এবার আইসিবি ইসলামিক ব্যাংক মার্জারের উদ্যোগ

ICB-Islamic-Bankশেয়ারবাজার রিপোর্ট: পুঁজিবাজারে তালিকাভুক্ত আইসিবি ইসলামিক ব্যাংক দীর্ঘ ২১ বছরেও আর্থিক অবস্থার উন্নতি ঘটাতে না পারায় ভাল অবস্থানে থাকা অন্য ব্যাংকের সাথে মার্জারের উদ্যোগ নিয়েছে বাংলাদেশ ব্যাংক। ব্যাংকটির আমানতকারীদের স্বার্থে এমন উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে বলে জানিয়েছে কেন্দ্রীয় ব্যাংক।

আর এ মার্জারের জন্য কেন্দ্রীয় ব্যাংক ভাল অবস্থানে থাকা ইসলামী ব্যাংক, প্রাইম ব্যাংক এবং অগ্রণী ব্যাংকে প্রস্তাব দেওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছে।

সম্প্রতি, গভর্নর ড. আতিউর রহমান সংশ্লিষ্ট বিভাগের কাছে সমস্যাপূর্ণ এ ব্যাংকটির বিষয়ে করণীয় সম্পর্কে জানতে চাইলে বাংলাদেশ ব্যাংকের কর্মকর্তারা এসব উদ্যোগের কথা জানান।

এ বিষয়ে বাংলাদেশ ব্যাংকের উর্ধ্বতন কর্মকর্তারা শেয়ারবাজারনিউজ ডট কমকে নাম প্রকাশ না করার শর্তে জানান, আমানতকারীদের স্বার্থে আমরা ব্যাংকটিকে অন্য ভাল ব্যাংকের সাথে মার্জারের উদ্যোগ নিয়েছি। তবে মার্জারের জন্য কোন ব্যাংক রাজি না হলে আমাদের অন্য উপায় বের করতে হবে।

এ কর্মকর্তারা আরও জানান, পুনর্গঠনের জন্য কেন্দ্রীয় ব্যাংক আইসিবি ইসলামিক ব্যাংকের বর্তমান মূলধনের অবস্থান, শ্রেণীকৃত ঋণ, আমানত, বিনিয়োগ, সমন্বিত লোকসানসহ আরও অন্যান্য বিষয় খতিয়ে দেখবে।

এ বিষয়ে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ১৯৯৪ সাল থেকে আইসিবি ইসলামিক ব্যাংক কেন্দ্রীয় ব্যাংকের কাছে সমস্যাপূর্ণ (প্রবলেম) ব্যাংক হিসেবে চিহ্নিত হয়ে আসছে। এ সময়ে বেশ কয়েকবার ব্যাংকটির মালিকানা এবং কাঠামোগত পরিবর্তন হলেও আর্থিক অবস্থার কোন তারতম্য ঘটেনি।

ব্যাংকটির আর্থিক প্রতিবেদন থেকে জানা যায়, ৩০ জুন, ২০১৫ সমাপ্ত অর্থবছর পর্যন্ত ব্যাংকটির মোট মূলধন ঘাটতি রয়েছে এক হাজার ৪৩৬ কোটি টাকা। বর্তমানে ব্যাংকটির পরিশোধিত মূলধন ৬৬৪ কোটি ৭০ লাখ টাকা। ব্যাংকটির মোট ৭০৮ কোটি ৭৬ লাখ টাকা শ্রেণীকৃত ঋণ রয়েছে। যা ব্যাংকটির মোট ঋণের ৮১ শতাংশ। এই শ্রেণীকৃত ঋণের ৯৯ দশমিক ৬৮ শতাংশই মন্দ এবং লোকসানি ঋণের খাতায় রয়েছে। এছাড়া ব্যাংকটির মোট সমন্বিত লোকসান এক হাজার ৬৯৯ কোটি টাকা।

এদিকে প্রতিবেদনে আরও বলা হয়, আইসিবি ইসলামিক ব্যাংক ঝুঁকি ভারিত সম্পদের বিপরীতে প্রয়োজনীয় মূলধন সংরক্ষণ করতে ব্যর্থ হয়েছে। ব্যাংক কোম্পানি আইন ১৯৯৪ এ বলা হয়েছে কোন ব্যাংককে ঝুঁকি ভারিত সম্পদের বিপরীতে প্রয়োজনীয় মূলধন সংরক্ষণ করতে হবে। এর জন্য আইনে ব্যাংকগুলোকে প্রয়োজনীয় মূলধন সংরক্ষণ করতে দুই বছর সময় দেওয়া হয়েছে। কিন্তু আইসিবি ইসলামি ব্যাংককে আরও এক বছর সময় বেশি দেওয়া হলেও তারা প্রয়োজনীয় মূলধন সংগ্রহে ব্যার্থ হয়েছে। অথচ আইনে আরও বলা হয়েছে নির্ধারিত সময়ের মধ্যে প্রয়োজনীয় মূলধন সংগ্রহে ব্যর্থরা ব্যাংকিং ব্যবসা করতে পারবে না।

