চুইংগাম বিক্রি করা ওয়ারেন বাফেট যেভাবে সাফল্যের শীর্ষে

warren 2আমাদের পত্রিকার শেয়ারবাজার লিজেন্ড বিভাগে গত দুই পর্বে মিউচ্যুয়াল ফান্ডের বিবেক বলে খ্যাত জন সি বোগলে’কে নিয়ে লেখা প্রকাশিত হয়। প্রকাশিত প্রতিবেদন দু’টিতে জন বোগলে’র সংক্ষিপ্ত জীবনী এবং সফল বিনিয়োগে তার দেয়া পরামর্শ তুলে ধরা হয়।  সেই ধারাবাহিকতায় আজকের আয়োজন ওয়ারেন বাফেটকে নিয়ে। এ পর্বে আমরা ওয়ারেন বাফেটের সংক্ষিপ্ত জীবনী এবং কিছু দিক নির্দেশনা তুলে ধরার চেষ্টা করেছি। আশা করি শেয়ারবাজারনিউজ ডটকমের পাঠকরা এই লেখা থেকে উপকৃত হবেন।

ওয়ারেন বাফেটের পরিচিতি: সারা বিশ্বের ইতিহাসে ওয়ারেন বাফেট একজন সফল বিনিয়োগকারী হিসেবে সমাদৃত। ১৯৩০ সালের ৩০ আগস্ট নেব্রাক্সা অঙ্গরাজ্যর ওমাহাতে জন্মগ্রহণ করা বাফেট একজন মার্কিন ব্যবসায়ী, বিনিয়োগকারী এবং জনহিতৈষী ব্যক্তি। তাকে “ঋষি” বা ওমাহা এর “ওরাকল” হিসেবে অভিহিত করা হয়। বাফেটকে বিংশ শতকের সবচেয়ে সফল বিনিয়োগকারী হিসেবে বিবেচনা করা হয়। বাফেট বার্কশায়ার হ্যাথাওয়ে কোম্পানির প্রধান নির্বাহী। তিনি ধারাবাহিকভাবে বিশ্বের সবচেয়ে ধনী ব্যক্তি হিসেবে বিবেচিত হয়ে আসছেন।২০১১ সালে বাফেট বিশ্বের তৃতীয় ধনী ব্যক্তি ছিলেন। টাইম ম্যাগাজিন” টাইম ম্যাগাজিন তাকে বিশ্বের অন্যতম প্রভাবশালী ব্যক্তি ঘোষণা করে।

বেঞ্জামিন গ্রাহামের নীতি অনুসারে, আসলে বাফেট ব্যাক্তিগতভাবে স্টকে বিনিয়োগ করে এবং বার্কশায়ার হ্যাথাওয়ের শেয়ারে বিনিয়োগ এবং বিক্রয়ের মাধ্যমেই ভাগ্যক্রমে মিলিয়ন ডলার অর্জন করেছেন।তার মতে, যে সকল বিনিয়োগকারীই ১৯৬৫ সালে বার্কশায়ার হ্যাথাওয়ে কোম্পানিতে ১০ হাজার ডলার বিনিয়োগ করেছে তারা প্রত্যেকেই বর্তমানে ৫০ মিলিয়ন ডলার অর্জন করতে সক্ষম হয়েছেন।

