এনবিআরের রিপোর্ট: দুই বছরে ৭৯০ কোটি টাকা পাচার

NBR_SharebazarNewsশেয়ারবাজার ডেস্ক: জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) বন্ড সুবিধাপ্রাপ্ত প্রতিষ্ঠানের তালিকায় অদিতি অ্যাপারেলস লিমিটেডের নাম আছে। প্রতিষ্ঠানটির ঠিকানা হিসেবে উল্লেখ আছে ৭৪৪ শেওড়াপাড়া, রোকেয়া সরণি, মিরপুর, ঢাকা। গত দুই বছরে প্রতিষ্ঠানটি কাগজে-কলমে বেশ কয়েক দফায় ২ কোটি ৩৩ লাখ ৬২ হাজার ৪৭৭ টাকার কাঁচামাল আমদানি করেছে। এনবিআর গঠিত তদন্ত কমিটি ওই ঠিকানায় গিয়ে অদিতি অ্যাপারেলস লিমিটেড নামে কোনো প্রতিষ্ঠানের অস্তিত্ব পায়নি।

এনবিআর বলছে, এ প্রতিষ্ঠানের নামে ভুয়া বা জাল কাগজপত্র ব্যবহার করে কাঁচামাল আমদানির নামে অর্থ পাচার হয়ে আসছে। প্রতিষ্ঠানটির নামে মিথ্যা ঘোষণায় কম দামের কিছু পণ্য এনে খোলাবাজারে বিক্রি করা হয়েছে।  শুধু অদিতি অ্যাপারেলস লিমিটেডই নয়, এনবিআরের তদন্তে এমন ৩২৪টি প্রতিষ্ঠানের নাম উঠে এসেছে, যারা জালিয়াতির আশ্রয় নিয়ে গত প্রায় ২ বছরে ৭৮৯ কোটি ২২ লাখ ৪৭ হাজার ৩৭৮ টাকা পাচার করেছে। সম্প্রতি এনবিআরের অর্থপাচার সম্পর্কিত প্রতিবেদনে এসব তথ্য উঠে এসেছে।

এনবিআর চেয়ারম্যান মো. নজিবুর রহমানের নেতৃত্বে সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানের বিভিন্ন শাখার কর্মকর্তাদের নিয়ে গঠিত পৃথক কমিটি এ বিষয়ে তদন্ত করে যাচ্ছে। তদন্ত-সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা বিভিন্ন স্থলবন্দর, সমুদ্রবন্দর ও আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর, বাংলাদেশ ব্যাংকসহ বিভিন্ন ব্যাংক, এনবিআরের সংশ্লিষ্ট শাখা থেকে বন্ড সুবিধাপ্রাপ্তদের তথ্য-উপাত্ত সংগ্রহ করেছেন। সেই সঙ্গে চিহ্নিত সেই ৩২৪ প্রতিষ্ঠান কাগজে-কলমে যে ঠিকানা ব্যবহার করেছে সেখানে সরেজমিনে গিয়ে তদন্তে অর্থপাচারের বিষয়টি নিশ্চিত হন তাঁরা।

বিক্রেতা প্রতিষ্ঠান হিসেবে বিদেশে যেসব প্রতিষ্ঠানের অনুকূলে অর্থ পাচার করা হয়েছে সেসব প্রতিষ্ঠান চিহ্নিত করতে এনবিআরের একাধিক কমিটি দ্বৈত কর চুক্তির আওতায় তথ্য সংগ্রহের কাজ করছে। প্রতিবেদনে উল্লেখ আছে, এনবিআরের তালিকায় শতভাগ রপ্তানিমুখী বন্ড সুবিধাপ্রাপ্ত প্রতিষ্ঠান আছে সারা দেশে প্রায় ছয় হাজার। এর মধ্যে ৩২৪টি প্রতিষ্ঠানের নাম তালিকাভুক্ত থাকলেও বাস্তবে এদের কোনো অস্তিত্ব নেই। কাগজে-কলমের এসব প্রতিষ্ঠান ভুয়া বা জাল কাগজপত্র ব্যবহার করে বন্ড সুবিধার আওতায় প্রায় দুই বছর থেকে পণ্য আমদানির নামে অর্থ পাচার করেছে। ওই ৩২৪ প্রতিষ্ঠানের অধিকাংশই তৈরি পোশাক খাতের প্রতিষ্ঠানের আওতায় জালিয়াতি করে অর্থ পাচার করে আসছে।

