রাজনৈতিক পরিস্থিতি স্বাভাবিক হলেই বাজার ভালো হবে: শাকিল রিজভী

Sakil-Rizviবর্তমানে পুঁজিবাজারে নেতিবাচক প্রভাব পড়ার প্রধান কারণ হচ্ছে রাজনৈতিক অস্থিতিশীলতা। হরতাল-অবরোধের কারণে উৎপাদিত পণ্য ঠিকমতো শিপমেন্ট হতে পারছে না। এতে কোম্পানিগুলোর আর্থিক প্রতিবেদনে নেতিবাচক চিত্র ফুটে উঠবে। যার প্রভাব পুঁজিবাজারে পড়ছে। রাজনৈতিক সংকট কেটে গেলেই বাজার স্থিতিশীল পর্যায়ে চলে আসবে বলে মনে করেন ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জের (ডিএসই) সাবেক প্রেসিডেন্ট ও ডি-মিউচ্যুয়ালাইজড এক্সচেঞ্জের শেয়ারহোল্ডার পরিচালক মো: শাকিল রিজভী। শেয়ারবাজার নিউজ ডটকমের সঙ্গে একান্ত সাক্ষাতকারে তিনি এসব কথা বলেন । পাঠকদের উদ্দেশ্যে নিম্নে তার সাক্ষাতটির চুম্বক অংশ তুলে ধরা হলো।

শেয়ারবাজার নিউজ ডটকম : ডি-মিউচ্যুয়ালাইজড এক্সচেঞ্জ হওয়ার পর মেম্বারদের অংশগ্রহন অনেক কমে গেছে । অন্যদিকে দ্বিতীয়বারের মতো আপনি শেয়ারহোল্ডার পরিচালক হিসেবে নির্বাচিত হয়েছেন । আপনার অনুভূতি সম্পর্কে কিছু বলুন।

শাকিল রিজভী : আগে ডিএসইর বোর্ডে যেখানে মেম্বার থেকে ১২ জন পরিচালক করতো সেখানে ডি-মিউচ্যুয়ালাইজড হওয়ার পর এখন ৪ জন করা হয়েছে। এখানে আমাদের অংশগ্রহণ অনেক কমে গেছে। সদস্যদের কাছে মনে হয়েছে যে এই বোর্ডে আমার থাকা প্রয়োজন। তাই ২০১৪ সালের নির্বাচনে আমি প্রথম হিসেবে নির্বাচিত হই। এখন যেহেতু আইন অনুযায়ী একজনকে অবসর নিতে হবে। তাই এক পর্যায়ে আমি অবসরে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছিলাম। কিন্তু হাউজ মেম্বারদের অনুরোধে আমি পুনরায় নমিনেশন পেপার সংগ্রহ করি। শুধুমাত্র আমি প্রার্থী হওয়ায় ডি-মিউচ্যুয়ালাইজড এক্সচেঞ্জের শেয়ারহোল্ডার পরিচালক হিসেবে দ্বিতীয়বারের মতো নির্বাচিত হয়েছি।

শেয়ারবাজার নিউজ ডটকম : ২০১০ সালের শেয়ারবাজার ধসের সূত্রপাতটা আসলে কিভাবে হয় ?

শাকিল রিজভী : ২০১০ সালে ব্যাংকগুলোর বিনিয়োগ মাত্রাতিরিক্ত বেড়েছিল। এতে সূচক অনেক বেড়ে যায় । তা দেখে বিনিয়োগকারীরাও ছুটে আসে। পরবর্তীতে বিশ্ব ব্যাংক ও আইএমএফের চাপে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের নির্দেশে ব্যাংকগুলো বিনিয়োগ কমিয়ে দিয়েছে। তা আস্তে আস্তে করা হয়নি। একবারে করা হয়েছে বিধায় ধসটা নামে।

শেয়ারবাজার নিউজ ডটকম : আপনি দায়িত্বে থাকাকালীন অবস্থায় মার্কেটের অবস্থা সম্পর্কে কিছু বলুন।

