“বিনিয়োগকারী নেই, তাই আর মার্চেন্ট ব্যাংকে কাজ করতে ভালো লাগে না”

alamgirদীর্ঘ ১৮ বছরের কর্মজীবনে মো: আলমগীর হোসেন কাজ করেছেন বিভিন্ন মার্চেন্ট ব্যাংকে। বর্তমানে সাউথইস্ট ব্যাংক ক্যাপিটাল ম্যানেজমেন্ট লিমিটেডের কর্ণধার হিসেবে নিয়োজিত রয়েছেন। কর্মজীবনে পুঁজিবাজারে দীর্ঘ এই পথ পরিক্রমায় মুখোমুখি হয়েছেন বিভিন্ন অভিজ্ঞতার। একটা সময় জমজমাট ব্যস্ততার মধ্যে সময় কাটানো আলমগীর হোসেনের কাছে বর্তমানে কাজ করতে আর ভালো লাগছে না। বাজারে প্রকৃত বিনিয়োগকারী না থাকাতেই তার এ অনুভূতি। আলমগীর হোসেনের কর্মজীবন ও ব্যক্তিগত বিভিন্ন অভিজ্ঞতা সম্প্রতি উঠে এসেছে শেয়ারবাজার নিউজ ডট কমের সাথে সাম্প্রতিক এক আলাপচারিতায়। সাক্ষাৎকারটি নিয়েছেন ওয়াহিদুল হক।

 

মার্চেন্ট ব্যাংকের সাম্প্রতিক অবস্থা সম্পর্কে কিছু বলুন।

আলমগীর হোসেন

বাজারের অবস্থা তো দেখতেই পাচ্ছেন। আমাদের ব্যবসা বলতে তো আর কিছু নেই। বিনিয়োগকারীই নেই, আমাদের ব্যবসা থাকবে কিভাবে?

 

এ কথা কেন বলছেন? বাজার সংশ্লিষ্টরা তো বলছেন, বিগত কয়েক মাসে বাজার স্থিতিশীলতার দিকে যাচ্ছে। লেনদেনও বাড়ছে।

আলমগীর হোসেন

লেনদেন বাড়ছে বলেই বাজারে স্থিতিশীলতা আসছে, এটা তো সম্পূর্ণ ভূল ধারণা। বাজারে ভিত্তিহীন কোম্পানি একটার পর একটা আসছেই। নিয়ন্ত্রক সংস্থাও সেভাবে নজরদারি করতে পারছে না। মূল দায়িত্ব যাদের, সেই ইস্যু ম্যানেজাররাও কোম্পানির অবস্থা সম্পর্কে কতটুকু জেনে ইস্যু জমা দিচ্ছে তা নিয়ে সন্দেহ আছে। বাজার তো সাধারণ বিনিয়োগকারীদের জন্য। আর মূল কথা হলো সাধারণ বিনিয়োগকারীদের তো অবস্থার কোনো উন্নতি হচ্ছে না। তারা ক্ষতিগ্রস্ত থেকে আরও ক্ষতিগ্রস্তই হচ্ছেন। তাদের পকেটে টাকা না ঢুকলে এই বাজারকে আপনি ভালো বলবেন কিভাবে?

 

বিনিয়োগকারীরাই তো নতুন ইস্যুর ব্যাপারে বেশি আগ্রহী বলে শোনা যায়।

আলমগীর হোসেন

কারা নতুন ইস্যুর ব্যাপারে বেশি আগ্রহ দেখায়? এটা তো আপনাকে জানতে হবে। যাদের নামে বেনামে ছয়শ-সাতশ বিও একাউন্ট আছে, তারাই নতুন ইস্যুর ব্যাপারে আগ্রহ দেখায়। আপনি কিভাবে তাদের সাধারণ বিনিয়োগকারী বলবেন? তারা তো সুযোগ সন্ধানী। তারা বাজারে থাকবে না। বাজারে তাদের কোনো অবদানই নেই। তারা লটারিতে শেয়ার পেলে বেশি দামে বিক্রি করে বাজার থেকে চলে যাবে।

 

তাহলে সাধারণ বিনিয়োগকারীদের কল্যাণের জন্য কী করা উচিত?

