জিততে হলে জানতে হবে, শিখতে হবে, মানতে হবে

benjamin-graham-1নতুন কোম্পানির শেয়ার অন্তর্ভূক্তির দিনেই বাজার অস্থিতিশীল হবে। সাম্প্রতিক সময়ে প্রায় নিয়মে দাঁড়িয়ে যাওয়া অবস্থার এবারও কোন পরিবর্তন ঘটেনি। দুই একটি ব্যতিক্রম ছাড়া প্রতিটি শেয়ারই ব্যপক প্রত্যাশা সৃষ্টি করে বাজারে অভিষিক্ত হয় এবং দুই-চার দিন রাজত্ব করেই তাদের সঞ্জিবনী শক্তি নিঃশেষিত হয়। প্রত্যাশার বেলুন মাঝ আকাশে বার বার ফুট হয়ে যাবার পরেও আমাদের বধদয় হয় না। ন্যাড়া এক বারের বেশি বেল তলায় না গেলেও আমরা অত্যুসাহী ক্ষুদ্র বিনিয়োগকারীগন একই ঘটনার পুনরাবৃত্তি করছি দিনের পর দিন। পূঁজি হারিয়ে হা-হুতাস করলেও আমাদের শিক্ষা হচ্ছে না।

কোন শেয়ারের দাম বাড়তে দেখলেই আমাদের ক্ষদ্র বিনিয়োগকারীরা অস্থির হয়ে পড়ে। হাতে যেহেতু ক্যাশ নাই সেহেতু অন্য শেয়ার বিক্রি করে কার আগে কে নতুন শেয়ার বগলদাবা করবে সেই প্রতিযোগীতায় লিপ্ত হয়। ফলে পুড়নো শেয়ারের মূল্য পতন আর নতুন শেরারে উর্ধগতি দুটিই হয় লাগাম ছাড়া। আর ফলাফলও যেন পূর্বনির্ধারিত –টাকার হিসেবে লেনদেন বাড়লেও ইনডেক্সের বড় পতন। একই নাটক আমরা এবারও মঞ্চস্থ হতে দেখলাম গত ১লা সেপ্টেম্বর, আমান ফিডের অভিষেক ঘিরে একই অদ্ভুতুড়ে অবস্থা।

‘ফিক্সড প্রাইস’ পদ্ধতিতে লিস্টেড হওয়া কোম্পানিগুলর উদ্যগতা -পরিচালকদের শেয়ার লক-ইন থাকে ৩ বছর আর ইন্সটিটিউট গুলর জন্য বরাদ্ধকৃত শেয়ার সমূহ লক-ইন থাকে ১ বছর। ফলে ক্ষুদ্র বিনিয়োগকারীদের জন্য বরাদ্ধকৃত সল্প সংখ্যক শেয়ারের কৃত্তিম চাহিদা সৃষ্টি করা গেলেই দাম বাড়ানো সম্ভব। কিছু আইপিও শিকারী কুচক্রী মহলের গুজব, ক্ষুদ্র বিনিয়োগকারীদের অজ্ঞতা ও দ্রুত মুনাফা করার লোভ সামলাতে না পারার কারনেই একই ঘটনা বারংবার ঘটে চলেছে।

আমাদের ক্ষুদ্র বিনিয়োগকারীগন কতটা অসচেতন তা নিচের পয়েন্টগুল বিবেচনা করলেই অনুধাবন করা সম্ভবঃ

  • একটি শেয়ার থেকে বিনিয়োগকারীগন নূন্যতম ১০% মুনাফা করতে চায়।এখন ১০% লসে এক শেয়ার বিক্রি করে অন্য শেয়ার থেকে ১০% মুনাফা করতে হলে আপনাকে আসলে মোট ২০% এর বেশি মুনাফা করতে হবে। যাতে আগের ১০% ক্ষতি কাটিয়ে ১০% মুনাফা হয়। এর সাথে যোগ হবে তিন বার বিক্রয়-ক্রয়-বিক্রয় করার ব্রোকার কমিশন। নতুন একটি শেয়ার থেকে অল্প দিনে ২০-২২% লাভ করা সবার পক্ষে অসম্ভব। যদি না আপনি তুলানা মূলক কম দামে প্রথম দিকেই শেয়ায়রটি কিনতে না পারেন।
  • কোম্পানির পরিচালকগন এতটা বোকা নয় যে তারা নিজেদের লাভ বুঝতে পারবেন না। তাঁরা যেখানে ইস্যু মূল্যে নিজ কোম্পানির শেয়ার আইপিওতে বিক্রি করে দিয়েছে, সেখানে ইস্যু মূল্যের ২/৩ গুন বেশি দামে সেকেন্ডারী মার্কেট থেকে শেয়ার কিনে আপনি কতটা লাভ করতে পারবেন?
  • শেয়ার মার্কেটে বিনিয়োগ মানেই ঝুঁকি গ্রহণ। কতটুকু ঝুঁকি গ্রহণযোগ্য আর কতটুকু ঝুঁকি বিপদজনক এই মাত্রা জ্ঞান না থাকার কারনেই অনেকে অযৌক্তিক মূল্যে নতুন শেয়ার কেনেন এবং বিপদে পড়েন। এর পর আপনি বেকুব হবেন না বুদ্ধিমান প্রমানিত হবেন – তা নির্ভর করে, আপনি ২য় কোন বেকুবকে শেয়ারগুল গছিয়ে দিতে পেরেছেন কি না তাঁর উপর।