প্রতিবেদনে বলা হয়, অধিকাংশ প্রতিষ্ঠানের ঠিকানা হিসেবে ঢাকার মিরপুর, বনানী, যাত্রাবাড়ী, সাভার, নারায়ণগঞ্জ, টঙ্গীর বিভিন্ন এলাকার কথা উল্লেখ আছে। রাজধানীর মিপুরের সেকশন ১২, ব্লক বি, রোড ২, বাড়ি নম্বর ৩২ ঠিকানা ব্যবহার করা জেকোস্ গার্মেন্ট লিমিটেড কাঁচামাল আমদানির নামে ১২ কোটি ৩১ লাখ ৬৯ হাজার ৭৭৭ টাকা পাচার করেছে। মিপুরের ৬৫৯/১ নম্বর কাজীপাড়ার ঠিকানা উল্লেখ করা এবি প্যাকেজিং প্রতিষ্ঠানের নামে একই কায়দায় এক কোটি ৪৩ লাখ ৪৬ হাজার ৩১৮ টাকা পাচার করা হয়।

একই প্রক্রিয়ায় কাঁচামাল আমদানির নামে মিরপুরের ৭৩৮ শেওড়াপাড়ার ঠিকানা ব্যবহার করে একেএস পলিমার ইন্ডাস্ট্রিজ লিমিটেড ১৯ কোটি ৬৭ লাখ ৩৫ হাজার ৩৯৪ টাকা, প্লট নম্বর ৬২, ২০৩, ২০৪ বারইপাড়া সাভারের ঠিকানা দেখিয়ে জেনারেল অ্যাপারেলস ইন্ডাস্ট্রিজ লিমিটেডের নামে তিন কোটি ৪৪ লাখ ৯০ হাজার ৮৪৪ টাকা, নর্থ যাত্রাবাড়ীর ঠিকানা দেখিয়ে আইডিয়াল গার্মেন্ট লিমিটেডের নামে দুই কোটি ২১ লাখ ৪৬ হাজার ৪৯২ টাকা,  মিরপুর ১-এর প্লট নম্বর ২২, রোড নম্বর ১-এর ঠিকানা দেখিয়ে জয়ন্তিকা অ্যাপারেল লিমিটেড ১০ কোটি ৭০ লাখ ৩৩ হাজার ২৬৬ টাকা, ১২৫/৩ সাউথ মিরপুরের ঠিকানা দেখিয়ে এবি গার্মেন্ট লিমিটেড আট কোটি ৫২ লাখ ৫৭ হাজার ১৩৯ টাকা, উত্তরার প্লট নম্বর ৮৭৮, বিএনএস সেন্টার (১৩ ও ১৪ নম্বর ফ্লোর), রোড নম্বর ৭, সেক্টর নম্বর ৭-এর ঠিকানা দেখিয়ে বলাকা অ্যাপারেলস লিমিটেড তিন কোটি ৬১ লাখ ১৩ হাজার ৪৬৫ টাকা, ২৩ উত্তরার ঠিকানা দেখিয়ে ডেল্টা ডায়িং অ্যান্ড ফেব্রিকস লিমিটেড দুই কোটি ৮১ লাখ ৮৫ হাজার ৬৮৩ টাকা, সাভারের মাজিদপুর বাসস্ট্যান্ড প্লট বি ৩৬, রানা প্লাজা (পঞ্চম তলা) ঠিকানা দেখিয়ে উদার টেক্স লিমিটেড দুই কোটি ৪৭ লাখ ১৪ হাজার ১১৭ টাকা, নারায়ণগঞ্জ, রূপগঞ্জ, ভুলতা, গোলাকান্দাইল ঠিকানা দেখিয়ে এক্সট্রোভার্ট প্লাস্টিক লিমিটেড দুই কোটি ২০ লাখ ২৭ হাজার ১৮৪ টাকা, ৯৭ বানপুকুর, সাভার বাজার ঠিকানা দেখিয়ে ফুজি নিট অ্যান্ড ফ্যাশনওয়্যার লিমিটেড ১৪ কোটি ১৮ লাখ ৭৬ হাজার ৭৭৫ টাকা পাচার করেছে।