আলমগীর হোসেন

আমার মতে, বাজার ভালো করতে হলে ভিত্তিহীন কোম্পানি তো পরের কথা, বাজারে নতুন করে সামনের ৪-৫ বছর কোনো ইস্যুই অনুমোদনই দেয়া উচিত না। এই সময়ে বিএসইসি’র সব কোম্পানির অবস্থা সম্পর্কে অনুসন্ধান করবে। বাজারে আবেদন করার আগে কোম্পানির কী অবস্থা ছিলো, বাজারে আসার জন্য তারা কী তথ্য দেখিয়েছে আর বাজারে আসার পরই বা ওই কোম্পানির কী অবস্থা, তা সম্পূর্ণভাবে যাচাই-বাছাই করে দোষী ও কারসাজি করা কোম্পানিগুলোর বিরুদ্ধে যথাযথ ব্যবস্থা নিতে হবে।

 

২০১০ সালে বাজার ধসের পর তো ইব্রাহিম খালেদের নেতৃত্বে গঠিত তদন্ত কমিটি ভালো কাজ করেছে বলে শোনা যায়।।

আলমগীর হোসেন

দেখুন, ওই ব্যাপারে কিছু না বলাই ভালো। আমি শুধু বলবো, দৈবচয়নের ভিত্তিতে অমনিবাস অ্যাকাউন্ট নিয়ে অনুসন্ধান করা ঠিক হয়নি। সব অ্যাকাউন্ট সম্পর্কেই অনুসন্ধান করা উচিত ছিলো। দৈবচয়নের ভিত্তিতে কাজ করলে প্রায়ই ভুল হওয়ার সম্ভাবনা থাকে।

 

ইস্যু ম্যানেজারদের প্রায়ই কারসাজির আশ্রয় নিতে দেখা যায়। দুর্বল বা মৌলভিত্তিহীন কোম্পানি বাজারে আসছে। প্রথম দিকে বাজারদর উর্ধ্বমুখী থাকলেও পরবর্তী সময়ে কোম্পানির আর কোনো খবর থাকে না।

আলমগীর হোসেন

এটা তো হচ্ছেই। আমরা শুধু বলি ‘ফান্ডামেন্টাল, ফান্ডামেন্টাল’, কিন্তু ফান্ডামেন্টাল ভালো এমন কোম্পানির শেয়ার দরের তুলনায় তো এখনও ভিত্তিহীন কোম্পানিই বাজারে শেয়ার দরের হিসাবে ভালো করছে। নাম বলা ঠিক হবে না, কিন্তু এমন সব কোম্পানির শেয়ার দর বাড়ে যা দেখলেও খারাপ লাগে। বিনিয়োগকারীরা এখনও কী চিন্তা করে বিনিয়োগ করছে, তা আমাদের বুঝে আসে না। যেসব কোম্পানির শেয়ার দর বাড়ার কথা সেগুলোর কোনো খবর নেই, কিন্তু মৌলভিত্তিহীন কোম্পানির সূচক ঠিকই উর্ধ্বমুখী।

 

আপনাদের প্রতিষ্ঠান বিনিয়োগকারীদের জন্য কী করছে?

আলমগীর হোসেন

দেখুন, প্রতিটি বাণিজ্যিক ব্যাংক প্রতি বছর মোটা অঙ্কের মুনাফা করে। সাবসিডিয়ারি মার্চেন্ট ব্যাংকের অস্তিত্ব রক্ষার জন্য চাইলে লাভের কিছু অংশ তো সাধারণ বিনিয়োগকারীদের জন্য খরচ করা যেতে পারে। এসব ক্ষতিগ্রস্ত মানুষের জন্য কিছু না করতে পারলে সিএসআর বা অন্য প্রকল্পে এত টাকা খরচ করার অর্থ কী?

 

বাংলাদেশ ব্যাংকের ভূমিকাকে কিভাবে মূল্যায়ন করবেন?

আলমগীর হোসেন

এক্সপোজার নিয়ে বাংলাদেশ ব্যাংক যা করেছে, তা সব সময়ই প্রশ্নবিদ্ধ হয়েছে। তাদের কাছে প্রত্যেক সপ্তাহের রিপোর্ট যায়। তারা কি আরও আগেই সতর্ক হতে পারতো না? তারা তো জানতোই যে ব্যাংকগুলো এক্সপোজার লিমিট অতিক্রম করেছে। প্রথমে কোনো ব্যাংককে তো তারা সতর্ক করেইনি, উল্টো যখন বাজারের অবস্থা নিয়ন্ত্রহীন পর্যায়ে চলে গিয়েছিল, সে সময় সার্কুলার দিয়ে সবাইকে এক্সপোজার কমানোর নির্দেশ দেয়ার যৌক্তিকতা কী। যাদের এক্সপোজার বেশি ছিলো তাদের আলাদা আলাদা করে নির্দেশ দিলেই তো বাজারে এতো বড় একটা ধস নামতো না।

 

এখন পরিস্থিতিটা কী?

আলমগীর হোসেন

ওই পরিস্থিতির পরও যে বাংলাদেশ ব্যাংক পুঁজিবাজারের প্রতি সহানুভূতিশীল হয়েছে, তা বলা যাবে না। এত কিছু থাকতে স্বচ্ছতা আনার জন্য ব্যাংকের সাবসিডিয়ারিকে কেন আলাদা করতে হবে? আমরা তো এমনিতেই সংকটে আছি। বাংলাদেশ ব্যাংকের ওই সার্কুলারের পর থেকে সাবসিডিয়ারি মার্চেন্ট ব্যাংকগুলোর দুর্দশা যে কোন পর্যায়ে এসে পড়েছে, তা বলার মতো না।

 

এ অবস্থায় বাংলাদেশ ব্যাংকের কাছ থেকে কী প্রত্যাশা করেন?

