বিশ্ববিদ্যালয়ে বীমা বিষয়ে উচ্চ শিক্ষার সুযোগ থাকা উচিত: অজিত চন্দ্র আইচ

aichদেশের অর্থনৈতিক উন্নয়নে বীমা একটি গুরুত্বপূর্ণ খাত। এ খাতের জন্য  যে পরিমাণ দক্ষতা সম্পন্ন জনবল দরকার তা পাওয়া যাচ্ছে না। যেই পরিমাণ দক্ষতা এবং শিক্ষগত যোগ্যতা সম্পন্ন ব্যাক্তি ব্যাংকগুলোতে চাকুরির জন্য আগ্রহী হয় বীমায় সেই পরিমাণ হয় না। বীমা পেশার জন্য প্রয়োজনীয় যোগ্যতা নির্মাণে বিশ্ববিদ্যালয়গুলো অবশ্যই ভুমিকা রাখতে পারে। বীমায় সেবার মান উন্নয়নের লক্ষে, একটি বীমা কোম্পানির এমডি হিসেবে আমি বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষের কাছে বীমা বিষয়ক উচ্চতর শিক্ষাদানের সুযোগ তৈরি করে দেয়ার জন্য অনুরোধ করবো। শেয়ারবাজারনিউজ ডট কমকে দেয়া একান্ত সাক্ষাতকারে এসব কথা বলেন, সোনালী লাইফ ইন্স্যুরেন্স এর ব্যবস্থাপনা পরিচালক (এমডি) অজিত চন্দ্র আইচ। সাক্ষাতকারটি নিয়েছেন শেয়ারবাজারনিউজ ডট কমের নিজস্ব প্রতিবেদক রুহান আহমেদ।

সাক্ষৎকারের চুম্বক অংশটুকু শেয়ারবাজারনিউজ ডট কমের পাঠকদের জন্য তুলে ধরা হলো:

শেয়ারবাজার নিউজঃ বীমা পেশায় কখন এবং কিভাবে আসলেন?

অজিত চন্দ্র আইচঃ ১৯৮৫ সালের মে মাসে মূলত জীবন বীমা কর্পোরেশনে ফিল্ড অফিসার হিসেবে আমার বীমা পেশা শুরু।

শেয়ারবাজার নিউজঃ ১৯৮৫ সাল থেকে ২০১৫ সাল পর্যন্ত এই দীর্ঘ সময়ে আপনার চাকুরী জীবনে কোন স্বরণীয় ঘটনা রয়েছে কি?

অজিত চন্দ্র আইচঃ স্বরণীয় ঘটনা আসলে দুই দিক থেকে বিবেচিত হয়। এর মধ্যে একটি দু:খজনক কিন্তু স্বরণীয় ঘটনা রয়েছে। খুব কাছের একজন ব্যক্তির জীবনবীমা আমি করিয়েছিলাম এবং এই বীমাটি ছিল আমার পেশাগত জীবনের প্রথম মৃত্যু দাবি। ঘটনাটি হল, একদিন হঠাৎ শুনলাম সেই ভদ্রলোক মারা গেছেন, অথচ ঠিক তার আগেরদিন তার সাথে কথা হয়েছে। অন্যদিকে আনন্দজনক স্বরণীয় ঘটনা হল- ন্যাশনাল লাইফে থাকার সময় সারা দেশের সেরা রিজিওনাল অফিসারের পুরষ্কার পেয়েছিলাম।

শেয়ারবাজার নিউজঃ আপনার কর্মজীবনে সাফল্যের বছর কোনটি?

অজিত চন্দ্র আইচঃ ১৯৯১ এবং ১৯৯২ এই দুই সালকে আমার কর্মজীবনের সবচেয়ে সাফল্যের বছর বলবো। এর কারণ, ন্যাশনাল লাইফ ইন্সুরেন্সে পেশাগত দায়িত্ব পালনকালে এই দুই বছর আমি প্রথম স্থান অর্জন করি এবং এসিস্ট্যান্ট ভাইস প্রেসিডেন্ট পদে পদোন্নতি পাই। যা ছিল অত্যন্ত আকর্ষণীয় এবং সম্মানিত পদ।

শেয়ারবাজার নিউজঃ বীমা গ্রহীতাদের একটি অভিযোগ প্রায়ই পাওয়া যায় যে, বীমায় মৃত্যু দাবি পেতে বিভিন্ন সমস্যা হয় এবং কার্য প্রক্রিয়ায় অনেক সময় লেগে যায়। এ বিষয়ে আপনার অভিমত কি?