তাই ব্যাংকটির পুনর্গঠন কিভাবে করা যায় এ বিষয়ে চলতি ডিসেম্বর মাসে বাংলাদেশ ব্যাংকে একটি অভ্যন্তরীণ সভা অনুষ্ঠিত হয়। ডেপুটি গভর্নর আবু হেনা মো: রাজী হাসানের সভাপতিত্বে সভায় অংশ নিয়েছিল কেন্দ্রীয় ব্যাংকের অফ-সাইট সুপারভিশন বিভাগ, ব্যাংকিং প্রবিধি ও নীতিমালা বিভাগ, ফাইন্যান্সিয়াল স্ট্যাবিলিটি বিভাগ, ব্যাংকিং পরিদর্শন বিভাগ এবং ফাইন্যান্সিয়াল ইন্টিগ্রিটি এবং কাস্টমার সার্ভিস বিভাগ।

সভায় ব্যাংকটির পুনর্গঠনের জন্য বেশ কিছু পদ্ধতি নিয়ে আলোচনা হয়। এর মধ্যে মার্জারের প্রতি সবচেয়ে বেশি জোর দেওয়া হয়। তবে এসব পদ্ধতি কাজে না আসলে লিক্যুইডিশন ছাড়া আর কোন রাস্তা নেই বলে জানানো হয়।

কিন্তু প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ব্যাংকটির অধিকাংশ সম্পদ উচ্চ ঝুঁকিপূর্ণ। এছাড়া ব্যাংকটির মোট ৩৩টি শাখার মধ্যে ১৮টি শাখাই ব্যাপক লোকসানে রয়েছে।

এদিকে ডিএসই সূত্রে জানা যায়, ব্যাংকটি টানা ১২ বছর ধরে লোকসানে রয়েছে। এমন পরিস্থিতিতে ব্যাংকটি ১০ বছরেরও বেশী সময় ধরে বিনিয়োগকারীদের ডিভিডেন্ড দিতে ব্যর্থ হয়েছে। এরই ধারাবাহিকতায় চলতি বছরের তৃতীয় প্রান্তিক অর্থাৎ ৯ মাস শেষে ব্যাংকটির মোট লোকসান হয়েছে ১৫ কোটি ৪০ লাখ টাকা। তাই বর্তমানে ব্যাংকটির শেয়ার মাত্র ৪.৫০ টাকায় লেনদেন হচ্ছে।

১৯৯০ সালে পুঁজিবাজারে তালিকাভুক্ত ‘জেড’ ক্যাটাগরিতে থাকা এ ব্যাংকটির ৫৯ দশমিক ৭৮ শতাংশ শেয়ার উদ্যোক্তা ও পরিচালকের কাছে, ১৬ দশমিক ৩৪ শতাংশ শেয়ার প্রাতিষ্ঠানিক বিনিয়োগকারীর কাছে এবং ২৩ দশমিক ৮৮ শতাংশ শেয়ার সাধারণ বিনিয়োগকারীর কাছে রয়েছে।

প্রসঙ্গত, ১৯৮৭ সালে আল-বারাকা নামে ব্যাংকটি বাংলাদেশে ব্যাংকিং ব্যবসা শুরু করে। এরপর ১৯৯৪ সাল থেকে ব্যাংকটির আর্থিক অবস্থার ব্যাপক অবনতি ঘটে। তাই ব্যাংকটিকে বিক্রি করার জন্য উদ্যোগ নেয় কেন্দ্রীয় ব্যাংক। সে সময় অরিয়ন গ্রুপ ব্যাংকটির ৮৩ শতাংশ শেয়ার কিনে নিয়েছিল। পরবর্তীতে ২০০৪ সালে ওরিয়েন্টাল ব্যাংক নামে যাত্রা শুরু করে। কিন্তু ২০০৬ সালে এ ব্যাংকটির পরিচালনা পর্ষদের সদস্যদের বিরুদ্ধে আবারও ব্যাপক দুর্নীতির প্রমাণ পায় কেন্দ্রীয় ব্যাংক। তাই আমানতকারীদের স্বার্থে কেন্দ্রীয় ব্যাংক পরিচালনার ভার গ্রহণ করে একজন নির্বাহী পরিচালককে ব্যাংকটির প্রশাসক হিসেবে নিয়োগ দেয়। এরপর ২০০৭ সালের আগস্ট মাসে কেন্দ্রীয় ব্যাংক ওরিয়েন্টাল ব্যাংকের শেয়ার বিক্রির জন্য নিলামের আয়োজন করে। এতে দুটি প্রতিষ্ঠান অংশগ্রহণ করেছিল। এর মধ্যে সুইজারল্যান্ডের আইসিবি গ্রুপ নিলামে ব্যাংকটির অধিকাংশ শেয়ার কিনতে সমর্থ হয়। পরবর্তীতে আইসিবি ইসলামিক ব্যাংক নামে পুনরায় যাত্রা শুরু করলেও এখনো ব্যাংকটি আর্থিক দুর্বলতা কাটিয়ে উঠতে পারেনি।

শেয়ারবাজারনিউজ/আ/ম.সা

আপনার মন্তব্য

*

*

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.

Top