একশ কোটি দিয়ে হাজার কোটির সুবিধা নিচ্ছে বহুজাতিক কোম্পানি

Business People Meeting Corporate Office Buildings Working Conceশেয়ারবাজার রিপোর্ট: কর সুবিধা নেওয়ার জন্য দেশের শেয়ারবাজারে নামে মাত্র তালিকাভুক্ত হচ্ছে বহুজাতিক কোম্পানি। দেশে প্রায় ৮০০ বহুজাতিক প্রতিষ্ঠান ব্যবসা পরিচালনা করছে। এর মধ্যে দেশের শেয়ারবাজারে তালিকাভুক্ত রয়েছে মাত্র ১৩টি কোম্পানি। আর এ কোম্পানিগুলো সামান্য পরিমান শেয়ার অফলোড করেই সরকারী কর সুবিধা নিয়ে হাজার কোটি টাকা বাইরে নিয়ে যাচ্ছে।
তথ্য বিশ্লেষণে দেখা যায়, ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জে (ডিএসই) তালিকাভুক্ত ১৩টি কোম্পানি কর প্রদানের পর মুনাফা করেছে প্রায় ৩ হাজার ৬৪৯ কোটি টাকারও বেশি। আর এর বিপরীতে ডিভিডেন্ড আকারে সাধারন বিনিয়োগকারীদের দিয়েছে মাত্র ১৩৩ কোটি টাকার কিছু বেশি। শতাংশের হিসেবে যা মাত্র ৩.৬৪ শতাংশ। কোম্পানি আইন অনুযায়ী তালিকাভুক্ত কোম্পানির ক্ষেত্রে কর্পোরেট করে ১০ শতাংশ ছাড় থাকায় কোম্পানিগুলোর সম্মিলিতভাবে কর কম দিতে হয়েছে প্রায় ১ হাজার ১২২ কোটি টাকার বেশি। অথচ এর সামান্য পরিমান মুনাফায় সাধারন বিনিয়োগকারীদের অংশিদার করে সুবিধা নিয়ে যাচ্ছে ওই ১৩ কোম্পানি।
তালিকাভুক্ত ১৩ বহুজাতিক কোম্পানির অধিকাংশেরই সামান্য পরিমান শেয়ার অফলোড করেছে। কোনো কোনো কোম্পানিতে সাধারন বিনিয়োগকারীদের মালিকানায় থাকা শেয়ারের পরিমান ১ শতাংশেরও কম। এ প্রসঙ্গে কোনো আইন বাধ্য-বাধকতা না থাকায় কোম্পানিগুলোও শেয়ার অফলোডের পরিমান বাড়াচ্ছে না। শুধুমাত্র ফু-ওয়াং সিরামিক ছাড়া বাকি কোম্পানিগুলোর স্টক ডিভিডেন্ড দেওয়ার কোনো নজিরও নেই। ফলে বিনিয়োগকারীদের মালিকানায় নতুন কোনো শেয়ারও যাচ্ছে না। অথচ পাশ্ববর্তি দেশ ভারতেও কোনো কোম্পানি পুঁজিবাজারে তালিকাভুক্ত হতে চাইলে তাকে অবশ্যই মোট শেয়ারের ২৫ শতাংশ অফলোড করতে হবে।