warren 8

ওয়ারেন্ট বাফেটের পরিবার

ব্যক্তিগত জীবনী: ৬ বছর বয়সে ওয়ারেন বাফেট বাড়িতে বাড়িতে গিয়ে জুসি ফ্রুট চুইংগাম (৫টিতে এক প্যাকেট) এবং কোকা-কোলা বিক্রি করতো। সে সবসময়ই পুরো প্যাকেট একসঙ্গে বিক্রি করতো। এতে তার প্রতিটি প্যাকেটে দুই সেন্ট করে লাভ হতো। বাফেট তার দাদার দোকান থেকে কোকা-কোলা (৬টিতে এক প্যাকেট, মূল্য ২৫ সেন্ট) কিনে তা বাড়ি বাড়ি গিয়ে ৩০ সেন্টে বিক্রি করতো। মাত্র ১১ বছর বয়সেই বাফেট সিটিস সার্ভিসের (বর্তমানে যেটার নাম CITGO, এটি একটি অয়েল কোম্পানি) ৬টি শেয়ার কিনে শেয়ার ব্যবসার জগতে প্রবেশ করেন।  ১৫ বছর বয়সে বাফেট পত্রিকা, কেলেন্ডার বিক্রি শুরু করেন। নানা চড়াই উৎড়াই পেরিয়ে ২২ বছর বয়সে ১৯৫২ সালে ওয়ারেন বাফেট সুসান বাফেটকে বিয়ে করেন। তাদের তিন সন্তান রয়েছে- সুসি, হাওয়ার্ড ও পিটার। ১৯৭৭ সালে বাফেট দম্পতি পৃথকভাবে থাকতে শুরু করে যদিও ২০০৪ সালে সুসান মারা যাওয়ার পূর্ব পর্যন্ত তারা বিবাহিত ছিল। তাদের সন্তান সুসি ওমাহাতে থাকে এবং সেখানে জনহিতৈষীমূলক কাজ করে। ২০০৬ সালে ছিয়াত্তরতম জন্মদিনে বাফেট তাঁর দীর্ঘদিনের পরিচিত অ্যাসট্রিড ম্যাঙ্কসকে বিয়ে করেন। বাফেটের ছেলে পিটার ২০০৬ সালে নিকোল নামে এক মেয়ে দত্তক নেয়। যদিও পিটারের প্রথম স্ত্রী নিকোলকে গ্রহণ করেছিলেন কিন্তু বাফেট এক পত্রের মাধ্যমে নিকোলকে জানিয়ে দেন যে, তিনি এবং তাঁর পরিবার নিকোলকে মেনে নেয়নি।

warren 4

ওয়ারেন বাফেটের ছোটবেলা, যৌবন ও শেষ জীবনের চিত্র

বাফেট একজন অত্যন্ত উৎসাহী কনট্র্যাক্ট ব্রিজ খেলোয়ার। বিল গেটসের সাথে তিনি প্রায়ই ব্রিজ খেলেন। তিনি সপ্তাহের প্রায় ১২ ঘন্টা এ খেলা খেলেন। বাফেট নেব্রাস্কা ফুটবলের ভক্ত। তিনি তাঁর ব্যস্ত সময় থেকে যতটা সম্ভব ফুটবল খেলা দেখতে যান। বাফেট দৈনিক পাঁচটিসংবাদপত্র পড়েন। তিনি চীনদেশের তৈরি ট্র্যান্ডস ব্র্যান্ডের স্যুট পরিধান করেন, এর আগে তিনি আরম্যানিগিল্ডো যিগনা ব্র্যান্ডের স্যুট পড়তেন।

২০০৬ সালে বাফেটের বার্ষিক বেতন ছিল এক লক্ষ ডলার, যা বার্কশায়ার হ্যাথাওয়ের সমকক্ষ অন্যান্য কোম্পানির সিনিয়র নির্বাহীর বেতনের চেয়ে কম।২০০৭ ও ২০০৮ সালে তিনি মোট ১ লাখ ৭৫ হাজার ডলার বেতন পান; এর মধ্যে মূল বেতন ছিল মাত্র এক লক্ষ ডলার। ১৯৫৮ সালে বাফেট যে বাড়িটি কিনেছিলেন, এখনো তিনি ওমাহার সেই বাড়িতেই বাস করেন। এর বর্তমান মূল্য সাত লাখ ডলার, যদিও সেসময়ে তিনি ৩১ হাজার 0৫০০ ডলারে বাড়িটি কিনেছিলেন। ১৯৮৯ সালে বাফেট ব্যক্তিগত জেট বিমান ক্রয়ে প্রায় ৬.৭ মিলিয়ন ডলার ব্যয় করেছিলেন। তিনি এর নাম দিয়েছিলেন ‘ইন ডিফেন্সিবল্‌’। এটি ছিল তাঁর অন্যান্য সময়ের মানসিকতার চেয়ে সম্পূর্ণ ভিন্ন এক পদক্ষেপ; তিনি সবসময়ই বড় বড় কোম্পানির প্রধান নির্বাহীদের ব্যয়বহুল খরচের প্রতি নিন্দা জানাতেন এবং নিজেও অধিকাংশ সময় গণপরিবহণ ব্যবহার করতেন।

