ডিএসইতে দেখা যায়, লোকসানি হওয়া সত্তেও এ সকল কোম্পানির শেয়ার নিয়ে কারসাজি চক্র থেমে নেই। দেখা যায় প্রায় কোম্পানিগুলোর শেয়ার দর হঠাৎ করেই বাড়তে থাকে। এ বিষয়ে ডিএসইর পক্ষ থেকে দর বাড়ার কারন জানতে চাওয়া হলে জবাবে কোম্পানিগুলো খুব সহজ উত্তর দিয়ে থাকে “দর বাড়ার পেছনে কোন মুল্য সংবেদনশীল নেই”।

নিম্নে কোম্পানিগুলোর চিত্র বর্ননা করা হলো:

আজিজ পাইপস: ১৯৮৬ সালে পুঁজিবাজারে তালিকাভুক্ত হওয়া প্রকৌশল খাতের আজিজ পাইপসের অনুমোদিত মূলধন ৫০ কোটি টাকা এবং পরিশোধিত মূলধন ৪ কোটি ৯০ লাখ টাকা। কোম্পানিটির পুঁঞ্জিভুত লোকসানের পরিমান রয়েছে ৪ কোটি ১৯ লাখ টাকা। অথচ এ কোম্পানিটির দায়ের পরিমান ৬১ কোটি টাকা। অর্থাৎ পরিশোধিত মুলধনের ১৫ গুণ দায় বহন করছে কোম্পানিটি।

এছাড়া ঋণ খেলাপি হওয়ায় কোম্পানিটি নতুন করে কোন ঋণ পাচ্ছে না। কোম্পানির নিরীক্ষকের মতে চলতি মুলধনেও বড় আকারে ঘাটতি রয়েছে।

জেড ক্যাটাগরির এ কোম্পানি সর্বশেষ ২০০১ সালে ১০ শতাংশ ক্যাশ ডিভিডেন্ড দিয়েছিলো। তার পর থেকে এখন পর্যন্ত লোকসানের পর লোকসান দেখিয়ে বিনিয়োগকারীদের ডিভিডেন্ড থেকে বঞ্চিত করছে।

এর মোট ৪৮ লাখ ৫০ হাজার শেয়ারের মধ্যে পরিচালনা পর্ষদের কাছে রয়েছে ৪০.২২ শতাংশ, প্রতিষ্ঠানিক বিনিয়োগকারীদের কছে রয়েছে ৭.৪১ শতাংশ এবং সাধারণ বিনিয়োগকারীদের কাছে রয়েছে ৫২.৩৭ শতাংশ শেয়ার। বর্তমানে এটি একটি লোকসানি কোম্পানি যার অস্থিস্ত সংকটে রয়েছে।

দুলামিয়া কটন: বস্ত্র খাতের ‘জেড’ ক্যাটাগরির কোম্পানি দুলামিয়া কটনের অনুমোদিত মূলধন ৩০ কোটি টাকা এবং পরিশোধিত মূলধন ৭ কোটি ৫৬ লাখ টাকা। অথচ কোম্পানিটির পুঞ্জিভুত লোকসানের পরিমান রয়েছে ৩৩ কোটি ১২ লাখ টাকা।

এ কোম্পানির নিরীক্ষকের মতে, কোম্পানিটি দায় পরিশোধের ক্ষমতা হারাচ্ছে। অর্থাৎ কোম্পানিটি দেউলিয়ার দিকে যাচ্ছে।

এর মোট ৭৫ লাখ ৫৬ হাজার ৬০০টি শেয়ারের মধ্যে পরিচালনা পর্ষদের কাছে রয়েছে ৫৮.২২ শতাংশ, প্রতিষ্ঠানিক বিনিয়োগকারীদের কছে রয়েছে ৩.৭০ শতাংশ এবং সাধারণ বিনিয়োগকারীদের কাছে রয়েছে ৩৮.০৮ শতাংশ শেয়ার। বর্তমানে এটি একটি লোকসানি কোম্পানি যার অস্থিস্ত সংকটে রয়েছে।

১৯৮৯ সালে পুঁজিবাজারে তালিকাভুক্ত হওয়া প্রকৌশল খাতের এ কোম্পানি সর্বশেষ ২০০৯ সালে ২ শতাংশ ক্যাশ ডিভিডেন্ড দিয়েছিলো। তার পর থেকে এখন পর্যন্ত লোকসানে থাকায় বিনিয়োগকারীদের ডিভিডেন্ড দিতে পারেনি।

আইসিবি ইসলামী ব্যাংক: ব্যাংক খাতের ‘জেড’ ক্যাটাগরির কোম্পানি আইসিবি ইসলামী ব্যাংকের অনুমোদিত মূলধন ১ হাজার ৫০০ কোটি টাকা এবং পরিশোধিত মূলধন ৬৬৪ কোটি ৭০ লাখ টাকা। অথচ কোম্পানিটির পুঞ্জিভুত লোকসানের পরিমান রয়েছে ১ হাজার ৬২৭ কোটি ৬২ লাখ টাকা। এর মোট ৬৬ কোটি ৪৭ লাখ ২ হাজার ৩০০টি শেয়ারের মধ্যে পরিচালনা পর্ষদের কাছে রয়েছে ৫৯.৭৮ শতাংশ, প্রতিষ্ঠানিক বিনিয়োগকারীদের কছে রয়েছে ১৬.৩৪ শতাংশ এবং সাধারণ বিনিয়োগকারীদের কাছে রয়েছে ২৩.৮৮ শতাংশ শেয়ার। বর্তমানে এটি একটি লোকসানি কোম্পানি যার অস্থিস্ত সংকটে রয়েছে।