এ প্রসঙ্গে তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সাবেক অর্থ উপদেষ্টা ও নিয়ন্ত্রক সংস্থা বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশনের (বিএসইসি) সাবেক চেয়ারম্যান ড. এ বি মির্জ্জা আজিজুল ইসলাম শেয়ারবাজারনিউজ ডট কম’কে বলেন, ‘বহুজাতিক কোম্পানিকে বাজারে আনার জন্য উদ্যোগ সরকারকেই নিতে হবে। এক্ষেত্রে নিয়ন্ত্রক সংস্থার ব্যাপারে কোম্পানিগুলোর যে অমূলক ভয় আছে তা বিএসইসি’কেই কাটাতে হবে। আর বহুজাতিক কোম্পানিগুলোর বাজারে অংশিদারিত্ব বাড়াতে কোম্পানিগুলোকে উদ্বুদ্ধ করা বা যুগোপোযোগী আইন করার বিষয়ে কোম্পানিগুলোর সাথে আলোচনা করেই পদক্ষেপ নিতে হবে। এমন যেন না হয় আইনের কারনে পরবর্তিতে অন্য কোম্পানিগুলো তালিকাভুক্ত হতে আগ্রহ হারিয়ে ফেলে’।
অন্যদিকে, বহুজাতিক কোম্পানির শেয়ারে বিনিয়োগের ক্ষেত্রে বিমাতাসুলভ আচরন করছে প্রাতিষ্ঠানিক বিনিয়োগকারীরা। গণপ্রস্তাবের সময় কোম্পানিগুলো যে সামান্য পরিমান শেয়ার অফলোড করছে তার অধিকাংশই প্রাতিষ্ঠানিক বিনিয়োগকারীরা কিনে নিচ্ছে। ফলে বাজারে মৌলভিত্তি সম্পন্ন শেয়ারের পরিমানও কমে যাচ্ছে। বহুজাতিক কোম্পানির শেয়ার নিয়ে করা কারসাজিগুলোর সাথেও প্রাতিষ্ঠানিক বিনিয়োগকারীরাই জড়িত থাকছে বলে অভিযোগ রয়েছে। সংশ্লিষ্টরা অভিযোগ করছেন, কোম্পানির শেয়ারদর অস্বাভাবিকভাবে বাড়িয়ে প্রাতিষ্ঠানিক বিনিয়োগকারীরা শেয়ার বিক্রি করে আবার তারাই দর কমানোর ক্ষেত্রে প্রভাব বিস্তার করছে।
২০১৫ অর্থবছরের তথ্য বিশ্লেষণে দেখা যায়, বার্জার বাংলাদেশের কর প্রদানের পর মুনাফা হয়েছে ১৪৯ কোটি ২৭ লাখ টাকা যার মধ্যে ডিভিডেন্ড আকারে বিনিয়োগকারীরা পেয়েছেন ৫০ লাখ ৬২ হাজার টাকা। অথচ এর বিপরীতে কোম্পানি কর সুবিধা নিয়েছে ৪৫ কোটি ৯১ লাখ টাকা। গ্রামিনফোন বাংলাদেশের কর প্রদানের পর মুনাফা হয়েছে ১ হাজার ৯৭০ কোটি টাকা যার মধ্যে ডিভিডেন্ড আকারে বিনিয়োগকারীরা পেয়েছেন ৫১ কোটি ৭৯ লাখ ৭৫ হাজার টাকা। অথচ এর বিপরীতে কোম্পানি কর সুবিধা নিয়েছে প্রায় ৬০৬ কোটি টাকা। বাটা বাংলাদেশের কর প্রদানের পর মুনাফা হয়েছে ৭০ কোটি ৬ লাখ টাকা যার মধ্যে ডিভিডেন্ড আকারে বিনিয়োগকারীরা পেয়েছেন ৩ কোটি ৫৫ লাখ ৮৪ হাজার টাকা। অথচ এর বিপরীতে কোম্পানি কর সুবিধা নিয়েছে ২১ কোটি ৫৫ লাখ টাকা।