warren 5

ওয়ারেন বাফেটের সঙ্গে বিল গেটস

কর্মজীবন: ওয়ারেন বাফেট ১৯৫০ সালে নেবাস্ক্রা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে স্নাতক ডিগ্রি লাভ করেন। বেঞ্জামিন গ্রাহামের “ইনটিলিজেন্ট বিনিয়োগকারী” বইটি পড়ার পর তিনি গ্রাহামের নিকটে এই বিষয়ে অধ্যয়ন করতে চেয়েছিলেন। এরই ধারাবাহিকতায় তিনি গ্রাহামের অধীনে থেকেই ১৯৫১ সালে স্নাতকোত্তর ডিগ্রী অর্জন করেন। এরপর তিনি ওমাহা ফিরে আসেন এবং বাফেট-ফাল্ক অ্যান্ড নামক একটি বিনিয়োগ ফার্ম গঠন করেন। সেখানে তিনি ১৯৫১ থেকে ১৯৫৪ সাল পর্যন্ত কর্মরত ছিলেন। আর এ সময়ের মধ্যে বাফেটের সঙ্গে গ্রাহামের ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক গড়ে ওঠে, যে কিনা তাঁর সময় এবং চিন্তার বিষয়ে উদার ছিলেন। সাবেক অধ্যাপক ও ছাত্রের এই ঘনিষ্ঠ সম্পর্কে কারণেই অবশেষে বাফেটকে গ্রাহাম নিউ ইয়র্কের গ্রাহাম-নিউম্যান কর্পোরেশন কোম্পানিতে চাকরির সুযোগ দান করা হয়। যেখানে তিনি একটি নিরাপত্তা বিশ্লেষক হিসেবে ১৯৫৪ থেকে ১৯৫৬ সাল পর্যন্ত দায়িত্ব পালন করেন। এই দুই বছর গ্রাহামের সাথে থেকে ও শত শত বিশ্লেষণধর্মী শিক্ষামূলক কোম্পানি নিয়ে কাজ করায় স্টক বিনিয়োগ করতে বাফেট আগ্রহী হয়ে ওঠে। যা কিনা বাফেটকে একজন সফল বিনিয়োগকারী হওয়ার পথে পৌঁছে দেওয়ার পথ সুগম করে।

স্বাধীনভাবে কাজ করার লক্ষ্যে ২৫ বছর বয়সেই বাফেট ওমাহায় নিজ বাড়িতে ফিরে আসেন এবং অংশীদারিত্বের ভিত্তিতে পারিবারিকভাবেই ১০ ডলার নিয়ে মূলধন ভিত্তিক ব্যবসা শুরু করেন। ১৯৫৬ থেকে ১৯৬৯ সালের মধ্যেই বাফেটের অংশীদারিত্ব বিলুপ্ত হয়। প্রতি শেয়ারেই ৩০ ধাপ পর্যন্ত লাভ করতে সক্ষম হওয়ায় বাফেট পূর্ণাঙ্গ বিনিয়োগকারী হিসেবে আত্নপ্রকাশ করেন। অংশীদারিত্ব থেকে বাফেট বের হওয়ার চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেন কারণ, বার্কশায়ার হ্যাথাওয়ে টেক্সটাইলের নিউ বেডফোর্ড, ম্যাসাচুসেটস, শেয়ারে লাভবান হতে পারেননি।কিন্তু ১৯৬৫ সালে বার্কশায়ার কোম্পানির আর্থিক কাঠামো পরিবর্তন করায় বাফেটের ও ভাগ্যের চাকা ঘুরে যায়।