অজিত চন্দ্র আইচঃ দেখা যায়, প্রতি এক হাজার পলিসির মধ্যে প্রায় পাঁচটি মৃত্যুর দাবি আসে। এর চেয়ে বড় কথা অন্য বীমাকারী যাদের বীমা পলিসি পূর্ণতা পেয়েছে তাদের টাকা পাওয়ার ক্ষেত্রেও বিলম্ব হচ্ছে যা আরও দু:খজনক।

শেয়ারবাজার নিউজঃ পলিসির টাকা পেতে এতো দীর্ঘ সময়ের প্রয়োজন হচ্ছে কেন?

অজিত চন্দ্র আইচঃ একজন বীমাজীবী হিসাবে আমি বলব, এর প্রধান সমস্যা কোম্পানির ম্যানেজম্যান্ট এর দুর্বলতা ও শৃঙ্খলার অভাব। বীমাকর্মী সাধারণত বীমা করার সময় সুন্দর সুন্দর কথা বলে থাকেন, কিন্তু পরবর্তীতে গ্রাহকের সাথে আর সেইভাবে যোগাযোগ রক্ষা করেন না। এমন পরিস্থিতিতে বীমা গ্রাহকেরাও পলিসির প্রিমিয়াম সময়মতো কোম্পানিতে জমা দেয় না। ফলে গ্রাহক তার সঠিক সুফল ভোগ করতে পারেন না। আবার নিয়মিত টাকা না দেয়ায় হিসাবটি ক্লোজ করতে কোম্পানির হয়তো একটু সময় লেগেই যায়।

শেয়ারবাজার নিউজঃ অনেকেই আছেন যারা বীমাকে বিশ্বাস করতে চাননা বা পারেন না। এর কারণ কি?

অজিত চন্দ্র আইচঃ এমন অনেক বীমাকর্মী রয়েছেন যারা গ্রাহকের কাছ থেকে টাকা নিয়ে কোম্পানিতে জমা দেয় না। তখন গ্রাহক কোম্পানির উপর বিশ্বাস হারিয়ে ফেলে। তাছাড়া গ্রাহকের সাথে যখন একজন বীমাকর্মী প্রতারণা করে তখন গ্রাহক ঐ বীমাকর্মীর পাশাপাশি বীমা কোম্পানীকেও দোষারোপ করতে থাকে। কিন্তু মজার ব্যাপার হল বীমা কোম্পানি এর কিছুই জানে না। আর ঐ প্রতারিত গ্রাহক তার আশে পাশে প্রচার করতে থাকে যে বীমা কোম্পানিগুলো সব ধান্দাবাজ। যা বীমার উন্নয়নকে বাধাগ্রস্থ করে।

শেয়ারবাজার নিউজঃ এর প্রতিকারে করণীয় সম্পর্কে আপনার অভিমত কি?

অজিত চন্দ্র আইচঃ কোম্পানিগুলোর ম্যানেজমেন্টের দুর্বলতা কাটিয়ে দক্ষতা বাড়ানো ছাড়া এর প্রতিকার সম্ভব নয়। এর পাশাপাশি কর্মরত জনবলের দক্ষতারও উন্নয়ন ঘটাতে হবে। এক্ষেত্রে শিক্ষাগত যোগ্যতাও একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়।

শেয়ারবাজার নিউজঃ বীমায় প্রতারণা রোধে নিয়ন্ত্রক সংস্থা আইডিআরএ’র ভূমিকা সম্পর্কে আপনার অভিমত কি?

অজিত চন্দ্র আইচঃ বীমায় প্রতারণা রোধে আইডিআরএ যথেষ্ট সচেষ্ট রয়েছে। কিন্তু বিভিন্ন বাধা বিঘ্নতার কারণে আইডিআরএ’র কার্যক্রম চালাতে সমস্যা হচ্ছে। তার পরেও বীমায় প্রতারনা রোধে বেশ ভাল ভূমিকা রাখছে আইডিআরএ।তাছাড়া বীমা আইন ও আইডিআরএ সৃষ্টি হওয়ার কারণে এখন বীমা খাতে কিছুটা হলেও স্বচ্ছতা ফিরেছে।

শেয়ারবাজার নিউজঃ বীমায় শিক্ষাগত যোগ্যতা নির্মাণে বিশ্ববিদ্যালয়গুলো কারিকুলামের মাধ্যমে কোন ভূমিকা রাখতে পারে কিনা?