শাকিল রিজভী : বাজার কিন্তু কে লাভ করেছে কে লস করেছে সেটা বিবেচনা করে না। মূলত সামষ্টিক বাজারের কি অবস্থা সেটা দেখতে হবে। ২০১৩ ডিসেম্বর বাজার মূলধন ছিল ২ লাখ ৫৩ হাজার কোটি টাকা। ২০১৪ সালের ডিসেম্বরে বাজার মূলধন দাঁড়িয়েছে ২ লাখ ৯৪ হাজার কোটি টাকা। অর্থাৎ এক বছরে বাজার মূলধন ১৬ শতাংশ বেড়েছে। মার্কেট পরিসংখ্যান উন্নতির দিকে অগ্রসর হচ্ছে। টার্নওভার ২০১৩ সালে ছিল ৮৫ হাজার কোটি টাকা । সেটা বেড়ে গিয়ে ১ লাখ ২৫ হাজার টাকায় দাঁড়িয়েছে। এর মধ্যে কোনো সময়ে বেড়েছে আবার কমেছে। ব্রড ইনডেক্স ছিল ৪ হাজার ২৬৬ পয়েন্ট। সেটা বেড়ে গিয়ে দাঁড়িয়েছে ৪ হাজার ৮৬৪ পয়েন্টে। আমি যখন ২০১৪ সালের ফেব্রুয়ারিতে ডিএসইর পরিচালক হয়ে আসলাম তখন সূচক ছিল ৪২৫০ পয়েন্টে। আবার ২০১৫ সালের জানুয়ারিতে যখন অবসর নিলাম তখন ইনডেক্স ৪৮০০ পয়েন্ট। এ সময়ের মধ্যে মার্কেটের পরিধি অনেক বেড়েছে।

শেয়ারবাজার নিউজ ডটকম : বর্তমান বাজার পরিস্থিতিকে আপনি কিভাবে মূল্যায়ন করছেন ?

শাকিল রিজভী : বর্তমানে রাজনৈতিক অস্থিরতা শেয়ারবাজারের ওপর পড়ছে। পণ্য ঠিকমতো শিপমেন্ট হচ্ছে না। ফ্যাক্টরীগুলো ঠিকমতো চলতে পারছে না। সবাই আতঙ্কের মধ্যে রয়েছে। এতে তাদের আর্থিক প্রতিবেদনে নেতিবাচক প্রভাব পড়বে। আর এক্ষেত্রে তাদের শেয়ার দরেও নেতিবাচক প্রভাব পড়াটাই স্বাভাবিক। তবে বর্তমানে দেশের যে পরিস্থিতি এই পরিস্থিতি অনুযায়ী শেয়ারবাজার অনেক ভালো অবস্থানে রয়েছে। মার্কেট ফান্ডামেন্টাল অনেক ভালো রয়েছে। এখানে ভয়ের কিছুই নেই।

শেয়ারবাজার নিউজ ডটকম : বাজার স্বাভাবিক হবে কবে ?

শাকিল রিজভী : ডিমিউচ্যুয়ালাইজড এক্সচেঞ্জ ৪ হাজার ২৫০ থেকে শুরু হয়েছে। যা এখনো ভালো পর্যায়ে রয়েছে। রাজনৈতিক পরিস্থিতি ভালো হলেই ইনডেক্স অনেক দূর এগিয়ে যাবে।

শেয়ারবাজার নিউজ ডটকম : প্রাইমারি মার্কেটতো অনেক গতিশীল। এ সম্পর্কে আপনার অভিমত কি ?

শাকিল রিজভী : বর্তমানে একটু বেশি আইপিও অনুমোদন দেয়া হচ্ছে। বর্তমান বাজারের জন্য সেটি ক্ষতিকর। তবে বাজারের জন্য যতটুকু প্রয়োজন ততটুক আইপিও অনুমোদন দেয়া উচিত। বেশিও না আবার কমও নয়। অনেক ভালো কোম্পানি রয়েছে। যেগুলোকে বাজারে আনা উচিত।

শেয়ারবাজার নিউজ ডটকম : ওটিসির ভোগান্তি যেন শেষই হচ্ছে না। এ মার্কেট নিয়ে কোনো পরিকল্পনা আছে কি ?

