১০ টাকায় শেয়ার কিনে ২০ টাকা আশা করা ঠিক না : মাজেদুর রহমান

Majedur Rahman 01শেয়ারবাজার রিপোর্ট: উল্লম্ফন বা পতনের দিকে লক্ষ না করে আমাদের যে ভাল লিস্টেড কোম্পানিগুলো রয়েছে তাদের যে কোন একটাতে দীর্ঘমেয়াদে বিনিয়োগ করা উচিত। তবে অবশ্যই ভালভাবে জেনে বুঝে যাচাই করে বিনিয়োগ করতে হবে। এটা আশা করা ঠিক হবে না, আমি আজ ১০ টাকায় শেয়ার কিনে কাল ২০ টাকা পেয়ে যাব। সেটা বাজারের স্বার্থেও ভাল না, বিনিয়োগকারীর স্বার্থেও ভাল না। কথাগুলো বলছিলেন ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জের (ডিএসই) ব্যবস্থাপনা পরিচালক কে.এ.এম মাজেদুর রহমান। শেয়ারবাজারনিউজকে দেয়া এক সাক্ষাতকারে এ বিষয়টির সঙ্গে আরো বেশকিছু গুরুত্বপূর্ণ বিষয় নিয়ে খোলামেলা আলোচনা করেন ডিএসইর নবনিযুক্ত এমডি মাজেদুর রহমান। সাক্ষাতটির চুম্বক অংশ নিম্নে পাঠকদের উদ্দেশ্যে তুলে ধরা হলো: সাক্ষাতকারটি নিয়েছেন শেয়ারবাজারনিউজ ডটকমের নিজস্ব প্রতিবেদক রুহান আহমেদ এবং ইসমাইল হোসেন। 

শেয়ারবাজার নিউজ: সাড়া পৃথিবীতেই একটি অস্থিরতা রয়েছে জঙ্গি এবং সাইবার হামলা। যেহেতু ডিএসই’র সকল কার্যক্রম অনলাইনে হয় সেহেতু এ ধরনের সাইবার হামলা প্রতিরোধে আপনাদের পরিকল্পনা কি?

মাজেদুর রহমান: আমরা ইন্টারনেট সিকিউরিটি বা সাইবার সিকিউরিটি বলতে যেটা বুঝি সে বিষয়ে আমরা পদক্ষেপ নিয়েছি। কিন্তু এখানে সবচেয়ে বড় প্রশ্নটি হল ফান্ডামেন্টাল সিকিউরিটি। মানে হল আমি যদি না জানি কি কি কারণে আমার ডাটা হ্যাকড হতে পারে, আমার পাসওয়ার্ড যদি দুর্বল করে দেয়া থাকে বা এসব বিষয়ে যে ধারণাটা না থাকে তবে আমাদের ক্ষতিগ্রস্থ হওয়ার সম্ভাবনা থেকেই যায়। এসব ব্যাপারে আমাদের যে প্রাথমিক ধারণাটা দরকার সেটাই আসলে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। সেই জন্য আমি প্রথমে যে কাজটি করি তা হল: সর্বস্তরের ব্যবহারকারীদের এ্যাওয়ারনেস এবং তাদের মধ্যে যাতে সিকিউরিটি বজায় থাকে তা নিশ্চিত করা। তারপরে কোথায় দুর্বলতা রয়েছে, সিস্টেমস কিভাবে কাজ করছে, আইটি অডিট, ডেটা অডিট ঠিকভাবে করেছে কিনা তা খতিয়ে দেখাসহ আরো অন্যান্য বিষয় নিয়ে আমরা সজাগ আছি।

শেয়ারবাজার নিউজ: সাইবার সিকিউরিটি নিশ্চিত করার জন্য অন্যকোন প্রতিষ্ঠানের স্বরণাপন্ন হয়েছেন কি?

মাজেদুর রহমান: আপনারা জানেন আমরা স্টক এক্সচেঞ্জ সাপোর্টার নাসডাক এর সাথে কাজ করি। এটা খুবই শক্তিশালী সফটওয়্যার এবং তাদের সঙ্গে আমরা স্বার্বক্ষণিক যোগাযোগ রক্ষা করি। আর এর মধ্যে আমাদের আয়ত্বে কিছু জিনিষ রয়েছে, যা আমরা মনে করি যথেষ্ট শক্তিশালী। যদি বিশেষ কোন প্রয়োজনে কারো সঙ্গে যোগাযোগ করার প্রয়োজন হয় তাহলে আমরা অবশ্যই যাব।

শেয়ারবাজার নিউজ: আগামী কিছুদিনের মধ্যেই মার্কেটে নতুন কিছু ইস্যু যুক্ত হতে যাচ্ছে। যেমন: ইটিএফ ফান্ড, ফিউচার অপশন ডেরিভেটিভ মার্কেট ইত্যাদি। এগুলোর জন্য ডিএসই কতটা প্রস্তুত?

