সূচকের এক পয়েন্ট পতনে বুকে একটি সেল বিদ্ধ হচ্ছে

Editorialপ্রতিদিনই সূচক পড়ছে। রোববার পড়লো প্রায় ৬০ পয়েন্ট। আগের কার্যদিবসে ৯ পয়েন্ট আর বুধবার পড়েছে ৪০ পয়েন্ট। একেকটি পয়েন্টের পতন যেনো বিনিয়োগকারীদের বুকে একেকটি সেলের মতো বিদ্ধ হচ্ছে। শেয়ার বাজারে ব্যবসা করে যারা জীবনযাপন করছেন শুধু তারাই নন যারা কষ্টে শিষ্টে কিংবা ধারদেনা করে গত ৫ বছর ধরে এখানে বিনিয়োগ করছেন তাদের অনেকেই শারিরিকভাবে কাবু হয়ে পড়েছেন। ৫ বছরেই যেনো তাদের বয়স ২০ বছর এগিয়ে গেছে।

ক্ষুদ্র বিনিয়োগকারীদের অতি পরিচিত মিজান ভাই গত সপ্তাহে শেয়ার বাজার নিউজ অফিসে এসেছিলেন। তাকে যেনো চেনাই যায়নি। জিজ্ঞেস করলাম অসুস্থ হয়েছিলেন কিনা। তিনি নিরুত্তর থেকে জানালেন,হাউজ তার হাতে থাকা ৪০ লাখ টাকার শেয়ার ১০ লাখ টাকায় ফোর্স সেল করে দিয়েছে। কর্তৃপক্ষ এতোদিন ধৈর্য ধরে ছিল। তিনি আস্তে আস্তে ঋণের টাকা শোধ করে দিবেন বলেছিলেন কিন্তু তা না পারায় গত সপ্তাহে তার পোর্টফোলিও ফাঁকা করে দেয়া হয়েছে। দুশ্চিন্তায় একেবারেই ভেঙ্গে পড়েছেন তিনি।

আমার ঘনিষ্ট একজন ট্রেক হোল্ডার (ডিএসইর মেম্বার) পরিবারসহ কানাডায় সেটেল্ড। হঠাৎ সেদিন খবর পেলাম তিনি গত ৬ মাস ধরে ঢাকায় নিয়মিত অফিস করছেন। জানতে পারলাম, লেনদেন না হওয়ায় ঢাকার বাইরের অধিকাংশ শাখা তিনি গুটিয়ে ফেলেছেন। ডিএসই ভবনের হাউজ থেকে অধিকাংশ জনবল ছাঁটাই করেছেন। এবং এখন চিন্তা করছেন সবকিছু বিক্রি করে দিয়ে একবারেই চলে যাবেন কিনা। তার সেই হাউজটিতে আমি কখনো গেলে সবাইকে দেখেছি উচ্ছ্বাসে ভরপুর সেখানেই গত সপ্তাহে গিয়ে আমি দেখেছি সবাই যেনো বেদনাক্লিষ্ট রোগাক্রান্ত এবং দুশ্চিন্তাগ্রস্ত।

আমার বন্ধু শাহরিয়ার ভাই যাকে এক মাস ধরে (৩০ দিন) ফোন করলে তিনি পরের মাসে একদিন ফোন ব্যাক করে বলবেন বিদেশ ছিলেন নয়তো ফোন নষ্ট ছিলো ইত্যাদি ইত্যাদি তাই ফোন ধরা হয়নি। সেই শাহরিয়ার ভাই এখন সকাল বিকাল দুবার করে ফোন করে বাজারের খবর নিচ্ছেন আর জিজ্ঞাস করছেন কত দূর যাবে বাজার। গভর্ণরের মতিগতি বদলাচ্ছে কিনা? কিংবা চলতি সংসদে কোনো বিল আসছে কিনা? কিন্তু কোনো সুখবরই আমরা তাকে দিতে পারছিনা।

গত দুবছর আগেও আমি লিখেছি, বাজার তলানিতে। অনেককে বলেছি সূচক যেখানে নেমেছে তার থেকে নিচে নামার আর জায়গা নেই। কিন্তু তারপরও নামছে। পতনের এক অজানা গন্তব্যে যেনো সূচকের গতি।

