পুঁজিবাজার ট্রাইব্যুনাল নিয়ে চেয়ারম্যান কি ভাবছেন

Editorialপুঁজিবাজার বিষয়ক আদালত প্রতিষ্ঠার পর ইতিমধ্যে তিনটি মামলার রায় হয়ে গেছে। রায়ে প্রায় প্রত্যেকটি মামলার ফলাফল গেছে বিনিয়োগকারীদের পক্ষে। এ সংক্রান্ত খবরা খবর প্রকাশের পর অভিযুক্ত এবং কারসাজি চক্র বিশেষ করে বাংলাদেশের পুঁজিবাজার নিয়ে যারা খেলাধুলা করেন তারা একটু নড়েচড়ে বসেছেন। হিসাব কষে পা বাড়াচ্ছেন বাজারের দিকে। আর বিলম্বে হলেও ন্যায় বিচারের প্রত্যাশায় বুক বাধছেন ভুক্তভোগী ক্ষতিগ্রস্ত বিনিয়োগকারীরা। এই সম্পাদকীয়টি যেদিন প্রকাশ পাবে সেদিনও পুঁজিবাজার বিষয়ক আদালতে বহুল আলোচিত’৯৬ কেলেঙ্কারির মামলার শুনানি হওয়ার কথা রয়েছে।

খবরে প্রকাশ এই মামলায় বিবাদী পক্ষের যিনি আইনজীবী তিনি বাংলাদেশের একজন স্বনামধন্য ব্যারিস্টার। তিনি বিবাদীদের কাছ থেকে প্রতি উপস্থিতির জন্য পাচ্ছেন এক লাখ টাকার ওপরে। আর বিনিয়োগকারীদের পক্ষে অর্থাৎ বিএসইসি নিয়োজিত আইনজীবী প্রতি উপস্থিতিতে পাচ্ছেন মাত্র পাঁচশত টাকা। বিবাদীরা চাহিবার আগেই ব্যারিস্টার সাহেবকে সকল প্রকার ডিড ডকুমেন্ট কাগজপত্র এবং অন্যান্য দ্রব্যাদি তার সামনে হাজির করেন। আর বাদী পক্ষের আইনজীবী দিনের পর দিন ঘুরেও বিএসইসি থেকে প্রয়োজনীয় কাগজপত্রের সরবরাহ পাননা বলে অভিযোগ পাওয়া গেছে। এর চেয়েও আরেকটি গুরুতর অভিযোগ বিনিয়োগকারীদের উদ্বিগ্ন করে তুলেছে এমনকি ভাবিয়ে তুলেছে সংবাদ কর্মীদেরও। বিষয়টি হলো:বিবাদী পক্ষের লোকজন এমনকি অভিযুক্ত ডিএসইর সাবেক প্রেসিডেন্টসহ বিগ ভলিউমের ব্যক্তিবর্গও আদালতে উপস্থিত থেকে সার্বক্ষনিক সঙ্গ দেন ব্যারিস্টার সাহেবকে। প্রয়োজনীয় পরামর্শ ও তথ্য সরবরাহ করে মামলার কাজকে এগিয়ে দেন বিবাদীরা। পক্ষান্তরে বাদী পক্ষের আইনজীবী মাসের পর মাস ঘুরেও বিএসইসির চেয়ারম্যানের সাক্ষাত পাননা। মামলা পরিচালনার জন্য প্রয়োজনীয় পরামর্শ এবং সিদ্ধান্ত জানাতে কিংবা সিদ্ধান্ত গ্রহণ করতে প্রতিষ্ঠানটির শীর্ষ ব্যাক্তিদের কাজে লাগাতে পারেন না। ফলে প্রায়শই বিচারকের কাছ থেকে ভৎসনার শিকার হন তিনি। আদালতে দাড়িয়ে তিনি বলতেও পারছেন না যে তিনি তার ক্লায়েন্টের কাছ থেকে না পাচ্ছেন আর্থিক সাপোর্ট আর না পাচ্ছেন আনুষঙ্গিক সহযোগিতা। যে কারনে প্রমানিত হয় বিএসইসির আইনজীবী অযোগ্য এবং মামলায় লড়ার জন্য অনুপযুক্ত। আদালতে উপস্থিত সাংবাদিকদের মুখে শোনা, বিএসইসির আইনজীবীকে সম্মানিত বিচারক মহোদয় এমন প্রশ্নও করেন যে, তিনি কি তার(বিচারকের) কথাগুলো এবং চেয়ারম্যানকে জিজ্ঞাস্য বিষয়গুলো তার(চেয়ারম্যান) পর্যন্ত পৌছাতে অক্ষম?

