দুই এক্সচেঞ্জের নির্বাহীরা কি নিরোর চেয়েও অধম

Editorialরোম যখন জ্বলছে নিরো তখন বাঁশি বাজাচ্ছে। ঘটনাটির সত্য মিথ্যা জানিনা তবে ছোটবেলা থেকে এটিকে একটি প্রবাদবাক্য হিসাবে জেনে আসছি। যারা জানেন না তাদের জন্য ঘটনাটির সার সংক্ষেপ হচ্ছে,বহি:শক্তি দ্বারা রোম আক্রান্ত হয়েছে, চারদিকে দাউদাউ করে জ্বলছে আগুন, শেষ হয়ে যাচ্ছে রোম সম্রাজ্য, আর ঠিক তখন মনের সুখে বাঁশি বাজাচ্ছে রোমান সম্রাট নিরো। প্রবাদটির সাথে মিলিয়ে লিখতে চেয়েছিলাম, শেয়ার বাজার যখন ধ্বংস হয়ে যাচ্ছে তখন মনের সুখে পদবীর ভার নিয়ে ঘুমিয়ে আছেন ডিএসই এবং সিএসই’র দুই চেয়ারম্যান। টানা পতনে ট্রেক হোল্ডাররা যখন অস্থির, শীর্ষস্থানীয় ব্রোকাররা এ অবস্থা সামাল দিতে কি করা যায় তা নিয়ে যখন ছটফট করছেন, আহমেদ রশীদ লালি, ছায়েদুর রহমান(এমডি, ইবিএল সিকিউরিটিজ), আহসানুল ইসলাম টিটু, রকিবুর রহমানের মতো ডিএসইর সাবেক প্রেসিডেন্টরা যখন বাজার ঠিক রাখতে এ মন্ত্রী থেকে ও মন্ত্রীর দ্বারে দ্বারে ঘুরে বেড়াচ্ছেন ঠিক সেই মুহূর্তে প্রতিষ্ঠান দুটির দুজন কর্নধার নীরবে নিভৃতে সব ঝামেলা থেকে নিরাপদ দূরত্বে বসে মানুষের আহাজারি দেখছেন।

আজম ভাই ডিএসইতে একটি হাউজ চালান। তার রুমে সেদিন একজন বিনিয়োগকারী বলছিলেন, ওনাদের কি? ওনরাতো পরগাছা। অন্যের তৈরি করা শ্রম ঘাম আর বিনিয়োগকারীদের তিল তিল করে বিনিয়োগ করা অর্থের অট্টালিকায় এসে প্রস্তুত করা সিংহাসন পেয়েছেন, কেউ ধরে এনে বসিয়ে দিয়েছেন আর ওনারা বসে গেছেন। মাস শেষে ওনাদের বিশাল পাওনাটায় কোনো বিঘ্ন না ঘটা পর্যন্ত বাজার যতই শেষ হোকনা কেনো তাদেরতো কিছুই যায় আসেনা। তারা জীবনের শুরুতেও বাজার সংশ্লিষ্ট কোনো লোক ছিলেন না, মধ্য বয়সেও বাজারে কোনোদিন বিনিয়োগ করেননি, আর এই শেষ বয়সে (দুজনই অবসরপ্রাপ্ত) মৃত্যু চিন্তার বাইরে বিনিয়োগের মতো জটিল কাজে জড়িতও হতে চাচ্ছেন না। পাশের আরেক বিনিয়োগকারী তখন বলে উঠলেন, সরকার চাচ্ছে সৎ এবং স্বচ্ছ ব্যাক্তি তাইতো মসজিদ থেকে ইমাম সাহেবদের ধরে এনে সেনাবাহিনীর প্রধান বানালেন, হাসপাতালের প্রধান নির্বাহী হিসাবে নিয়োগ দিলেন কিংবা বসিয়ে দিলেন ফায়ার সার্ভিসের ডিজি হিসাবে। এর ফলে সেনা উন্নয়ন, চিকিৎসা সেবা কিংবা অগ্নি নির্বাপনের কাজ হোক আর না হোক এসব জায়গায় নামাজ কায়েম হবে এটা নিশ্চিত বলা যায়।

যেমনটি শেয়ার বাজারে হয়েছে। জীবনভর বিচার কাজ চালিয়ে শেয়ার বাজারের উত্থানপতন কিভাবে নিয়ন্ত্রণ হয় সেটা একজন বিচারকের পক্ষে জানা আদৌ সম্ভব কিনা তা একজন শিশুও বলে দিতে পারবে। অথচ সে কাজটিই বাংলাদেশে হয়েছে।

