অনিয়মে ইনটেক অনলাইন: হুমকির মুখে কোম্পানির আর্থিক ভিত (পর্ব:৩)

Inteckশেয়ারবাজার রিপোর্ট: পুঁজিবাজারে তালিকাভুক্ত তথ্য ও প্রযুক্তি খাতের ইনটেক অনলাইনের ২০১৩ অর্থবছরের নিরীক্ষিত হিসাব বিবরণীতে গড়মিল পাওয়া যায়। জরুরি ভিত্তিতে এর সমাধানের জন্য নিরীক্ষক প্রতিষ্ঠানের সুপারিশ সত্ত্বেও কোম্পানিটি এখনো কোন ব্যবস্থা নেয়নি বলে জানা যায়। আর শেয়ারহোল্ডারদের টাকা ইচ্ছামতো ব্যবহার করা সত্ত্বেও নিয়ন্ত্রক সংস্থা বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ এন্ড এক্সচেঞ্জ কমিশন (বিএসইসি) কোম্পানিটির বিরুদ্ধে রহস্যজনক কারণে কোন ব্যবস্থা গ্রহণ করছেনা বলে অভিযোগ উঠেছে।
এদিকে, ২০১৪ অর্থবছরের প্রথম, দ্বিতীয় এবং তৃতীয় প্রান্তিকে অস্বাভাবিক টানা লোকসানে রয়েছে কোম্পানিটি। কারণ প্রান্তিক প্রতিবেদন পর্যালোচনা করে দেখা যায় কোম্পানিটির টার্নওভারের তুলনায় লোকসানের পরিমাণ বেশি। এর কারণ হিসেবে কোম্পানির পক্ষ থেকেও শেয়ারহোল্ডারদের কোন ব্যাখ্যা দেয়া হয়নি। পরিণতিতে ২০১৪ হিসাব বছরে কোম্পানিটি শেয়ারহোল্ডারদের ডিভিডেন্ড দিতে পারবে কিনা এ বিষয়ে যথেষ্ট সংশয় রয়েছেন বাজার সংশ্লিষ্টরা।
বর্তমানে ‘এ’ ক্যাটাগরিতে অবস্থানরত কোম্পানিটি বিএসইসি’র বিভিন্ন আইন পরিপালনেও নিচ্ছে ছলচাতুরির আশ্রয়। মূল্য সংবেদনশীল তথ্য গোপন করে কোম্পানিটি বিনিয়োগকারীদের স্বার্থ লঙ্ঘন করছে বলে শেয়ারবাজারনিউজ ডট কমের অনুসন্ধানে বেরিয়ে এসেছে।
অডিট আপত্তি: ২০১৩ অর্থবছরের হিসাবে আর্থিক অস্বচ্ছতার কারণে কোম্পিানিটির বিরুদ্ধে অভিযোগ করে অডিটর এমএবিএস এন্ড পার্টনার্স। পরবর্তীতে এ অভিযোগ শেয়ারহোল্ডারদেরও জানানো হয়েছিল।
অভিযোগে বলা হয়, ব্যবসায়িক পার্টিদের কাছ থেকে ইনটেক অনলাইনের ৩ কোটি ৩৬ লাখ ৪২ হাজার ৪৬২ টাকা পাওনা রয়েছে। এ হিসাবে ব্যবসায়িক পার্টি আইভরি ট্রেডিং লি: এর কাছে ১ কোটি ৪৩ লাখ ৭১ হাজার ৪৬২ টাকা, আইভরি ট্রেডিং বিকাশের কাছে ৮৭ লাখ ৩৮ হাজার টাকা, ঐতিহ্য এর কাছে ৫৪ লাখ ১৮ হাজার টাকা, আইভরি বিল্ডার্স লি: এর কাছে ২৭ লাখ ৫ হাজার টাকা এবং আইভরি ট্যুরস এন্ড ট্রাভেলস এর কাছে ২৪ লাখ ১০ হাজার টাকা পাওনা রয়েছে।