warren 7

ওয়ারেন বাফেটের সঙ্গে মার্কিন প্রেসিডেন্ট বারাক ওবামা

টেক্সটাইল ব্যবসা রাখা, এমনকি প্রচুর চাপ মুখে থাকা সত্ত্বেও বার্কশায়ার তার অন্যান্য অন্যান্য বিনিয়োগের মাধ্যমেই কোম্পানীর আধিপত্য ধরে রাখতে সক্ষম হয়েছিল। এটা ১৯৭৩ থেকে ১৯৭৪ সালে যখন বার্কশায়ারের শেয়ারের পতন হয়েছিল তখনই দর কষাকষি করে অন্যান্য কোম্পানি ক্রয় করার সুযোগ পেয়েছিলিনে বাফেট। তখন তিনি শেয়ার ক্রয়ে মাতাল হয়ে ওঠেছিলেন যা ওয়াশিংটন পোস্টে একটি বড় বিনিয়োগ হিসেবে অন্তর্ভুক্ত হয়. ব্যবসায়ের বৈচিত্রতা আনয়নের মাধ্যমে বার্কশায়ার হ্যাথাওয়ে কোম্পানিটি বর্তমানে আজকের ইতিহাসে সাফল্যের গুরু হিসেবে পরিচয় বহন করে। ২০০৬ সালের শেষ দিকের হিসেব অনুযায়ী, এ কোম্পানির মোট সম্পদের পরিমান ১০০ বিলিয়ন ডলার থেকে যথাক্রমে বেড়ে দাঁড়িয়েছিল ২৪০ বিলিয়ন ডলার।

বিনিয়োগের কৌশল: শৃঙ্খলা, ধৈর্য এবং মান এই তিনটিকে বিনিয়োগের কৌশল হিসেবে প্রাধান্য দেয়ায় ওয়ারেন বাফেট ধারাবাহিকভাবে কয়েক দশক ধরেই বাজার ছাপিয়ে রেখেছে। “মানি মাস্টার্স” (1980) গ্রন্থের লেখক, জন ট্রেন, বাফেট এর বিনিয়োগ পদ্ধতির একটি সংক্ষিপ্ত বিবরণ প্রদান করেছেন: “ওয়ারেনের চিন্তাভাবনার সারমর্ম এই যে, বিশ্ব বানিজ্যকে একটি ক্ষুদ্র সংখ্যার বিস্ময়কর ব্যবসায় বিভক্ত করেন্।

তার মতে, সবসময় বিক্রি করলে যে ভালো মুল্য পাওয়া যাবে তা ঠিক নয়।কারন এটা খুবই বিরল যে, বিস্ময়করভাবে না হলে ব্যবসা থেকে দ্রুত লাভবান হওয়া্। যখন এটা ঘটবে যে, বর্তমান অর্থনীতিতে মন্দাভাব রয়েছে ঠিক তখনই নির্ভয়ে শেয়ার কিনতে মনযোগ দিতে হবে। কেননা, এটা স্টক মার্কেট ভালো হওয়ার পূর্বাভাস।” warren 6

ওয়ারেন বাফেটের দৃষ্টিতে সফল ব্যবসায়ী যারা:

তারাই মূলধনের ওপর ভাল মুনাফা করে যাদের ঋণের বোঝা নেই।

* তাদের বোধগম্য শক্তি প্রবল।

* তারা নগদ প্রবাহে (ক্যাশ ফ্লো) তাদের লাভ দেখতে পায়া।

* তারা শক্তিশালী এবং দরমূল্য নির্ধারণে স্বাধীনতা আছে।

* যাদের ব্যবস্থাপনা নিজস্ব মালিক-ভিত্তিক হয়।

গুরুত্বপূর্ণ উক্তি:

০১.”বিধি নম্বর ১ হচ্ছে  বিনিয়োগ হারানো যাবেনা এবং বিধি নম্বর ২ হচ্ছে কখনোই বিধি নম্বর ১ ভোলা যাবে না।”

০২.”শেয়ার যেন নিছক কাগজের টুকরা না হয়। কেননা, তারা একটি ব্যবসার অংশ মালিকানা প্রতিনিধিত্ব করে। তাই, যখন একটি বিনিয়োগ নিয়ে চিন্তা করা হয়, তখন তার সম্ভাব্য মালিক মনে করতে হয়।”

০৩.” সকল বিনিয়োগই ভাল স্টক হয় ভাল সময়ে এবং যতদিন তারা ভাল কোম্পানি থাকে ঠিক ততদিনই তাদের সঙ্গে থাকতে হয়।”

০৪. “বাজারের অস্বাভাবিক ওঠা-নামাকে আপনার শত্রু নয় বরং বন্ধু হিসেবে দেখেন। আর এতে ভালো জ্ঞানের মাধ্যমে অংশগ্রহণ করলে মুনাফা পাওয়া যায়। ”

শেয়ারবাজারনিউজ/মা/ম.সা

আপনার মন্তব্য

*

*

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.

Top