যেসব বিনিয়োগকারী নিয়মিত গত কয়েকদিন আদালতে উপস্থিত থেকেছেন, তাদের প্রায় সকলেই বলেছেন, যে সমস্ত মামলায় বিবাদী পক্ষের সরব উপস্থিতি থাকবে তার সবগুলোতেই তারা বিজয়ী হবে। তারা জানান, চিক টেক্সটাইল মামলায় বিবাদীরা অনুপস্থিত থাকার জন্যই শুধুমাত্র তাদের সাজা হয়েছে। এ ক্ষেত্রে তারা সবাই বিএসইসির চেয়ারম্যান এবং তার পরিষদকেই অভিযুক্ত করছেন। অনেকেই বলছেন, বিএসইসির নির্লিপ্ততায় এবং অসহযোগিতায়ই যুগ যুগ ধরে মামলাগুলোর নিস্পত্তি হয়নি। এতদিন এ বিষয়টি পরিস্কার না হলেও এখন চোখের সামনে মামলা লড়ার ক্ষেত্রে আইনজীবীকে সহযোগিতা না করার ব্যাপারটি প্রকাশ হওয়ায় এযাবতকালের সব ঘটনার জন্য বিনিয়োগকারীরা অনেকটা বাধ্য হয়েই তাদেরকে দুষছেন।

সংবাদ পত্রের নীতিমালা অনুযায়ী এ অভিযোগগুলোর ব্যাপারে লেখার আগে একটু যাচাই বাছাইয়ের দরকার ছিলো। কিন্তু আমি নিজে এ ব্যাপারে এত বেশি ভূক্তভোগী যে চেয়ারম্যানের সাথে সাক্ষাতকার না পাওয়ার কথা শুনেই বিশ্বাস হয়েছে। ২০০৯-২০১০ সালে শেয়ার বাজার সংক্রান্ত একটি বাংলা কাগজে কাজ করার সময় তৎকালীন চেয়ারম্যানের একটি সাক্ষাতকার আনতে গিয়ে আমার তিক্ত অভিজ্ঞতা হয়েছে তাতেই আমি বুঝতে পারছি চেয়ারম্যানের কাছ থেকে সময় পাওয়া কত ভাগ্যের ব্যাপার।