কিন্তু এ টাকা কোম্পানিটি ব্যবসায়িক পার্টিদের কাছ থেকে উদ্ধার করতে পারেনি।
তাছাড়া নিরীক্ষকের মতে, ২০১৩ এর ৩১ ডিসেম্বর শেষে ব্যবসায়িক পার্টিদের কাছ থেকে ইনটেক অনলাইনের মোট পাওনা রয়েছে ৬ কোটি ৯৫ লাখ ৯৩ হাজার ৮৬৭ টাকা। যা এর আগের বছর একই সময়ে ছিল ২ কোটি ৯৮ লাখ ৫০ হাজার ৩৩৪ টাকা। কিন্তু এ টাকা উদ্ধার করতে না পারলে কোম্পানিটির অস্তিত্ব হুমকির মুখে পড়বে। তাই এ টাকা দ্রুত উদ্ধারের জন্য সুপারিশ করেছিল নিরীক্ষা প্রতিষ্ঠান।
জড়িত টাকা উদ্ধার হয়েছে দাবী করে কোম্পানি সেক্রেটারি মো: মহিবুল ইসলাম শেয়ারবাজার নিউজ ডট কমকে বলেন, অডিটরের পরামর্শ অনুযায়ী আমরা সম্পূর্ণ টাকা উদ্ধার করেছি।
কিন্তু কোম্পানিটির প্রান্তিক প্রতিবেদনে কিংবা ডিএসই’র ওয়েবসাইটেও এর প্রতিফলন অর্থাৎ এ বিষয়ে কোন ঘোষণা আসেনি।
এদিকে শ্রম আইন অনুযায়ী প্রতিটি কোম্পানি তার নীট মুনাফার ৫ শতাংশ শ্রমিক কল্যাণ ফান্ডে জমা করতে হয়। কিন্তু কোম্পানিটি এ আইন পরিপালন করেনি।
এ বিষয়ে কোম্পানি সেক্রেটারি বলেন, শ্রম আইনের এ বিধিমালাটি আমাদের ক্ষেত্রে প্রযোজ্য হবে না। তাছাড়া এ আইন আমাদের ক্ষেত্রে প্রযোজ্য হবে কিনা তা জানার জন্য আমরা আদালতে গিয়েছি। আদালত আমাদের জন্য প্রযোজ্য করলে অবশ্যই আমরা তা পরিপালন করবো।
এদিকে, ৩১ ডিসেম্বর ২০১৩ শেষে কোম্পানিটি ক্লোজিং ব্যালেন্স দেখিয়েছে ৪৫ লাখ ৩৮ হাজার ৫৩ টাকা। যা অস্বাভাবিক বেশি। তাছাড়া এ টাকার সমর্থনে কোম্পানি কর্তৃপক্ষ কোন সার্টিফিকেট অডিটরকে দেখাতে পারেনি।
অপরদিকে, ২০১৩ অর্থবছরের হিসাবে কোম্পানিটি ৫৫ লাখ ২৪ হাজার ৫০০ টাকার উদ্বৃত্ত পণ্য রয়েছে বলে অডিটরকে জানায়। কিন্তু অডিটর উদ্বৃত্ত পণ্যের অস্তিত্ব খুঁজে পায়নি। যা বিএএস-২ (ইনভেনটরিস) এর লঙ্ঘন।
এদিকে ডিএসই এর ওয়েবসাইটে কোম্পানিটির রিজার্ভ এন্ড সারপ্লাস দেখানো হয়েছে ১৯ লাখ টাকা। অথচ সিএসই এর ওয়েবসাইটে রিজার্ভ এন্ড সারপ্লাস দেখানো হয়েছে ২ কোটি ১১ লাখ ৬০ হাজার টাকা।