গ্ল্যাস্কো-স্মিথক্লাইন বাংলাদেশের কর প্রদানের পর মুনাফা হয়েছে ৮৩ কোটি ১৮ লাখ টাকা যার মধ্যে ডিভিডেন্ড আকারে বিনিয়োগকারীরা পেয়েছেন ৬২ লাখ ৯৪ হাজার টাকা। অথচ এর বিপরীতে কোম্পানি কর সুবিধা নিয়েছে ২৫ কোটি ৫৮ লাখ টাকা। মারিকো বাংলাদেশের কর প্রদানের পর মুনাফা হয়েছে ১৩৪ কোটি ৪৭ লাখ টাকা যার মধ্যে ডিভিডেন্ড আকারে বিনিয়োগকারীরা পেয়েছেন ১৩ কোটি ৩৮ লাখ ৭৫ হাজার টাকা। অথচ এর বিপরীতে কোম্পানি কর সুবিধা নিয়েছে ৪১ কোটি ৩৬ লাখ টাকা।

রেকিট-বেনকিজার বাংলাদেশের কর প্রদানের পর মুনাফা হয়েছে ১৭ কোটি ৭৫ লাখ টাকা যার মধ্যে ডিভিডেন্ড আকারে বিনিয়োগকারীরা পেয়েছেন ১ কোটি ৯৯ লাখ ৩২ হাজার টাকা। অথচ এর বিপরীতে কোম্পানি কর সুবিধা নিয়েছে ৫ কোটি ৪৫ লাখ টাকা। লিন্ডে বাংলাদেশের কর প্রদানের পর মুনাফা হয়েছে ৬৫ কোটি ৩ লাখ টাকা যার মধ্যে ডিভিডেন্ড আকারে বিনিয়োগকারীরা পেয়েছেন ৪ কোটি ৯০ লাখ ৬৩ হাজার টাকা। অথচ এর বিপরীতে কোম্পানি কর সুবিধা নিয়েছে ২০ কোটি টাকা।

সিঙ্গার বাংলাদেশের কর প্রদানের পর মুনাফা হয়েছে ৩৬ কোটি ৮৫ লাখ টাকা যার মধ্যে ডিভিডেন্ড আকারে বিনিয়োগকারীরা পেয়েছেন ২ কোটি ৫৭ লাখ ২৩ হাজার টাকা। অথচ এর বিপরীতে কোম্পানি কর সুবিধা নিয়েছে ১১ কোটি ৩৩ লাখ টাকা। ব্রিটিশ-আমেরিকান টোব্যাকো বাংলাদেশের কর প্রদানের পর মুনাফা হয়েছে ৫৮৭ কোটি ৪০ লাখ টাকা যার মধ্যে ডিভিডেন্ড আকারে বিনিয়োগকারীরা পেয়েছেন ২ কোটি ৬০ লাখ ৭০ হাজার টাকা। অথচ এর বিপরীতে কোম্পানি কর সুবিধা নিয়েছে ১৮০ কোটি ৬৮ লাখ টাকা।

হাইডেলবার্গ সিমেন্ট বাংলাদেশের কর প্রদানের পর মুনাফা হয়েছে ১৪০ কোটি ১৯ লাখ টাকা যার মধ্যে ডিভিডেন্ড আকারে বিনিয়োগকারীরা পেয়েছেন ১৮ কোটি ৫৬ লাখ ১৪ হাজার টাকা। অথচ এর বিপরীতে কোম্পানি কর সুবিধা নিয়েছে ৪৩ কোটি ১২ লাখ টাকা। আরএকে সিরামিকস বাংলাদেশের কর প্রদানের পর মুনাফা হয়েছে ১০৯ কোটি ৪৩ লাখ টাকা যার মধ্যে ডিভিডেন্ড আকারে বিনিয়োগকারীরা পেয়েছেন ৯ কোটি ৫০ লাখ ৭৬ হাজার টাকা। অথচ এর বিপরীতে কোম্পানি কর সুবিধা নিয়েছে ৩৩ কোটি ৬৬ লাখ টাকা।

লাফার্জ-সুরমা সিমেন্ট বাংলাদেশের কর প্রদানের পর মুনাফা হয়েছে ২৮১ কোটি ৯৮ লাখ টাকা যার মধ্যে ডিভিডেন্ড আকারে বিনিয়োগকারীরা পেয়েছেন ২২ কোটি ৯৮ লাখ ৩৫ হাজার টাকা। অথচ এর বিপরীতে কোম্পানি কর সুবিধা নিয়েছে ৮৬ কোটি ৭৩ লাখ টাকা। তালিকাভুক্ত অন্য বহুজাতিক কোম্পানি ফু-ওয়াং সিরামিকস বাংলাদেশ ২০১৫ অর্থবছরে কর প্রদানের পর মুনাফা করেছে ৩ কোটি ৪৩ লাখ টাকা এবং কর সুবিধা নিয়েছে ১ কোটি ৫ লাখ টাকা। উল্লেখ্য অর্থবছরে বিনিয়োগকারীদের জন্য ১০ শতাংশ স্টক ডিভিডেন্ড দিয়েছে।

শেয়ারবাজারনিউজ/ওহ/আহা

আপনার মন্তব্য

Top