মাজেদুর রহমান: এখানে শুধু ডিএসই না, ডিএসই’র ট্রেক হোল্ডার, বিনিয়োগকারী এবং সংশ্লিষ্টদের সকলের ধারণা থাকা উচিৎ। জিরো কুপন বন্ড আমি প্রথম বাংলাদেশে পরিচিতি করিয়েছিলাম। কিন্তু তা দুর্ঘটনাবশত স্টক এক্সচেঞ্জে লেনদেন হয়নি। এসব বিষয়গুলো পরিচালনার ব্যাপারে আমাদের যথেষ্ট যোগ্যতা রয়েছে। এছাড়া আরো যতগুলো নতুন কনটেন্ট আসবে সেগুলো ডেভেলপ করার জন্য যথাসময়ে ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।

শেয়ারবাজারনিউজ: মোবাইম এ্যাপস এর বিষয়ে কি বলবেন?

মাজেদুর রহমান: যুগের সাথে তাল মিলিয়ে আমরা আপডেট থাকতে চাই। তারই একটি পদক্ষেপ হল মোবাইল এ্যাপস। এটা চালু করে শুধু বলে দিলেই কাজ শেষ হয়ে গেল না। এটার জন্য আমাদের এখানে প্রতিদিন প্রশিক্ষণ চলছে। এখানে আমাদের ব্রোকাররা এবং বিনিয়োগকারীরাও অংশগ্রহণ করছেন। পরে এ প্রোগ্রামটি আরো প্রসারিত করে বিভিন্ন ব্রোকার এবং মার্চেন্ট ব্যাংকে গিয়ে বিনিয়োগকারীদের প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করার বিষয়ে আমরা ভাবছি।

শেয়ারবাজারনিউজ: বাজার উন্নয়নে আপনার ভবিষ্য পরিকল্পনা কি ?

মাজেদুর রহমান: খুব মজার বিষয় হল পরিকল্পনা আমার আগেই করা আছে। আর সেসব পরিকল্পনা বাস্তবায়ন করা হল এখন আমার সবচেয়ে বড় দায়িত্ব। তার মধ্যে রয়েছে ইটিএফ ফান্ড। যেটার সম্পর্কে বিএসইসি ইতিমধ্যে গাইড লাইন দিয়েছে। এছাড়া নতুন যেসব প্রোডাক্ট বাজারে আনার চেষ্টা করছি। এসব এক্সচেঞ্জ প্রোডাক্ট রাতারাতি আনাও সম্ভব হবে না। আর এগুলো নিয়ে ধীরেসুস্থে অগ্রসর হতে হবে।

শেয়ারবাজারনিউজ: দীর্ঘদিন কোন সরকারি কোম্পানি তালিকাভুক্ত হচ্ছে না। অনেকেই মনে করছেন এই মুহূর্তে আমাদের সরকারি কোম্পানি তালিকাভুক্তির প্রয়োজন। আপনি কি মনে করেন?

মাজেদুর রহমান: এখানে কোন ধরনের বাধা নেই। তবে মূল সমস্যাটা হল: উদ্যোগটা কে নেবে। উদ্যোগের জন্য দেশের মার্চেন্ট ব্যাংক বা সিকিউরিটিজ কোম্পানি যদি উদ্যোগ নিয়ে বাজারে আসতে পারে। একটা জিনিষ আমি শেয়ার করি, ২০০৪ সালে আমাদের মেঘনা এবং যমুনা সেতু থেকে প্রতিদিন ১৪ কোটি টাকা আয় হত। একটা হিসাব ছিল আমি যদি এই বিষয়টাকে ঠিকঠাক ভাবে পরিচালনা করে বন্ড ইস্যুর মাধ্যমে ‍কুপন আকারে বাজারে ছাড়তে পারি তবে আমাদের বাজারে একটা ভাল প্রোডাক্ট যুক্ত হবে। ঠিক তেমনি পদ্মা সেতুও আমাদের বাজারে একই ভাবে আসতে পারে। আমাদের তেল কোম্পানিগুলো খুব লাভজনক প্রতিষ্ঠান; তারাও আসতে পারে। শুধু তাই না দেশের বড় বড় ইনফ্রাস্ট্রাকচার গুলো আমাদের বাজারে এসে তাদের ক্যাপিটাল রেইস করতে পারে।

শেয়ারবাজারনিউজ: দেশের বেশকিছু বড় গ্রুপ অব কোম্পানি রয়েছে। যারা তাদের কোম্পানিকে স্টক এক্সচেঞ্জে তালিকাভুক্ত করতে আগ্রহী নয়। প্রয়োজনে এর জন্য কোম্পানিগুলো জরিমানাও দিতে প্রস্তুত। এ ক্ষেত্রে তালিকাভুক্তির ব্যাপারে তাদের সমস্যগুলো চিহ্নিত করে সমাধানের মাধ্যমে আগ্রহ ফিরিয়ে আনা যায় কিনা?