১৯৯০ সালে পুঁজিবাজারে তালিকাভুক্ত হওয়া ব্যাংক খাতের এ কোম্পানি ২০০০ সাল থেকে এখন পর্যন্ত লোকসানের পর লোকসান দেখিয়ে বিনিয়োগকারীদের ডিভিডেন্ড বঞ্চিত করেছে।

মেঘনা পেট: ২০০১ সালে পুঁজিবাজারে তালিকাভুক্ত হওয়া খাদ্য ও আনুসাঙ্গিক খাতের কোম্পানি মেঘনা পেটের অনুমোদিত মূলধন ৩০ কোটি টাকা এবং পরিশোধিত মূলধন ১২ কোটি টাকা। কোম্পানিটির পুঞ্জিভুত লোকসানের পরিমান রয়েছে ১৪ কোটি ৩৯ লাখ টাকা।

অডিটরের মতে, বর্তমানে কোম্পানিটি ১৬ কোটি টাকা সমন্বিত লোকসানে রয়েছে। এছাড়া কোম্পানিটির মোট দায় সম্পদ মূল্যের চেয়ে ৬৪ লাখ টাকা বেশি। আর এভাবে চলতে থাকলে অচিরেই কোম্পানিটি দেউলিয়ায় পরিণত হবে।

এর মোট ১ কোটি ২০ লাখ শেয়ারের মধ্যে পরিচালনা পর্ষদের কাছে রয়েছে ৫০.০০ শতাংশ এবং সাধারণ বিনিয়োগকারীদের কাছে রয়েছে ৫০.০০ শতাংশ শেয়ার। বর্তমানে এটি একটি লোকসানি কোম্পানি যার অস্থিস্ত সংকটে রয়েছে।

জেড ক্যাটাগরির এ কোম্পানিটি তালিকাভুক্তির পর থেকে এখন পর্যন্ত কোন প্রকার ডিভিডেন্ড দিতে পারেনি বিনিয়োগকারীদের। অথচ বাজারে তালিকাভুক্তির পূর্বের তিন বছর টানা কিভাবে মুনাফা দেখিয়েছে।

সমতা লেদার: চামড়া খাতের ‘জেড’ ক্যাটাগরির কোম্পানি সমতা লেদারের অনুমোদিত মূলধন ৫০ কোটি টাকা এবং পরিশোধিত মূলধন ১০ কোটি ৩২ লাখ টাকা। কোম্পানিটির মোট ১ কোটি ৩ লাখ ২০ হাজার শেয়ারের মধ্যে পরিচালনা পর্ষদের কাছে রয়েছে ৫০.০০ শতাংশ, প্রতিষ্ঠানিক বিনিয়োগকারীদের কছে রয়েছে ১৪.২৪ শতাংশ এবং সাধারণ বিনিয়োগকারীদের কাছে রয়েছে ৩৫.৭৬ শতাংশ শেয়ার।

১৯৯৮ সালে পুঁজিবাজারে তালিকাভুক্ত হওয়া এ কোম্পানি সর্বশেষ ২০০৩ সালে ৪ শতাংশ ক্যাশ ডিভিডেন্ড দিয়েছিলো। তার পর থেকে এখন পর্যন্ত লোকসানে থাকায় বিনিয়োগকারীদের ডিভিডেন্ড দিতে পারেনি।

শ্যামপুর সুগার: চামড়া খাতের ‘জেড’ ক্যাটাগরির কোম্পানি  শ্যামপুর সুগার অনুমোদিত মূলধন ৫০ কোটি টাকা এবং পরিশোধিত মূলধন ৫ কোটি টাকা।

অডিটরের মতে, প্রতিবছর কোম্পানিটির দায়, ঋণ ও সুদের পরিমাণ বাড়ছে।

কোম্পানিটির মোট ৫০ লাখ শেয়ারের মধ্যে সরকারি বিনিয়োগ রয়েছে ৫২.৬০ শতাংশ এবং সাধারণ বিনিয়োগকারীদের কাছে রয়েছে ৪৭.৪০ শতাংশ শেয়ার।

১৯৯৬ সালে পুঁজিবাজারে তালিকাভুক্ত হওয়া এ কোম্পানি সর্বশেষ ২০০০ সালে থেকে এখন পর্যন্ত লোকসানে থাকায় বিনিয়োগকারীদের ডিভিডেন্ড দিতে পারেনি।

ঝিলবাংলার: খাদ্য ও আনুসাঙ্গিক খাতের কোম্পানি ঝিলবাংলার অনুমোদিত মূলধন ৫০ কোটি টাকা এবং পরিশোধিত মূলধন ৬ কোটি টাকা। এর পুঞ্জিভুত লোকসানের পরিমান রয়েছে ১৭১ কোটি ৫৬ লাখ টাকা। কোম্পানিটির মোট ৬০ লাখ শেয়ারের মধ্যে সরকারের কাছে রয়েছে ৫১.৫০ শতাংশ, প্রতিষ্ঠানিক বিনিয়োগকারীদের কছে রয়েছে ০.৩৮ শতাংশ এবং সাধারণ বিনিয়োগকারীদের কাছে রয়েছে ৪৮.১২ শতাংশ শেয়ার।

১৯৮৮ সালে পুঁজিবাজারে তালিকাভুক্ত হওয়া এ কোম্পানি সর্বশেষ ২০০০ সালে থেকে এখন পর্যন্ত লোকসানে থাকায় বিনিয়োগকারীদের ডিভিডেন্ড দিতে পারেনি।

 

শেয়ারবাজারনিউজ/মু/ম.সা

আপনার মন্তব্য

*

*

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.

Top