এই সমস্ত প্রতিষ্ঠানের চেয়ারে বসার আগ পর্যন্ত চেয়ারম্যানরা অনেকটা সহজলভ্য থাকেন। টিচার হিসাবে কিংবা অন্য পেশায় থাকাকালীন যারা ছাত্র শিক্ষক কিংবা গণমানুষের নাগালের মধ্যে থাকেন তারা বিএসইসির মত সরকারী প্রতিষ্ঠানের চেয়ারে বসলেই দুর্লভ হয়ে পড়েন। মাঝে মাঝেই শুনতে পাই, বিএসইসির ফ্লোরগুলোতে সাংবাদিকদের প্রবেশে কড়াকড়ি আরোপ করা হয়েছে। চেয়ারম্যানের ফ্লোরে সাধারণ মানুষতো দূরে সাংবাদিকদেরই ঢুকতে দেয়া হয়না। অনেকেই মনে করেন আমলাতন্ত্রের একটি দুষিত চক্র শিক্ষক কিংবা অর্থনীতিবিদরা চেয়ারম্যান হলেই এদের বোঝান, সাংবাদিক এবং সাধারণ মানুষদের কাছ থেকে দূরে থাকতে হবে। তাহলেই শুধুমাত্র আপনার চেয়ারখানি এখানে পাকাপোক্ত হবে। আপনি হবেন আজীবনের চেয়ারম্যান। আর এই টোপে পড়েই উদার মানুষগলো কঠিন হয়ে যান সাংবাদিকসহ অন্যান্য মানুষের কাছে। শুনেছি জান্নাতে আদম আ: কে ইবলিশ পরামর্শ দিয়েছিল, আপনাকে আল্লাহ এখান থেকে বের করে দিবেন। আপনি যদি দীর্ঘস্থায়ীভাবে এখানে  বসবাস করতে চান তাহলে ওই নিষিদ্ধ ফলটি খান। আল্লাহর নিষেধাজ্ঞা জেনেও আদম আ: সে ফলটি খেয়েছিলেন। তার পরিনতি যেমন আমাদের সবার জানা তেমনি, আমলাদের পরামর্শে যারা নিজেদের দূরে রাখেন তাদের ইতিহাসও এই বিএসইসি থেকেই আমরা অনেক দেখেছি। কিন্তু আফসোস এই ইতিহাস থেকে শিক্ষা নেননা চেয়ারম্যানরা।

এর পরও আমরা এখনো হতাশ হইনি। আমাদের বিশ্বাস আজ না হোক কাল আইনজীবী মহোদয় অবশ্যই চেয়ারম্যানের নাগাল পাবেন। কারণ লক্ষ লক্ষ বিনিয়োগকারী চেয়ে আছেন আদালতে মামলা লড়তে গিয়ে আইনজীবী চেয়ারম্যানের কতটুকু সহযোগিতা পান সেদিকে। এর বাইরে যে সমস্ত কোম্পানির কাছ থেকে জরিমানা আদায় করা হচ্ছে সেই জরিমানা আদায় করে কিভাবে বিনিয়োগকারীদের মধ্যে বন্টন করা যায় তা নিয়েও আদালতের মধ্যস্ততায় চেয়ারম্যানকেই সিদ্ধান্ত নিতে হবে। শুনেছি, চেয়ারম্যানের উদাসিনতার বিষয়টি মাননীয় আদালতও নাকি জেনেছেন। তিনি নাকি বিএসইসির আইনজীবীকে বলেছেন, “আমরা চেয়ারম্যানকে এখানে এনে দাঁড় করিয়ে রাখতে পারি। আদালতের এ এখতিয়ার আছে। কিন্তু আমরা সেই ক্ষমতা প্রয়োগ করতে চাইনা। বরং আপনি (আইনজীবী) মামলাগুলো নিয়ে যতদ্রুত সম্ভব তার সাথে বসে আলোচনা করুন। এভাবে অপ্রস্তুত এবং অপূর্নাঙ্গ অবস্থায় আদালতে দাঁড়িয়ে লাভ নেই”। আদালতের এই ভাষার সাথে আমরাও সুর মিলিয়ে বলবো, দয়া করে চেয়ারম্যান মহোদয় এবার একটু বিনিয়োগকারীদের পক্ষে নামুন। বিশ্বাস রাখবেন, সাংবাদিক এবং সাধারণ বিনিয়োগকারীরা আপনার মেয়াদকে যতখানি দীর্ঘস্থায়ী করতে পারবে আপনার চারপাশের লোকজন কিন্তু ততখানি পারবে না। বরং আপনি বিপদে পড়লে তারা যে কত বড়  পলটি মারবে তা আপনি চিন্তাও করতে পারছেন না। আমরা কিন্তু সে দৃশ্য দেখেছি।

আপনার মন্তব্য

One Comment;

*

*

Top