আলমগীর হোসেন

বাংলাদেশ ব্যাংকের কাছে আর কীই বা প্রত্যাশা করার আছে? আমরা তো অনেক আগে থেকেই আহ্বান জানিয়ে আসছি, ন্যূনতম ইন্টারেস্ট রেটে বাংলাদেশ ব্যাংক আমাদের কিছু ঋণ দিতে পারে। ব্যাংকের রিজার্ভ তো রেকর্ড পরিমাণ হয়েছে। টাকাগুলো ব্যাংকে অলস ফেলে না রেখে তো এই রুগ্ন ব্যবসাটিকে বাচানোর উদ্যেগ নেয়া যেতে পারে। বিভিন্ন বাণিজ্যিক ব্যাংকের নানা কারসাজি এবং মন্দ ঋণ তো ঠিকই নিয়ন্ত্রক সংস্থার চোখ ফাঁকি দিয়ে হচ্ছে। আর আমরা তো প্রাতিষ্ঠানিকভাবে চাচ্ছি। এখানে ক্লায়েন্টের টাকা নষ্ট হওয়ার কোনো আশঙ্কাই নেই।

 

একটু ব্যক্তিগত কথায় আসি। মার্চেন্ট ব্যাংকে কিভাবে এলেন?

আলমগীর হোসেন

ইউনিভার্সিটিতে পড়ার সময় থেকেই শেয়ার ব্যবসা শুরু করেছিলাম। টিউশনির টাকার সাথে এক বন্ধুর কাছ থেকে কিছু টাকা নিয়ে আরম্ভ। এরপর ভার্সিটি পাস করার পর এক বন্ধু আমাকে SAR সিকিউরিটিজ হাউজে একটা চাকরির অফার আছে বলে নিয়ে আসলো। সেই থেকেই পুঁজিবাজারে স্থায়ীভাবে যাত্রা। ওই জায়গায় ভালো করার পর এনসিসি ব্যাংকের সিকিউরিটিজ হাউজ থেকে অফার আসলো। বাণিজ্যিক ব্যাংকের সাবসিডিয়ারি হিসেবে খোলা এটিই প্রথম সিকিউরিটিজ হাউজ। সেখানে কিছুদিন কাজ করার পর ঢাকা ব্যাংক থেকে অফার আসলো। সেখানেও কিছুদিন কাজ করলাম  এরপর সাউথইস্ট ব্যাংক অফার করলো তাদের মার্চেন্ট ব্যাংকে আসার জন্য। এরপর থেকে তো এখানেই। প্রায় পাঁচ বছর দুই মাস হলো এখানে আছি।

 

সামনের দিনগুলোতে কী করতে চান?

আলমগীর হোসেন

এখন আর মার্চেন্ট ব্যাংকে কাজ করতে ইচ্ছা করে না। আগে আমার অফিস ভর্তি বিনিয়োগকারী থাকতো। খুব ভালো লাগতো। এখন বিনিয়োগকারীরাও আসে না, কাজের মধ্যেও কোনো আনন্দ পাই না। বাজারে যদি বিনিয়োগকারীই না থাকে, তাহলে এই বাজারের মূল্যটা কী? বিনিয়োগকারী ছাড়া এই বাজার কী থাকবে? আমি চাই বিনিয়োগকারীরা আবার বাজারে ফিরে আসুক। বিনিয়োগকারীদের জন্য কিছু করার আশায় এখনও মার্চেন্ট ব্যাংকে আছি। তাদের প্রতি আহ্বান জানাবো, তারা আবার বাজারে ফিরে আসুক। আমরা য়থাসাধ্য সাহায্য করার জন্য প্রস্তুত আছি।

 

নিজের সন্তানদের কোথায় দেখতে চান?

আলমগীর হোসেন

দেখুন, আমি আমার বাবার কথা সারাজীবন মেনে চলেছি। তিনি বলতেন, কারও যদি উপকার না করতে পারো, করার দরকার নেই। কিন্তু কখনও কারও ক্ষতি করবে না। আমি আমার সন্তানদেরকেও এটি শিক্ষা দেই। তারা কর্মজীবনে যেখানেই যাক না কেন, তাদের মধ্যে যেন নৈতিকতা ঠিক থাকে, যে কাজই করুক সে কাজে যেন সৎ থাকে আমি মনে-প্রাণে আল্লাহ্ তা’আলার কাছে এ প্রার্থনা করি।

 

মূল্যবান সময় দেয়ার জন্য আপনাকে ধন্যবাদ।

আলমগীর হোসেন

আপনাকেও ধন্যবাদ।

শেয়ারবাজার রিপোর্ট:

আপনার মন্তব্য

Top