আইপিও নিয়ে কি হচ্ছে!

Editorialপুঁজিবাজার সংশ্লিষ্টমহল প্রাথমিক গণ প্রস্তাবের (আইপিও) অনুমোদন নিয়ে যখন নানাধরনের অভিযোগ এবং অনিয়মের কথা বলছেন ঠিক সেই মুহূর্তে সকল প্রস্তুতি সম্পন্নের পরও দুটি আইপিও’র রহস্যজনক আকস্মিক স্থগিতের ঘোষণায় বিস্মিত এবং হতবাক হয়েছেন সাধারণ বিনিয়োগকারীরা।

তারা এখন বলে বেড়াচ্ছেন, প্রতিষ্ঠান দুটির আইপিও স্থগিত করায় তাদের এতদিনকার অভিযোগের বিষয়টিই সত্য বলে প্রমাণিত হয়েছে। তারা এতদিন বলে আসছিলেন, আইপিও অনুমোদনের নামে কোনো বাছবিচার কিংবা বিনিয়োগকারীদের স্বার্থ বিবেচনা না করেই বিভিন্নদিকের তদবির রক্ষা করতে অযোগ্য প্রতিষ্ঠানকে অযৌক্তিক প্রিমিয়াম ধরিয়ে দিয়ে কিংবা অনুপযুক্ত কোম্পানিকে আইপিওতে আসার সুযোগ করে দেয়া হচ্ছে।

তারা এও বলেছেন, বর্তমান বোর্ডের অনুমোদন দেয়া বহু কোম্পানি এখন বছর না ঘুরতেই ফেস ভ্যালুর নিচে চলে গেছে। এর মাধ্যমে সাধারণ বিনিয়োগকারীদের পকেট কেটে বড় ধরনের গচ্চার মধ্যে ফেলে দেয়া হয়েছে। কেন কোম্পানির আইপিও অনুমোদন দেয়া আবার কেনই-বা স্থগিত করা হলো সেটা বিচার বিশ্লেষণ করা কিংবা কোনো কোম্পানির পক্ষে বা বিপক্ষে লেখা অথবা যারা এগুলোর সাথে জড়িত তাদের সম্পর্কে কিছু বলাও আমাদের এই সম্পাদকীয়র মূল উদ্দেশ্য নয়।

আমাদের এই লেখার উদ্দেশ্য, বছরের পর বছর অপেক্ষায় রেখে দিনের পর দিন কোম্পানির সাথে যোগাযোগ রক্ষার মাধ্যমে বহু বাছ বিচার ও যাচাই বাছাই করে যে কোম্পানিগুলোর অনুমোদন দেয়া হলো সেটি মাত্র কয়েক ঘন্টার নোটিশে স্থগিত করে অনুমোদন কর্তৃপক্ষকে কি পরিমাণ বেইজ্জতি করা হয়েছে তা তুলে ধরা। কারণ এই দীর্ঘ সময় ধরে যারা এই কাজগুলো করেছেন তারা তাহলে সময়ক্ষেপণের নামে করলেনটা কি? তাহলে কি আমরা ওই বিনিয়োগকারীর কথাই সত্য ধরে নেবো, যিনি এর আগে বলেছিলেন, অনুমোদনের নামে এখন শুধু টাকা পয়সা বাট বাটোয়ারা হয়।

তিনি আরও বলছিলেন, এ কাজে যারা জড়িত তারা শুধু প্রাপ্তির হিসাব নিকাশ মেলান, কোম্পানির হিসাব নিকাশ মেলান না। আমরা এই বিনিয়োগকারীর কথা বিশ্বাস করিনি এবং এখনো করতে চাইনা। কিন্তু বাস্তবতা আমাদেরকে সেদিকেই ঠেলে দেয়। দুটি কোম্পানির ক্ষেত্রেই কর্তৃপক্ষীয় দায়িত্বশীল কর্মকর্তা বলেছেন, “অনিবার্য কারণবশত  আইপিও আবেদন স্থগিত করা হয়েছে। পরবর্তী নির্দেশনা না দেয়া পর্যন্ত আইপিও প্রক্রিয়া স্থগিত থাকবে”।