ইদানিং ডিএসইতে গেলে অনেকেই বলেন, “আপনিতো বর্তমান গভর্ণরের খুব ভক্ত। আপনার গভর্ণরের সূচক এখন উর্ধমুখী। তাই শেয়ার বাজারের সূচক নিন্মমুখী। তিনি নিন্মমুখী হওয়া শুরু করলেই বাজার উর্ধমুখী হওয়া শুরু করবে”। তবে আমি ব্যক্তিগতভাবে বিনিয়োগকারীদের মতো একমুখী হয়ে শুধুই গভর্ণরের দোষ দেবোনা। তিনি জীবনে যা প্রত্যাশাও করেননি তার চেয়েও অধিক পেয়েছেন। যে পরিবার থেকে তার উত্থান সেখান থেকে আজ দেশের একটি শীর্ষ পদে। কাজেই কয়জন বিনিয়োগকারী শরীর শুকিয়ে মারা গেলো আর কয়জনের শরীরে সূচক পতনের একেকটি পয়েন্টে কয়টি শেল বিদ্ধ হলো সেটি তার দেখারও কথা নয় আর বোঝারও কথা নয়। তিনি দেশের গভর্ণর। বিনিয়োগকারীদের মতো ক্ষুদ্র তুচ্ছাতিতুচ্ছ বিষয় তাকে কেয়ার করতে হবে কেনো? তার রয়েছে বাচ্চু, তার রয়েছে হলমার্ক, বিসমিল্লাহ, প্রায় অর্ধশত ব্যাংক আর্থিক প্রতিষ্ঠানও সমসংখ্যক। যখন যেটা বলেন এদের কাছ থেকে তখনই তিনি সেটি পেয়ে যান। ওনার টেবিল থেকে এদের শুধু জানাতে দেরি, ওনার সেটি পেয়ে যেতে দেরি হয়না।

ব্যাংক বিটের আমার এক বন্ধুর কয়েকদিন আগে একটি মটর সাইকেল হারিয়ে গেছে। খবরটি শুনে গভর্ণর মহোদয় তাৎক্ষনিক একটি ব্যাংককে ফোন করে দিলেন। ওই ব্যাংক তাকে একটি নতুন মটর সাইকেল কিনে দিয়েছে। আমার সাংবাদিক বন্ধু গভর্ণরের মহত্বে মুগ্ধ। কিন্তু যে ব্যাংক এই মটর সাইকেলটি দিয়েছে সেই ব্যাংকের সিএফওর সাথে আমি কথা বলেছি। তিনি বলেছেন, বিনিয়োগকারীরা এসমস্ত কারনেই ডিভিডেন্ড কম পায়।আমরাতো আর চুরি করে এনে গভর্ণরকে দেইনা? আমাদের লাভের টাকা থেকেই দেই।

এতো গেলো একটি ঘটনা। এমন অনেক ঘটনা প্রায়ই ঘটছে। বই প্রকাশ থেকে শীত বস্ত্র। দুর্যোগের ত্রান থেকে সবুজ ব্যাংককিং। সবকিছুতেই টাকা যায় ব্যাংক থেকে। আর সবটার গচ্ছা খায় বিনিয়োগকারীরা।

তারপরও আমরা এগুলোর জন্য গভর্ণরকে দোষ দেবোনা। কারন ক্ষমতা থাকলে সেটিতো কাজে লাগাতেই হবে। কিন্তু এজন্য লক্ষ লক্ষ বিনিয়োগকারীর পেটে লাথি মেরে ক্ষমতার দাপট দেখানো উচিত নয় বলে সাধারন মানুষই এখন এ কথাগুলো বলা শুরু করেছে। কেনো যেনো ওই মানুষগুলোর মধ্যে একটি বদ্ধমুল ধারনা জন্মেছে এই গভর্ণর সরে গেলেই বাজারের জন্য কোনো নীতিমালা না বদলালেও বাজার এমনিতেই ভালো হয়ে যাবে। এদের দুএকজনতো এমনও বলছে, এই গভর্ণরই হলো বাজারের জন্য কুফা।

আমি তাদেরকে বুঝিয়েছি, এটা আইনগত ব্যাপার গভর্ণরকে দোষ দেন কেনো? তাৎক্ষনিক জবাব আপনিও গভর্ণরের দালাল। তাই এ নিয়ে এখন আর বলিনা। শুধু নতুন দিনের অপেক্ষায়। যেমন এদেশের কোটি কোটি মানুষ একটি নতুন দিনের স্বপ্ন দেখছে।

আপনার মন্তব্য

Top