শাকিল রিজভী : ওটিসি নিয়ে আমাদের পরিকল্পনা রয়েছে। এখন নতুন সফটওয়্যার তৈরি হয়েছে। বোর্ড এ নিয়ে কাজ করছে। আশা করা যায় ওটিসির ভোগান্তি লাঘব হবে।

শেয়ারবাজার নিউজ ডটকম : সংকোচনশীল মুদ্রানীতি কিভাবে শেয়ারবাজারের ওপর প্রভাব ফেলে?

শাকিল রিজভী : আসলে পুঁজিবাজার বান্ধব মূদ্রানীতি বলতে এক কথায় সংকোচনশীল মুদ্রানীতিকে বুঝায় । বাজারে ফ্লোটিং টাকাকে কমিয়ে আনা হয়। এতে বাজারে অর্থের প্রবাহ কমে যায় । সেখানে জিনিষ পত্রের দাম কম থাকে। টাকাটা মূল্যবান হয়। তখন সব জায়গায় এর প্রভাব পড়ে। এক্ষেত্রে পুঁজিবাজারে শেয়ারের দামের ক্ষেত্রেও এর প্রভাব পড়ে। মূদ্রানীতি দেশের ১৬ কোটি মানুষের কথা চিন্তা করে তৈরি করা হয়ে থাকে। তবে সবকিছু মাথায় রেখেই মূদ্রানীতি প্রণয়ন করতে হবে । ধীরে ধীরে বাংলাদেশ এক্সপোর্ট ওরিয়েন্টেড কান্ট্রি হচ্ছে। যদি আগে ১০০ কোটি টাকা আমদানী হতো সেখানে রপ্তানি হতো মাত্র ৫ কোটি টাকা । মানে পার্থক্য ছিল প্রায় ৯৫ শতাংশ ।দিন দিন এর পরিমাণ কমে আসছে। এখন মনে করেন আমার একটি গার্মেন্টস আছে ।আমি ১০ কোটি টাকার মাল রপ্তানি করেছি। সেখানে আমার মুনাফা ৫০ লাখ টাকা হয়েছে। এটাকে কিন্তু বাংলাদেশ ব্যাংক সংকোচন করতে পারে না । সংকোচন করে আসলে ব্যাংকের টাকা। ব্যাংকের সিআরআর,এসএলআর বাড়িয়ে দেয়া হয়। এতে ব্যাংকগুলোর তারল্যে ঘাটতি পড়ে যায়। ফলে ব্যাংকগুলো বেশি লোন দিতে পারে না। যাকে লোন দিয়েছে তাকে ঋণ পরিশোধের চাপ দেয়া হয়।

শেয়ারবাজার নিউজ ডটকম : সর্বশেষে বিনিয়োগকারীদের জন্য কিছু বলুন।

শাকিল রিজভী : শেয়ারবাজারের প্রতি আস্থা রেখে বিনিয়োগ করার জন্য বিনিয়োগকারীদের কাছে আমার পরামর্শ থাকবে। বিনিয়োগের ক্ষেত্রে সতর্কতার কোনো বিকল্প নেই। বিভিন্ন কর্মশালার আয়োজন করা হচ্ছে। সেখানে নানাভাবে বিনিয়োগকারীদের প্রশিক্ষিত করে তোলা হচ্ছে।আমাদের সাথে সাথে আপনাদের মতো অন্যান্য স্টেক হোল্ডাররাও যদি প্রশিক্ষণ কিংবা কর্মশালা আয়োজনের ব্যাপারে এগিয়ে আসে তাহলে বাজারের জন্য উপকারী হবে। আর বর্তমান বাজার নিয়ে আতঙ্কের কিছুই নেই। রাজনৈতিক অস্থিরতা কেটে গেলেই বাজার স্বাভাবিক হয়ে উঠবে।

 

শেয়ারবাজার/সা/অ

আপনার মন্তব্য

*

*

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.

Top