অস্বাভাবিক প্রান্তিক প্রতিবেদন: ইনটেক অনলাইন ২০১৪ হিসাব বছরের তৃতীয় প্রান্তিক পর্যন্ত অস্বাভাবিক লোকসানে রয়েছে। কারণ এ সময় পর্যন্ত হিসাব পর্যালোচনা করে দেখা যায় কোম্পানিটির টার্নওভারের চেয়ে লোকসানের পরিমাণ বেশি।
প্রাপ্ত তথ্যমতে, ২০১৪ হিসাব বছরের প্রথম তিন মাসে (জানুয়ারি-মার্চ) কোম্পানিটির টার্নওভার হয়েছে ১৬ লাখ ৭০ হাজার টাকা। কিন্তু এ সময় কোম্পানিটির কর পরিশোধের পর নীট লোকসান হয় ৪১ লাখ ৮০ হাজার টাকা। অর্থাৎ টার্নওভারের চেয়ে লোকসানের পরিমাণ ২৫ লাখ ১০ হাজার টাকা বেশি।
দ্বিতীয় প্রান্তিকে অর্থাৎ অর্ধ বার্ষিকি (জানুয়ারি-জুন) হিসাব বিবরণীতে কোম্পানিটির টার্নওভার হয়েছে ৩৪ লাখ ৯০ হাজার টাকা। কিন্তু কর পরিশোধের পর লোকসানের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ৯৩ লাখ ৪০ হাজার টাকা। অর্থাৎ টার্নওভারের চেয়ে লোকসানের পরিমাণ ৫৮ লাখ ৫০ হাজার টাকা বেশি।
তৃতীয় প্রান্তিকে (জানুয়ারি-সেপ্টেম্বর) কোম্পানিটির টার্নওভার হয়েছে ১ কোটি ৩২ লাখ ২০ হাজার টাকা। কিন্তু কর পরিশোধের পর নীট লোকসান হয়েছে ১ কোটি ৩৯ লাখ ৬০ হাজার টাকা। অর্থাৎ টার্নওভারের চেয়ে লোকসানের পরিমাণ ৭ লাখ ৪০ হাজার টাকা বেশি। আর টার্নওভারের থেকে লোকসান কেন বেড়েছে এ বিষয়ে কোম্পানি থেকে শেয়ারহোল্ডারদের কোন সুষ্ঠু ব্যাখ্যা দেওয়া হয়নি।
টার্নওভারের চেয়ে লোকসানের পরিমাণ বেশি এর কারণ জানতে চাইলে কোম্পানি সেক্রেটারি বলেন, এটা হতেই পারে। তিনি বলেন, অবচয় বা ডিপ্রেসিয়েশন ধার্য করার কারণে টার্নওভারের চেয়ে লোকসানের পরিমাণ বেশি হতে পারে।
উল্লেখ্য, কোম্পানির টার্নওভারের থেকে সব খরচ বাদ দিলে নীট প্রফিট পাওয়া যায়।
বর্তমান ব্যবসায়িক অবস্থা: বর্তমানে কোম্পানিটির ব্যবসায়িক অবস্থা ভাল যাচ্ছে না। যার প্রভাব ২০১৪ অর্থবছরের হিসাবে পড়েছে। এর জের ধরে কোম্পানিটি বর্তমানে লোকসানে রয়েছে। অথচ আইটি খাতের অন্য কোম্পানিগুলো বর্তমানে ভাল ব্যবসা করছে। তাছাড়া আইটি খাতে বর্তমান সরকারও বিশেষ সুযোগ সুবিধা দিচ্ছে। এর অংশ হিসেবে আইটি খাতের ক্ষেত্রে ২০১৫ সালের জুন পর্যন্ত ইনকাম ট্যাক্স অব্যাহতি দেওয়া আছে।
এ বিষয়ে কোম্পানিটির পক্ষ থেকে জানানো হয়, ইনটেক অনলাইনের মূল ব্যবসা ব্রডব্যান্ড ইনটারনেট সার্ভিস দেওয়া। কিন্তু বর্তমানে বেশিরভাগ গ্রাহক মোবাইল নেটওয়ার্ক কোম্পানির মাধ্যমে ইনটারনেট সার্ভিস নিচ্ছে।
তাছাড়া এই খাতে অনেক আধুনিক প্রযুক্তি যুক্ত হলেও ইনটেক অনলাইন এ ক্ষেত্রে অন্য কোম্পানিগুলোর তুলনায় পিছিয়ে রয়েছে।
এদিকে, কোম্পানিটি গত আট বছর ধরে শেয়ারহোল্ডারদের ১০ শতাংশ স্টক ডিভিডেন্ড দিয়ে আসছে। শুধুমাত্র ক্যাটাগরি ধরে রাখার জন্যই নামমাত্র এ ডিভিডেন্ড দেওয়া হচ্ছে। কিন্তু কোম্পানিটির ক্রমানবতি সত্ত্বেও একে ঘিরে পুঁজিবাজারে সক্রিয় রয়েছে কারসাজিচক্র। এর অংশ হিসেবে গত ৬ মাসে তিনবার কোম্পানির কাছে অস্বাভাবিকভাবে শেয়ারদর বাড়ার কারণ জানতে চাওয়া হয়েছে।

শেয়ারবাজার/তু/সা

আপনার মন্তব্য

Top