কিন্তু আমরা নানা মিডিয়ার মাধ্যমে বিশ্বস্ত সূত্রের বরাত দিয়ে যা জানতে পেরেছি তা হলো, মাত্র কয়েক ঘন্টা আগে হিসাব নিকাশের কিছু ভুল তথ্য অন্য কেউ কমিশনকে ধরিয়ে দেয়ায় তড়িঘড়ি করে আইপিও প্রক্রিয়া স্থগিত করা হয়েছে। আমাদের প্রত্যাশা ছিল স্বচ্ছতা প্রকাশের জন্য কমিশনের পক্ষ থেকে একটি বিবৃতি দিয়ে কেন এমনটি করতে হলো এবং এ জন্য কারা কারা দায়ী তাদেরকে সনাক্ত করে যথাপোযুক্ত শাস্তি দিয়ে সকল বিনিয়োগকারী এবং এতদসংশ্লিষ্ট সবাইকে আস্বস্ত করবে। কিন্তু অদ্যবধি সে ধরনের কোনো বিবৃতি না পেয়ে আজ অনেকটা বাধ্য হয়েই আমরা এ বিষয়ে সম্পাদকীয় লিখতে উদ্যোগী হয়েছি।

দীর্ঘদিন ধরে অনিয়মে ভরপুর কোনো প্রতিষ্ঠানকে সুপথে ফিরিয়ে আনতে আমাদের মতো একটি অনলাইন পত্রিকার একটি বা দুটি সম্পাদকীয়তে কোনো কাজ হবেনা এটা জেনেও আমরা লিখছি। সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানগুলোর অভিযুক্ত ব্যক্তিদের চোখ রাঙ্গানি কিংবা হয়রাণির আশঙ্কা সত্বেও আমরা বিনিয়োগকারীদের স্বার্থে লেখার ঝুঁকি নেই। এসব ক্ষেত্রে আমাদের প্রত্যাশা থাকে, যা হবার তাতো হয়েই গেছে পরবর্তীতে যেনো বিএসইসির মতো জাতীয় প্রতিষ্ঠাণগুলোর বিরুদ্ধে অনিয়মের অভিযোগ ওঠাতে না পারে।

কিন্তু দুর্ভাগ্যজনক হলেও সত্য, আইপিও সংক্রান্ত বিষয় নিয়ে বর্তমান বোর্ডের বিরুদ্ধে শুরু থেকেই বিনিয়োগকারীরা অভিযোগের আঙ্গুল তুলেছিল। একের পর এক নতুন নতুন আইপিওর অনুমোদন দিয়ে মৃত বাজারকে এক পর্যায়ে অচলাবস্থার দিকে নিয়ে যাওয়া হয়েছিল। বিনিয়োগকারীরা একসময় এর বিরুদ্ধে ক্ষোভ প্রকাশ করেছে, আনুষ্ঠানিক প্রতিবাদও জানিয়েছে। কিন্তু কোনো কাজ হয়নি। এমনকি ডিএসইর একজন সাবেক প্রেসিডেন্ট এবং বর্তমান ব্রোকারেজ হাউজ এসোসিয়েসনের কর্মকর্তা দায়িত্ব নিয়ে বলেছেন, “আইপিও অনুমোদনের ক্ষেত্রে বিএসইসি কখনোই আমাদের পাত্তা দেয়না। আমাদেরকে ফরমালি জানানো হয় কিন্তু আমরা যদি কোনো সুপারিশ করি সেটা তারা আমলে নেয়না”।

আমরা মনে করি ওই কর্মকর্তার এ অভিযোগটি বিএসইসির জন্য আরও গুরুতর। আমাদের জানামতে, বাজারে তালিকাভুক্তির পরদিন থেকে যুগযুগ ধরে কোম্পানিগুলোর সুফল কুফল উভয়টাই ভোগ করবেন এই ব্রোকাররা এবং তাদের ক্লায়েন্ট সাধারণ বিনিয়োগকারীরা। অথচ তাদেরকে কোম্পানি তালিকাভুক্তির ক্ষেত্রে কোনো গুরুত্বই দেয়া হবেনা এটি কিছুতেই গ্রহনযোগ্য নয়। এটিকে আঞ্চলিক ভাষায় বললে বিএসইসির অনেকটা ‘ড্যম কেয়ার’ ভাব বলা যায়। পরপর দুটি আইপিও স্থগিত হওয়ায় অনেক বিনিয়োগকারী বিএসইসির এ কর্মকে বিনিয়োগকারীদের লাশের ওপর দাড়িয়ে বিএসইসির ঔদ্ধত্বপূর্ণ আচরণ বলেও অভিহিত করেছেন। একটি সভ্য জাতির অর্থনীতিকে নিয়ে এভাবে কেউ খেলবেন আর দেশের সব মানুষ তা তাকিয়ে তাকিয়ে দেখবে এটা দীর্ঘ সময় ভাবা ঠিক নয়। দ্রুত এর পরিবর্তন আবশ্যক। আমরা প্রত্যাশা করি ক্ষমতাবানরা নিজেরাই শুধরে যাবেন। আর এমনটি না হলে দেশের মানুষ যদি গর্জে ওঠে অভিযুক্তরা পালিয়ে যেতেও পথ পাবেনা এটাই ইতিহাস।

 

 

আপনার মন্তব্য

*

*

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.

Top