 

এই অসচেতনতার মূলে রয়েছে আমাদের কোন শেয়ারর অন্তরনিহীত মূল্য (Intransic Value) যাচাই করতে না পারার অক্ষমতা। কোন শেয়ারর অন্তরনিহীত মূল্য যাচাই করা কষ্ট সাদ্ধ কাজ কিন্তু অসম্ভব নয়। ১৫-২০ মিনিটের চেষ্টায় আপনি কোন শেয়ারর অন্তরনিহীত মূল্য সম্পর্কে ধারনা করতে পারেন। যত অনুশীলন করবেন ততই নির্ভূল হবে আপনার এই পূর্বানুমান।  এই কাজটি আপনি করতে পারেন দুই ভাবে-

  • কোম্পানির ফান্ডামেন্টাল এনালাইসিস করে।
  • রিলেটিভ মার্কেট এনালাইসিস করে।

ফান্ডামেন্টাল এনালাইসিসঃ নতুন কোম্পানি লেনদেনের ২/১ দিন আগে অথবা শুরুর দিনেই তাদের সর্বশেষ আয় প্রকাশ করে। সেখান থেকে NAV ও EPS এর তথ্য সংগ্রহ করুন। এবার EPS থেকে বাৎসরিক EPS হিসেব করুন,সাধারন ঐকিক নিয়মেই এটা করা সম্ভব। এবার বাৎসরিক EPS থেকে PE হিসেব করে ফেলুন।

৩ মাসের EPS * ৪ = বাৎসরিক EPS
৬ মাসের EPS * ২ = বাৎসরিক EPS
৯ মাসের EPS * ১.৩৩ = বাৎসরিক EPS

PE = Market Price /Annual EPS

ভ্যালু ইনভেস্টমেন্টের জনক ব্যাঞ্জামিন গ্রাহাম (তিনি আবার বিনিয়োগ গুরু ওয়ারেন বাফেটের শিক্ষক) এর মতে একটি শেয়ার তখনি বিনিয়োগযগ্য যখন নিচের দুইটি শর্ত পূরন হবে-

  • শেয়ার মূল্য NAV এর ১.৫ গুন বা তার কম।
  • শেয়ার মূল্য বাৎসরিক EPS এর ১৫ গুন বা তার কম।

অর্থাৎ ব্যাঞ্জামিন গ্রাহামের মতে সর্বোচ্চ বিনিয়োগযোগ্য মূল্য হতে পারে Square Root (1.5*NAV*15*EPS) = Square Root (22.5*NAV*Yearly EPS)
উদাহরণ স্বরূপঃ ২০ টাকা NAV ও ৩ টাকা বাৎসরিক EPS এর একটি কোম্পানির সর্বোচ্চ বিনিয়োগযোগ্য মূল্য সীমা Square Root (22.5*20*3) = ৩৬.৭ টাকা। ৩৬.৭ এর চাইতে যত বেশি দামে আপনি ঐ শেয়ার কিনবেন, আপনার বিনিয়োগ ঝুঁকি তত বাড়বে।

রিলেটিভ মার্কেট এনালাইসিসএঃ এই পদ্ধতি আপনাকে মার্কেটের সাথে নতুন শেয়ারের মূল্যের একটি তুলনামূলক চিত্র প্রদান করবে। যে কোন দৈনিক পত্রিকা থেকেই আপনি মার্কেটের বর্তমান PE ও খাত ভিত্তিক PE এই দুটি তথ্য পাবেন। উদাহরণ স্বরূপ – ধরুন মার্কেটের বর্তমান PE ১৭ আর বস্ত্র খাতের PE ১৪। এখন বাজারে আসা নতুন কোম্পানিটি যদি বস্ত্র খাতের হয় তবে আপনি মার্কেট ও সেক্টর PE এর মধ্যে যেটি ছোট তার সমান PE হয় এমন মূল্যে শেয়ারটি কিনতে চাইবেন। অর্থাৎ ১৭ ও ১৪ এর মধ্যে যেহেতু ১৪ ছোট তাই আপনি নতুন আসা শেয়ারটি এমন দামে কিনবেন যেন কোন ভাবেই নতুন শেয়ারের PE ১৪ এর বেশি না হয়।

পরিশেষে আবারো ব্যাঞ্জামিন গ্রাহামের একটি উক্তি দিয়ে আজকের লেখা শেষ করছি – “If you are shopping for common stocks, chose them the way you would buy groceries, not the way you would buy perfume.”  সাধারন একটি শেয়ার কেনার ক্ষেত্রে,শখের পারফিউম কেনার মত নয় বরং কাঁচা বাজারে সবজি কেনার মত করে দর-দাম করুন। শেয়ার কেনার সময় জিততে না পারলে বিক্রি করেও জেতা সম্ভব নয়। শেয়ারের অন্তর্নিহীত মূল্য বুঝে দাম হাকুন,আপনার বিনিয়োগকে নিরাপদ রাখুন।
মোহাম্মদ হাসান শাহারিয়ার

ক্ষুদ্র বিনিয়োগকারী, ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জ

আপনার মন্তব্য

*

*

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.

Top