টানা পতনের কারনে বুধবারও মানব বন্ধনের চেষ্টা করেছে বিনিয়োগকারীরা। ডিএসই’র সামনেই তাদের একজন জানালেন, বর্তমান অবস্থায় বিনিয়োগকারীদের রক্তক্ষরণ হচ্ছে। বুকফেটে আর্তনাদ করতে রাস্তায় নামবে তাদেরকে তাও করতে দিচ্ছেনা পুলিশ। রাস্তায় নামলেই সারা দেশে বিরোধী দলের যে অবস্থা এখানেও তাদের সাথে সেই আচরণ করা হচ্ছে। অথচ আমিসহ শেয়ার বাজারের অধিকাংশ বিনিয়োগকারী আওয়ামীলীগ করি। আমাদের মুখফুটে শ্লোগান পর্যন্ত দিতে দিচ্ছে না।

এর চেয়েও মজার তথ্য জানালেন বাংলাদেশ পুঁজিবাজার বিনিয়োগকারী ঐক্য পরিষদ সাধারণ সম্পাদক কাজী আবদুর রাজ্জাক। তিনি বিক্ষোভ শেষে এসেছিলেন শেয়ার বাজার নিউজ অফিসে। তিনি জানিয়ে গেলেন, “শেয়ার বাজার শেষ হয়ে যাচ্ছে। আমরা আমাদের কিছু দাবী দাওয়া নিয়ে ডিএসই’র এমডির সাথে আলোচনার জন্য দীর্ঘদিন ধরে চেষ্টা চালাচ্ছি। কিন্তু তিনি আমাদের ফোনই ধরেননা। ওনার পিএস আমাদের বার বার না করে দিচ্ছেন। কিছুক্ষন আগে জানিয়ে দিয়েছি উনি আমাদের সাথে কথা না বললে, তার পদত্যাগ চেয়ে আমরা এক দফার আন্দোলনে নামবো। তিনি আরো জানালেন, ইতিপূর্বে বাজারের এরকম পরিস্থিতিতে, লালি ভাই, রকিব ভাই কিংবা শাকিল রিজভী ভাইয়েরা আমাদের সাথে কথা বলতেন। মিডিয়ার সাথে পরিস্থিতি নিয়ে শেয়ার করতেন। বিএসইসি, অর্থ মন্ত্রনালয়সহ প্রয়োজনে প্রধান মন্ত্রীর সাথে দেখা করে আলাপ আলোচনা করতেন। কিন্তু এখন যারা আছেন তারাতো বহিরাগত। বাজারটিতো আর তাদের নয়। লক্ষ লক্ষ বিনিয়োগকারীর রক্ত নিসৃত হয়ে মৃত্যুবরণ করলেও তাদের কিছুই হবেনা। এই বাজারে তাদের একটি টাকার ইনভেস্ট নেই।বিনিয়োগকারীদের ধংসে তাদের দরদ আসবে কোথা থেকে”।

বিনিয়োগকারীদের এই কষ্টের কথাগুলো আগেও আমরা শুনেছি। অনেকে অনেক ধরনের অভিযোগ দিয়েছেন। কিন্তু আমরা শেষ পর্যন্ত ডিমিউচুয়ালাইজেশনের সুফল দেখতে চাচ্ছিলাম। বিশ্বের প্রায় সকল স্টক এক্সচেঞ্জই এ পদ্ধতির সুফল পেয়েছে। দৈনিক শেয়ার বিজ পত্রিকার বার্তা সম্পাদক থাকাকলীন এই প্রক্রিয়াটি চালুর পক্ষে প্রচুর লেখালেখি করেছিলাম। একাধিক সম্পাদকীয়তে এর সুফল বর্ননা করেছিলাম। কিন্তু এখন কেনো যে উল্টো হয়ে যাচ্ছে তা আমারও বোধগম্য হচ্ছেনা। এখনো অনেকেই মনে করছেন, চেয়ারম্যান মহোদয় এমডি সাহেবকে নিয়ে একটু আগালেই বাজার ঘুরে দাড়াবে। ওনরা মাঠে নামলে কিংবা শীর্ষমহলে দাবী জানালে ব্যাংকের এক্সপোজারসহ সব কিছু ঠিক হয়ে যাবে।

আমরাও এমনটাই মনে করি। দুই এক্সচেঞ্জের দুজন চেয়ারম্যান যদি উদ্যোগী হন এবং যথাযথ জায়গায় হস্তক্ষেপ করার অনুরোধ জানাতে পারেন তাহলে একদিনেই ঘুরে যাবে বাজার। কারন গভর্নরের সংসদীয় তত্ব যে একটি ভুল তথ্য তা এখন সবাই জেনে গেছে। যে আইনটি(প্রজ্ঞাপন) উনি নিজে জারি করে বাজারে ধস এনেছেন সেই আইনটি পরিবর্তনের জন্য এখন সংসদে যেতে হবে এটি আর কেউ বিশ্বাস করছেনা। কাজেই আমরা মনে করি সময়ও আছে এবং সুযোগও আছে । দরকার শুধু দুই স্টক এক্সচেঞ্জের পক্ষ থেকে উদ্যোগ নেয়া। খুব দ্রুততার সাথে এই উদ্যোগ নেয়া হবে বলেই প্রত্যাশা করছেন এ দেশের লাখ লাখ বিনিয়োগকারীও।

আপনার মন্তব্য

Top