মাজেদুর রহমান: আমি বলব এইটাই হল সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ। আমাদের দেশে এমন কিছু ভাল ভাল কর্পোরেট এখন তৈরী হয়ে গেছে যা পারিবারিক ঐতিহ্য। বিশ্বের উন্নত দেশগুলোর মধ্যেও পরিবারিক ঐতিহ্যগত অনেক কোম্পানি রয়েছে যারা স্টক এক্সচেঞ্জে লিস্টেড হয়েছেন এবং সেই ঐতিহ্যও ধরে রেখেছেন। যাদের কথা বলছেন, তাদের কি কি সুবিধা-অসুবিধা আছে তা বিশ্লেষণ করে একটা সলিউশনে আসা অবশ্যই দরকার। তাদের কাছে মনে হয় আমরা খুব ইফেক্টটিভলি পৌছতে পারিনি। যদিও আমরা সেই রোলটা প্লে করতে পারবো না, একটা কাজ করতে হয়তো পারবো। তা হল: এমন একটা পরিবেশ সৃষ্টি করতে পারব যাতে তারা কোম্পানিকে লিস্টেডে আগ্রহী হবে।

শেয়ারবাজার নিউজ: আপনি যোগদানের পর থেকে কি কি সমস্যার সম্মূখীন হয়েছেন। এর মধ্যে কোন কোন সমস্যাকে চ্যালেঞ্জ বলে মনে করছেন?

মাজেদুর রহমান: আমি এখনো দেখছি। আমি যা দেখব তা হল আমার প্লাটফর্ম। আমার প্লাটফর্মে আমি যেটা দেখটি ২০ দিনের মধ্যে পালন করতে হবে। সেটা আমার টিমকে উদ্ভুদ্ধ করছি তা ৭ দিনে করে দেয়া যায় কিনা?

শেয়ারবাজারনিউজ: কোন কোম্পানির শেয়ার দর নির্দিষ্ট সময়ে অনেক উল্লম্ফন বা পতন ঘটলে অনেকেই অভিযোগ করে ডিএসই চাইলে এটা ঠেকাতে পারে। এ বিষয়ে কি বলবেন?

মাজেদুর রহমান: উল্লম্ফন বা পতনের দিকে লক্ষ না করে আমাদের যে ভাল লিস্টেড কোম্পানিগুলো রয়েছে তাদের যে কোন একটাতে দীর্ঘমেয়াদে বিনিয়োগ করলে আমার মনে হয় এমটি হওয়ার কথা না। তবে অবশ্যই ভালভাবে জেনে বুঝে যাচাই করে বিনিয়োগ করতে হবে। এইটা আশা করা ঠিক হবে না, আমি আজ ১০ টাকায় শেয়ার কিনে কাল ২০ টাকা পেয়ে যাব। সেটা বাজারের স্বার্থেও ভাল না, বিনিয়োগকারীর স্বার্থেও ভাল না।

শেয়ারবাজারনিউজ: বাজার গতিশীল কিনা?

মাজেদুর রহমান: আমি বলব বাজার গতিশীলতার দিকে যাচ্ছে।

শেয়ারবাজারনিউজ: সাম্প্রতিক সময়ে নাশকতার কারণে পুঁজিবাজারে বিদেশী বিনিয়োগে প্রভাব পড়বে কিনা।

মাজেদুর রহমান: না, এখনো কোন প্রভাব পড়েনি, আশাকরি সামনেও পরবে না। সন্ত্রাস নিয়ে আমাদের ভয় পাওয়ার কোন কারণ নাই, তবে সাবধান হওয়ার প্রয়োজন রয়েছে। নাশকতা শুধু আমাদের দেশেই হয়নি, ছিটেফোটা বিশ্বব্যাপি হচ্ছে।

শেয়ারবাজারনিউজ: ওভার দ্য কাউন্টার (ওটিসি) মার্কেটের কিছু কোম্পানি ভাল করছে এবং ভাল ডিভিডেন্ডও দিচ্ছে। কিন্তু তারা মূল মার্কেটে ফিরে আসার জন্য কোন আবেদনও করছে না এবং তেমন আগ্রহীও না। এ ব্যাপারে কি বলবেন?

মাজেদুর রহমান: ওটিসি’র কোন কোম্পানির মনোভাব যদি এই হয় যে তারা মূল মার্কেটে ফিরে আসতে আগ্রহী নয়। তবে অবশ্যই সেখানে আমাদের কাজ করার বিষয় আছে। এছাড়া ওটিসিকে আরো উন্নয়নের কথা ভাবা হচ্ছে।

শেয়ারবাজারনিউজ/রু/সো/ম.সা

আপনার মন্তব্য

Top