অজিত চন্দ্র আইচঃ হ্যাঁ এটি একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। দেশের অর্থনৈতিক উন্নয়নে বীমা একটি গুরুত্বপূর্ণ খাত। এর জন্যে যে পরিমাণ দক্ষতা সম্পন্ন জনবল দরকার তা আমরা পাচ্ছিনা। তাই বীমা বিষয়ে শিক্ষিত জনবল তৈরিতে বিশ্ববিদ্যালয়গুলো কার্যকর এবং গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে। বীমায় সেবার মান উন্নয়নের লক্ষ্যে, একটি বীমা কোম্পানির একজন এমডি হিসেবে আমি বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষের কাছে বীমা বিষয়ক উচ্চতর শিক্ষাদানের সুযোগ তৈরি করে দেয়ার জন্য অনুরোধ করব।

শেয়ারবাজার নিউজঃ বীমা কর্মীর দক্ষতা উন্নয়নের লক্ষ্যে আপনারা কোন প্রশিক্ষণ কর্মশালার আয়োজন করেছেন কি?

অজিত চন্দ্র আইচঃ আমাদের নিজস্ব ট্রেইনার এবং সেই সাথে ট্রেনিং মডিউল রয়েছে। মডিউল অনুযায়ী আমরা আমাদের কর্মীদের প্রশিক্ষণ দান করি।

শেয়ারবাজার নিউজঃ আপনাদের কার্যক্রমে প্রযুক্তিকে কতোটুকু গুরুত্ব দিচ্ছেন?

অজিত চন্দ্র আইচঃ বাংলাদেশের ইতিহাসে এখন পর্যন্ত আমরাই প্রথম কোম্পানি যারা বীমা ব্যবসা শুরুর প্রথম দিন থেকেই শতভাগ এন্টিগ্রেটেড সফটঅয়্যার ব্যবহার করছি। আামাদের সকল প্রকার কার্যক্রম কম্পিউটারাইজড। এতে পৃথিবীর যে কোন স্থানে বসে গ্রাহক অনলাইনের মাধ্যমে পলিসি মেক করতে পারবেন। যাতে কোন প্রকার প্রতারণার সুযোগ নেই বলে আমি মনে করি।

শেয়ারবাজার নিউজঃ এখন পর্যন্ত কি পরিমাণ মৃত্যু দাবি আপনারা পরিশোধ করেছেন?

অজিত চন্দ্র আইচঃ এই অল্প সময়ে আমরা তিনটি সাধারণ মৃত্যু দাবি পরিশোধ করেছি। গ্রুপ বীমার ক্ষেত্রে প্রায় ২০০টি দাবি পরিশোধ করেছি এবং আরও প্রায় এক থেকে দেড়শটি দাবি পরিশোধের প্রক্রিয়ায় রয়েছে।

শেয়ারবাজার নিউজঃ বীমায় লাইফ ফান্ডের গুরুত্ব কতোটুকু?

অজিত চন্দ্র আইচঃ বীমায় লাইফ ফান্ড অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ন। লাইফ ফান্ডকে বীমার ব্লাড বলা হয়। মূলত বীমার দায় মুক্তির ক্ষমতাই হল লাইফ ফান্ড। কোম্পানির লাইফ ফান্ড যত বাড়বে ঝুঁকি ততটাই কমবে।

শেয়ারবাজার নিউজঃ কোম্পানি হিসেবে সোনালী লাইফ ইন্স্যুরেন্স এর লক্ষ্য কি?

অজিত চন্দ্র আইচঃ কোম্পানি হিসেবে আমাদের লক্ষ্য হচ্ছে বাংলাদেশে এবং আর্ন্তজাতিকভাবে বীমায় সেবার মান উন্নয়ন, বীমাকে পেশামুখী করা, বীমার প্রতি সাধারণ মানুষের আস্থা বৃদ্ধি করা এবং বীমাকে একটি মানসম্পন্ন শিল্প হিসেবে মানুষের কাছে প্রকাশ করা।

শেয়ারবাজার নিউজঃ বর্তমান অস্থিতিশীল পরিস্থিতে বীমা ব্যবসার কি রকম ক্ষতি হয়েছে?

