নিয়মিত করদাতার জন্য বাড়তি চাপ: ঝুঁকিতে ব্যাক্তিখাতের বিনিয়োগ

Masudযদি আপনি একজন নিয়মিত ব্যক্তি করদাতা হন, তাহলে ২০১৬-১৭ অর্থবছরের জন্য ঘোষিত বাজেটের কারণে আপনার ওপর করের বোঝা আরও বাড়বে। কীভাবে সেটি বাড়বে? আসুন এবার তার হিসাব মেলানো যাক। ঘোষিত বাজেটে সাধারণ ব্যক্তি করদাতার করমুক্ত আয়সীমা আড়াই লাখ টাকা অপরিবর্তিত রাখা হয়েছে। তবে কমানো হয়েছে করদাতার বিনিয়োগ-সুবিধা।

নতুন ঘোষণা অনুযায়ী, এখন থেকে কোনো করদাতা তাঁর মোট আয়ের ২০ শতাংশ পর্যন্ত বিনিয়োগ করে ১০ শতাংশ হারে কর রেয়াত সুবিধা নিতে পারবেন। আগে ৩০ শতাংশ পর্যন্ত বিনিয়োগ করে তার বিপরীতে ১৫ শতাংশ হারে কর রেয়াত সুবিধা পেতেন সাধারণ ব্যক্তি করদাতারা।
ঘোষিত বাজেটে ব্যক্তি করদাতার বিনিয়োগ-সুবিধা ২০ শতাংশে নামিয়ে আনার ফলে কীভাবে করের চাপ বাড়বে, সেটি এবার অঙ্কের হিসাবে মিলিয়ে দেখা যেতে পারে।

ধরা যাক, আপনি একজন নিয়মিত করদাতা এবং আপনার মোট আয় ১০০ টাকা। এখন বছর শেষে এ আয়ের ওপর আপনাকে ৩০ টাকা কর দিতে হবে। আগে আয়ের ৩০ শতাংশ বা ১০০ টাকায় ৩০ টাকা বিনিয়োগ করলে তার ওপর ১৫ শতাংশ হারে অর্থাৎ প্রায় সাড়ে ৪ টাকা কর রেয়াত সুবিধা পাওয়া যেত। আপনি যদি আয়ের ৩০ শতাংশ বিনিয়োগ করতেন তাহলে আপনাকে আসলে ৩০ টাকার বদলে কর দিতে হতো ২৫ টাকা ৫০ পয়সা।

ঘোষিত বাজেটে বিনিয়োগ-সুবিধা কমিয়ে ২০ শতাংশ এবং তার বিপরীতে কর হার ১০ শতাংশ নির্ধারণ করা হয়েছে। এর ফলে কর রেয়াত সুবিধা মিলবে দুই টাকা। তাতে করে আগে আপনাকে যেখানে ২৫ টাকা ৫০ পয়সা কর দিতে হতো, সেখানে এখন দিতে হবে ২৮ টাকা। অর্থাৎ করমুক্ত আয়ের সীমা অপরিবর্তিত থাকলেও বিনিয়োগ-সুবিধা কমে যাওয়ায় আপনার জন্য আড়াই টাকা কর বেড়েছে। গত জুলাই থেকেই এ বর্ধিত কর পরিশোধ করে আসতে হবে আপনাকে। এটিই আয়কর আইনের বিধান। যে বছর আপনি রিটার্ন জমা দেবেন, কর কার্যকর হবে তার আগের বছর থেকে। মাসিক ৪০ হাজার থেকে এক লাখ টাকা পর্যন্ত করযোগ্য আয় আছে এমন চাকরিজীবীদের বেলায় কর বাড়বে ২৭ থেকে ৫১৪ শতাংশ পর্যন্ত। যাঁদের মাসিক করযোগ্য আয় ৪০ হাজার টাকা, তাঁদেরই সর্বোচ্চ ৫১৪ শতাংশ করভার বাড়বে।

নিয়মিত করদাতাদের জন্য ঘোষিত বাজেটে দুঃসংবাদ আরও আছে। ধরেন, আপনার চাকরির বেতনের বাইরে সঞ্চয়পত্র কিংবা ব্যাংকে জমানো অর্থ থেকে মাসে মাসে কিছু সুদ আয় হয়। সেসব আয়ের ওপর থেকে উৎসে কর কেটে নেওয়া হয়। আবার আপনি যদি একটি মোটরগাড়ি কেনেন তখনো আপনার কাছ থেকে উৎসে কর কাটা হয়। পরে বছর শেষে রিটার্ন জমা দেওয়ার সময় সেসব উৎসে করকে সমন্বয় করে প্রকৃত আয়ের ওপর কর নির্ধারিত হয়ে থাকে। এটিই ছিল বিদ্যমান ব্যবস্থা। ঘোষিত বাজেটে সেখানেও কিছু পরিবর্তন আনা হয়েছে, যার কারণেও আপনার ওপর করের চাপ বাড়বে। কীভাবে সেটি? অঙ্কের হিসাবে তাহলে মিলিয়ে নিন। ধরুন সুদ আয় থেকে আপনার উৎসে কর কাটা হলো ১৫ হাজার টাকা আর মোটরযান থেকে আরও ২০ হাজার টাকা মিলিয়ে মোট উৎসে কর কাটা হলো ৩৫ হাজার টাকা। বছর শেষে রিটার্ন দাখিলের সময় দেখা গেল আপনার কর এল ২০ হাজার টাকা। তাহলে উৎসে কর বাবদ যে ৩৫ হাজার টাকা কাটা হলো, সেখান থেকে ১৫ হাজার টাকা ফেরত পাওয়ার কথা। কিন্তু আয়কর আইনের ৮২(সি) ধারাটি পরিবর্তন করে সেই পথটি এখন বন্ধ করা হয়েছে। জাতীয় রাজস্ব বোর্ড বা এনবিআর এখন বলছে, বছরজুড়ে বিভিন্ন ধরনের আয় থেকে যে উৎসে কর কাটা হয়েছে, বছর শেষে আপনার প্রদেয় কর তার কম হতে পারবে না।

আবার আপনি যেখানে চাকরি করেন সেখানে যদি প্রভিডেন্ট ফান্ড সুবিধা পান, তাহলে এখন সেখান থেকেও আপনার আর্থিক সুবিধা কমবে। আগে প্রভিডেন্ট ফান্ডের অর্থ কোথাও বিনিয়োগ করে যে আয় হতো, তা করমুক্ত ছিল। এখন ওই আয় থেকেও ৫ শতাংশ হারে উৎসে কর কেটে রাখা হবে। ফলে প্রভিডেন্ট ফান্ডের সুদ ও বিনিয়োগ থেকে প্রাপ্ত আয় থেকে আগের চেয়ে কম অর্থ যোগ হবে আপনার হিসাবে। একইভাবে করের চাপ বাড়ায় গ্র্যাচুইটি ও শ্রমিক মুনাফা তহবিল থেকেও আপনার আয় কমে যাবে।

এভাবেই ঘোষিত বাজেটে সাধারণ ব্যক্তিশ্রেণির সৎ করদাতার ওপর করের বোঝা বাড়ানো হয়েছে। যেসব প্রতিষ্ঠান ও ব্যক্তি সৎভাবে কর পরিশোধ করেন, তাঁদের ওপরই এ চাপ বাড়বে।

লেখক: মাসুদ খান, প্রধান অর্থ কর্মকর্তা (সিএফও), লাফার্জ সুরমা সিমেন্ট।

আপনার মন্তব্য

*

*

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.

Top