এভাবে বিভিন্ন মিথ্যা ঠিকানা ব্যবহার করে বন্ড সুবিধা পাওয়া ৩২৪টি প্রতিষ্ঠান বড় অঙ্কের অর্থ বাংলাদেশ থেকে পাচার করেছে।  প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, এসব প্রতিষ্ঠান তাইওয়ান, সিঙ্গাপুর, থাইল্যান্ড, ভারত, মালয়েশিয়া, চীন, ওমান, সুইজারল্যান্ড, সুইডেন, ভিয়েতনাম, ডেনমার্কসহ ২১টি দেশ থেকে পণ্য আমদানির নামে অর্থ পাচার করেছে। পণ্য আমদানির নামে অর্থপাচারে সর্বোচ্চ এক কোটি ২০ লাখ টাকা পর্যন্ত একবারে পাঠানো হয়েছে। শুল্ক, ব্যাংকসহ সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানের সন্দেহের বাইরে থাকতেই এ প্রক্রিয়া অনুসরণ করা হয়।

এনবিআর কর্মকর্তারা বলছেন, অস্তিত্বহীন (কাগুজে প্রতিষ্ঠান) ৩২৪ প্রতিষ্ঠান আমদানির নামে এলসি খুলে বিদেশে টাকা পাঠালেও অধিকাংশ সময়ে কোনো পণ্য আমদানি করা হয়নি। তবে কিছু ক্ষেত্রে মিথ্যা ঘোষণায় নামমাত্র মূল্যের কিছু কাঁচামাল আমদানিও করা হয়েছে, যা পরে খোলাবাজারে বিক্রি করা হয়েছে বলে তদন্তে প্রমাণ মিলেছে। নাম প্রকাশ না করার শর্তে এনবিআরের তদন্ত কমিটির এক ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা বলেন, ‘অর্থপাচারকারীরা দীর্ঘদিন ধরে সুকৌশলে অর্থ পাচার করে আসছে। কাঁচামাল কিনতে বিদেশে বিক্রেতা প্রতিষ্ঠান হিসেবে যেসব প্রতিষ্ঠানের নাম আমরা পেয়েছি তাতেও জালিয়াতির চূড়ান্ত হয়েছে। আমরা বের করেছি যেসব প্রতিষ্ঠানের অনুকূলে অর্থ পাঠানো হয়েছে তার অধিকাংশই ওই ৩২৪ প্রতিষ্ঠানের নিজস্ব মালিকানাধীন প্রতিষ্ঠান। সহজে জালিয়াতি করতে আগে থেকেই বিদেশে নিজেরাই প্রতিষ্ঠান খুলে নিয়েছে তারা।

তবে নিজস্ব মালিকানাধীন প্রতিষ্ঠানের বাইরেও বিদেশি অন্য প্রতিষ্ঠানের সহযোগিতায় অর্থপাচারের উদাহরণও আছে। এসব ক্ষেত্রে সমঝোতায় অর্থ পাচার করে পরবর্তী সময়ে তা সংগ্রহ করে বিদেশেই রেখে দেওয়া হয়।’ ওই কর্মকর্তা আরো বলেন, ‘বিদেশি যেসব প্রতিষ্ঠানের ঠিকানা ব্যবহার  করে অর্থ পাচার করা হয়েছে সেসব প্রতিষ্ঠান চিহ্নিত করার কাজ চলছে। এরই মধ্যে কিছু প্রতিষ্ঠান আমরা চিহ্নিত করতে পেরেছি, বাকিগুলোর সন্ধান চলছে। উপযুক্ত তথ্য-প্রমাণ হাতে এলেই মামলা করা হবে।’

শেয়ারবাজারনিউজ/রু

আপনার মন্তব্য

*

*

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.

Top