অজিত চন্দ্র আইচঃ জীবন বীমার ক্ষেত্রে বিশাল ক্ষতি হয়েছে বলে আমি মনে করি। সাধারণত বীমা ব্যবসা নির্ভর করে মাঠ কর্মীর ওপর। আর মাঠ কর্মী বিভিন্ন স্থানে যোগাযোগের মাধ্যমে পলিসি বিক্রি করে থাকে। বর্তমান পরিস্থিতে আমাদের কর্মীরা মাঠ পর্যায়ে কাজ করতে পারছে না। অন্যদিকে, সাধরণ মানুষ মৌলিক চাহিদা পুরনের পর যা অবশিষ্ট থাকে তা থেকেই সাধারণত বীমা পলিসি করে। এখন দেশে যা হচ্ছে তাতে মানুষ মৌলিক চাহিদা পুরন করবে নাকি বীমা করবে। সুতরাং, এই অস্থিতিশীল পরিস্থিতি জীবন বীমা ব্যবসার অত্যন্ত ক্ষতি করে চলেছে।

শেয়ারবাজার নিউজঃ সামাজিক দায়বদ্ধতার দিক থেকে কি করছেন?

অজিত চন্দ্র আইচঃ সামাজিক দায়বদ্ধতার অংশ হিসেবে আমরা সমাজের উন্নয়নে সব সময়ই অবদান রাখার চেষ্টা করি। প্রত্যেকটা কোম্পানি থেকে বার্ন ইউনিটের জন্য একটা ফান্ড দেয়া হচ্ছে। আমরাও তাতে অংশ নিয়েছি। তাছাড়া আমাদের যে কোন স্টাফের বিপদে আপদে আমরা প্রয়োজনীয় সাহায্য সহযোগিতা করার চেষ্টা করি।

শেয়ারবাজার নিউজঃ চতুর্থ প্রজম্নের বীমা কোম্পানি হিসেবে অনুমোদন দেয়া ১৩টি কোম্পানির মধ্যে সোনালী লাইফ সবচেয়ে এগিয়ে এই বিষয়ে আপনার অভিমত কি?

অজিত চন্দ্র আইচঃ আমরা আমাদের দীর্ঘ সময়ের অভিজ্ঞতা কাজে লাগিয়ে গবেষণার মাধ্যমে আমাদের মানব সম্পদকে কাজে লাগানোর চেষ্টা করছি। আমার মনে হয় এটা তারই প্রতিফলন। কেননা আমরা জীবন বীমা ব্যবসায় এগিয়ে থাকার পাশাপাশি বীমা গ্রাহককে সুষ্ঠু সেবা প্রদানের জন্য সুপরিকল্পিত ভাবে যথেষ্ট শ্রম ও মেধা খাটাচ্ছি।

শেয়ারবাজার নিউজঃ আপনার গ্রাহকদের উদ্দেশ্যে কিছু বলুন।

অজিত চন্দ্র আইচঃ আমাদের গ্রাহকের উদ্দেশ্যে বলবো, আপনাদের সক্ষমতার মধ্যে বীমা পলিসি করা উচিত। বীমার টাকা নিজের হাতে কোম্পানিতে জমা দিন অথবা অনলাইনে সেন্ড করুন এবং রশিদ সংগ্রহ করুন। কোন অবস্থাতেই বীমা কর্মকর্তা, আত্বীয়, পরিচিতির বিশ্বাসের ওপর নির্ভর করে টাকা দেওয়া উচিত নয়। যদি আপনার টাকা আপনি ব্যাংকে লেনদেন করতে পারেন। তাহলে আপনার বীমার টাকা আপনি অন্যের হাতে দিবেন কেন? মূলত এখানেই সমস্যা।

শেয়ারবাজার নিউজঃ আপনাকে অসংখ্য ধন্যবাদ।

অজিত চন্দ্র আইচঃ আপনাকেও ধন্যবাদ।

 

শেয়ারবাজার/রু/অ

 

আপনার মন্তব্য

*

*

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.

Top